তমসুর হোসেন
১ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ | ১০:৫৫

অপার্থিব আনন্দ

tesst

রাত দশটা হবে। ঘন কুয়াশায় ঢেকে গেছে চারদিক। কনকনে শীতে জমে যাচ্ছি। বিশেষ প্রয়োজনে শহরে দেরী হয়ে গেছে। বাসায় ফেরার জন্য একখানা রিক্সা তালাশ করছি। স্ট্যা-ে যে ক’জন রিকসাওয়ালা যাত্রীর জন্য অপেক্ষা করছে তারা শহরের বাইরে যেতে নারাজ। ভাবলাম হেঁটে হেঁটে সুজামের মোড় পর্যন্ত গেলে হয়তঃ গ্রামের ফিরতি রিকসা পাওয়া যাবে।
একজন রিকসাচালক বলল, কুড়ি টাকা হলে সে আমাদের গ্রাম পলাশবাড়ী যাবে। কতই বা ভাড়া হবে এখান থেকে। বড়জোড় দশ টাকা। আমি বললাম, ওসব বাদ দাও পনের টাকা দেব। অনেক কথার পর ও যেতে রাজি হলো। তানা হলে তো ওকে খালি রিকসা টেনে বাড়ি ফিরতে হবে। অত রাতে ও প্যাসেঞ্জারই বা পাবে কোথায়। আমি বললাম, একটু অপেক্ষা কর। বাথরুম সেরে আসি।’ হায়রে টার্মিনালের বাথরুম! পেসাবখানায় কোন যাত্রী যেন মলত্যাগ করেছে। আর পায়খানায় তো ঢোকার উপায় নেই। অগত্যা কোন রকমে কাজ সেরে পায়চারি করছি। আকাশে মনে হয় জোসনা ছিল। বিজলি বাতি, জোসনার আলো ম্লান করে দিয়েছে পৌষের কুয়াশা। লোকজন নেই বাসস্ট্যা-ে । দু’একজন হেলপার অযথা ঘোরঘুরি করছে। গায়ে চাদর মুড়ি দিয়ে পানবিড়ি বিক্রি করছে কিছু উটকো দোকানদার। ভেতরের একটি বন্ধ দোকানের বারান্দায় কচি কন্ঠের অস্পষ্ট কান্না শুনতে পেলাম। কে ওখানে কাঁদছে। একটি ফুটফুটে মেয়ে। আমার মেয়ে তুলির মতো দেখতে। দেরী না করে তাড়াতাড়ি কোলে তুলে নিলাম। গায়ে হাত দিয়ে দেখলাম জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে। কি করা যায়! এত রাতে কোথা থেকে আসল এখানে। চাদর পেঁচিয়ে বুকের কাছে নিলাম। হায়রে আমার প্রাণের বাছা! আমি যদি না আসতাম আজ তোমার ভাগ্যে কি হত খোদাই জানে। আচ্ছা, বাড়ির লোকেরা করছেটা কি? এতটুকু পিচ্চি মেয়েটা একা একা কি করে বাস টার্মিনালে পৌঁছল। কারও নজরে কি পড়ল না। রিকশা, ঠেলা, টেম্পো, মাইক্রো এড়িয়ে কি করে সে এখানে এসেছে। আহা, জ্বরের তাপে মাঝে মাঝে প্রলাপও বকছে। নরম দেহখানা থেকে জ্বরের ভাঁপ বের হয়ে আমার বুক পুড়িয়ে দিচ্ছে। হায় আমার আদরের মা মনি! লোকের ভীড়ে আজ তুমি হারিয়ে গেলে এই বিস্তীর্ণ সংসারে কোথায় তোমাকে খুঁজে পেতাম।

রিকসাচালককে বললাম,‘ ভাই, একটু জলদি চালাও।’ এত রাতে কোথায় পাব ডাক্তার, কোথায় পাব ঔষধপত্র। টাউন ফার্মেসী তো বেশী রাত করে বন্ধ করে। ওখানে একজন ডাক্তারও বসে। দেখা যাক ওখানে গিয়ে যদি ডাক্তারের দেখা মেলে। আবার ভাবলাম সরাসরি বাড়ি যাই। বাড়ি পৌঁছলে একটা পথ অবশ্যই বের হবে। তুলিকে ডাকলাম। ‘মা তুলি, কি করে একা এতদূর এসেছ মা। আব্বুর কথা খুব মনে পড়েছে তাইনা? কথা বলতো মা, শুনি কি হয়েছে তোমার। মাথা ব্যথা করে? দেখি মাথাটা ঘষে দেই।’ কোন কথা নেই মেয়ের মুখে। শুধু থরথর করে কাঁপছে। জ্বরের ঘোরে একবার শুধু বলল,‘ আম্মু যাব।’ আমি বললাম,‘ তোমার আম্মুর কাছেই তো যাচ্ছি। নে ভাই রিকসাঅলা, একটু জোরে চালা না ভাই।’

জলদি বাড়ি ফেরা দরকার আমার। ওদিকে নিশ্চয় তোলপাড় হচ্ছে। তুলিকে কে কোথায় খুঁজছে তার হয়ত ইয়ত্তা নেই। আমি বাড়ি ফিরলে সবাই স্বস্তি পাবে। ওরা হয়ত ওকে বাড়ির আশেপাশে খুঁজে বেড়াচ্ছে। কিন্তু মেয়েটা যে এতদূরে এসে জ্বর সর্দিতে কাবু হয়ে পড়েছে তা ওরা কি করে জানবে। বাড়ি এসে দেখি অবাক কা-। খেয়ে দেয়ে লেপ মুড়ি দিয়ে সবাই নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে। তুলিও ঘুমাচ্ছে ওর মায়ের গলা জড়িয়ে। বুক থেকে নামিয়ে মেয়েটিকে পাশের বিছানায় শুইয়ে দিলাম। স্ত্রীকে বললাম,‘ওকে বাসষ্ট্যা-ে কুড়িয়ে পেলাম। জ্বরে ওর গা পুড়ে যাচ্ছে। মনে করেছি ও আমাদের তুলি। একটু চেষ্টা করে দেখ, কথা বলে কিনা।’

রাহেলা ওর কপালে জলপট্টি দিল। উষ্ণ পানিতে তোয়ালে ভিজিয়ে বারবার গা মোছাতে লাগল। আমি ওকে দু’চামচ পাইরাক সিরাপ খাইয়ে দিলাম। জ্বরটা একটু নেমে এলে ওর সুগোল মায়াবী মুখখানা ভাল করে নিরীক্ষণ করলাম। এ যে আমার তুলির সাক্ষাত প্রতিরূপ। খুঁজে দেখলাম সোকেসে কোট্রিম সিরাপও আছে। তারও দু’চামচ ওকে খাইয়ে দিতেই ও চোখ মেলে তাকাল। বারবার চেষ্টা করেও ও কথা বলতে পারল না। শুধু কাঁদল। খুবই দুঃখ পেলাম ওর বিষন্ন চেহারা দেখে। সারারাত আমরা ঘুমাতে পারলাম না। আমার বৃদ্ধা জননীও দুর্বল শরীরে সারারত ওর পাশে বসে কাটাল।

পরদিন ওকে হাসপাতালে নিয়ে ডাক্তার দেখালাম। রক্ত পরীক্ষায় ধরা পড়ল বেনাইন টারসিয়ান ম্যালেরিয়া। প্রিসক্রিপশন অনুযায়ী চিকিৎসা চলল। আল্লাহর কৃপায় চারদিনের মাথায় ও সুস্থ হয়ে উঠল। অসুস্থতার ধকল সামলিয়ে ও স্পষ্ট করে নিজের নাম বলতে পারল। ওর নাম অর্পিতা, আমার তুলির সমবয়সী। পাশাপাশি দাঁড়ালে যমজ বোন মনে হয়। ওকে পেয়ে তুলি আনন্দিত হল। মনের মত একজন খেলার সাথী পেয়ে তুলি খাওয়া দাওয়া ভুলে গেল। অর্পিকে নিয়ে সারাদিন ও খেলতে চায়। কিন্তু অর্পি খেলতে চায়না। সারাক্ষণ কাঁদে আর আম্মু আম্মু বলে। চার বছর বয়স হবে। আব্বু আম্মুর নাম বলতে পারলেও বাড়ির ঠিকানা বলতে পারেনা। ওকে দেখলে আমার বুক কেঁপে ওঠে। ওকে না পেয়ে ওর বাবা-মা না জানি কত কষ্ট পাচ্ছে। পরণের পোষাক এবং চেহারা দেখে মনে হয় ও ভদ্র ঘরের সন্তান হবে।

আমার মাথায় শুধু একটা চিন্তা ঘুরপাক খায়, বাসস্ট্যা-ে অর্পিতা এল কি করে। এতটুকু মেয়ে কি একা একা এসেছে এখানে। যেখানে নিত্যদিন অসংখ্য লোকের সমাগম। কত মানুষ আসে দূর দূরান্ত থেকে। কোন বাবা-মা অসাবধান বশতঃ তাদের কন্যাকে রেখে গেছে। এখন তাদের সন্ধান কি করে পাওয়া যাবে। কী করে বাবা-মায়ের কাছে ওকে তুলে দিতে পারি। রাতে হঠাৎ ঘুম থেকে জেগে ও যখন আম্মু আম্মু বলে চিৎকার শুরু করে তখন রাহেলা ওকে সামলাতে গিয়ে হয়রান হয়ে পড়ে। ‘এই তো আমি আছি, তোমাকে ছেড়ে কোথাও যাইনি। আমার সোনা মা কাঁদেনা।’ কিন্তু অর্পিতা এ সবে কান দেয়না। সে কান্নাভেজা চোখে চারদিকে তার জননীকে খুঁজতে থাকে। এভাবে অসহায় কষ্টে কেঁদে কেঁদে ক্লান্ত হয়ে একসময় সে ঘুমিয়ে পড়ে।

অর্পিতাকে নিজের সন্তানের মতো আপন করে নেয়ার জন্য রাহেলা সর্বদা তৎপর থাকে। তুলির সাথে খেলা দিয়ে ওকে গোসল করায়। দু’জনকে একসাথে গল্প করে খাওয়ায়। সুর করে নানান রকম ছড়া শোনায়। মজার মজার গল্প বলে হাসিখুশী রাখার চেষ্টা করে রাহেলা। সুন্দর একখানা খেলনা গাড়িও কিনে এনেছে সে। গাড়ী চালানোর কাজে ব্যস্ত রেখে তার মায়ের কথা ভুলে যেতে সাহায্য করে রাহেলা। নানারকম খেলনা, সুন্দর জামাকাপড় এবং রুচিকর খাবার দাবাড়ে ওকে মগ্ন রাখার চেষ্টা সে কম করেনা। কিন্তু অর্পিতাকে ওসব দিয়ে খুব একটা ভুলিয়ে রাখা যায়না। ওর মুখে যদি কখনও এক চিলতে হাসি ফোঁটে সে হাসিও বিষাদের কাল মেঘে রাঙানো থাকে। ওর মন কখনই প্রসন্ন হয়না। মনে হয় ঘন মেঘে ঢেকে আছে আকাশের প্রচ্ছদ। ওর বিষাদমাখা অবয়ব দেখে আমার খুব খারাপ লাগে। কিন্তু উপায় কি? কোথায় খুঁজে পাব আমি ওর জনক জননীকে।

শেষ বিকেলে বারান্দায় বসে ওকে নিয়ে ভাবছি। আর ভাবছি আমার তুলি যদি এমন করে হারিয়ে যেত তখন কি রকম অন্তর্ভেদী প্রদাহে আমার বুক পুড়ে যেত। তার কচি মুখের নির্মল জ্যোতি হৃদয়ের আয়নায় কতবার বিম্বিত করতাম। পৃথিবীর সকল জনপদে তাকে খোঁজার জন্য ছুটে যেতাম উদাস গৃহত্যাগী হয়ে। এক জীবনে না হলে খোদার কাছে আমি আবারও পরমায়ু প্রার্থনা করতাম। তবু আমার নয়ন পুত্তলি, অন্তরের প্রশান্তি তুলিকে খুঁজে বের করতাম। এসব কথা ভেবে আমার মন বেদনায় ভরে গেল। অন্তর কেঁদে উঠল। এই ফাঁকে অর্পিতা এসে আমার কাছে দাঁড়াল। আমি ওকে বুকে তুলে নিলাম। তখন আমার কাঁধে মাথা রেখে ও বলল,‘ আম্মু যাব।’ ওর কথা শুনে আমি অবোধ শিশুর মত কাঁদতে লাগলাম। সকল পথ, সকল প্রচেষ্টার ফল লাভের সম্ভাবনা যখন রুদ্ধ হয়ে যায় তখন কান্নাই হয় সান্তনার একমাত্র অবলম্বন। কান্নাই পারে তার প্রশমন শক্তি দিয়ে হৃদয়ের বেদনা মোচন করে দিতে।

এরই মধ্যে কখন রাহিলা আমার পাশে এসে বসেছে টেরই পাইনি। আমার কোল থেকে অর্পিতাকে নিয়ে সে আদর করে চুমু খেল। নরম কন্ঠে আমাকে বলল,‘ একটা কথা খেয়াল করেছ? এ আমার হারিয়ে যাওয়া পলি। বেঁচে থাকলে পলি কত বড় হত? ও মারা যাওয়ার তো ছয় সাত বছর পার হল। খোদা আমাদের হারানো ধন ফিরিয়ে দিয়েছে। ওকে পেয়ে আমার শূন্য বুকটা ভরে গেছে। একটি মুহুর্তও আমি ওকে ছেড়ে থাকতে পারব না।’

রাহেলাও আমার সাথে কাঁদতে লাগল। একই বেদনার বৃষ্টিতে দু’জনে ভিজছি। পলির কথা মনে পড়ায় আমার শূন্য বুকটা হু হু করে কেঁদে উঠল। জন্মের তিন বছর পর পলি নিউমোনিয়া হয়ে মারা গেছে। সারাটা বাড়ি আলো করে সে ছুটে বেড়াত। তার মৃত্যুতে শীতল অন্ধকারে ডুবে গেল এ বাড়ির উঠোন, ঘর দরজা। তারপর একদিন প্রথমা চাঁদের মত আলোর ছটা ছড়িয়ে আমাদের কোলে তুলি এল। তুলিকে বুকে চেপে আমরা পলিকে ভুলতে প্রবৃত্ত হলাম। একটা আকস্মিক ঘুর্ণিঝড়ে ক্ষতবিক্ষত হয়ে খোদার কাছে প্রার্থনা করলাম পলি যেন আকাশের তারা হয়। আজও তার কথা হৃদয় থেকে মুছে যায়নি। সে আমার সমস্ত অনুভূতির সাথে মিশে আছে। পলি তো এই মায়াময় জগতে বেঁচে নেই। দৃশ্যমান জগতের কোনখানে তাকে খুঁজে পাওয়া যাবেনা।

কিন্তু অর্পিতাকে ওর বাবা-মা কি করে ভুলতে পারবে। তাদের অন্তরের বাঁধভাংগা ব্যথা আমি স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করতে পারছি। পলিকে হারিয়ে আমি যে কষ্ট পেয়েছি তাই আমার দৃষ্টি খুলে দিয়েছে। আমার হৃদয় করেছে প্রসারিত। গভীর রাতে প্রগাঢ় আঁধারের নিমগ্নতায়, তারার ম্লান আলোয় অনুজ্জ্বল পা-ুর মেঘের ব্যথামগ্ন অস্তিত্বের সন্ধান পাই। রাহেলাকে অর্পিতার বাবা-মায়ের কষ্টের ধারণা দেয়ার চেষ্টা করি। সন্তানহারা সে দম্পতির কাছে তাদের কলিজার টুকরাকে ফিরিয়ে দেয়া আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। এ কথা শুনে রাহেলা বিচলিত হয়ে উঠল। আমাকে অনুনয়ের সুরে বলল,‘ খোদার দোহাই, এমন কাজ তুমি করবেনা। ও অর্পিতা নয়, ও আমাদের হারিয়ে যাওয়া পলি। ওকে তো আমরা নিজের সন্তান করে নিয়েছি। ও অসুখী হবে এমন কাজ কোনদিনই আমরা করব না। তুমি ওকে ফিরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করবে না। ওকে ছাড়া আমি বাঁচব না।’

আমি বললাম,‘রাহেলা, বিষয়টি নিজের করে ভাবতে শেখ। তুলি যদি হারিয়ে যেত তাহলে আমাদের চোখের ঘুম কি বন্ধ হতনা? ওর মা-বাবার কষ্টটুকু বোঝার চেষ্টা কর। তাদের মর্মভেদী হাহাকারের কথা তুমি কি খেয়াল করেছ। প্রথম দেখাকেই আমি মনে করেছি ও আমাদের তুলি। টার্মিনালের অন্ধকার বারান্দায় বসে কাঁদছে। জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে। আমার বুকটা তখন মোচড় দিয়ে উঠেছিল। মা হয়ে আরেক মায়ের বুকের রোদন তুমি কি উপলব্ধি করতে পারনা?’

আমার কথা শুনে রাহেলা চুপ করে বসে থাকে। এই ক’দিনে অর্পিতার প্রতি ওর হৃদয়ের টান যে স্থানে পৌঁছেছে তা তুলনাহীন। তার অন্তরের শব্দহীন মায়াময় রাজ্যে তুলি এবং অর্পিতা ছাড়া কোন নাম নেই। তার হারিয়ে যাওয়া পলি অর্পিতা হয়ে এসেছে হৃদয়ের নিভৃত কাননে। সে আমাকে বলল,‘ তুমি যে ওর বাবা-মার সন্ধান করতে চাও, আমার কথা কি একবার ভেবে দেখেছ? ওরা যদি অর্পিকে আমার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে যায় তখন কেমন হবে। তখন আমি ওকে ছাড়া কেমন করে থাকব। তুমি যা করার কর। আমি কিন্তু ওকে দিতে পারব না। আমার নিকট থেকে কেউ ওকে নিতে পারবে না।’

আমি ভেবে দেখলাম রাহেলাকে এ মুহুর্তে কিছুই বলা যাবেনা। মায়া-মমতা এমন এক অদৃশ্য আকর্ষণ যা মানুষকে অন্ধ করে দেয়। নষ্ট করে দেয় বিবেচনাশক্তি। মানব মনের এ অন্ধ আকুতিকে দোষ দেয়াও যায়না। কী এক দুর্বার শক্তি এর মধ্যে সংযুক্ত থাকে যা হৃদয়কে হীরকখ-ের মত সমুজ্জ্বল করে তোলে। কোন নিন্দা এবং বিরূপ সমালোচনা এর জ্যোতিকে ম্লান করতে পারেনা। রাহেলার মনের অবস্থা আমি বুঝতে পারি। চঞ্চল হরিণ শাবককে বুকে ধরে সে নির্জন স্বপ্নের ভূবনে ঘর বাঁধতে চায়।

যেদিন অর্পিতাকে কুড়িয়ে পেয়েছি সেদিন থেকে পত্রিকার হারানো বিজ্ঞপ্তির দিকে একটু নজর রাখি। একদিন পত্রিকার একটি বিজ্ঞপ্তির দিকে আমার দৃষ্টি পড়ল। বড় অক্ষরে লেখা-‘কাজের মেয়েসহ চার বছরের কন্যা নিখোঁজ’। পাশে অর্পিতার ছবি। নীচে লেখা আছে- বাসার মুল্যবান স্বর্ণের অলঙ্কার এবং অর্পিতা নামের চার বছরের কন্যাসহ কাজের মেয়ে বেশ কিছুদিন ধরে নিখোঁজ রয়েছে। কাজের মেয়েটির বয়স বার বছর। গায়ের রঙ হালকা শ্যামলা। কোন সহৃদয় ব্যক্তি এদের খোঁজ পেলে নিম্নোক্ত মোবাইল নাম্বারে অবহিত করবেন। অর্পিতার বাবা-মায়ের সাথে যোগাযোগের নাম্বার পেয়ে আমার বুকটা স্বস্তির সুগন্ধে ভরে গেল। তাড়াতাড়ি ওই নাম্বারে কল করলাম আমি।
‘হ্যালো, এটা কি অর্পিতার বাড়ি?’
‘জ্বী, আমি ওর বাবা বলছি। আপনি কে বলছেন ভাই?’
‘আমি কুড়িগ্রাম থেকে। অর্পিতা সম্পর্কে খবর আছে।’
‘দয়া করে বলুন কি খবর। আমরা খুব চিন্তিত।’
‘ওকে পাওয়া গেছে। আমার বাসায় আছে ও। কোন চিন্তা করবেন না।’

আমার কাছে ঠিকানা নিয়ে সেদিনই অর্পিতার স্বজনরা এল কার নিয়ে। রংপুর মুলাটোল থেকে সোজা আমার বাড়ি। কার থেকে নেমে ওর মা অপ্রকৃতিস্থের মত অগোছালো বসনে আমার বাসায় ঢুকল। ‘কোথায় আমার মা মনি। ওকে এক নজর দেখে আমার বুকটা ঠা-া করি’ বলতে বলতে ভেতর আঙিনায় অজ্ঞান হয়ে আছড়ে পড়ল। অর্পিতাকে কোলে নিয়ে ওর মায়ের কাছে বসলাম। মাথায় অনেকক্ষণ পানি ঢালার পর উনি সুস্থ হলেন। অর্পিতা তখন ওর বাবার কোলে। বাড়িতে প্রচুর জন সমাগম হয়েছে। এ রকম ঘটনা শুনে সবাই অবাক। বাচ্চাকে কোলে নিয়ে অর্পিতার মা কেঁদে আকুল হয়ে গেল। কোথায় রাখবে সে তার মেয়েকে। একবার বুকে, একবার কোলে এবং একবার পিঠে–।

ওদিকে শুরু হয়েছে আর এক কা-। অর্পিতাকে নিতে আসার কথা শুনে রাহেলা বারবার মুর্ছা যাচ্ছে। কেউ তাকে বোঝাতে পারছে না। তার কাছে অর্পিতা হল হারিয়ে যাওয়া পলি। তার পলিকে সে কিছুতেই অন্যকে দিতে পারবে না। কোন অচেনা জগত থেকে ফিরে এসে সে তার শূন্য বুকটা শীতল করেছে। এখন কেন তাকে হারাতে হবে। খোদার এটা কেমন অবিচার। রাহেলাকে আমি কিছুতেই বোঝাতে পারছিলাম না যে অর্পিতার প্রকৃত বাবা মায়ের চেয়ে আমরা কখনই তার আপন হতে পারব না। কিন্তু ও এতটা একগুয়ে এবং নাছোড়বান্দা হয়েছে যে ওকে কোনকিছু বোঝানোর চেষ্টা করা এ মুহুর্তে অবান্তর। পরপর দু’দিন ওরা আমাদের বাড়িতে অবস্থান করল। অর্পিতা, অর্পিতার মা, তুলি এবং রাহেলা একই সাথে রাত্রিযাপন করল। অর্পিতার প্রতি রাহেলার অকৃত্রিম স্নেহ দেখে অবাক হল ওর মা বাবা। কী করে তাকে এমন করে কাছে টানতে পারল রাহেলা। গর্ভে ধারণ না করলে কী করে কাউকে এতটা ভালবাসা যায়। অর্পিতার মা মিনারা বেগম প্রকৃতিস্থ হওয়ার পর এ সিদ্ধান্তে পৌঁছল যে অর্পিতা এখন থেকে রাহেলার কাছেই থাকবে। ওর প্রতি রাহেলার মনে স্নেহের যে তরঙ্গ উদ্বেলিত হচ্ছে তাকে অবদমিত করা ঠিক হবেনা। বরং এ স্বভাবজাত স্নেহের আবেশে অর্পিতাকে বড় হতে দিতে হবে। সে যখন মাতৃসোহাগে লালিত হচ্ছে তখন দুশ্চিন্তার কী আছে। এর চেয়ে আর আনন্দের কোন বিষয় আছে যে এক মায়ের সন্তান আরেক জননীর বুভুক্ষ ভালবাসার প্রদাহ নিরসন করছে। এ বিশ্ব সংসার যে আদি মানবের ক্রম বিকাশমান শোণিত স্রোতের ঐক্যসূত্রে বাঁধা এই ঘটনা তারই উৎকৃষ্ট প্রমান। এ পৃথিবীতে কেউ তো পর নয়। সবাই একই সুত্র থেকে সৃষ্ট মানব সন্তান। শুধু হৃদয়ের ঐক্য স্থাপন করলে সবকিছু জীবন্ত হয়ে গতিশীল হয়। তুলি এবং অর্পিতা দুই বোন। রাহেলা এবং মিনারা এক অবিভাজ্য নারীস্বত্তা। এক রোদন পিয়াসী নারীজন্মের তরঙ্গময় সমান্তরাল স্রোতধারা। এক অতৃপ্ত মাতৃমনের ক্রন্দনগুঞ্জরিত হাজার রাতের অলিখিত বাণীমঞ্জরী।

রাহেলার কোলে অর্পিতাকে রেখে যেতে মিনারার কোন দুঃখ নেই। রাহেলার মনে ব্যথার কোন আঁচড় লাগুক মিনারা তা চায়না। মাঝে মাঝে এসে তারা অর্পিতাকে দেখে যাবে। এই রুক্ষ প্রকৃতির বুকে অর্পিতা খুঁজে পেয়েছে এক প্রশান্ত অরণ্যানী। এক মায়ামধুর ছায়াঘন নিকুঞ্জ। এর চেয়ে খুশীর বিষয় কি আছে। তবে তারা অর্পিতার বদলে তুলিকে চায়। এই পরষ্পর বিরোধী অকর্ষণেরই বা কি ব্যাখ্যা। কিন্তু রাহেলা তুলিকেও দিতে রাজি নয়। সে তার অন্তরের শূন্যতা উপশমের জন্য জগতের সব কান্না সব মর্মবেদনার সুর মথিত করে একটি পরম সত্যে একীভূত হতে চায়, যা তাকে এক বিশ্বজননীন দীক্ষামন্ত্রে উজ্জীবিত হতে অনুপ্রেরণা দেয়। সে দুজনকে নিয়ে বাঁচতে চায়। এ যুদ্ধে জয়ী হল রাহেলা। তার স্নেহের অন্ধ দাবীর কাছে সবাইকে হার মানতে হল।

রফিক সাহেব এবং মিনারা তাদের সাথে আমাদের তাদের বাড়ি রংপুর মুলাটোলে নিয়ে গেল। সকালে নাস্তা সেরে সবাই উঠলাম কারে। অর্পিতা বসল রাহেলার কোলে। মিনারা বেগম কোলে তুলে নিল তুলিকে। আর.কে রোড ধরে গাড়ি চলল দ্রতবেগে। চারদিকে সকালের রোদের প্রফুল্লতা। গাছের পাতায় বাতাসের ঢেউ। সবখানে গলে পড়ছে শীতের কোমল লাবণ্য। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে সবকিছু ম্লান করে সমুজ্জ্বল হয়ে বিকশিত হচ্ছে দু’টি নিষ্পাপ শিশুর অপার্থিব আনন্দ। সব পাপ, কলুষ কালিমা ধুয়ে দেবার দুর্বার শক্তি আর কারও আছে বলে আমার মনে হলনা।

বিষয়সমূহঃTags: