সোলায়মান আহসান
৩১ জানুয়ারি, ২০১৯ | ০১:৩০

আফসার নিজাম-এর কাব্যগ্রন্থ : তিন পুরুষ এবঙ পুত্র প্রজন্ম

tesst

কবিতা নিয়ে কিছু বলতে আড়ষ্টতা আমার পেয়ে বসে। কেনো যেনো অন্যের কবিতা পড়ে তার সম্পর্কে মন্তব্য করতে বার বার এ বোধ এসে বাধা দেয়- সুবিচার করতে পারছি? আমার ধারণা কাব্য মূল্য বিচারের সুনির্দিষ্ট মানদ- যেভাবে নেই, তেমনি বিচার ক্ষমতাও খুব কম সংখ্যক ব্যক্তি রাখেন। বিশেষ করে আমাদের সমাজে সাহিত্য গবেষকের কাব্য-বিচার প্রায় উপেক্ষিত। সাহিত্য গবেষণার মতো দুরুহ এবং অপাংক্তেয় কর্মে আজকাল তেমোন উৎসাহী ‘দু’জনকে’ দেখা যায় না। এমন এক সন্ধিক্ষণে দেখা যায় কবিরা কেউ কেউ অপর কবির প্রতি সহানুভূতি কিংবা অপার ভালবাসার বষবর্তী হয়ে কাব্য মূল্যায়নের দুরুহ কর্মে হাত দেন। এমন ধারার সাহিত্য সমালোচকের সংখ্যাও খুব বেশি দেখা যায় না। এতে আমাদের সাহিত্যের অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে- বিকশিত হচ্ছে না আমাদের সাহিত্য-প্রতিভার।

এ রকম এক সমীকরণে আমি আর হাত গুটিয়ে বসে থাকা সমীচিন মনে করলাম না। আমি বিলক্ষণ জানি সাহিত্যের ইতিহাসে অনেক সৃষ্টিশীল কবি সাহিত্য-মূল্যায়ন কর্মে যতেষ্ট যোগ্যতার স্বাক্ষর রেখেছেন। কিন্তু আমি তেমন ভরসা পাইনে। শক্তিও অনুভব করি না। মনে হয় গোটা কর্মই বুঝি পন্ডশ্রমে পর্যবসিত হতে যাচ্ছে।

কবি আফসার নিজামের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘তিনপুরুষ এবং পুত্রপ্রজন্ম। সম্পর্কে কিছু লিখতে যাওয়ার আগে উপরিউক্ত কথাগুলো বলতে ইচ্ছে হলো। এ কথাও বলতে চাই- দিন যতোই গড়াচ্ছে, বয়স বাড়ছে যতো, কাব্য সম্পর্কে আমার ধারণাও কেমন গোলমেলে হয়ে পড়ছে। এটা অবশ্য আমাকে দোষ দিয়ে কী হবে। কাব্য ইতিহাস, সবদেশের কাব্যধারা যতো ঘাঁটছি এমন গোলমেলে অবস্থা অনেকের মধ্যেই দেখতে পেরেছি।

জার্মান কবি গট ফ্রায়েড বেন (১৮৮৬-১৯৫৬) যিনি প্রথম জীবনে একজন চিকিৎসক ছিলেন। দুটি বিশ্বযুদ্ধেই তিনি ডাক্তার হিসেবে কাজ করেছেন। কিন্তু অল্পদিনের মধ্যে তিনি বুঝতে পারেন, তিনি ভুল করেছেন- তাঁর পথ শরীরের চিকিৎসা নয়- মনের। তিনি কাব্য সাধনায় মানুষের বাস্তবজীনের জরাজীর্ণ অস্তিত্বের একটা ব্যধিগ্রস্ত দিক উন্মোচন করেন যাতে একটা শূন্যবাদের বেহারা প্রকটভাবে ধরা দেয়। কিন্তু অল্প দিনের মধ্যেই এর পরিবর্তন ঘটে এবং সব বাস্তবতার অন্তরালের সুন্দর ও পবিত্র জিনিসের প্রতি তার আকর্ষণ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি মনে করতেন প্রকৃত কবিতা হচ্ছে- স্বসম্পূর্ণ স্বসম্ভব প্রকৃত জীবনের মধ্যে এর কোনোরকম অনুপ্রবেশ না ঘটলেও চলবে। এ প্রসঙ্গে (১৯৩০ সালে) একটি বেতার কথোপকথনে বিস্তারিত নিজ চিন্তা প্রকাশ করেন যেন।

তিনি স্পষ্টভাবে কবিদের সমকালীন ঘটনা প্রবাহ জীবনযাপনের ঘাত-প্রতিঘাত এবং প্রতিষ্ঠানিকতা ইত্যাদি বিষয় উপজীব্য করে কবিতা না লিখতে পরামর্শ দেন।

তিনি বলেন, ‘… এসব ব্যাপার কবিতার সীমানার অন্তর্গত নয়। যেসব লেখক সভ্যতার নানাবিধ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত থেকে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন এবং সেই অভিজ্ঞতাই যাঁদের কাজে লাগাবার কথা তাঁরাই পৃথিবীর খাঁটি বাস্তবতার সঙ্গে মাখামাখি; এঁরা পৃথিবীতে জড় বনে গণ্য করেন ও ত্রিস্তার এঁদের কাজ করে। এরা কারিগরদের কাছে গিয়ে হাজির হন। সেপাইদের কাছে যান, যেসব মানুষ সীমানা ঠিকঠাক করে ও পৃথিবীর বুকের উপর দিয়ে তার টেনে নিয়ে যায়, এঁরা যান তাদের কাছেও। এঁরা বাহ্যিক পরিবর্তন বা আকস্মিক পরিবর্তনের ডামাডোনের ভিড়ে মিশে যান। কিন্তু কবির ধর্ম আলাদা, তার নীতিও পৃথক। তার অভিজ্ঞতার ধরণও অন্য প্রকার; হাতেনাতে কাজ করে যে পরিবর্তন আনা হচ্ছে বা তথাকথিত যে অগ্রগতি ঘটানো হচ্ছে, তার মধ্যে না গিয়ে তার নিজস্ব অভিজ্ঞতা অন্যরকম ফল চান।”

গট ফ্রায়েড বেন মনে করেন কবিরা নীতিকথা বলবেন, উপদেশ দেবন, দূর থেকে সমাজ ও মানুষকে নিরীক্ষণ করে নিজস্ব উপলব্ধির কথা ব্যক্ত করবেন। স্বপ্ন দেখাতে সাহায্য করবেন। কিন্তু রাষ্ট্রীয় কোনো কর্মকান্ডে সম্পৃক্ত হবেন না- আন্দোলনে শ্রমিকদের উদ্বুদ্ধ করতে মিছিলে সামিল হবেন না।

আরেক জার্মান সাহিত্য-সমালোচক, ভাববাদী সাহিত্যের অক্লান্ত পৃষ্ঠপোষক কুট’ পিনথাস (১৮৮৬) ১৯২০ সালে তার কবিতা সংগ্রহ। ম্যানকাউন্ড’স টোয়াইলাইট) গ্রন্থ Adduss to Yoany poets’’ এ বলেছেন- সমাজের ধ্বংসকামীদের ঈশ্বরে বা অবিশ্বাসীদের মত পরিবর্তনের জন্য ভাববাদী চিন্তার আশ্রয় সর্বোত্তম। পিনথাস ভাববাদের উন্নত আদর্শের উপর বেশ জোর দিয়েছেন মানুষের মনে এতে বল আসে এবং কবিতার পক্ষে এ হচ্ছে কষ্টকর শক্তি। অপরদিকে জার্মান কবি ফ্রিডরিখ, হ্যোল্ডার্লিনের (১৭৭০-১৮৪৩) মতে- ‘মানুষের সবচেয়ে অনপকারী কর্ম কবিতা।’ ‘অনপকারী কথাটাকে খুব কেিময়ে অত্যন্ত মৃদুভাবে বলা হয়েছে; এর আসল অর্থ বুঝতে হলে কবিতার সঙ্গে ভাষার সম্বন্ধের কথা ভাবতে হবে। এই হ্যোল্ডার্লিন আরেক জায়গায় বলেছেন- “ভাষা মানুষের সবচেয়ে বিপজ্জনক সম্পত্তি।’ একটু ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, ‘বুদ্ধিমানের হাতে ভাষার বিকৃতি সহজেই ঘটে থাকে এবং যার যত বেশি বুদ্ধি তিনি ভাষাকে তত বেশি বিকৃত করতে পারেন।’ ভিন্নার্থে বিকাশও ঘটাতে পারেন। প্রকৃত পক্ষে সাহিত্য চর্চা বুদ্ধিমানের কাজ বটে। এখানে মেধাবী ও অধ্যবসায়ীদের সফল হতে দেখা যায়। কবিতা যেহেতু আরো উঁচু মানের শিল্প- এক্ষেত্রে অতিশয় মেধা ও বুদ্ধির অধিকারীদের অগ্রসর হওয়া উচিত। কিন্তু অপরিণামদর্শী অনেক কবিযশ প্রার্থীকে এখানে ভিড় করতে দেখা যায়- যারা সাহিত্যের উপকারের পরিবর্তে অন্ধকার সাধন করেন। কবিতাও মাঝে মধ্যে পথহারা হয়- কাব্যানুরাগীরা হন বীতশ্রদ্ধ।

কবিতা নিয়ে নানা কথা আছে। মত ও পথ আছে। কিন্তু কবিতার একটি মাত্র ধর্ম হচ্ছে- কবিতাকে হতে হবে মানুষের হৃদয়ের কথা। কবিতার রয়েছে একটি নিজস্ব চলা- পথ। সৈয়দ আলী আহসান যথার্থ বলেছেন- “কবিতা কখনও নতুন করে আরম্ভ করা যায় না। প্রত্যেক কবিতার একটা বিদ্যমানতা আছে।”

(আল মাহমুদের কবিতা : সোনালী কাবিন)

আফসার নিজামের গ্রন্থে উল্লেখিত জন্ম তারিখ ধরে হিসেব করলে তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের কালে বয়স পঁয়ত্রিশ উতরে গেছে। বিষয়টি এ জন্য উল্লেখ করছি নিজাম সাহিত্য চর্চায় মনোনিবেশ করেছেন আমার জানা মতে বছর বিশেক হবে, আর গ্রন্থ প্রকাশ পেল পরিণত বয়সে অর্থাৎ তার গ্রন্থ প্রকাশের বিষয়টির সঙ্গে কারা জীবনের স্ফুরণের সমার্থক অর্থ যদি কেউ খুঁজতে চায়- ন্যায়সঙ্গত বটে।

নিজাম ‘ছড়াকার’ হিসেবে অনেক দিন ধরে জননন্দিত। গল্পকার হিসেবেও তার সাম্প্রতিক প্রকাশ লক্ষ্যণীয়। বরং কবিতা নিয়ে তার হাজির হওয়া বিষয়টি একত্রিত তেত্রিশটি কবিতার এক মলাটে সংস্থাপন বলা যায় বিস্ফোরণ। ব্যক্তিগতভাবে আমি তার ‘দুঃসাহস’ যাত্রাকে অভিনন্দিত করছি। ‘দুৎসাহস’ বলছি এ জন্য তার কাব্যগ্রন্থে একটা নিজস্ব চলার ঢঙ বা অহমিকা আছে। বিশ্বাস এবং আত্মানুসন্ধানের দিদৃক্ষ চোখ আঙুলি দিয়ে সচকিত করার ক্ষমতা আছে।

‘আমি আফসার নিজাম…….’ এভাবে কাব্যগ্রন্থের মলাটে নিজ পরিচয় তুলে ধরার সহজ এবং সরলরৈখিক বচন খানিকটা প্রথা বিরুদ্ধ এবং আত্মপ্রচারমূলক আপাত মনে হতে পারে- কিন্তু নিজাম সেই উদ্দেশ্যে নয় বরং রবীন্দ্রনাথের – ‘সহজ কথা যায় না বলা সহজে’ সেই বেড়া ডিঙাতে সচেষ্ট থেকেছেন- মলাটের ভেতর কবিতাগুলি সেই পরিচয়ই বহন করে।

নিজাম ব্যক্তিগত জীবনে ঋজু স্পষ্টবাদী এবং সরাসরি কথাবার্তা বলে থাকেন। কবিতায়ও তার এ চারিত্র্য প্রকাশিত। সর্বোপরি তিনি মনেপ্রাণে ইসলামী আদর্শে উদ্বুদ্ধ। কিন্তু কবিতায় সেই আদর্শকে ধারণ করেছেন বক্তব্যে নয় প্রতীকী ব্যঞ্জনায়। তিনি বলতে চেয়েছেন আজ তিনি যা ভাবছেন, বলছেন তা উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত, তেমনি তার ভাবনা জীবন চর্চাগুলো পরবর্তী প্রজন্ম অর্থাৎ সন্তানরা ধারণ করবে। এদিক থেকে আমরা তাকে ঐতিহ্যঘনিষ্ঠ কবিও বলতে পারি।

কাব্যগ্রন্থের শুরু কবিতাটিতে কবি প্রার্থনা করেছেন-
“প্রার্থনা করো মহান প্রভুর কাছে
ইবলিশের কূটচাল থেকে নিষ্কৃতির প্রত্যাশায়।”
(প্রার্থনা/৯)

আমরা জানি মানবজাতির আদি পিতা আদম (আঃ) এবং মা হাওয়া (আঃ) শয়তানের কূটচালে বিভ্রান্ত হয়ে আল্লাহর রোষানলে পতিত হন এবং এ পৃথিবীতে নিক্ষিপ্ত হন। আদম সিংহলে (শ্রীলংকা) এবং হাওয়া আরবের আরাফা অঞ্চলে পতিত হন। ৩৫০ বছর ক্ষমা প্রার্থনার পর আরাফাত ময়দানে উভয়ের সাক্ষাৎ ঘটে। কবি নিজাম ঐ শয়তানের কূটচাল থেকে বেঁচে সঠিক পথে নিজ জীবন ও কাব্যচর্চাকে চালাতে প্রথমেই প্রার্থনা জানিয়েছেন আল্লাহর কাছে। শুধু তাই নয় দ্বিতীয় কবিতায় রাসূল মুহাম্মদ (সাঃ)-এর প্রতি জানিয়েছেন আকুতি- মুসলমানরা জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চায় যাতে ফিরে আসে-

‘ডিজিটাল সময়কে নিয়ন্ত্রণ করার কৌশল
এবং পরমাণু শক্তির আনবিক বিন্যাসের কথা-
(মাননীয় প্রফেট/১০)

নিজাম আন্তর্জাতিক ঘটনা প্রবাহের ব্যাপারে সচেতন। বর্তমান তথ্য-প্রযুক্তির বিকাশ ও সহজ প্রাপ্যতার যুগে একজন কবিও ঘটমান বিশ্বের সঙ্গে পরিচিত না থেকে পারেন না। কিন্তু এসব ঘটনা কবির মনে কী ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া করে তা কবিতায় ব্যক্ত হওয়াকে আমরা গুরুত্বপূর্ণ মনে করি। নিজাম বন্ধুবর কবির দাড়ি কমিয়ে ফেলার ঘটনায় মনঃক্ষুণœ হয়ে কবিতা লেখেন। সেখানেও বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বেদনামন্থিত জনপদ ফিলিস্তিনের প্রসঙ্গ তিনি উত্থাপন করেছেন এইভাবে-

“লালন করা দাড়িগুলোকে হত্যা করেছ
হত্যা করেছে- বিদেশী ব্লেডের নিষ্ঠুরতায়।
আহ! কি কষ্ট নিয়েই না
চলে গেল তারা
ফিলিস্তিনীদের মতো উদ্বাস্তু হয়ে
নিজেদের জমি থেকে।”
(দাড়ি হত্যাকারী/১১)

একটি ব্যক্তিগত অনুভূতিকে আন্তর্জাতিক অনুভবের সঙ্গে মিশিয়ে মানব জাতির আবেগের সঙ্গে গেঁথে দেওয়া এটাই কবিতা। এই বোধ কবি সত্তার নিজস্বতা। এই নিজস্ব বোধের বিস্তার নিজামের প্রতিটি কবিতায় লক্ষ্যণীয়।

জার্মান দার্শনিক হামান বলেছিলেন যে ‘কবিতাই মানবজাতির মাতৃভাষা।’ য়োহাগ গেয়র্গ হামান, যার প্রভাবের বশবর্তী হয়ে প্রথমে হের্ডার ও পরে য়াকবি আধুনিক জার্মান ভাষাতত্ত্বের ভিত্তি স্থাপন করেন, তার এই বাক্যের সমর্থন আছে পৃথিবীর বহু পুরানে ও ধর্মগ্রন্থে। আরেক জার্মান সাহিত্য গবেষক জোহান গটফ্রায়েড থরডার (১৭৪৪-১৮০৩) যিনি কুসংস্কার-মুক্তি আন্দোলনের অন্যতম প্রতিনিধি হিসেবে স্বীকৃত। কবিতা সম্বন্ধে এবং ভাষা সম্বন্ধে তার প্রবন্ধে “এট্টু পোথেট মাস্ট রাইট ইন হিজ ওন লাঙ্গুয়েজ” বলেন-

“কবিতায় চিন্তা ও প্রকাশভঙ্গি যদি অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত হয় তাহলে আমি সেই ভাষায় কবিতা লিখব। যে ভাষায় প্রতিটি শব্দের ওজন ও তাৎপর্য আমি নিখুঁতভাবে বিচার করে দেখতে পারব, যে ভাষার উপর পরিপূর্ণ দখল আমার আছে সে ভাষা সম্বন্ধে আমার ধারণা পরিষ্কার, অন্তত সে ভাষার কোনো বক্তব্য প্রকাশ করায় দৃষ্টতা কখনোই স্বেচ্ছাচারিতা বলে মনে হবে না।”
(জার্মান সাহিত্য- সৈয়দ আলী আহসান সম্পাদিত)

হামান এর বক্তব্য এবং হারডার-এর মন্তব্য বিশেষ প্রণিধানযোগ্য। হামান কবিতার ভাষা সম্পর্কে বলেছেন- কবিতা এমন ভাষা ধারণ করবে যা গোটা মানব জাতির, আত্মা সেখানে স্থান পায়। তেমনি হারডার বলছেন- কবিতার ভাষা এমোন হবে যা স্বত:উৎসারিত প্রাঞ্জল এবং মানুষের হৃদয়ের সঙ্গে সম্বন্ধ স্থাপক।

কিন্তু দুঃখের বিষয় আজকাল কবিতায় এ দু’টি বৈশিষ্ট্যের অভাব পরিলক্ষিত। যে কারণে কবিতা আগের মত মানুষকে টানছে না। কবিতার কাছে মানুষ ঘেঁষতে চাইছে না। নিজামকে এব্যাপারে আমরা ব্যতিক্রম দেখেছি। তার কবিতার ভাষা যেভাবে সহজ এবং পরিপূরক তেমনি কবিতার বিষয়কে মানব হৃদয়ের চিরন্তন আবেগকে গ্রোথিত করার প্রয়াস। যেমন-

“জগতের চাওয়া-পাওয়া মিটে গেছে রাতে
সব কিছু ফেলে গেছে- গেছে খালি হাতে।”
[গতকালও ছিল মো/১৬)

“কত সময় কেটে গেছে
ক্ষয়ে গেছে পাথরের ইট
কতো রাজা এসেছিলো
কতো রাজা চলে গেছে
সময়ের ঘুমে”
(ধ্যানমান সময়ের কবিতা/২২)

নিজাম সময়কে ধারণ করতে চেয়েছেন। সময়ের দুঃখ-কষ্ট জীবন কথাও। যেমন-

“প্রতিদিন স্বপ্ন নিয়ে দর্জিবাড়ি যাও
আর ফিরে আসো
এক টিফিন ক্যারিয়ার দুঃখ নিয়ে।
(দুঃখ/২৪)

নিজামের দুঃখ-কষ্ট, হতাশা, ক্রোধ এবং দ্রোহ সবকিছুর জন্য একমাত্র সমর্পণ মহান আল্লাহরকাছে। যেমন-

“কারণ তিনি কথা দিয়েছিলেন
আমার যাবতীয় সেজদার বিনিময়ে
আমার বাজেট পাস করে দেবেন।”
(শবে বরাত/২৭)

নিজাম তাঁর নাম কবিতা ‘তিন পুরুষ এবং পুত্র প্রজন্ম’তে একটি ধারাবাহিক ইতিহাস টেনে এনেছেন এবং পুত্র প্রজন্মকে সতর্ক করেছেন এইভাবে-

‘যেমন দেখেছি একাত্তরে নেতার কুতুব মিনার হয়ে যাওয়া তারপর ক্ষুধার্ত মানুষ কুকুর………’

এমন যুক্তিহীন আবেগের কাছে সমর্পিত হতে বারণ করেছেন কবি পুত্র প্রজন্মকে। তিনি চান তাঁর পরবর্তী প্রজন্ম নতুন এক সমৃদ্ধ ইতিহাসের রচনাকারী হবে। নিজাম প্রচলিত এবং মুখের শব্দকেও কবিতায় স্থান দিতে চেয়েছেন। যেমন-

‘চৈত্রের পুড়ে যাওয়া ক্ষেতের লাহান’
‘ডাক শুনে পুতহগল বাজার থুয়ে’

নিজাম কবিতায় নর-নারীর সহজাত প্রেমকে ধারণ করেছেন। কিন্তু এব্যাপারে তার মাত্রাজ্ঞান ও পরিমিতি রোধ প্রশংসাযোগ্য।

“আর প্রজাপতি-চুমু খেলে
কোল জুড়ে নেমে আসে পবিত্র শিশু
(চুমু/৩৭)

সবশেষে যে কথাটি চাই- নদী বর্ষায় যৌবন পায়, গতি বাড়ে, পাড় ভাঙে, শষ্য ক্ষেত ডুবিয়ে দেয়, জনপদ ভাসিয়ে মনুষ্য বিপর্যয় আনে। কিন্তু এর অন্তরালে থাকে মাঠ ভরা ফসল সবুজ মাঠ, সোনালী ধানের শীষের হাতছানি, স্বর্ণালী দিনের আবাহন-হাসিমাখা জীবনের কলগুঞ্জন। কবিকেও যৌবনকালে উদ্দামতা দিয়ে।

উত্তালতা নিয়ে, দ্রোহ মেজাজে জানান দিতে হয় আমি আসছি- ভেঙ্গে দিতে-পুতিময়তাকে পরিষ্কার করতে, নতুন জীবনের উদ্ভাস জাগাতে-তবেই তিনি কবি। এমন কবির আক্রা চলছে বড়। নিজামের কার্য্য-স্বভাবের তার খানিকটা আভাস যা পেয়েছি তাকে উসকে দিতে বলি-নিজাম, তুমি এগিয়ে যাও-সামনে দিগন্ত বিস্তারি সীমানায়-প্রত্যাশিত গন্তব্যে।