আহমদ বাসির
১০ জানুয়ারি, ২০২০ | ০৯:২৭

আবৃত্তির সীমাবদ্ধতা ও উৎকর্ষের প্রয়োজনে

tesst

কবিতা হচ্ছে মানবজাতির সবচেয়ে সূক্ষ্ম, জটিল, কঠিন ও রহস্যময় শিল্পকর্ম- হোক সে মহাকাব্য কিংবা আধুনিক গীতিকবিতা। এই শিল্পকর্ম তথা কাব্যকলার নান্দনিক উপস্থাপনাই হচ্ছে আবৃত্তি কিংবা বাচিকশিল্প। অবশ্য বাচিকশিল্প আবৃত্তির ভুবনকে অনেক প্রসারিত করে। বাচিকশিল্প শুধু কবিতাকেই উপস্থাপন কিংবা পরিবেশন করে না, বিচিত্র ধরনের নান্দনিক রচনাকেই উপস্থাপন কিংবা পরিবেশন করে। যে কোনো ধরনের অনুষ্ঠান উপস্থাপনা কিংবা সংবাদ পরিবেশনাও বাচিকশিল্পের মুখাপেক্ষী। তবে আবৃত্তি বলতে আমরা কবিতার নান্দনিক পরিবেশনাকেই বুঝে থাকি।
আবৃত্তিশিল্পে উৎকর্ষ লাভ করা শ্রম ও সাধনালব্ধ ব্যাপার। কবিতার সূক্ষ্ম দিকগুলোকে অনুধাবন করা, এর জটিলতাকে নিরসন করা, এর কঠিন্যকে আয়ত্ব করা এবং এর রহস্যকে উন্মোচন করা আবৃত্তিশিল্পীর সাধনার বিষয়। একজন বাচিকশিল্পীকে সাধনা করেই প্রকৃত আবৃত্তিশিল্পী হতে হয়। কেবল প্রমিত উচ্চারণ, ছন্দ, ভাবরস আর উপস্থাপনার কৌশল-প্রকৌশল জানলেই কবিতার আবৃত্তিকে সার্থক করা যায় না, বরং কবি ও কবিতাকে যথাসম্ভব আত্মোপলব্ধির গভীরে ধারণ করতে হয়। উপস্থাপিত কবিতাটির মর্মকথা নিজের মর্মে ধারণ করতে না পারলে আবৃত্তি ব্যর্থ হয়ে যায়।
কবিরা শব্দকে তার মৌলিক মহিমায়, শৈল্পিক তাৎপর্যে উপস্থাপন করে থাকেন। শব্দের গূঢ় চেতনাকে ধারণ করে শব্দকে নতুন নতুন মাত্রায় উত্তীর্ণ করা, নতুন নতুন আর্থবোধকতা সৃষ্টি করা কবিদের কাজ। কবিতায় শব্দ গাঁথা হয় রূপকে, প্রতীকে, উপমায়, উৎপ্রেক্ষায়, নানা অলংকারে। এসব শব্দের নিহিত তাৎপর্য উদঘাটন করা শুধু অধ্যাপক, কাব্যসমালোচক কিংবা দাশর্নিকদের কাজ নয়, এটা আবৃত্তিশিল্পীরও কাজ এবং অবশ্যই মৌলিক কাজ। কিন্তু প্রচলিত আবৃত্তিচর্চায় এই মৌলিক কাজটি অর্থাৎ কবিতাকে যথাযথ ব্যবচ্ছেদের মাধ্যমে মর্মে ধারণ করার কাজটি সেভাবে সম্পন্ন হয় না, যেভাবে সম্পন্ন হলে আবৃত্তিশিল্প উচ্চাঙ্গের মাহাত্ম্যকে ধারণ করতে পারে।

দুই.
কবি আল মাহমুদের একটি আলোচিত, সমালোচিত ও জনপ্রিয় কবিতা ‘কদর রাত্রির প্রার্থনা’। কবিতাটি আগাগোড়াই মহান আল্লাহর নিকট প্রার্থনা। এই প্রার্থনার মধ্যেই আছে নানামাত্রিক কথামালা। এ কবিতায় আমাদের শিক্ষাঙ্গনের ভয়াবহ নৈতিক বিপর্যয়ের বিবরণ দিয়ে, এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য মহান আল্লাহ তায়ালার নিকট প্রকৃত জ্ঞান প্রার্থনা করা হয়েছে। ঘটনাক্রমে এ কবিতায় একটি গুরুতর প্রসঙ্গ উঠে এসছে। আর সেই প্রসঙ্গটি হচ্ছে শব্দ, কবিতার শব্দ-
আমি পড়তে না পারলেও শব্দের ত্বরিত গুঞ্জনের
নিগৃঢ় তত্ত্ব আমি জানি। আমি জানি
আমার চোখ ও হৃদয়কে তুমি সৌন্দর্যের জারকে চুবিয়ে
কেন নির্মাণ করেছিলে।
কেন আমি কবি? কেন প্রতিটি শব্দের জ্ঞাত অর্থের
অতিরিক্ত অর্থ আমার জানা।
এই যে ‘প্রতিটি শব্দের জ্ঞাত অর্থের অতিরিক্ত অর্থ’- এটা কেবল কবিই জানেন। কবিদের পক্ষেই সম্ভব এই অতিরিক্ত অর্থকে ধারণ করা এবং প্রকাশ করা। আর কবিতার পঙক্তিমালায় ব্যবহৃত শব্দটি কিভাবে এর অতিরিক্ত অর্থকে প্রকাশ করে থাকে, তা একজন আবৃত্তিশিল্পীকে আবিষ্কার করতে হয়। এবং সেই অতিরিক্ত অর্থকে কবিতার নান্দনিক উপস্থাপনার ভিতর দিয়ে প্রকাশ করতে হয়। এ প্রসঙ্গে আমরা আরও একটি কবিতা উল্লেখ করতে পারি।
‘কবি ও কবিতা’ শিরোনামের এ কবিতাটি লিখেছেন কবি মতিউর রহমান মল্লিক। প্রসঙ্গক্রমে গোটা কবিতাটি এখানে উদ্ধৃত করা হলো-
কবিতার শব্দ কি সব
অঙ্গ কি তার অমোঘ বিষয়
কবিতার সংজ্ঞা কেবল সন্নিহিত
শরীরের শিল্পকলাই?
কবিতার দেহের জন্য
কবি কি দীপ্র মেধার
এতোকাল বোদলেয়ারী?
কবিতার সবকিছু কি বাইরে থাকে?
কবি কি অলংকারের স্বর্ণঈগল
উপমার জালের ভিতর পালক ঝরায়
এবং সে তার ইচ্ছে মতো দেয় না উড়লে দিগন্তেরে?
কবি কি ডুব দেবে না
ভাবের স্বচ্ছ সম্ভাবনায়
শিকড়পন্থী মহান মানুষ
তৃপ্ত রবেই ডালপালাতেই?
নারী কি শুধুই নারী কবির নিকট
নদী কি শুধুই নদী
কবিতার স্বভাব কি তার অঙ্গে বিভোর
নাকি এক হৃদয় আছে
কবিতার গহীন ভিতর?
(কবি ও কবিতা/তোমার ভাষায় তীক্ষ্ণ ছোরা)
এ কবিতা থেকে আমরা বুঝতে পারি, কবিতার শুধু দেহ নয়, একটা হৃদয়ও থাকে। আর হৃদয় অবশ্যই দৃশ্যমান কোনো বিষয় নয় এবং সচরাচর ব্যাখ্যাযোগ্য কোনো বিষয়ও নয় বরং অনুভূতির তীব্রতা দিয়ে সেই হৃদয়কে উপলব্ধি করতে হয়। কবি যেভাবে ‘ভাবের স্বচ্ছ সম্ভাবনায়’ ডুব দিয়ে শিকড়ে পৌঁছে যান, আবৃত্তিশিল্পীকেও সেই শিকড় অভিযানে নামতে হয়। কেবলমাত্র শরীর হাতড়ে যেমন হৃদয়ের সন্ধান পাওয়া যায় না, তেমনি ডালপালায় বিচরণ করেও শিকড় আবিষ্কার করা সম্ভব হয় না। কবিতার হৃদয়কে আবিষ্কার করতে হলে আবৃত্তিশিল্পীকে তা হৃদয় দিয়েই করতে হবে আর শিকড় সন্ধান করতে হলে তার জন্য অবশ্যই খোঁড়া-খুঁড়ি করতে হবে। অর্থাৎ ভাবের স্বচ্ছ সম্ভাবনায় ডুব দিতে হবে, কবিতাকে যথাযথভাবে ব্যবচ্ছেদ করতে হবে।

তিন.
বিখ্যাত ফরাসী লেখক সাঁত বভ এর একটি বিখ্যাত প্রবন্ধের নাম ‘হোয়াট ইজ ক্লাসিক’। প্রবন্ধটি বহুল পঠিত এবং বহু ভাষায় অনুদিত। এ প্রবন্ধের লেখক ধারণা করেছেন যে, পৃথিবীতে একটা সময় আসবে, যখন নতুন সৃজনশীলতার প্রয়োজন ফুরিয়ে যাবে। তখন আর নতুন কিছু সৃষ্টি করার দরকার হবে না। শিখরস্পর্শী সৃজনশীলতায় পৃথিবী ভরে যাবে। নতুন করে চিন্তা করারও কিছু থাকবে না। লেখক প্রশ্ন সৃষ্টি করেছেন, যদি এমনটাই হয়ে থাকে তাহলে মানুষের মেধা ও প্রতিভা কিভাবে নিরূপণ করা সম্ভব হবে তখন? এ প্রশ্নের জবাবও লেখক নিজেই দিয়েছেন। তিনি বলছেন যে, তখন মেধা আর প্রতিভা নিরূপণের মাপকাঠি হবে একটাই; আর তা হচ্ছে ক্লাসিক সৃষ্টিকর্মের ওপর ব্যক্তির দখল কতটা আছে সেটা নিরূপণ করা। অর্থাৎ উন্নততর সৃষ্টিকর্মগুলো, ক্লাসিকগুলোকে কতোটা গভীরভাবে অনুধাবন করতে পারেন, ব্যাখ্যা করতে পারেন তার ওপর ভিত্তি করেই ব্যক্তির মেধা ও প্রতিভাকে তখন মূল্যায়ন করা হবে।
সাঁত বভের এই ধারণার সঙ্গে সবাইকে একমত পোষণ করতে হবে এমন কোনো কারণ নেই। বরং আমরা মনে করি মানুষের হৃদয়বৃত্তি ও মস্তিষ্কবৃত্তি যতোদিন থাকবে ততোদিনই মানুষ নতুন নতুন সৃজনকর্মে নিবিষ্ট হবে, ততোদিনই মানুষের সৃজনশীলতা অটুট থাকবে।
এ প্রসঙ্গে আরেকটি মজার ঘটনা উল্লেখ করে আমরা সাঁত বভের কথায় ফিরে আসবো। বাংলাভাষার একজন অসাধারণ জননন্দিত কবি জসীম উদদীন। একটা বয়সে এসে তিনি নাকি প্রায়ই বলে বেড়াতেন, ‘আমার পরে আর কোন কবি নেই। আর কেউ কবিতা লিখতে পারবে না’। এই কথাগুলো তিনি তরুণ কবিদের প্রায়ই শোনাতেন। জসীম উদদীনের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে একটি বৃহৎ সংকলনের কাজ করতে গিয়ে বিষয়টি নিয়ে আমরা পঞ্চাশের দশকের অন্যতম শ্রেষ্ঠকবি শামসুর রাহমানকে প্রশ্ন করেছিলাম। তিনি ঘটনাটির সত্যতা স্বীকার করেছেন। অবশ্য তিনি বলতে পারেননি, কেন জসীম উদদীন এমন ধারণা পোষণ করতেন। তবে কবি শামসুর রাহমানের ধারণা ছিলো আমাদের অনুরূপ। তিনি বলেছেন, ‘মানুষের হৃদয়বৃত্তি ও মস্তিষ্কবৃত্ত যতোদিন সচল থাকবে, ততোদিনই মানুষ কবিতা সৃষ্টি করে যাবে’। অর্থাৎ কবি জসীম উদদীনের সঙ্গে তিনি একমত ছিলেন না। আমরাও সাঁত বভের ধারণার সঙ্গে একমত নই।
তবে যে কারণে আমরা সাঁত বভের কথাটি উল্লেখ করলাম, সে প্রসঙ্গে ফিরে আসি। সাঁত বভের কথা ছিলো ক্লাসিকের ওপর যার যতোটা দখল থাকবে সে ততোটা প্রতিভাবান হিসেবে স্বীকৃতি পাবে। আমরা সাঁত ভবের এই ধারণাটিকে আবৃত্তিশিল্পের ব্যাপারে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ মনে করি। অর্থাৎ কাব্যশিল্পের ওপরে যার যতোটা দখল থাকবে, আবৃত্তিশিল্পে সে ততোটাই সাফল্য লাভ করতে পারবে।

চার.
আবৃত্তিকলা একটি মহৎ ও উচ্চাঙ্গের শিল্পকলা, যদিও একে আমরা সেই স্তরে উন্নীত করতে পারিনি। একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি সহজবোধ্য হবে। বাংলাভাষার সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ কবিতা কাজী নজরুল ইসলামের ‘বিদ্রোহী’। অবশ্যই এটি কোনো মহাকাব্য নয়। এটি একটি একক গীতিকবিতা। যদিও মহাকাব্যের আবহ ও ব্যাপকতা সর্বোচ্চ মাত্রায় ধারণ করেছে এ কবিতাটি। এটি প্রকাশের পর থেকে বিগত প্রায় শত বছর ধরে হাজার হাজার কন্ঠে আবৃত্তি হয়েছে, যদিও কবিতাটিকে যথাযথভাবে ধারণকারী শিল্পীর সংখ্যা খুব-খুব-খুবই কম। এই কবিতার প্রথম স্তবকেই প্রায় সবাই হোঁচট খেয়ে পড়ে। কারণ হচ্ছে একটি শব্দ এবং একটি কমা। লক্ষ্য করা যাক কবিতার প্রথম অংশটি-
বল বীর-
বল উন্নত মম শির!
শির নেহারি আমারি, নতশির ওই শিখর হিমাদ্রির!
এখানে ‘নেহারি’ শব্দের অর্থ দু’চারজন বিশেষ শিল্পী ছাড়া প্রায় সবারই অজানা। তাছাড়া অধিকাংশ প্রিন্টেড ভার্সনে দেখা যায় ‘আমারি’ শব্দের পর যে কমা (,) টি থাকার কথা সেটি নাই। ফলে নতুন পাঠক ও আবৃত্তিশিল্পীদের জন্য এটা আরও জটিল হয়ে ওঠে। প্রসঙ্গক্রমে একটি ঘটনা উল্লেখ করছি। হাফেজে নজরুল খ্যাত নজরুল বিশেষজ্ঞ মরহুম শাহাবুদ্দীন আহমদ তাঁর এক বক্তৃতায় ঘটনাটি তুলে ধরেছেন। ঘটনাটি তিনি জেনেছেন মোহাম্মদ মনিরুজ্জামানের কাছ থেকে। মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান ছিলেন খ্যাতনামা কবি, গীতিকার, সাহিত্য সমালোচক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলার শিক্ষক। তিনিই ঘটনাটি জানিয়েছিলেন শাহাবুদ্দীন আহমদকে। ঘটনাটি হচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের মৌখিক পরীক্ষা নিয়ে। পরীক্ষা নিচ্ছিলেন মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান ও অন্য শিক্ষকবৃন্দ। সে বছর লিখিত পরীক্ষা হয়ে যাওয়ার পর শিক্ষার্থীদের মৌখিক পরীক্ষা নেয়া হচ্ছিল। তো প্রথম থেকেই একটি প্রশ্ন সব শিক্ষার্থীর জন্য নির্দিষ্ট করেছিলেন মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান। সে প্রশ্নটি ছিলো, ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় ব্যবহৃত ‘নেহারি’ শব্দের অর্থ কী? মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান অবাক হয়েছিলেন যে, একজন শিক্ষার্র্থীও শব্দটির অর্থ বলতে পারেননি। তিনি আফসোস করে শাহাবুদ্দীন আহমদকে বলেছিলেন, এরাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম এ পাস করে বিভিন্ন কলেজে শিক্ষকতা করবে, কেউ কেউ বিশ্ববিদ্যালয়েরও শিক্ষক হয়ে যাবে।
দেখুন কী ভয়ানক অবস্থা! ‘নেহারি’ শব্দের অর্থ হচ্ছে ‘দেখে’। ‘শির নেহারি আমার’ কথাটির অর্থ হচ্ছে ‘আমার মাথা দেখে’। ‘নতশির ওই শিখর হিমাদ্রির’ অর্থ হচ্ছে ‘পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতের সর্বোচ্চ চূড়াটি মাথা নত করে ফেলবে’। কিন্তু আমরা যখন ‘নেহারি’ শব্দের অর্থ জানবো না, ‘আমারি’ শব্দের পরে যে কমা (,) টি আছে সেটি ব্যবহার করবো না তখন স্বাভাবিকভাবেই হিমালয়ের সর্বোচ্চ মাথা নত হওয়ার পরিবর্তে আমাদেরই মাথা নত হয়ে পড়বে। অর্থাৎ আপনি পাঠ করবেন ‘আমারি নতশির’।
আমাদের সাধনাহীন আবৃত্তিচর্চার এ হচ্ছে এক দুঃখজনক পরিণতি। বিগত প্রায় অর্ধশতাব্দীকাল ধরে আমাদের আবৃত্তিচর্চার ঘুরপাক খাচ্ছে স্বাধীনতাযুদ্ধে ভাবাবেগ নিয়ে রচিত কিছু মধ্যমমানের কবিতা, আর তারচেয়েও নিম্নমানের কিছু প্রেমের কবিতা ঘিরে। এর ব্যতিক্রম যৎসামান্যই বলা যায়। এমনকি রীন্দ্রনাথ, নজরুল, জসীম উদদীন, জীবনানন্দের কিছু অতিপরিচিত কবিতাই ঘুরে-ফিরে সবাই আবৃত্তি করেছেন। বাংলাসাহিত্যের মহৎ কবিতাগুলো শ্রোতাদের কাছে উপস্থাপন কখনোই সেভাবে করা হয়নি। যে কারণে আবৃত্তিশিল্পও কখনো সে অর্থে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেনি। আপনি কোনো মঞ্চে আবৃত্তি করতে শোনেননি শাহাদাৎ হোসেন কিংবা গোলাম মোস্তফার কবিতা; শোনেনটি কায়কোবাদ কিংবা শেখ ফজলল করিমের কবিতা; শোনেননি সৈয়দ আলী আহসান, আহসান হাবীব কিংবা আবুল হোসেনের কবিতা। ফররুখ আহমদের মতো কবি, যাঁর অধিকাংশ কবিতাই আবৃত্তিযোগ্য, অসাধারণ; তাঁর কবিতাও ভয়াবহ অবহেলার শিকার হয়েছে এই সময়ে। এর সবটাই যে রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক কারণে হয়েছে এমনটা নয়; বরং পরিকল্পিত ও পর্যাপ্ত সাধনার অভাবেই এমনটি হয়েছে। যদিও রাজনৈতিক বিভাজন এবং সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের কারণেই প্রকৃত সাধনা থেকে আমরা ছিটকে পড়েছি।

পাঁচ.
আবৃত্তিশিল্পের এইসব সীমাবদ্ধতাগুলোকে অতিক্রম করে যেতে হবে আমাদের। রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের মোকাবেলায় হাজার বছর ধরে সৃষ্ট বাংলা কাব্যভান্ডার থেকে মহৎ সৃষ্টিগুলোকে উপস্থাপন করতে হবে আবৃত্তির মঞ্চে। প্রয়োজনে আবৃত্তির জন্য আলাদা ইনস্টিটিউশন, পাঠ্যক্রম তৈরি করতে হবে। কেননা, আবৃত্তি একটি শক্তিশালি সাংস্কৃতিক হাতিয়ার।
কাব্যবিমুখ কোনো জাতি সহসাই পতিত হয় আত্মপরিচয়ের সংকটে। কবি ও কবিতা হচ্ছে উন্নত জাতিসমূহের প্রাণসত্তার মতো। মহৎ কবিতা ও কাব্যের চর্চা যারা করে তারা মহত্তম জাতিতে পরিণত হয়। প্রসঙ্গক্রমে আল্লামা ইকবালের কয়েকটি পঙক্তি উল্লেখ করে আজকের আলোচনা শেষ করবো। ইকবাল বলেছেন-
‘হারায় গরিমা-সম্মান মাটি
আকাশ খিলান তলায়
হরায় যখন সে আত্মজ্ঞান
ধর্মে কাব্যকলায়।’
অর্থাৎ কোনো জাতি যদি ধর্ম ও কাব্যকলায় নিজেদের আত্মজ্ঞান হারিয়ে ফেলে তখন সে জাতির গরিমা-সম্মানও হারিয়ে যায়। আমরা আমাদের ধর্ম ও কাব্যকলায় আত্মজ্ঞানকে বিকশিত করতে চাই। এজন্যই আমাদের উচিৎ মহৎ কাব্যসৃষ্টি শুধু নয়; বরং সেই কাব্যকে মানুষের কাছে নান্দনিকভাবে উপস্থাপনের মাধ্যমে উন্নততর জাতীয় মনন গঠন করা। এ কারণেই আবৃত্তিশিল্পকে আমাদের যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে এবং এ শিল্পের যথাযথ চর্চা ও প্রসারে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

বিষয়সমূহঃTags:

পূর্বের সংবাদ

«