আহমেদ খায়ের
৬ ডিসেম্বর, ২০১৯ | ১৫:৫৪

আহমেদ খায়ের’র কবিতা

tesst

চোখ বিরোধী

চোখের দেখায় ভ্রান্তি অনেক দেখি
তবু সবাই চোখের পথেই চলি
চোখের বর্ণে জীবনকাব্য লেখি
চোখ দেখে না মনের অলিগলি।

মন ছাড়া কি হয় জীবনের চাষ!
মাটির ধরায় বৃথাই বসবাস

অথচ এই মাটির ভেতর যেনো
জীবন দানের অফুর উপাদান
চোখের রঙে যেই পৃথিবী চেনো
এ সবকিছু তারই অবদান

আলোর চেরাগ দগদগিয়ে জ্বলে
তার জ্বালানি গোপন যে তার তলে

চোখের গোলক যেই দিগন্ত দেখে
পৃথিবী কি এতটুকুই সার!
চোখের দেখন যেই ইতিহাস লেখে
তার পেছনে শুধুই অন্ধকার!

কতটুকু দেখে মানুষ যা ঘটে যায়
কতটুকু বোঝে মানুষ যার দেখা পায়।

বলছি না তাই চোখটা তোমার তুলে রাখো
বলছি না যে চোখকে সাথে নিয়ো না
বলছি শুধু ঘোমটা মনের খুলে রাখো।
বলছি কেবল হৃদয় তালাক দিয়ো না।

সংক্ষিপ্ত চোখ

চিমনির ভেতর থেকে আকাশ দেখার মতো খুবই সংক্ষিপ্ত দৃষ্টি ফেলে-
আমরা সবকিছু বুঝে নিতে চাই,
এবং আরো সংক্ষিপ্ত পর্যবেক্ষণে তাবীল করতে যাই একজন মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের শ্বেতপত্র।

অথচ আমরা নিজেদের সংক্ষিপ্ত চোখের মতন সংক্ষিপ্ত বোধের ভেতর থেকে
চিলের ন্যায় আচমকা উড়ে আসা অভিমতের ভবিষ্যত দেখতে পাই না, দেখতে পাই না
সংক্ষিপ্ত বোধের ঘেসো পথের অসাবধানতায়
কতো বিষধর সাপের ফণার মতো মুসিবত ওঁৎ পেতে আছে।

খুব সংক্ষিপ্ত পর্যবেক্ষণে আমরা পড়ে নিতে চাই একটি জীবনের আদ্যন্ত ইতিহাস
আর এভাবে আমাদের পরিপার্শের বেসতর পৃথিবী
এবং আমাদের সমগ্র অস্তিত্ব কতো দ্রুততায় সংক্ষিপ্ত হয়ে যাচ্ছে দেখো!
অথচ আমরা নিজেদের ব্যক্তিগতটা একটি বারের জন্যে পড়ে নিতে পারলাম না এখন অব্দি।

পশ্চাতগামী

কতোশতো ভাবছে আমার কালের মানুষগণ! কতদূর-
এগিয়ে গেলো তাদের পায়ের পাতা হতে শাহাদত অঙ্গুলি;
অতলান্তিকের তলদেশ হতে মহাকাশ-নক্ষত্র মন্ডলি।
আমি আজো ঘাস লতাপাতা প্যাঁক-কাদা মেখে বিবশ-বিমূঢ়,
এখনো চোখে কচুরি পালক উলঙ্গ বালক শান্ত পুকুর
টলোমলো জলে লাফিয়ে পড়ে বালকের দল নিরেট গেয়
এসব দেখেই খুললো বুঝি আপন হস্ত সব পরিধেয়
কৈশর ছুঁতে লালফড়িংয়ের পাছে কাটে রোদরঙা দুপুর।

কতদূর হেঁটে এগিয়ে গেলো আমার সহগামী বন্ধুবর্গ!
অথচ ঘাড় ঘুরে দ্যাখে আমি কোকিলের সাথে সুর সাধছি
নদীর বর্ণ বদলে যায় বলে বেদনায় অঝোর কাঁদছি
ধান পাট আর মাটির সোঁদা গন্ধে খুঁজে ফিরি আমার স্বর্গ।
কতো তড়িত ঘুরছে এ দুনিয়া, ঘনঘন নিচ্ছে শুধু বাঁক
আমি শুধু ভাবছি যে তার গতি সব কোলাহল থেমে যাক।

হৃদয়ের হাকিকত

হৃদয় কি গো নদীর মতো –
তুফান-স্রোতের বিরোধ সয়ে চলার ছলে
পাঁজর ভাঙে বামপাশে আর ডানপাশে তার আবার গড়ে নতুন পাঁজর!
আমায় বলো একটি হৃদয় ধারণ করে কয়টি পাঁজর।

হৃদয় কি অই দৃষ্টিহরা আকাশ সুনীল-
হারায় যদি মনের হরষ কালো মেঘের কোলাহলে
ঝর্না ঝরায় অবিরত দুঃখ পোড়ায় রোদের আগুন জ্বালিয়ে দিয়ে
আমায় বলো হৃদয় আকাশ কত রোদ আর নহর নিয়ে।

না কি হৃদয় সবুজ জমিন নরম দিনে
ধূসর রঙের রুক্ষ পাষাণ গরম দিনে
ঋতুর পোশাক ধারণ করে হৃদয় দেহ!
কঠিন সময় হৃদয়ের লাগ পায় কি কেহ?

নাকি হৃদয় কালবোশেখি-
তামাম ভেঙে ছুটতে থাকে আবেগবিহীন
বল্গাবিহীন লুটতে থাকে পথের মাঝে যা পাওয়া যায় সব গনীমত
আমায় শোনাও হৃদয়ের ঠিক ঠিক হাকিকত।

একটি হৃদয় কেমন হবে-
কেমন হওয়া ঠিক আসলে, সইবে কি সব সহজ কঠিন!
না কোনদিন বাঁধন ভেঙে জ্বলবে দ্রোহে কালবোশেখির স্বভাবে
বুঝি না ঠিক সঠিক বোধে নাকি বোধের অভাবে।

আহত হৃদয়-মনে

হৃদয়ে আঘাত লেগে রক্ত ঝরে ঝরঝরিয়ে
এ বুকে ব্যথার পাথর সুখের বাগান যায় মাড়িয়ে
এ মনের শীতলতায় মরুর হাওয়া যায় ছড়িয়ে
মননের গীতলতা বিষাদ সুরে যায় হারিয়ে।

সে আঘাত শুকায়নি তো
সে ব্যথা লুকায়নি তো

সে বাগান সাজেনি তো নতুন কোন ফুলে
সে মনন বাজেনি তো ললিত সুর তুলে।
কি করে সেই মনে কেউ স্বপ্ন তুলে আনে!
কি করে ভরবে হৃদয় সতেজ মরুদ্যানে।

অন্ধকার

রাতের অন্ধকার:
সূর্য না থাকা অন্ধকার
সূর্য এলে এ অন্ধকার ডুবে যায়।

অন্তরের অন্ধকার:
বিবেক ঘুমিয়ে থাকা অন্ধকার
বিবেক জাগলে এ অন্ধকার উবে যায়।

অজ্ঞতার অন্ধকার:
নিজেকে এবঙ স্রষ্টাকে না জানা অন্ধকার
নিশ্চিত এলেম ছাড়া এ অন্ধকার কাঁটে না।

সমাজের অন্ধকার:
অন্যায় জুলুম অপ-সংস্কারের মতো অন্ধকার
ন্যায়-ইনসাফ-সত্য এলে এ অন্ধকার থাকে না।

বোধের অন্ধকার:
জীবনের অর্থ বুঝে না পাওয়া অন্ধকার
ঘাত-প্রতিঘাতে হারানো পথ খুঁজে না পাওয়া অন্ধকার
একটা কালবোশেখির মতো তুমুল ঝাপটা
কিঙবা শ্রাবণের মতো প্রবল বর্ষণ বোধের নদীতে
ঢেউ জাগাতে পারে অথবা কখনোই সে অন্ধকার সারে না।

জীবনের অন্ধকার:
প্রবৃত্তির দাসত্বে ডুবে সকল মানবিক
মূল্যবোধ হারিয়ে ফেলা অন্ধকার
মন-মনন-মানসের ভেতরে নান্দনিক
চেতনাবোধ হারিয়ে ফেলা অন্ধকার।
জীবনে জীবন সঞ্চারিত না হলে
এ অন্ধকার জীবনের আঙিনা ছাড়ে না।

কালের অন্ধকার:
এ অন্ধকার সর্বাধিক জটিল অন্ধকার
কালে কালে তিলে তিলে জমে থাকা ভুলের অন্ধকার
এ অন্ধকার সব অন্ধকারের মহা-সম্মেলন
এ অন্ধকারের কার্যকর পথ্য দেয়া অনেক বেশী কঠিন
এ অন্ধকারে জ্বলে পুড়ে মরে ইতিহাসের চৌদ্দ পুরুষ
এ অন্ধকারের মহৌষধ আজো করছি অন্বেষণ।

গোলকধাঁধা

যা দেখছি
তা ঘটছে না
যা ঘটছে
তা দেখছি না
যা চাচ্ছি
তা পাচ্ছি না
যা পাচ্ছি
তা চাইনি
চোখের পেছনে ঘোরেফেরে ডাইনি-
কত প্রাণ মরলো
কত লহু ঝড়লো
কত চোখ ভরলো জলে
লোনাজল পড়লো গলে
তার হেতু-হন্তা আজো খুঁজে পাইনি।

বিষয়সমূহঃTags: