হেলাল আরিফীন
১২ মে, ২০২০ | ২০:৩৬

কংক্রিটের কংকাল

tesst

বাইরে চান্দি ফাটা রোদ্দুর । ছাতা আনতে ভুলে গেছেন রইসউদ্দিন । তাঁর হাতে বাজারের ব্যাগ । সকালে তিনটা টিউশনি সেরে বাজারে যেতে যেতে প্রায় দুপুর । সবজি থেকে শুরু করে কোন কিছুই ঠিকমতো পাওয়া যায় না তখন । তবু দুপুর বেলাতেই যেতে হয় তাঁকে , কারণ , বিকালে আরও সময়ের অভাব । বিকালে টিউশনির সংখ্যাটা আরও বেশি ।
রইস উদ্দিন বাংলায় এম.এ পাস করেছেন । কিন্তু একটা চাকরি যোগাতে পারেন নি । চাকরি না হলে কি হবে , সংসারে খরচপাতি তো একটা আছে । তাই তো তাঁকে সংসারের খরচ চালানোর জন্য দিনরাত টিউশনি করতে হচ্ছে ।
রোদের উত্তাপে তিনি দরদর করে ঘামতে থাকেন । শালা , ছাতা না নিয়ে এসে কি বোকামিটাই না হয়ে গেছে । মনে মনে কথাগুলো বলে হঠাৎ ওপরের দিকে তাকান তিনি । চারপাশে কত সুন্দর সুন্দর বাড়ি । কবরস্থানের কবরগুলোর মত চারপাশে দোতালা তিনতলা থেকে তরতর করে পাঁচতলা ছয়তলা পর্যন্ত উঠে যাচ্ছে । শালা , মানুষের এত টাকা হয় কি করে ? নাহ্‌ আমাকে দিয়ে আর কিস্যু হবে না । টিউশনি ফিউশনি করে কি আর জায়গাজমি কেনা যাবে ? যাবে না ।
ফাত করে একটা গরম নিশ্বাস ফেলেন রইস উদ্দিন । একটা পাগল হঠাৎ কোত্থেকে এসে তাঁর সামনে দাঁড়ায় । ধূলোবালিতে জটপাকানো মাথার চুল । পরনে শতচ্ছিন্ন আধ ময়লা মার্কিন লুঙ্গি । উদোম গা । দু হাতে লোহার বালা । লোকটি তাঁর দিকে গাঢ় দৃষ্টিতে তাকায় । তিনি ভয় পেয়ে একটু পিছিয়ে যেতেই লোকটি মেঘগম্ভীর স্বরে বলে , ভয় নাই । তোর ভয় নাই । এই শহরে তোর একটা বাড়ি হবে । এইটাই তো তুই চাস , তাই না ?
রইস উদ্দিন কম্পিত গলায় বললেন , হ্যাঁ , হ্যাঁ , বাবা । আমি –

বাকিটুকু আটকে থাকে তাঁর ঠোঁটে । লোকটি বলল , কইতে হবে না । আমারে কইতে হবে না । হুদা একটা বাড়ি হবে না । এই শহরে তোর তিনটা বাড়ি হবে ।
রইস উদ্দিনের হৃদয়ে ভালোলাগার স্রোত বয়ে যায় । খুশিতে তিনি কম্পিত গলায় বললেন , তিনটা বাড়ি হবে ? তিনটা বাড়ি দিয়ে আমি কি করব ? আমার একটা হলেই হবে ।
পাগল লোকটি বলল , একটা তো হবে না বাপ্‌ ? তিন । রহস্যময় সংখ্যা । ত্রিকাল – অতীত , বর্তমান , ভবিষ্যত । স্বর্গ , মর্ত , পাতাল । তিন সংখ্যাটা মনে রাখিস । হে…হে…হে….. !
পাগল লোকটি মাথাটা অদ্ভুতভাবে এদিক ওদিক দুলিয়ে দুলিয়ে হাসতে থাকে । তিনি চলে যাবেন কিনা ভাবেন । লোকটি হাসি থামিয়ে দরাজ গলায় বলে , দে , আমাকে টাকা দে ।
তিনি পকেট থেকে পঞ্চাশ টাকার একটি নোট বের করে লোকটির হাতে দিলেন । লোকটি টাকাটা নেড়েচেড়ে দেখে বলল , পকেটে যা আছে সব দিয়ে দে ।
রইস উদ্দিন কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন । পাগল লোকটি তার জটপাকানো দাড়িতে হাত বুলাতে বুলাতে বলল , কী ভাবতাছোস ? যা আছে সব দিয়ে দে । আমি ফিন্দনের একটা লুঙ্গি কিনব ।
রইস উদ্দিন পকেট থেকে একশত টাকার একটা নোট বের করে পাগল লোকটির হাতে দিলেন ।
পাগল লোকটি টাকাটা নেড়েচেরে দেখতে দেখতে বলল , তরে না বললাম যা আছে , সব দিয়ে দিতে ? এত চিন্তা ভাবনা করস কেন ? তোর অনেক ধনসম্পদ হবে ।
রইস উদ্দিন কিছুক্ষণ ভাবেন । টাকাটা কি তাঁর দিয়ে দেওয়া উচিত ? পাগল মানুষ , দিয়ে দেওয়াই ভালো। তিনি পকেটে যা ছিল সবই লোকটির হাতে তুলে দিলেন । পাগল লোকটি বিড়বিড় করে কিছু একটা বলতে বলতে চলে যায় । রইস উদ্দিন সেখানেই কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকেন । এখন বাজারের দিকে যাওয়ার কোন প্রশ্নই ওঠে না । কারণ , পকেটে একটা ফুটো পয়সাও নেই । বাসায় শূন্য ব্যাগ নিয়ে ফিরে যাওয়ার কথা ভাবতেই তাঁর বুকের মধ্যে ধরাস করে ওঠে । হার্টবিট বেড়ে যায় । তনিমা রান্না করার জন্য হয়ত তৈরি হয়েই আছে । তিনি বাজারটা নিয়ে ফিরলেই কেটেকুটে রান্না চরিয়ে দেবে । কিন্তু যখন দেখবে তিনি খালি ব্যাগ নিয়ে ফিরেছেন , তখন তনিমা রেগে গিয়ে কি করবে কে জানে !
তনিমা এমনিতে সহজে রাগে না । কিন্তু একবার রাগাতে পারলে হয় , গণ্ডার তখন ওর কাছে কোন ছাড় । রইস উদ্দিন মনে মনে নিজেকেই গালমন্দ করলেন । কেন যে সব টাকা দিয়ে দিলেন ? অর্ধেকটা রাখলেও তো আজকের বাজারটা চালিয়ে নেয়া যেত ।
তবে পাগল লোকটার প্রতি কোন কটুক্তি করার সাহস হল না তাঁর । করতে ইচ্ছাও করল না । রাস্তায় যে সব পাগল ঘুরে বেড়ায় তারা তো সবাই পাগল না । আল্লাহ্‌র প্রিয় বান্দা বুজর্গ কেউ থাকতেও পারে । রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো পাগলদের ব্যাপারে বরাবরই খুব সিরিয়াস তিনি । গেট নক করলে তনিমাই এসে খুলে দিলো । হাতের খালি ব্যাগটির দিকে তাকিয়ে ভূত দেখার মতো চমকে উঠে বলল , কী ব্যাপার , ব্যাগ খালি ক্যান ? বাজার কই ?
রইস উদ্দিন মিনেমিনে গলায় বললেন , বাজার মানে — বাজা—–
হ্যাঁ , বাজার মানে কি ? বল ? টাকা হারাইয়া ফেলছ ?
না , টাকা হারাই নাই । টাকা হারাবে ক্যান ? আমি কি ছোট বাচ্চা নাকি যে আমার টাকা হারাবে ?
তনিমা এবার রেগে বলল , টাকা হারাও নাই ! তাহলে বাজার করো নাই ক্যান ?
টাকা নাই , বাজার করব কি দিয়ে ?
বাজার করবা কি দিয়া মানে ? টাকা নিয়ে যাও নাই ?
গিয়েছিলাম ।
তনিমা অধৈর্য হয়ে বলল, এসবের মানে কি ?
রইস উদ্দিন বিরক্তির গলায় বললেন , আগে তো ভিতরে যেতে দেবে , নাকি ?
তনিমা বিদ্রুপের গলায় বলল, হ্যাঁ, ভেতরে আসো । ভেতরে এসে সোফায় বসো । তালপাখা দিয়ে আমি তোমার মাথায় বাতাস করি , তারপর বল , কেমন ?
রইস উদ্দিন ভেতরে গিয়ে ড্রইং রুমটায় বসলেন । তনিমা ফ্যানের সুইচটা দিয়ে বলল, সরি, তালপাখা দিয়ে বাতাস করতে পারলাম না । এবার বল তো কী হয়েছে ? নির্ভয়ে বল ? আমি কি বাঘ না ভাল্লুক ? আমাকে এত ভয় পাচ্ছ কেন ?
রইস উদ্দিন মনে মনে বললেন , বাঘ ভাল্লুক হলে তবু ভালো ছিল । তুমি যে আমার বউ । আর বউকে কে না ডরায় ?
তনিমা উঁচু গলায় বলল , এই, কি ভাবছ ? রইস উদ্দিন বললেন , না , কিছু না ।
তনিমা বলল , মিথ্যেটা কীভাবে বলবে মনে মনে গুছিয়ে নিচ্ছ ?
রইস উদ্দিন রেগে বললেন , আশ্চর্য, আমি আবার কবে কখন তোমার কাছে মিথ্যা বললাম ?
বল নাই । তবে আজ বলবে মনে হচ্ছে ।
শোন , বাজার করার টাকাটা আমি একটা পাগলকে দিয়ে দিয়েছি ।
বাজার করার টাকাটা পাগলকে দিয়ে দিয়েছ মানে ? পাগল কি বাজার করে বাসায় দিয়ে যাবে ?
রইস উদ্দিন বিরক্তির চোখে তনিমার দিকে তাকালেন । তনিমা শক্ত গলায় বলল , পাগলকে সব টাকা দিয়ে দিলে ক্যান ?
তিনি পাগলকে টাকা দেওয়ার ঘটনাটি আদ্যপান্ত বর্ণনা করে শোনালেন । তনিমা সব শুনে রেগে বলল, পাগল বলল তোমার তিনটা বাড়ি হবে , আর তুমি সব টাকা পাগলকে দিয়ে দিলে ? ওই ব্যাটা তো পাগল না । ওই ব্যাটা হল সিয়ান । পাগল হল তুমি । শুধু পাগল না । চ্যাম্পিয়ন পাগল । আরে, ওই পাগলটা তোমার ওই টাকা দিয়ে কী করবে, জানো ? হেরোইন , ফেনসিডিল , গাঁজা এগুলো খাবে, বুঝ কিছু ?
রইস উদ্দিন বললেন, সব পাগল এক না । সবাই কি আর নেশা করে ? তুমি চেনো না , তাই ।
তনিমা মুখ ঝেমটিয়ে বলল, চিনি । একজনকে ভালো করেই চিনি ।
কাকে ?
কাকে আবার, তোমাকে । তুমি কি কম পাগল ? পাগল না হলে কী আর এমন কাজ করে ?
রাগে গজর গজর করতে করতে তনিমা কিচেনে চলে যায় । রইস উদ্দিন কিছুক্ষণ সোফায় ঝিম মেরে বসে থাকেন ।
এর কয়েক বছর পর । টিউশনির ওপর হঠাৎ মন উঠে যায় রইস উদ্দিনের । তনিমার গয়না বিক্রি করে এবং নিজের কাছে যা ছিল তাই দিয়ে একটা নীট ওয়্যারের ব্যবসা খুলে বসেন তিনি । নীট ওয়্যারের ব্যবসায় সফল হলে একটা গার্মেন্টস খুলে বসেন । এরপর এক্সপোর্ট ইমপোর্ট । তরতর করে বাড়ে তাঁর ব্যবসা । শহরের অভিজাত এলাকায় নিজেদের জন্য একটা বাড়ি ক্রয় করেন । আরও দুটি বাড়ি কিনে ভাড়া দিয়ে রাখেন । ওঁদের দুটি মেয়ে । রিয়া ও রাইমা । ওরাও বাবা–মায়ের চড়াইউৎড়ায়ের সাথে তাল রেখে বড় হয়ে গেছে । পিঠাপিঠি দুই বোন । তাই একই স্কুলে একজন নবম শ্রেণিতে অন্যজন দশম শ্রেণিতে পড়ছে ।
সকাল সাতটা বাজতে না বাজতেই ভীষণ ব্যস্ততা তনিমার । কাজের মেয়ে থাকলেও রান্নার কাজটা নিজেই করে ও । সকাল আটটার মধ্যেই রইস উদ্দিন অফিসে চলে যান ।
সকাল আটটার পরেই পুরো বাসাটা ফাঁকা । সুনসান । আসলে মেয়ে দুটোই বাসাটাকে একদম মাতিয়ে রাখে । ক্যাসেট প্লেয়ার ছেড়ে এই গান শুনছে তো ওই নাচ প্র্যাকটিস করছে । কখনও আবার দুজনে মিলে তর্ক জুড়ে দিচ্ছে । তর্ক বাধার বিষয়েরও কোন অভাব নেই ।
রইস উদ্দিন রেডি হয়ে এসে খাবার টেবিলে বসতে বসতে বললেন , ওরা রেডি হয়েছে ? তনিমা প্লেটে নাশতা সাজিয়ে দিতে দিতে বলল , হ্যাঁ , ওরা রেডি হচ্ছে । তুমি খেতে শুরু করো ।
একটু তাড়াতাড়ি করতে বল ।
তনিমা ডাইনিং রুম থেকেই উঁচু গলায় বলল , রাইমা , তোদের হলো ?
রাইমা ওদের রুম থেকে সাড়া দিল —– এই তো মা , আমরা রেডি ।
রইস উদ্দিন গরম দুধে রুটি ভিজিয়ে খাচ্ছেন । এটাই তাঁর প্রতিদিনের ব্রেকফাস্ট । যখন টিউশনি করে সংসার চালাতেন তখনও খেতেন , এখন অবস্থার পরিবর্তন হওয়া সত্ত্বেও খান ।
রিয়া ও রাইমা এসে বাবার দু পাশে বসতে বসতে বলল , গুড মর্নিং বাবা!
গুড মর্নিং !
রাইমা বলল , বাবা , প্রতিদিন সকালে তোমার একই খাবার খেতে কেমন লাগে ?
রইস উদ্দিন মৃদু হেসে বললেন , ভালো লাগে ।
রিয়া বলল , বাবা , আমারও খারাপ লাগে ।
তনিমা একটু শাসনের সুরে বলল , খাবারটা তোদের বাবার গলা দিয়েই নামছে । তোদের গলা দিয়ে তো নামছে না ?
রাইমা আপত্তির গলায় বলল , মা , তুমিও ।
রইস উদ্দিন ওদের দিকে সস্নেহ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন , ঠিক আছে , তোদের যখন খারাপ লাগে তখন সপ্তাহে অন্তত দুদিন তোরা যা খাস তাই খেলাম । কিন্তু একবারে ছাড়তে পারব না ।
তনিমা আপত্তির গলায় বলল , ওদের কথায় কান দিও না তো ? মেয়েরা বলল আর তাতেই উনি দুধরুটি খাওয়া বন্ধ করে দেবেন ।
রাইমা বলল , রোজ রোজ চিনি দিয়ে রুটি খাওয়া ভালো ? ব্লাডে সুগার বাড়লে তখন ?
রইস উদ্দিন হেসে বললেন , হ্যাঁ , এটাও তো একটা কথা । সুগার বেড়ে যাবে কী বলছিস , সুগার তো বোধহয় বেড়েই গেছে । সো , দুধ – চিনি – রুটি খাওয়া বন্ধ । এবার চল , চল , দেরি হয়ে যাচ্ছে ।
রইস উদ্দিন ওদেরকে নিয়ে দোতালার সিঁড়ি ভেঙ্গে নিচে নামেন । তমিজ গ্যারেজ থেকে এক্স ড্যাভেন গাড়িটি বের করে দাঁড়িয়ে ছিল । ওদেরকে দেখেই সসম্ভ্রমে একটি সালাম ঠুকে পেছনের দরজাটি খুলে দিল ।
এক্স ড্যাভেন গেট পেরিয়ে রাস্তায় নামে । বাইরে প্রচণ্ড গরম । অথচ গাড়ির ভেতরে ফুরফুরে ঠাণ্ডা হাওয়া বইছে ।
এমন সুখ কখনও কল্পনাও করতে পারেন নি রইস উদ্দিন । মেয়েদেরকে স্কুলে নামিয়ে দিয়ে অফিসে চলে যান তিনি । ঐশ্বর্যে আর সুখে শান্তিতে স্ত্রী আর মেয়ে দুটিকে নিয়ে এভাবেই কেটে যাচ্ছিল তাঁর জীবন । কিন্তু উপর থেকে যিনি কলকাঠি নাড়ান তিনিই তো সব কিছুর ধারক , সব কিছুর বাহক । তিনিই যাকে ইচ্ছা ঐশ্বর্য দান করেন আবার ফিরিয়েও নেন । রইস উদ্দিনের দুটি মেয়েই নৌকাডুবিতে মারা যায় । মেয়ে দুটির মৃত্যু সংবাদ শুনে তাদের মাও হার্ট অ্যাটাক হয়ে পরপারে চলে যায় ।
আপনজনদেরকে আকস্মিকভাবে হারিয়ে রইস উদ্দিন শোকে পাথর হয়ে যান । কোন কাজকর্মেই তাঁর মন বসে না । আপনজনশূন্য বহু কাঙ্ক্ষিত এই বাড়িটিকে তাঁর কাছে কংক্রিটের কঙ্কাল মনে হয় । রোগে শোকে তিনি বিছানা নেন ।

বিষয়সমূহঃTags:

পূর্বের সংবাদ

«

পরের সংবাদ

»