সায়ীদ আবুবকর
১৭ মে, ২০১৯ | ০২:৫৯

কবিতা-অকবিতা

tesst

কবিতা সেই জিনিস যা কখনও গানের মতো গেয়ে বেড়ানোর প্রয়োজন নেই, অভিনেতার মতো হাতপা ঝাঁকিয়ে কণ্ঠ কাঁপিয়ে আবৃত্তি করারও প্রয়োজন নেই, কেবল পাঠ করতে পারলেই চলে। কবিতা আবৃত্তিযোগ্য বটে, কখনও কখনও গীতযোগ্যও হয়তো বা; কিন্তু একথা অবলীলায় বলা যায় যে, কবিতা কখনও এসব উদ্দেশ্যে রচিত হয় না। কবিতার মধ্যে এমন একটা যাদু থাকে যা কোনো সুর ছাড়াই, কোনো কণ্ঠের উপস্থিতি ছাড়াই এর পাঠককে বিমোহিত করে রাখে। কবিতা শব্দ দিয়ে গাঁথা হলেও শব্দগুলো পঠিত হওয়ার পর এটা মস্তিষ্কের সিঁড়িদরোজা পার হয়ে সোজা পাঠকের হৃদয়ে গিয়ে আঘাত করে। সে-আঘাতে ঘুমন্ত হৃদয়টা হঠাৎ আড়মোড়া ভেঙে জেগে ওঠে কিংবা বটের পাতার মতো স্বতঃস্ফূর্ত নড়ে ওঠে পত্পত্ পত্পত্। বড় কবি তাঁরাই যাঁদের কবিতায় এ ধরনের যাদুকরী শক্তি থাকে।
মীর তকী মীর কিংবা আসাদুল্লাহ খাঁ গালিবই সম্ভবত এ ধরনের কবি যাঁদের রচিত প্রতিটি কবিতাই শুধু নয়, প্রতিটি পঙ্ক্তিই আশ্চর্য সম্মোহনী শক্তিতে ভরা। আধুনিককালের কবিদের মতো বিশাল ও জটিল প্রেক্ষাপট নিয়ে তাঁরা অবশ্য কবিতার ইমারত নির্মাণ করেননি, বরং তাঁদের প্রত্যেকটি কবিতাকে ছোট ছোট স্বর্গীয় কুটিরই হয়তো বলা যায়, কিন্তু বাবুই পাখির মতো সূক্ষ্ম শিল্পজ্ঞান না থাকলে এ ধরনের আশ্চর্য শিল্পকুটির কখনও নির্মাণ করা যায় না। এ ধরনের পঙ্ক্তিমালার বিশেষত্ব হলো, এরা ভিন্ন যে-কোনো ভাষায় সরল গদ্যে অনূদিত হয়েও সবসময় মাতৃভাষার মতো সমান কাব্যশক্তি জাহির করতে থাকে। মীর যখন এরকম করে বলেন:
দিলমে রহ দিলমে, কেহ্ মেমার-এ কজাসে অবতক
এ্যায়সা মতবু মকা কোঈ বনায়া নহ্ গয়া।।
অর্থাৎ হৃদয়ের মধ্যে থাকো, আমার হৃদয়ের মধ্যে, কারণ ভাগ্যনির্মাতা আজ পর্যন্ত এর চেয়ে মনোরম বাড়ি তৈরি করতে পারেননি; কিংবা তিনি যখন বলেন:
শহর-এ দিল অজব জা থী পর উসকে গয়ে
এ্যায়সা উজড়া কেহ কিসী তরহ্ বসায়া নহ্ গয়া।।
অর্থাৎ হৃদয় আমার এক আশ্চর্য নগরী ছিলো, কিন্তু সে চলে যাবার পর এমন উজাড় হলো যে, কিছুতেই আর তাতে বসত করা গেল না ; আবার গালিব যখন বলেন:

সব কহা কুছ লালহ্ ও গুল-মে নুমায়া হো গয়ী,
খাক-মে কেয়া সুরতে হোগি কেহ্ পিন্হা হো গয়ী।।
অর্থাৎ না, সব নয়, অতি অল্পই রূপ নিয়েছে লালহ্ ও গোলাপের রূপে; কী রূপসীই ছিলেন যাঁরা এই মাটির তলায় চাপা পড়ে আছেন! কিংবা তিনি যখন বলেন:

আগোশ-এ গুল কুশাদহ্ বরায়ে বিদা হৈ;
অয় অন্দলীব চল্ কেহ্ চলে দিন বহার-কে।।
অর্থাৎ গোলাপের কলিগুলি পাপড়ি মেলেছে বিদায় জানাবার জন্যে; হে বুলবুল, চলো এবার, চলে যাচ্ছে বসন্তের দিন; তখন কিন্তু আমাদের অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠে ব্যথা ও পুলকমিশ্রিত এক মধুর ভাবাবেগে, যার কথা আমরা ভুলতে পারি না কিছুতেই। ফলে এ ধরনের পঙ্ক্তির নিকট আমাদের দ্বারস্থ হতে হয় বারবার।

আধুনিককালে কবিতা অবশ্য তার চারিত্র্য বদলিয়েছে; আবেগের চেয়ে সেখানে বেশি চিšতার গভীরতা ও শব্দের কারুকাজের উপস্থিতি। মেধাশূন্য পাঠকের পক্ষে এ ধরনের কবিতা উপভোগ করা কখনও সম্ভব হয় না। টি এস ইলিয়টের ‘দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড’ কিংবা ডবি¬উ বি ইয়েটসের ‘সেইলিং টু বাইজান্টিয়াম’ উপভোগ করা আর এস টি কোলরিজের ‘দ্য রাইম অব দ্য এইন্স্যান্ট মেরিনার’ উপভোগ করা এক কথা নয়। ‘দ্য রাইম অব দ্য এইন্স্যান্ট মেরিনারে’র মধ্যেও অবশ্য কিছু কাব্যসৌন্দর্য আছে কিন্তু কবিতাটি কাহিনীপ্রধান হওয়ায় এর গাঁথুনি বড় নড়বড়ে এবং নি®প্রয়োজনীয় কথায় ও পুনরাবৃত্তিতে ভরপুর। কোলরিজের সুদীর্ঘ এ কবিতাটি থেকে একটামাত্র ম্যাসেজ-ই আমাদের পাওয়ার আছে আর তা হলো:

He prayeth best who loveth best,
All things both great and small;

এ ম্যাসেজটুকু পাওয়ার জন্য পাঠককে দৌড়ে বেড়াতে হয় বিশাল এক কবিতার বালুচরে। রবীন্দ্রনাথের ‘পুরস্কার’ কবিতাটিও কিন্তু একইভাবে যেন ইঁদুরের আত্মা নিয়ে ধারণ করে আছে হস্তিনীর শরীর। কবিতায় ভাষার সারল্য কোনো দোষ নয় বটে, তবে অতি কথন অবশ্যই বর্জনীয়।

অনেক দুর্বল কবিতাও দরাজ গলায় আবৃত্তি করে স্টেজ গরম করিয়ে দেওয়া যায়। সাধারণ শ্রোতা যারা, তারা চায় শুধু কানের আরাম; শুনতে ভালো লাগলেই তাদের চলে। জসীমউদ্দীনের ‘কবরে’র আবৃত্তি শুনে হয়তো কারো চোখে পানি এসে যেতে পারে, তাই বলে এটা মনে করা উচিত নয় যে, কবিতা হিসেবে এটি অনন্য। আমাকে অনেকে ‘হুলিয়া’র কথা বলে; তখন আমার কিছু বলার থাকে না, কারণ আমি জানি একটি উৎকৃষ্ট কবিতা উপভোগ করার মতো কান তৈরি হয়নি তাদের। মূলত হৃদয়ের কান ও বোধি একসাথে না খুললে কারো পক্ষে, কবিতা বলতে যা আমরা বুঝি, তা উপলব্ধি করা সম্ভব হয় না। একজন সুকণ্ঠ আবৃত্তিকারকে দিয়ে আবৃত্তি করালে একজন অখ্যাত কবির কবিতাও তো অসাধারণ বলে মনে হবে।
কবিতাকে কখনও গানের মতো হালকা জ্ঞান করা সমীচীন নয়। এমনও হতে পারে যে, কোনো সঙ্গীততারকার পরিবেশিত কোনো একটি গান উপস্থিত কয়েক লক্ষ শ্রোতাকেও বিমোহিত করে ফেলেছে, কিন্তু অনেক বিখ্যাত, শিল্পগুণে যথার্থভাবে উত্তীর্ণ, কোনো কবিতা ভালো আবৃত্তিকার দিয়ে পরিবেশন করার পরও হয়তো ওই একই শ্রোতা কান ফিরিয়ে নিয়েছে তা থেকে। মিল্টন কিংবা গেইটের কবিতা স্টেজে পরিবেশন করার জিনিস নয়; সুলিখিত কবিতার জন্য চাই সম্পূর্ণ মনোযোগ, আর তার জন্য চাই নিরিবিলি পরিবেশ। মাছকে যত পানির গভীরে রাখা হবে ততই তাতে মাছের সুখ, মাছের সৌন্দর্যও সেখানে।
সুর মানুষকে বিমোহিত করে সন্দেহ নেই। তবে এই সুরের মোহ মানুষের দীর্ঘদিন থাকে না। মানবকণ্ঠের সুলোলিত সুর অধিক ব্যবহৃত হতে হতে একসময় মানুষকে তা ঠিকঠিকই ক্লান্ত করে ফেলে। কোনো শাব্দিক সুর একবার দু’বার হয়তো ভালো লাগে, তৃতীয়বার সেই স্বাদ আর লাগে না। একসময় সেই সুরের প্রতি জাগে বিতৃষ্ণা। তখন সে অন্য আরেক সুরের দিকে ঝুঁকে পড়ে। এটা সেই সুর যার কোনো শ্রাব্য আওয়াজ নেই, ধ্বনির ঝংকার নেই, তা শুধু বাজতে থাকে মনের ভেতর, হৃদয়ের কর্ণকুহরে। কারো কারো কবিতা আছে যেখানে ব্যান্ডসঙ্গীতের চীৎকার ও পাখির কিচির মিচিরই বেশি, কারো কারো কবিতা আছে সেখানে সুর লুকিয়ে থাকে কবিতার শরীরের অšতরালে। শরীর মরে যায় কিন্তু হৃদয় অবিনশ্বর; কবিতার শরীরের অন্তরালের সুরও বেঁচে থাকে চিরদিন পাঠকের অন্তরে।

রূপরঙ মানুষের চোখকে ধাঁধিয়ে দেয় বটে,তবে রূপের এ মোহ কাটতে তার বেশি সময় লাগে না। যে রূপের মোহে পড়ে ঘর বাঁধে, মোহ কেটে গেলে তার ঘর ভাঙতে সাধ হয়। কিন্তু সে যদি হাতড়িয়ে একবার তার প্রেয়সীর ভেতরের রপকে ধরতে পারে তাহলে তার প্রেম হয় আরো গাঢ়, জীবন হয়ে ওঠে বটবৃক্ষের মতো ছায়াশীতল ও পাখপাখালির কলতানে মুখর। কবিতার দেহেও রমণীর মতো রঙ আছে, রূপ আছে, কিন্তু এসব চাকচিক্যের অন্তরালে আছে আর-এক অপার সৌন্দর্য। এ সৌন্দর্যকে যারা ধরতে পারে না, কবিতা তাদেরকে ফাঁকি দিয়ে সেইসব মানুষের কাছে পালায় যারা সত্যিকারের সুন্দরের পূজারী।

সত্যেন্দ্রনাথ দত্তকে বলা হয় ছন্দের জাদুকর। কিন্তু তাঁর কবিতায় কবিতার চেয়ে ছন্দের ঝনঝনানি এত বেশি যে কবিতার ভারী পাঠক যারা তারা শেষ পর্যন্ত তাঁর কবিতায় স্বস্তি বোধ করেননি। পক্ষান্তরে জীবনানন্দ দাশের কবিতায় পাওয়া যাবে সাদামাঠা ছন্দ ও অন্ত্যমিলের ব্যবহার কিন্তু তাঁর কবিতার ওজন এত বেশি যে, কবিতার বোদ্ধা পাঠকরা তার মূল্য বুঝতে একটুও ভুল করেননি, ধীর গতিতে হলেও তিনি শক্তিশালী কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন, জনপ্রিয়ও হয়ে উঠেছেন। কবিতাও তাজমহলের মতো শরীরে-পোশাকে সুন্দর হয়ে উঠতে চায় বটে তবে তাজমহলের আসল সৌন্দর্য লুকায়িত যে-প্রেমের জয়গানে, কবিতার শারীরিক সৌন্দর্য ছাপিয়েও অন্তরের এই শিল্পসৌন্দর্যই এখানে ফুটে ওঠে বেশি। যাঁর কবিতায় এ ধরনের সৌন্দর্যের সাক্ষাৎ মেলে, তাঁর কবিতাই সুন্দর, তাঁর কবিতাই জীবন্ত, তা কখনও মরে না, অমর বৃক্ষ হয়ে তা ফুলের সতেজ ঘ্রাণ ছড়াতে থাকে কালের বাতাসে। আমাকে যদি প্রশ্ন করা হয়, জীবন্ত কবিতা আর মৃত কবিতা বুঝবো কী করে? তাহলে তাকে আমি সেবার রানী বিলকিসের কাগজফুল ও সতেজ ফুল পরীক্ষার কাহিনী শুনিয়ে দেবো। বিলকিস যখন কিং সলোমনের প্রজ্ঞা পরীক্ষা করার জন্য দুটো একই রকম ফুল দিয়ে বললেন, এর মধ্যে আসল ফুল কোনটা বলতে হবে, কিং সলোমন তখন জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে রইলেন। দেখলেন একটা মৌমাছিকে ভেতরে ঢুকতে। মৌমাছি দুটো ফুলের মধ্যে একটির উপর গিয়ে বসলো। তিনি বিলকিসকে বললেন, এই ফুলটিই আসল ফুল। বিলকিস অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, কিভাবে বুঝলেন? সলোমন বললেন, মৌমাছির বসা দেখে। মৌমাছি সেই ফুলে গিয়ে বসে যেখানে মৌ আছে। তদ্রুপ সেই কবিতাও কালের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে পাঠককে আনন্দ দিতে থাকে যে-কবিতায় জীবন্ত ফুলের ঘ্রাণ আছে, প্রাণের স্পন্দন আছে।

কবিতার জন্য কি গদ্যের মতো সুলিখিত, অর্থবহুল, ব্যাকরণজনিত ভুলত্রুটিমুক্ত হওয়া আবশ্যক? কখনও কখনও এর ব্যত্যয় ঘটলেও, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এসবের আবশ্যকতা আছে। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সব কবিতাই, এদের শরীরজুড়ে অšত্যমিল, ছন্দ ও অলংকারের বাড়তি ব্যবহার থাকলেও, গদ্যের মতো একটানা পাঠ করা যায় এবং তা সহজবোধ্যও বটে। টি এস ইলিয়ট যখন বলেন:

If there were water
And no rock
If there were rock
And also water
And water
A spring
A pool among the rock
If there were the sound of water only
Not the cicada
And dry grass singing
But sound of water over a rock
Where the hermit-thrush sings in the pine trees
Drip drop drip drop drop drop drop
But there is no water

তখন কিন্তু টোটাল আবহটাই আমাদের কাছে সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে গদ্যের আদলে। কবিতা মূলত দুর্বোধ্য হয়ে ওঠে একজন কবির বাক্য গঠনের অসচেতনতার কারণে। আর এ ধরনের অক্ষম কবিকে ক্ষমা করে না কোনো সমালোচক, না কোনো মাঝারি মানের পাঠক, না তার মৃত্যুপরবর্তী কাল।

কবিতা নিশ্চয়ই কোনো সঙ্গীত নয়,তবে ইহা সঙ্গীতেরও অধিক। সঙ্গীত যেখানে সুর হারিয়ে ফেলে, কবিতার সুর শুরু হয় সেখানে। গানে সেখানে সুরের ঘাটতি থাকে, কণ্ঠ দিয়ে, গায়কী দিয়ে তা ভরে দেওয়া হয়। এজন্যে তার গাঁথুনি ঢিলেঢালা। কিন্তু কবিতাতে চুল পরিমাণও ফাঁকফোক থাকার কোনো অবকাশ কিন্তু নেই। কবিতা যদি অন্ধকারের নাম হয়, তবে তা নিশ্ছিদ্র অন্ধকার। কৈশোরে আমারও প্রিয় কবি ছিলো সত্যেন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রনাথের প্রতি তো ছিলো বিতৃষ্ণা। যত দিন গড়াতে লাগলো, প্রিয় হয়ে উঠতে লাগলেন রবীন্দ্রনাথ কারণ কবিতার সত্যিকার সুর ধরা পড়তে লাগলো আমার কানে। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কবিতাগুলো হলো সেইসব কবিতা যেখানে এই মোহনীয় সুর লুকিয়ে আছে অবকাঠামোর অন্তরালে।

বিষয়সমূহঃTags:

পূর্বের সংবাদ

«

পরের সংবাদ

»