উৎসঙ্গ সৃজন চিন্তন
৮ আগস্ট, ২০২০ | ১৭:৪২

তাজ ইসলাম-এর কবিতা

tesst

এন্ড্রয়েড ফোন

শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল
খুঁটির মতো
মাথার উপর ছিলো ছাদ হয়ে
যে মানুষ
সে মানুষ ভাঙা চেয়ার এখন
ঘরের এককোনে পড়ে আছে
অযত্ন অবহেলায়।
পোলাওয়ের সুখ দিতে
কষ্টের গরম তেলে
একেকটা দিন তার
পোড়া পিঁয়াজ কুঁচি হয়ে যেত।
গরম পোলাওয়ে শুয়ে থাকতো মচমচে দেহে।
দস্তরখানায় সে এখন
পরিত্যক্ত তেজপাতা।
যে মানুষ নাক চেপে
বসা ছিল চশমার মতো
সে মানুষ উড়ে যায়, নাই হয়ে যায়
শুকনো বাঁশ পাতা হয়ে
হাওয়ায় হাওয়ায়।
হলদে পাতার মতো
টুপ করে ঝরে যায়
মানুষের নাম
পাথর নুড়ির মতো
ডুবে যায় মানুষের জীবন
নষ্ট ঘড়ির মতো থেমে যায়
একদিন সব দৌড়ঝাঁপ

মাঝে মাঝে মনে হয়
মানুষ একটা দামি,
খুব দামি এন্ড্রয়েড সেট
জীবিতের যতন অনেক!
থাকে না খবর কোনোই
হয়ে গেলে একবার
সেই সেট ডেড।

জীবনের রঙ

একটা সবুজ পান হও
ইচ্ছার জর্দা কিংবা
আকাঙ্ক্ষার খয়ের
সৌন্দর্যের শুভ্র চুন লাগিয়ে
রাঙ্গিয়ে নাও জীবনের দুই ঠোঁট।
দুঃখ কষ্টের সাগরে ভাসাও জীবনের পানসি
জুড়ে দাও মাঝির প্রজ্ঞা
পরিকল্পিত বাতাসে উড়াও পাল
কৌশলের বৈঠা শক্ত হাতে ধর
সমস্ত ঢেউ মাড়িয়ে
বন্দরে পৌছে যাবে।
প্রাপ্তির ছায়ায় শুকরিয়ার জায়নামাজে
অপরাহ্নে তার নামে নত হও সেজদায়
যে তোমাকে প্রচন্ড ঝড়ে
শিল কড়ইর ধৈর্য শিখিয়ে দিলেন।
আর পড় তার নামে
” ইকরা বিসমি রাব্বি কাল্লাজি খালাক।

প্রীতিভাজনেষু ভোর

একটা প্রবীণ পুকুর হও
পাখিরা শীতল জলে
সেরে নিক প্রাত্যহিক স্নান।
জ্ঞানের গভীরে ডুবে পাখি
চঞ্চু ভরে নিয়ে যাক
নৈমিত্তিক দাঁড়কিনা মাছ।
দুপুরের রৌদ্র হও
উত্তাপে সতেজ হোক
মননের সেঁতসেঁতে কুৎসিত উন্নাসিক স্বভাব।
সবুজপত্র হয়ে
মানুষের মাথার উপর
বিস্তৃত হও তুমি কোমল ছায়া।
প্রীতিভাজনেষু ভোর হও
আজানের সুরে ডাক,
হে মানুষ দ্রুত আস
মঙ্গলের পথে, কল্যাণের পথে।
ফিরে আস চির ধ্রুব
সত্য সুন্দর মহত্তের পথে।

ফিরে এসো কোকিলের বিরহী গজল

ফিরে এসো আমাদের শাপলা শালুক
জোয়ারে উপচে ওঠা নদীদের বুক
ফিরে এসো দাঁড়কিনা খৈলসা পুঁটি
ফিরে এসো খালে বিলে শামুক ঝিনুক।

ফিরে এসো রাজপথে
মিছিল শ্লোগান
ফিরে এসো প্রতিবাদে
মুখর জোয়ান
ফিরে এসো ডালে ডালে
পাখিদের ডাক
ফিরে এসো কোকিলের
বিরহী গজল।
ফিরে এসো যুদ্ধের রণ দামামা
সংগ্রামী তরুণের রণ হুংকার
ফিরে এসো ফিরে এসো প্রবীণ পুরুষ
মুর্খ এ জনপদে জ্ঞানের মশাল
তোমার প্রজ্ঞা দিয়ে উড়াও নিশান।

মুজাদ্দিদে আলফেসানী আপনি আসুন
এ যুগে উবাই কারা স্পষ্ট হয়ে যাক
দারুল হরবের শর্ত কি হুজুর
এদেশে আপনি আবার এসে বলে যান।

টিপু সুলতান আসেন আপনি আবার
তরবারি নিয়ে মহাবীর ঈশা খাঁ ‘ র
আসুন এদেশে শেরে বাংলা আবার
সন্তোষে আপনি আসুন ভাসানী হুজুর

ফিরে এসো ইতিহাস গৌড় জয়ের
নদিয়া,সিন্ধুর বিজয় গাঁথা
ওঙ্কার তোল ফের এই জনপদে
আঠারো কোটির কণ্ঠে উঠুক ধ্বনি
নারায়ে তাকবীর আল্লাহ মহান

আবার ধ্বনিত হোক আকাশে বাতাসে
ধূলায় মিশুক সব স্বৈরশাসক
মিসমার হয়ে যাক জালিমের গদি
খিড়কি দরজা দিয়ে জালিম পালাক
শাহজালাল এ জমিনে ফিরে এসো ফের
টুঁটি চেপে ধর এসে সব জালিমের।
ফিরে এসো রেসকোর্স,পল্টন মাঠ
লক্ষ লোকের বিশাল গণজমায়েত
জলদগম্ভীর কণ্ঠে তর্জনীর সুতীব্র নাচ
এসো ফিরে রাজপথে অবাধ চলা
হরবোলা পাখির মতো অবিরাম বলা
ফিরে এসো মুক্ত পাখি অবাধ উড়াল
ন্যায্য দাবীর নামে উর্ধ্বে উত্থিত
মুষ্টিবদ্ধ হাত
ফিরে এসো আমাদের আলোর প্রভাত।

ফিরে এসো শৈশব সোনালী সুদিন
পাঁচ দশ পয়সার লাল আইক্রিম
কুড়ানো সরিষা,পাট,সুপারি ক’হালি
ইঁদুরের গর্ত খুঁড়ে তুলে আনা ধান
এসব বিক্রি করে লব্ধ টাকায়
মেলা থেকে কিনে আনা রঙিন ঘুড়ি
ফিরে এসো ডাঙ্গুলি, বৌছি খেলা
বিয়েবাড়ির উঠোনে মা- চাচির গীত।

ফিরে এসো মুক্তিযুদ্ধের গৌরব গাঁথা
বিদ্রোহে ফেটে পড়া অসীম সাহস
ফিরে এসো যুদ্ধের সাহসী কিশোর
ফিরে এসো রক্তের টগবগে নাচ
দুর্নীতির প্রাসাদে ঢুকো গেরিলা কমান্ড।

ফিরে এসো আমাদের সোনালী অতীত
ফিরে এসো আমাদের মসলিন শাড়ি
ফিরে এসো আমাদের ভাই ভাই দিন
জালিমের বিপক্ষে তোল বজ্র মুঠি
মজলুমের স্বপক্ষে ওঠা সাহসী সঙিন।
ফিরে এসো হারানো সকল সুদিন।

ফিরে এসো আমাদের আলোর প্রভাত।
ফিরে এসো হারানো সকল সুদিন।

দোয়েলের চাঞ্চল্য

পৃথিবী মুমূর্ষু
নার্সিং হাতে তাকে
সুস্হ করে তোল।
পৃথিবী বিষন্ন
প্রজাপতি ডানায়
সৌন্দর্য ছড়িয়ে দাও,
গ্লাস ভরে পান করাও
রংধনু রং।
অবসাদ ঝেড়ে ফেলে
দোয়েলের চাঞ্চল্য পাবে
আবার পৃথিবী।
বিপন্ন পৃথিবীর রুগ্ন শিয়রে
মাতৃমমতায় এসো হে মানুষ।
দরদী কৃষক হয়ে
প্রেমের লাঙ্গল দিয়ে
বসবাস যোগ্য করে
গড়ো এ পৃথিবী।
ঘাসের ডগায় শিশির ফোঁটা প্রাণের স্পন্দনে উঠুক হেসে
মানুষের যাত্রা হোক পৃথিবীময়
মানুষেরে ভালোবেসে।

নদীর অসুখ

গোলাপের পাপড়িতে নেমে আসা সুরভিত ভোর
বেঘোরে নিহত হয়
স্বৈরাচারী হাওয়ার হুকুমে,
বারান্দার কার্নিশে ঘুরঘুর করা চড়ুইর ঠোঁটের কোলাহলে
আর বেগুন পাতায় লাফিয়ে পড়া
টুনটুনির পায়ের স্বাধীনতায়
ঝুলতে থাকে কালো বিড়ালের জঘন্য আদেশের নির্মম তালা।
ভীতু পাতারা তখন দোলে না বাতাসে
মূঢ় ও বধির হয়ে সব সয়ে যায়
অনিয়ম, অন্যায়, অত্যাচারের বিরুদ্ধে কিছুই বলে না।
কিচ্ছু বলতে পারে না।
লালশাকের পাতায় পাতায়
চঞ্চল বালিকার হাসির মতো
সকালের এক টুকরো ঝিলিক মারা রোদ
পুঁইয়ের মাচায় গড়াগড়ি করা
দুপুরের তরতাজা রোদ
ঘুটঘুটে আঁধারের আজদাহা এসে
গিলে ফেলে ওদের নিজস্ব রোদ
ওরা রোদহীন হয়ে কাটায় বিবর্ণ জীবন
তবু কিছুই বলার নেই,কিচ্ছু বলার নেই।
বস্তুত বলার কোনো সুযোগ নেই
হরণ করা হয়েছে যা কিছু বলার সমস্ত অধিকার।
কলকল হেসে স্বাধীন স্বভাবে সাগরের দিকে ছুটা চলা নদী
মৃত লাশ হয়ে পড়ে থাকে হার্ডিঞ্জ ব্রিজের নিচে
বালুচর হত্যা করে যখন নদীর স্বাধীনতা
রুদ্ধ করে খরস্রোতা নদীর গতি
যখন নিহত হয় নদীদের বাকস্বাধীনতা
বালুকণা জমে জমে গড়ে ওঠে বালুচর নদীদের বুকে
পাড়ভাঙা গান ভুলে
ঢেউ কলতান ভুলে স্রোতস্বিনী ঢলে পড়ে মৃত্যুর অসুখে।

বিষয়সমূহঃ