তাসনীম মাহমুদ
১ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ | ১০:৪৬

তাসনীম মাহমুদ’র কবিতা

tesst

লাঙ্গল চষা জমিন

ঘামের সেঁচে ভেজা
লাঙ্গল চষা জমিন আমার…
এ আমারই সাত পুরুষের ভিটামাটি, ঘর।
এ মাটির মূলে প্রবাহ জীবন
আমার ভাইয়ের, আমার বাপ-দাদা’র
ভূমিলগ্ন রক্তস্রোত।

এখানে আমার মায়ের সাত পর্দার ভাঁজে
গড়ে ওঠা যে আবাস
সেখানে আমারই বসবাস; সেই আদিগন্ত
বিপ্লবের মিছিল মাড়িয়ে…
যেখানে মিছিলের শত-সহস্র যাত্রীরা
খুন রঙে
গর্ভফুলের বৃন্তে বৃন্তে রেখে গ্যাছে বিপ্লবী স্বাক্ষর।
এ মায়ের আদর-স্নেহ, শাসন-বারণে
আমার মস্তক উঁচু শীর।

কে তুমি শকুন নখোর তুলে
আমার জমিনে হাঁকাও লাঙ্গল?
দেখাও তোমার কালচে কলিজা
মুখোমুখি…

কসম! সেই মানবাত্মার মালিকের
আমি তোমার ঘাড় মটকে
আমার পূর্ব-পুরুষের রক্তের ঋণ শোধ করবো।
কসম!
আমার লাঙ্গল চষা জমিনে যদি
শকুনের পালকও উদগত হয়
শকুনের কলিজা চিরে; আমি
আমার মায়ের গর্ভফুলের ঋণ শোধ করবো।

এ জমিন আমার
এ লাঙ্গল চষা জমিন আমার।

আমফুল মন

মেয়েটি পাহাড় দেখলে ভয়ে পালায়
বৃষ্টি নামলে আঁচল পাতে…

সাজ বেলায়;
কদম গোজে চুলের খোঁপায়…

আমি বলিঃ পাহাড়কে এতো ভয়?
মেয়েটি বলেঃ এত্তো বড় আর উঁচু

যদি বিশলতায় ভেঙে পড়ে, ঢেকে দেয়
ঘাস লতাপাতা ফুল!

আমি বলিঃ বৃষ্টিতে আঁচল পাতো যে?
মেয়েটি বলেঃ বৃষ্টিকে ধরবো বোলে।
জানেন!
একেকটি ফোঁটা বৃষ্টি; প্রতিটি রঙিন প্রজাপতি
যেনো ছুঁতে গেলেই উড়াল দেয়;
শৈশবে যেমন ছিলো,
আমফুল বাগানের মৌ মৌ গন্ধশুষক মন!

আমি বলিঃ কদমকে আরদ্ধ কেনো?
মেয়েটি বলেঃ নিঃঅহংকার এক সুন্দরী সে!

আমি চেয়ে দেখিঃ
মেয়েটির সরল চোখ বৃষ্টির মতো স্বচ্ছ!
বুকের বাম পাশটায় নেই কোনো আড়ষ্টতা।

নীমপেঁচা

রাত্রির মধ্যঘুমে আজও আমি স্বপ্ন দেখে
ঘেমে উঠি; জেগে উঠি কাননী…

ইচ্ছে ছিলো না কখনো বেদুইন জীবনে
তোমাকে নিয়ে ভাববার আর। অথচ;
যতোবার চোখ বুজি,
ভেসে আসা ঢেউয়ের মতো ঘুমঘরে দেখতে পাই
তোমার জলপাই রঙিন নেকাব; নাকের চারপাশে
ঘুরে ফেরে সেইস’ব বিন্যস্ত চুলের আতর গন্ধ।

বড় বড় নিঃশ্বাসেরা ফুসফুসকে করে তোলে
অনেক বেশি উতলা। গাঢ়ো নিকোটিনে যেমন হয়!

এইতো মানব জীবন!
এইতো এঁটেল মাটির মতো থোক থোক পড়ে থাকা
যেন; ফসলহীন-উর্বরহীন নিরব কপোতাক্ষ এক।
জানো তো! বাবুই পাখির মতো শিল্পী হওয়ার বাসনা
সেই কবে পুড়িয়ে ফেলেছি বোশেখের দারুণ রৌদ্রে?
হয়তো রাখোনি খোঁজ; কে-জানে, হয়তো রেখেছো!

তথাপি;
তৃষ্ণায় সাহারা এখন প্রতিটি রাতের গন্ধরাজ। ফেরেনি ঘরে
নীল অক্ষরে লেখা আকুলিবিকুলি-আচরকাচরি।
ঈগলের সোনালি ঠোঁট তুলে নিয়ে গেছে আবদার…

খৈঁ ফোঁটা বিকেলে যে প্রেম একটু একটু করে
বেড়ে উঠেছিল চাঁদের মানসে; তার সাথে
রয়ে গেলো আজন্মকাল জ্যোৎস্না-ব্যবধান
কোনো এক বিষম পূর্ণিমায় দেখা হয়নি আমাদের।

হড়হড় করে হেঁটে গেলে তুমি, নীমপেঁচা সকালে
বেলাভূমির হৃদপি- ছুঁতে… আর আমি!
আমি চোখের কার্নিশে ঝুলে থাকা জলে
অবাক বিস্ময়ে চেয়ে চেয়ে দেখেছি,
আভিজাত্যের শিশিরে নেমে আসা রাত্রিগুলো কেমন হয়!
কেমন করে কুয়াশা ধূসর হয়ে আসে নূয়ে পড়া পাপড়িতে!

আজকাল আমার ঘুম হয় না। জেগে থাকি।
রাত্রি ফুরায়। ফুরায় না তার জেগে থাকা লেনদেন।

প্যারাডাইম

নদীর গুঞ্জনে কান পেতে শুনি
ম্রিয়মান কণ্ঠে কে যেন বলছে,
তোমাদের স্বপ্ন খুন হয়েছে! ইতিহাসÑ
বাতাসের সার্সিতে অহেতুক দোদুল্যমান…
রক্তরস;
শু’ষে নিয়েছে খটখটে এঁটেল মাটি।

আমি মাটির বুকে চোখ রেখে দেখি…
ফ্যাকাশে-কালচে দাগটা বেঁচে থাকা
একমাত্র স্বপ্নখুন সাক্ষী! অথচ;
যে ইবলিশ সুড়ঙ্গ খুঁড়ে আয়োজন করেছে
ছিন্ন মস্তকের রক্ত পিচ্ছিল বেলাভূমি
তার কাছে মৃত কেবল উচ্ছিষ্ট আর অজীর্ণ।

কেননা;
শয়তানের প্রতিজ্ঞা হলো,
সত্য-সংগ্রাম-স্বপ্নকে খুন; ইতিহাসকে খুন।
যেহেতু পরিবর্তনের প্যারাডাইম শয়তানী চ্যালাদের হাতে।

তথাপি;
ইতিহাসের আঁতুড়ঘরে বুনন হয়েছে
যে স্বপ্নের বীজ
দীপ্তি আর ভাস্বরের চিরন্তন বাণী নিয়ে
তার একটি মাত্র কাঙ্খিত রূপ
আমি আজও দেখতে চাই।

পৃথিবীর পথে

আমি একটিবারের জন্য
পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করতে চাই
সূর্যকে যেভাবে পৃথিবী, করে থাকে আবর্তন…

বিন্দু বিসর্গ দ্রাঘিমার সৌরজগত চেয়ে চেয়ে
অবাক বিস্ময়ে দেখবে, বিশ্ববালকের হেঁটে চলা!

ঘূর্ণন গতির সাঁকোয় চড়ে
নক্ষত্রের রাস্তায় অগণন পদচিহ্ন বুনে বুনে
গ্রহাণুর পিঞ্জরে আমি, গুঁজে দেবো
রুুদ্রউলঙ্গ নিশান।

সিম্ফনির মহাযাত্রায় উড়াল মহাশূন্য গহ্বর
বারেক ফিরে, দেখে নেবে প্রতিপক্ষ…

স্ররষ্টার সেবা দাস-দাসী আর নতজানু উল্কার বহ্নিশিখা
শ্রেষ্ঠত্ব্যের তুমুল করতালে আমাকে লুটাবে সালাম।

মহিমান্বিত গৌরবে চাঁদের থালায়
নেমে এসে স্বর্গীয় প্রেম;
জ্যোৎস্নার রুপালী আলিঙ্গনে মিশে
মায়াবী রাতের বিলাসী কাব্যে হবে একাকার।

দুরন্ত আমি,
ক্ষিপ্রতার প্যারাডাইম রক্তন চূড়ায় দাদোন রেখে
তারপর; সমুদ্র ভরের মতো স্থির; শান্ত হবো।

নিষিদ্ধ রোদ্দুর

রাতজাগা সকালে রোদ্দুর ঢুকে পড়েছিল
জ্বলতে থাকা ডালিমের খোসার মতো
রক্তিম চোখ দু’টোতে। ঘুমছিল
অনিবার্য প্রার্থনা। অথচ; নিষিদ্ধ রোদ্দুর
শঠতার সমীকরণ এঁকে
সদর দরজার চিকন চোরা পথ বেয়ে
এগিয়ে গেল, আরো খানিকটা দুর
চোখের মতো দূরবর্তী নৌকার গলুই-এ!
প্রার্থনার আর প্রয়োজন ছিল না; কেননা
ঘামের কপালে স্থির বিন্দুর মতো শিশির
ধরে রাখতে পারেনি বাঁশপাতা।

০২.
তখনো গোধূলী রঙ ছড়ায়নি চারিদিকে…
ফ্যাকাশে-লালচে মেঘেরা ক্রমশঃ
ভিড়ে গেল পশ্চিমের সম্মেলনে।
ধুলি রাস্তার পাড় ধরে ঝিঁঝিঁ আর
গোবরে বাদকেরা সুর টেনে একাট্টা!
একপশলা বৃষ্টির ছায়ায় খেলে যাওয়া
এঁলেবেঁলে এক মাতাল গন্ধ হঠাৎই
স্নায়ু বারান্দায় তুলে দিল তোলপাড়।

৩.
এখন চিকন চোরা পথগুলো স’ব নিষ্ক্রিয়…
জ্যোস্না সাগরে লণ্ঠন জ্বেলে ভেসে যাচ্ছে
জোনাক মেয়ে। পাতা আর ছায়া
সুনসান তরঙ্গে সহজ-সরল-নির্মল।
নিষিদ্ধ রোদ্দুর জেনে যায়; যা ছিল অনিবার্য
বাঁশপাতা-পাতার গন্ধ, স্নায়ু বারান্দায়।

নীল প্রত্যাবর্তন

আমি কি রকম ভাবে ভাতের নালায় রাখি
রসালো জিভ?
আমি কি রকম ভাবে উৎসবে আমেজে করি হৈ-চৈ, হুল্লোড়?

যখন; কাঁটাতারে ঝুলে আছে আমার
অগণন সম্ভাবনা মুখ!
যখন; স্বদেশী হাত কৃষক জমিন
করেছে রক্তাক্ত-লাল!

আরদিকে, ছাত্র-শ্রমিক বেশ্যার টাকায়
নেতা-পুলিশে ভাগাভাগি;
বোনসম্ভ্রম লুটে বেপরোয়া কুকুর…

তখন; তুমি কোন সে কু-কুকুর?
সভ্যতার শ্লোগান হেঁকে
বিবেক করে তুলেছো শয্যায় বণিতা বার!

ভাগাড়ে মাছির মতো ভনভন করছে প্রগতি!
প্রণয়ের ডামাডোলে বিচ্যুত ভালোবাসা!

মানবতা পোস্টার ব্যানার বক্তৃতা খাবি খায় ঐ
গ্রীষ্মবাষ্পে কেঁপে ওঠা কাককণ্ঠ যেন এক!

বিষয়সমূহঃTags:

পূর্বের সংবাদ

«

পরের সংবাদ

»