মাহমুদ বিন হাফিজ
৩১ আগস্ট, ২০১৯ | ২১:১২

দুটি শব্দের ব্যাসার্ধ এবং আবর্তন

tesst

উপমার মুখের দিকে তাকাতেই দেখি আমার বুকে বিশাল গর্ত। বিশুষ্ক সেই গর্তটা গভীর হচ্ছিল আর পরিপার্শ্বকে সাপেক্ষ করে বিশাল থেকে বিশালতর হচ্ছিল যেন খোদ আটলান্টিক পানিশূন্য কিংবা শূন্যতা আটলান্টিকের মতো। শৈশবের তিরতিরে ধারা আর বর্তমানের সমস্ত নির্ঝরণী বাহিত বস্তুপুঞ্জ একিভূত হয়ে বিশালাকৃতি তলদেশে সুউচ্চ ভিসুভিয়াসের জন্ম দিলো। সরলরৈখিক সময়ের এক নির্ধারিত ব্যবধানের পরÑ না, আমার সময় ছিল বক্ররেখা, সমতলের মধ্যে, কখনো কখনো গভীর জলাভূমির তলদেশে নেমেছিল, তারই এক তাৎক্ষণিক মুহূর্তে যখন আজ উপমার সামনে বসেছিলাম, সুপ্ত ভিসুভিয়াসে এক নিরব অগ্নুৎপাত ঘটে গেল। শীতল, গরল আর তরল লাভায় গর্তটা ভরে গেল নিমিষে, আমার গন্ডদেশ উপচে আমারই সামনে ঢেকে গেল উপমার জলজ্যান্ত যৌবন, শীতল জোসনায়িত চোখ, কারুকার্র্যময় মানচিত্র আর দোলায়িত কেশ।
অসহ্যের সীমারেখা আমার কণ্ঠনালীকে ফাটিয়ে দিতে যাচ্ছিল যখন, দেখি আমার সামনে উপমার ছায়াশরীর কিংবা উপমা স্বয়ং। আমি ছুঁয়ে দেখলাম! উহ! কি ভয়ংকর বাস্ততায় গড়া উপমার শরীর! এ বাস্ততার এমনি আবেশ যা সমস্ত বাস্তবতাকে অবাস্তব করে দেয়।
তখন হ্যাঁ, তখন হঠাৎ প্রশ্ন জাগে, উপমা কে? আমার কাছে তার পরিচয় কি? আত্মার সাথে তার কোন শ্রেণীর সম্পর্ক? জবাবগুলি মিলাতে গিয়ে দেখি উত্তর বিভিন্ন রকম! মাল্টিফিল চয়েজ কোয়েশ্চেন! জবাব খুঁজতে গিয়ে আমি ক্লান্ত হয়ে পড়লেও আমার সামনে উপমা নির্বাক। উহ! কি অসহ্যের ছিল সে মুহূর্তগুলি!
কিন্তু কোথায় আমার ব্যর্থতা? আমার সফলতাইবা ছিল কোনকালে? যখন আমি তরতর করে উপরে উঠতে থাকি, দেখি সামনের সিঁড়িগুলি উধাও। তখন শূন্যতার জিগরে পড়ে যাই। কোন এক অদৃশ্য অস্তিত্ব এভাবেই খেলে যায় প্রতিনিয়ত। বেঁধে রাখে আমাকে নির্দিষ্ট গন্ডির ভিতরে। আমি কি স্পর্শ করতে পেরেছি সে গন্ডির সীমানাকে?
উপমা ‘আউ’ করে উঠলে আমি তাকিয়ে দেখি তার গোলাপী শরীরে হেঁটে বেড়াচ্ছে একটা পতঙ্গ। কোন এক অচেনা পতঙ্গ। অথচ তার সৌন্দর্য উপমার শরীরের মতোই কারুকার্যময়। আর গায়ের রঙ বৃষ্টি-কণায় বিচ্ছুরিত অর্ধবৃত্ত বর্ণালীর মতো। আমার হিংসা হয়। আলতো হাতে বন্দী করে ফেলি তাকে সদ্য খালি হওয়া পানির গ্লাসে। বিশাল পৃথিবী তার সংকীর্ণ হয়ে গেল। সে কি ভাবছে আমার মতো, কেন তার সীমাহীন চারণক্ষেত্র হঠাৎ এত সংকীর্ণ? কেমন অদৃশ্য দেয়াল তার চতুর্দিকে? কে তাকে বন্দী করে রেখেছে এ গোলাকার বন্দীখানায়? কিইবা তার উদ্দেশ্য? পতঙ্গটা উড়াল দেয় কিন্তু হুমড়ি খেয়ে পড়ে কাঁচের দেয়ালে। সে হেঁটে হেঁটে বেরুতে চায় কিন্তু তার পথ অবরুদ্ধতায় সীমাবদ্ধ। ডানা ঝাপটায় সে। একসময় ক্লান্ত শরীর এলিয়ে পড়ে। আবার শুরু হয় তার মুক্তির প্রচেষ্টা। আমি নির্বিকার থাকি যেন আমিও আজ বড় ক্লান্ত। আমাকেও খানিকটা জিরিয়ে নিতে হবে।
উপমার দয়ার শরীর। নারীদের শরীরে আশিভাগ দয়ামায়া দ্রবীভূত থাকে। পতঙ্গটার শব্দোত্তর তরঙ্গ উপমার কান উপচে মায়াময় নার্ভটাকে নাড়া দিতেই সে গ্লাসটাকে উল্টে দিলো। আর পতঙ্গটা উড়ে গেলো তার একান্ত জগতে।
পতঙ্গটা তো মুক্ত হল, আমাকে মুক্ত করবে কে? নির্দিষ্ট এ গন্ডির আবদ্ধতা থেকে বের হওয়ার জন্য কতবার আমি অদৃশ্য সীমারেখায় মাথা কুটেছি তার কোন হিসাব নেই। কেউ কদাচিৎ পারে কোন কঠিন সীমাবদ্ধতা পার হতে। আমি ক্লান্ত হয়ে পড়েছি প্রতিনিয়ত একই পথ মাড়াতে মাড়াতে এবং আমি ভ্যাকুয়ামে সমপথে পর্যাবৃত্ত গতির মতো গতিশীল। কারণ ভুল হলেই আমি কেঁচোগন্ডুস করতে ভালবাসি। ভুল হলে প্রথম থেকে পুনরাবৃত্তি করা আমার একটি বাতিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিংবা কেউ বলে দেয়নি এরপর আমি কি করব অথবা আমার কি করা উচিৎ।
মনে আছে, যে বছর আমি শিক্ষালয়ের চতুর্থ সিঁড়ি মাড়াতে যাই, তখন আব্বা আমাকে বলেছিলেন আমাকে এরপর কি করতে হবে। তাঁর নির্দেশনার সারাংশ ছিল এরকম: এইযে তোমার সামনে নদীটা দেখছো কখনো উত্তাল কখনো শান্ত আর নদীটার প্রধান বৈশিষ্ট হলো, এর শুধু জোয়ার আছে, ভাটা নেই। এরকম চারটা নদী তুমি পাড়ি দিবে ঠিক এপথ দিয়ে একটা নির্দিষ্ট নিয়মে, তারপর যে মহাসাগরের তুমি নাবিক হবে, ঐশী বাক্যের এক সীমাহীন নির্যাস, তাতে প্রতিদিন যে সূর্যগুলি উদিত হয় তারা অনন্তকালের জন্য স্থান পায় আকাশের সীমানায়। তারা কখনো অস্তগামী হয় না, তুমি তাতে গোসল করবে এবং তোমার চোখ থেকে বিচ্ছুরিত হবে নূর আর কণ্ঠে প্রবাহিত হবে শীতল প্রস্রবণ। সেদিন হতে আমি এক প্রশান্ত নদীর পিঠ দিয়ে সাঁতরাতে থাকলাম সুনির্দিষ্ট নিয়মে, সুনির্ধারিত গতিপথ দিয়ে এবং একসময় আমি প্রথম নদীর অপর তীরে পৌঁছলাম অথচ তীর ছিল কত উঁচু ও খাড়া খাড়া যা আমার আরোহনাতীত ছিল এবং যখন আমি ব্যর্থ কসরতে ক্লান্তপ্রায় তখন নদীর বাসিন্দারা সমস্বরে বলে উঠল, ভুল! ভুল!! মিথ্যা এ প্রচেষ্টা!!! এটাই শুধু তোমার গতিপথ নয়, সহস্র তোমার পথ। “হে আমার মালিক এদিনে এবং সেদিনে আমাকে পর্যাপ্ত কল্যাণ দান করো।” সুতরাং আবার ফিরে এলাম। তখন থেকেই আমার পুনরাবৃত্তি শুরু।
এমনি আবর্তনের এক বাঁকে একদিন পরিচয় উপমার সাথে। সে দিনের বিকালের সূর্য তার চারদিকে বিছিয়ে দিয়েছিল বৃত্তাকার এক গোলাপী লাল কালার। তারই একটা খন্ড দিয়ে নব উথ্থানে বাঁধ-ভাঙ্গা যৌবনকে বেঁধে রেখেছিল উপমা, যার আভা তার পোশাককে ছাপিয়ে ম্লান করে দিচ্ছিল সে দিনের সূর্যকে। আমাকে দেখামাত্র সে সালাম দিয়েছিল। আমরা এর পূর্ব পর্যন্ত অপরিচিত ছিলাম কিন্তু একে অপরকে জানতাম। কারণ আমরা তখন একই নদীতে একই গতি পথের পথিক ছিলাম। হয়তো আরো কিছুদিন থাকবো। তাৎক্ষণিকভাবে অস্ফুটে সালামের জবাবটা দিয়ে দিলেও সেটা আমাকে ধাওয়া করলো রাত্রি পর্যন্ত, যতক্ষণ পর্যন্ত না আমার কলম দিয়ে কবিতা বেরিয়ে এলো:
হঠাৎ মনে হলো তোমাকে একটা কবিতা বলি
কাব্য নিস্বর্গে হারিয়ে যেতেই দেখি
মধ্যদুপুরের জোড়া কবুতরের মতো রূপ-চিত্র-কল্প
মৌচাকের বর্ণালী মৌমাছি যেন
স্বপ্নেরা সেখানে সঙ্গীতের কোরাস তোলে
অথচ কবিতা বলা হলো না
অবলা জিরাপ আমি খুঁজে ফিরছি
শরতের মেঘ-ডানা পরীর মতো শুভ্র
শতাব্দির শেষ পূর্ণিমার মতো প্রজ্জ্বল
চাঁদ জোসনায় নিশি দোয়েলের গানের মতো
যুৎসই শব্দ
অথচ শব্দেরা কানামাছি খেলে আমার চারদিকে
টাকিমাছের পোনা ছেঁড়া জালের ফাঁক দিয়ে
বেরিয়ে যায় সবাই
ক্লান্ত দুপুরে গলদ-ঘর্ম হয়ে শুধু দু’টি শব্দকেই হাতড়ে পেয়েছি

অথচ আজ পর্যন্ত আমি দু’টি শব্দকে এ কবিতার শেষ লাইনে বসাতে পারিনি কেননা তাদের নিয়ে আমি সয়ং সন্দিহান। তাছাড়া আমি কোনো কবি নই যে কোনো যুৎসই শব্দকে অনায়াসে সেট করতে পারি, কবিরাই যেখানে হিমশিম খেয়ে বসেন। আমি তিন তিন বার কসম খেয়ে বলতে পারি ঐ শব্দ দু’টিই উপমা কেন্দ্রিক বৃত্তের রহস্যময় পরিধি বরাবর আমাকে সঞ্চারমান রেখেছে। অথচ সুনির্দিষ্ট ব্যাসার্ধ পেলে আমি কোন এক নির্দিষ্ট আবর্তে সুস্থিত হতে পারতাম। ভেবেছিলাম উপমাই দিকনা জুড়ে পছন্দমতো দু’টো শব্দ। তখনই আমার কোনো এক বন্ধু যে আমার একমাত্র প্রমাণ শুভাকাঙ্খী, আমাকে উপদেশ দিয়েছিল, “সংযত হও এবং আবেগকে নিয়ন্ত্রণে রাখো”।
আমি তো বরাবরই সংযত ছিলাম। সংযত ছিলাম তখন থেকে যখন আমি বারোর ঘরে পা রেখেছিলাম এবং আট বছরের শিশু নূপুরের কোমল মুঠিতে আমার কনিষ্ঠ আঙ্গুল ধরিয়ে দিয়ে শীর্ণকায় ডাকাতিয়া নদীর তীরে বেড়াতে যেতাম। পড়ন্ত বিকালে হালকা শিশির ভেজা ঘাসের ভিতর পা ডুবিয়ে নূপুর হাঁটতো যখন, তখন কোন এক গভীর আবেগে তার কপালে ও কপোলে চুমু খেতাম। কেউ কি কল্পনা করতে পারে, সে দিনের সে-প্রেম কতটা গভীর ছিল? শরতের শাদা চাদর জড়ানো রাতে যখন গলায় ঝুলে পড়ে বলত “ভাইয়া, একটা গল্প,” তখন কি একাগ্রতায়ই না আলিফ লায়লার গুটিকয় রাতকে ভোর করে দিতাম!
হিমায়িত পৌষের সকালে এক নালা কাদায় রুকু দিয়ে কচি ধানের চারা রোপণ করতে করতে ধনুকের মতো বাঁকা কোমরটাকে একটু সোজা করতে গেলে মনে মনে সংযত হয়ে পড়তাম: আমি তো কাঙ্খিত বৃত্তের পরিধির বাইরে ছিটকে যাচ্ছি। সুতরাং পূর্ণোদ্দমে শিক্ষালয়ের সিঁড়ি ভাংতে থাকলাম আশাতীত সফলতার সাথে। কোনো এক ধাপে কোনো সহপাঠিনীর আঁখির পাতা আমার উদ্দেশ্যে এক হলে ভাবতাম এ ইশারার জবাব শুধু নূপুরেরই পাওনা। পারতপক্ষে আমি কারো চোখের দিকে তাকাতাম না। তবুও কখনো কখনো আবর্তমান দৃষ্টি মিলে যেত কোনো কোনো দৃষ্টির সাথে, তখন অপাঙতেয় প্রেমিকারা আমাকে কনজার্ভেটিভ বলে গাল দিতো।
একদিন অন্য একজন এসে সপ্তদর্শী নূপুরের পায়ে পায়েল বেঁধে নিয়ে গেলেও তখন পর্যন্ত কোনো কাক-পক্ষিও টের পেল না যে আমার ধমনীতে নজরুল সঙ্গীতের তালে শুকনো পাতার নূপুর বেজেই চলছে। কারণ তখন পর্যন্ত আমি নিজেকে সংযত রেখেছি। এমনকি নূপুরও জানতে পারল না। আসলে আমার তখন কীইবা করার ছিল, যেখানে সময় দুজনকে একসাথে ফাগুন দিলেও নূপুরেরটা বড়ই অরক্ষিত রয়ে গিয়েছিল। আর কোনো জন্মদাতাই কন্যার ফাগুনকে অরক্ষিত রাখতে চান না।
আজও আমি সংযত। তাইতো উপমার সামনে আমাকে সুচারুরূপে মেলে ধরতে পেরেছি যার ভিতরে আশৈশবের সমস্ত তথ্য গুপ্ত ছিল। আমার বিশ্বাস, উপমা এর সমস্ত বাঁক ও প্যাঁচগুলিকে তার ডান হাতের পাঁচটা আঙ্গুলের মতো করে চিনতে পেরেছে। কিন্তু তার পরেও উপমা নির্বাক। আর সে নির্বাক হলেই আমার মনে প্রশ্ন জাগে, উপমা কে, আত্মার সাথে তার কোন শ্রেণীর সম্পর্ক?
আমি যখন একাকীত্বের কাছে জিম্মি থাকি তখন উপমার কাছে ফিরে যাই অথচ তাকে দেখলে আমার একাকীত্ব গোছে না বরং একশভাগ নিঃসঙ্গ হয়ে যাই। তখন আমি বলি, প্রত্যেক মানুষেরই তার আত্মা ছাড়া আপন কেউ নেই। তবুও উপমা নির্বাক। হয়তোবা ছায়াশরীরীরা এভাবেই নির্বাক থাকে।
আমি ক্রমবর্ধমান লাভার ভিতর ডুবে যেতে থাকি। ডুবে যেতে থাকি আমার সমস্ত পরিপার্শ্বকে নিয়ে। আমি ভেসে ওঠার জন্য হাতড়াতে থাকি। হয়তোবা কবিতার শেষ লাইনে দু’টি শব্দ বসিয়ে দিলেই আমি ভেসে উঠতে পারবো। আর তখন আমি জেনে যাবো; উপমা কে, কী তার অর্থ।
অথচ লাভার উপর এক ত্রিমাত্রিক স্থানাংকে উপমার ছায়াশরীর নির্বাক দন্ডায়মান।

বিষয়সমূহঃTags:

পূর্বের সংবাদ

«