মাতিউর রাহমান
২৩ জুন, ২০১৯ | ০১:২৭

পদ্মাপাড়ের নূরবানু

tesst

বিনোদপুর বাজার থেকে সোজা পৌনে দু’কিলো পথ পেরিয়ে জাহাজঘাট। পাকিস্তান আমল থেকে, মুরুব্বীরা বলে, তারও আগে থেকে এ জায়গার নাম জাহাজঘাট। পাশ দিয়ে ক্ষীণকায় বয়ে যাওয়া পদ্মানদী। নদীর ওপারে বিস্তীর্ণ চর। সেই চরের ওপারে আরেক চর। যার নাম চরক্ষিদিরপুর। এখানেই বসবাস করে সাবের-এর মতো কিছু ভূমিহীন মানুষ। সাবের আলী যে জমিগুলো চাষ করে নিজের নয়, আবার বর্গাও নয়। তাহলে কী?
প্রতি বছর প্রকৃতির নিয়মে পদ্মার ভরা যৌবন ফুলে ফেঁপে উঠে। কয়েকমাস পর অপুষ্টিতে ভোগা নারীর মত শুকিয়ে কাঁকিলা মাছের ঠোঁট স্বদৃশ্য আকার ধারণ করে। জেগে উঠে সাদার উপরে কাদা পলির চর। শুরু হয় চরদখলের পালা। আর পাঁচ জনের মতো এভাবেই কিছু জমি সাবের আলীর দখলে আসে। সাবের আলীর তিন ছেলে যখন একত্রে ছিল, তখন এই দখলি জমির পরিমানও বেশি ছিল। বড় দুই ছেলে যুদা হবার কারণে এখন শক্তিও কম, দখলি জমির পরিমানও যৎ সামান্য। ছোট ছেলে লালচাঁদ আর মেয়ে রাহেলাকে নিয়ে এরই উপর নির্ভর করে তাকে চলতে হয়।
ছোট ছোট চারা আউস ধানের ক্ষেত। সাবের আলী ছেলে লালচাঁদকে নিয়ে বেশ মনোযোগে ধানক্ষেত নিড়াচ্ছে। সহসা আর্তনাদের মতো একটা শব্দ হওয়ায় পেছনে তাকায় লালচাঁদ। কিন্তু একি! নূরবানু স্থির পায়ে দাঁড়িয়ে। খুব রাগ হলো ওর নূর বানুর ওপর। মনে মনে বলে, এইরে, আসার আর সুময় পেলো না। মেয়েটা ভীষণ পাঁজি, ময়-মুরুব্বী কিচ্ছু মানে না। বাবা পাশে। এখন ও কিভাবে ওর সঙ্গে দেখা করবে? আবার না গেলেও নয়, বাবার সামনে একটা কিছু ঘটিয়েই ছাড়বে। এমন দস্যিমেয়ে ও দ্বিতীয়টি দেখেনি। সাবের আলী কিন্তু ওদের চোখাচোখি বিষয়টি খেয়াল-ই করেনি। ধান গাছের গোড়ায় আপন মনে দাউলি চালাচ্ছে। লালচাঁদ পেছন ফিরে বাবার দিকে তাকিয়ে পা টিপেটিপে নূরবানু’র দিকে এগোতে থাকে। একেবারে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বলে, তোমার কি সুময়-অসুময় নাই। যখন তখন আসতে হয়? দেখছো না বাবার সঙ্গে ধান নিড়াচ্ছি।
আমি কি ঘড়ি যে সুময়ের হিসেব রাখপো, বলে হো হো করে হাসতে থাকে নূরবানু। লালচাঁদ আবার রেগে যায়, তাই বলে তুই যখুন তখুন বাবার সামনে এসে আমাক ডাকবি?
নূরবানু এবার মুখ কেলিয়ে বলে, আমি কি তোকে বুল্যেছি, লালচান সোনা, কাছে আসো, আমার হাত ধরো, সোহাগ করো…..
লালচাঁদ হাতের দাউলিটা আলতো করে বসিয়ে দেয় নূরবানুর গায়ে। নূরবানু সামান্য ব্যথা পায় হাতে। রাগে ‘পদ্মগোখরা’ রূপ ধারণ করে উল্টো পথে এগোয়। লালচাঁদ নূরবানু নূরবানু বলে পেছন পেছন দৌঁড়াচ্ছে। নূরবানু’র কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। আরও দ্রুত পায়ে পথ চলে। এক পর্যায়ে কাছাকাছি এসে চাঁদ খপ করে নূরবানুর হাত চেপে ধরে। নূরবানুরও কৌশলী হাত ছাড়িয়ে নেয়ার চেষ্টা করে। কিছু পরে লালচাঁদের শক্তির কাছে থিতু হয় নূরবানুর রাগ। দু’জনে হাঁটতে হাঁটতে গিয়ে বসে, সামনের ছাতিম গাছটার নিচে। এবার লালচাঁদের কাছ থেকে হাত ছাড়িয়ে নিয়ে নূরবানু গাছের গুঁড়ির পেছন থেকে বার করলো গামছা ঢাকা কিছু একটা। নূরবানু গামছা সরালে বেরিয়ে এলো হলুদ রঙের একটা লোভনীয় ফল-বাঙ্গী।। এমন সরেস ফল দেখে লালচাঁদ-এর চোখ দুটো চকচক করে উঠে। নূরবানু বলে, এ জাতের বাঙ্গীগুল্যা খুব সুয়াদের হয়, তাই তুমার লাইগ্যা লিয়্যা আনু।
লালচাঁদ বলে, তুমি আমাকে এতো ভালবাস বানু।
বানু বলে, এ্যাতো ভালোবাসার কি দেখল্যা? কিছু দিলেই কি শুধু ভালবাসা হয়? ভাল কিছু দেখলেই তুমার কথা মুনে পড়ে। নদীতে মাছরাঙা ঝাঁপ দিয়্যা মাছ ধরল্যেই তুমার কথা মনে পড়ে। জুসনা রাত্যে চাঁদ দেখলে, আমার চাঁন্দকে মুনে পড়ে। তুমার কাছে তো ইসবের ক্যুনু দাম-ই নাইখো।
লালচাঁদ বলে, কে বুইল্যাছে দাম নাই, সগ আছে, শুদু পুরুষ মানুষ তোহরে মুতন সুন্দুর কোর‌্যা বুলার সুমাই পায় ন্যা, বুঝলি? ছুটু কালে লেখাপড়হা শিকতে পাননু না, সারাদিন শুদু প্যাটের জ্বালায় দড়িয়্যা ব্যাড়াই। ভালবাসার কথা কখন বুলবো বুল?
এরপর বাঙ্গীটা গামছায় পেঁচাতে পেঁচাতে লালচাঁদ বলে, এখন থাক বানু, আমি যাচ্ছি। বাপু এতোক্ষণ হামাকে খুঁজছে।
চরখিদিরপুর থেকে সোজা দক্ষিণে চাঁইপাড়া। পাশাপাশি এলাকা। তবে মাঝখানে আছে একটা সীমানা পিলার। যা দেখলে মানুষ বুঝতে পারে ওটা বাংলাদেশ আর এখানটা ভারত। চাঁইপাড়া ভারতের মধ্যে। এখানেই নানান পদের শাক-শব্জী আবাদ করে জাবের চাঁই। আর নূরবানু হচ্ছে, জাবের চাঁই- এর একমাত্র মেয়ে। শৈশব থেকেই ভীষণ দূরন্ত। বাবার লাগানো বাঙ্গী-পটলের জমিতে চষে বেড়ানো তার নিত্য দিনের কাজ। এখানকার সাধারণ লোকেরা সীমানা বলতে কিছু বোঝে না। অবাধে ভারত-বাংলাদেশ চলাফেরা করে। আর চিনবেই বা কি করে? সামান্য একটা পিলার ছাড়া তো আর তেমন কোনো প্রমাণ নেই। মাঝে মাঝে কালোবাজারী ধরা ছাড়া সীমান্তরক্ষীরাও তেমন কিছু বলে না।
চাঁইপাড়ার সামনাসামনি বাংলাদেশী গ্রাম হচ্ছে চরক্ষিদিরপুর। পদ্মার জেগে উঠা চরে এখানকার মানুষের বসবাস। লালচাঁদ ছোট বেলা থেকেই বাহিরঘোরা। মা মারা গেছে সেই আট বছর বয়েসে। একবার কালোবাজারীদের সঙ্গে বেড়াতে গিয়ে ছিলো ভারত। সেবার ওরা ওকে দিয়েছিল দু’শ টাকা। তাও নতুন বলে। নিয়মিত যারা, তাদের পাইঠের দাম এক টিপ তিন’শ টাকা। নিয়ে গিয়েছিল ৩৫ কেজি সুতোর বান্ডিল। এই সুতো থেকে ভারতে তৈরী হবে বেনারসি শাড়ি। সেই শাড়ি আবার হাত বদল হয়ে, মুঠ বদল হয়ে আসবে বাংলাদেশে। শোভা পাবে বাংলাদেশী মেয়েদের অঙ্গে রূপের ঝলকানি!
এভাবেই একদিন দু’দিন করে অভাবের তাড়নায় স্মাগলীং-এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে লালচাঁদ। একবার ভারত থেকে চিনি নিয়ে আসছিল রাতের বেলা। পেছন থেকে হঠাৎ তাড়া করে বিএসএফ। কি করবে লালচাঁদ? কোনো উপায় না দেখে কয়েকটা পেঁচি কেটে গমের ক্ষেতে মালের বস্তা ফেলে দিয়ে চাঁইপাড়া’র মধ্যে ঢুকে পড়ে। সামনের বাড়িটার গোয়াল ঘরে আশ্রয় নেয়।
ভোরবেলা ঝুজকি থাকতে নূরবানু গরু বার করার জন্যে ঘরে ঢোকে। দেখে গরুর সঙ্গে মানুষও চটমোড়া দিয়ে এক-ই গোয়ালে ঘুমোচ্ছে। সেই থেকে নূরবানু আর লালচাঁদের সম্পর্ক। দুটো ভিন্ন দেশ কিন্তু পাশাপাশি গ্রাম। এই সুবাদে সম্পর্কটা অনবদ্য এবং বিদ্যমান।
একবার বেনারসি শাড়ির সুঁতো নিয়ে রওনা দিল ওরা ১৩ জন। সামনে লাইনম্যান। এক হাতে বড় হাসুয়া অন্য হাতে দিঘল টর্চলাইট। লাইনম্যান-এর কাজ সামনের যত বাধা বিপত্তি আসে তা খেয়াল করা এবং সামলানো। পাশাপাশি পেছনে যাদের কাঁধে মাল আছে, তাদের অবস্থা বুঝে সংকেত প্রদান করা। সেই সময়টা সীমান্ত, যে কোনো সময়ের চেয়ে অনেকটা উত্তপ্ত। চোরাচালানীরা একজন বিএসএফকে একা পেয়ে বেশ ক’য়েকজন মিলে আধমরা করে মেরে, রেখে গিয়েছিল বাবলা গাছের নিচে। কিন্তু তারপরও থেমে থাকেনি কালোবাজারী। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলছে জীবনের চাকা। আর তাই তো লাইনম্যানকে আরও সর্তক হতে হয় বেশি। আগে লাইনম্যান ছিলো একজন, এখন মহাজন সংখ্যা বাড়িয়ে করেছে দু’জন। কারণ, মহাজনরা কখন-ই মাঠে ময়দানে থাকে না, কিন্তু মালের দিকে নজর সদা শকুনের দৃষ্টি। তাদের মানসিকতা, পাইঠদের যা-ই হোক না কেন মালের যেন কিছু না হয়। এমনিভাবে বালুচর-নদী-গমক্ষেত- ফাঁকা মাঠ পেরিয়ে রাত ১১ টার সময় পৌঁছে নবীপুর বাজার। মহাজনের গদিতে মাল রাতারাতিই বুঝিয়ে দেয়। হোটেলে খাওয়া-দাওয়া সেরে বিশ্রাম নিচ্ছে লালচাঁদ। হাতে জ্বলছে পাতার বিড়ি। হঠাৎ কোথা থেকে এক মক্ষিরানী এসে হাজির। লালচাঁদের গা’য়ে হাত দিয়ে কথা বলে, কাতুকুতু দেয়, ইয়ারকী মশকরা মারে। লালচাঁদ অসহ্য হয়ে বলে, এই ছুঁড়ি খবরদার আমার গায়ে হাত দিবিন্যা। তোর যত লাঙ আছে অহর কাছে যা।
এবার মেয়েটি বলে, এই শালা, তুই কি লিমর্দা। যদি বিহ্যা কত্ত্বিক তাও মাইন্যা লিতুক, তাওতো করিস নি।
এবার লালচাঁদের পা’য়ের স্যান্ডেল হাতে উঠে আসে। মেয়েটি সঙ্গে সঙ্গে দৌড়ে পালিয়ে যায়। লালচাঁদ মনে মনে বলে, শালা যেমন কুকুর তেমন মুগুর!
নবীপুর থেকে ফিরে এসে লালচাঁদ পুরো দুটো দিন বিশ্রাম নেয়। এবার ভারত থেকে যে চিনির বস্তাটা নিয়ে আসে এক কেজিও খালি ছিল না। পুরাবস্তা আনাও কঠিন। তারপরও নিয়ে আসতে বাধ্য হয়। নূরবানু’র মুখখান যখন ওর চোখের পর্দায় ভেসে উঠে, বস্তার ওজন কম-বেশি তখন আর মনে থাকে না। শুধু একটায় স্বপ্ন সামনে মাসে ওর ঘরে আসছে নূরবানু। অনেক কাঠ-খড় পুড়িয়ে, অনেক বলে কয়ে দুই পারের দুই বাপকে রাজি করিয়েছে।
দেখতে দেখতে গ্রীষ্ম থেকে বসন্ত কেটে গেল মনে হয় লালচাঁদ টের-ই পেলো না। শীতের সকাল। টাটকা রোদে নূরবানু পা ছড়িয়ে বসে আছে দাওয়ায়। এখন সে এক সন্তানের মা। পাশে বসে আদর করছে লালচাঁদ। সেই সঙ্গে দায়িত্বও বেড়ে গেছে ওর অনেক। আগে সপ্তাহে দু’তিন ক্ষ্যাপ মারতো। এখন কমের পক্ষে পাঁচ ক্ষ্যাপ। বিয়ের পর সংসারের সুখটায় যেন ওর কাছে বিবেচ্য-বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সুখের দিনগুলো লালচাঁদের খুব বেশিদিন স্থির থাকে না। এই চরখিদিরপুর এলাকার মানুষের ভাগ্য জড়িয়ে আছে পদ্মার সাথে। ক’দিন আগেই ছিলো ধু-ধু বালুচর। খালিপেটের কুমিরের মত ঢোল হয়ে পড়ে থাকে বিশাল পদ্মা। সাপের খোলস যেমন সাপ নয়, পেটে পানি না থাকায় এ নদীটাকেও মনে হতো পদ্মা নয়। সেই নদী অল্প দিনের ব্যবধানে ফুলে ফেঁপে একাকার।
ভোরবেলা বাবা সাবের আলীর হাঁকডাকে ঘুম থেকে লাফ দিয়ে উঠে লালচাঁদ। গোয়ালঘর, রান্নাঘর, উঠোন সবখানেই পানি। দুপুর হতে হতে শোবার ঘরেও সম্ভবত ঢুকে পড়বে। ভারতের ফারাক্কা। সবকটি গেট নাকি সম্প্রতি একসঙ্গে খুলে দিয়েছে। টিভিতে কারণ বলেছে, ওদেরকেও তো বাঁচতে হবে!
সহসা এমন পরিস্থিতি, ভাববারও সময় নেই। কি করবে তারও কুল- কিনারা নেই। শেষে সিদ্ধান্ত নেয়, চরে আর থাকা নয়। পদ্মা পাড়ি দিয়ে ওপারে ঘর বাঁধবে।
সেই থেকে লালচাঁদ-নূরবানুর ঠিকানা ঐ জাহাজঘাট। লালচাঁদের বাবার মামাতো ভাই- এর সহযোগীয় মাথাগোঁজার একটু করে জায়গা ওরা পেয়ে যায়। এখানে এসে নূরবানু’র কোল আলো করে আরও একটি পুত্রসন্তান হয়। লালচাঁদের বুকের ছাতি গর্বে আরও প্রসারিত এই ভেবে, চরের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দরী বউ-এর মালিক ছিলো ও নিজে। আবার ওর মতো একজন কালোবাজারীর ঘরে সৃষ্টিকর্তা দুটো পুত্রসন্তান দিয়েছে একেবারে রাজপুত্রের মতো। স্বপ্ন দেখে পরিণত বয়সে ও শুধু পা’য়ের উপর পা রেখে হুকুম চালাবে। আর সন্তানরা অঢেল সম্পদের মালিক হয়ে শুধু বাবার হুকুম তামিল করবে।
কথায় বলে, বসে খেলে নাকি রাজার ভাঁড়ারেও টান ধরে। চর থেকে আসার পর লালচাঁদের পরিবারে হু হু করে নেমে আসে অভাব অনটন। কোনো কিছু দিয়েই এ ছিদ্র যেন বন্ধ হবার নয়। কালোবাজারী ব্যবসা একেবারেই বন্ধ হয়ে যায়। প্রতি দিন-ই গোলাগুলি হচ্ছে সীমান্তে। দিনকাল আর আগের মত নেই, লঘু পাপে গুরুদন্ড। মানুষ মরছে পাখির মত। সব-ই সম্ভবত, ঐ মংলাকানার জন্যে। মংলাকানা কেবল নামেই, প্রকৃত অর্থে ও সবার থেকে বেশি দেখতে পায়। নইলে ওর মাল কেড়ে নেয়ার জন্যে বিএসএফকে মারলো কিভাবে? সেকি যা-তা মার? একেবারে বাম হাত মুচড়ে ভেঙে দেয়। চোখেও মারাত্মক জখম দেখা যায়। সেই থেকে বর্ডারে উত্তাল অবস্থা। লালচাঁদ-এর বাবা সাবের আলীরও কপালে চিন্তার ভাঁজ! হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকে জাহাজ ঘাটে। তাছাড়া আর কি করবে? চরের দখলি জমি সব পানির তলে। মানুষের বাড়িতে কাজ করার তাগুতও আর নেই শরীরে।
কাজ-কর্ম না থাকায় অলস সময় পার করে লালচাঁদ। এক সময় জড়িয়ে পড়ে মাদক-এর সঙ্গে। বেড়ে ওঠে সেই সব লোকেদের সঙ্গে মেলামেশা। এখন আর ফুরসত হয় না স্ত্রী-সন্তান পরিবারের দিকে চোখ তুলে তাকাবার। জীবনের একমাত্র অবলম্বন এখন ফেন্সিডিল। নিশ্চয়তার জ্যোতিপথ থেকে জীবনকে নিয়ে মেতে থাকে ক্রমশ অনিশ্চয়তার গহবরে।
নূরবানু কখনও যা ভাবে নি, তার চেয়েও কঠিনতম সময় পার করছে ওর জীবনে। রাতে ঘুমিয়ে থাকে ওর কানের মাকড়ি নেই, নদীর ঘাটে গেলে এসে দেখে ওর গলার মালা নেই। গরীবের গয়না আর ক’খান-ই বা থাকে খুব জোর হাত -কান- গলা? ইদানিং বাড়ি ফাঁকা পেলে সংসারের আসবাবপত্র, এটা সেটাও চুরি করে বিক্রি করছে। নূরবানু কত আর বিচার দেবে শ্বশুরের কাছে? পরিবারের প্রতিটি সদস্য এখন ওর প্রতি আস্থাহীনতায় ভুগছে। অবশেষে নূরবানু শ্বশুরের হাত ধরে বলে, বাবা, আমি আর পাচ্ছি ন্যা। একটা কিছু করেন।
লালচাঁদ এখন জেলখানায়। কি করবে বাবা সাবের আলী? ছেলেকে যখন আর নিয়ন্ত্রণে আনতে পারলো-ই না; বাধ্য হয়ে তুলে দেয় পুলিশের হাতে। কি করবে এখন নূরবানু? নদীর ঘাটে কাপড় ধুতে গেলে থেমে যায় হাত, নিভে যায় স্বপ্ন, বেড়ে যায় ভাবনার উদাসীনতা! কি করবে এখন ও? কে নেভাবে দুটো সন্তানের জঠোরের জ্বালা?
প্রথমে ভারতের চর চাঁইপাড়া থেকে এসেছিল চরখিদিরপুর। চরখিদিরপুর থেকে জাহাজঘাট। এখন নূরবানু আর একধাপ এগিয়ে কাজের সন্ধানে যায় বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা। বিনোদপুরে কাজ নেয় সাজ্জাদ হাজীর বাড়িতে। সাজ্জাদ হাজী লোক ভালো। মাস গেলে দুই হাজার টাকা বেতন আবার আসার সময় দেয় গামলা বোঝাই খাবার। নূরবানু সেই খাবার বাড়িতে এনে ছেলে দুটোকে নিয়ে তৃপ্তির ঢেকুর তোলে।
নূরবানু এখন ছেলে দুটো নিয়ে থাকে বিনোদপুরে। জাহাজঘাট থেকে এসে আলাদা একখান ঘর নিয়ে থাকে। ছেলে দু’টো অবশ্য বেশির ভাগ সময় চলে যায় দাদা-দাদীর কাছে। নূরবানু তখন স্বামী ছাড়া একাই থাকে ভাড়া ঘরে। এর-ই মধ্যে লালচাঁদ বেশ ক’বার রাজশাহী জেলে যায় আর আসে, কিন্তু ফলাফল শূন্য। মাদকাসক্তি বাড়ে বই কমে না।
একটা কথা হঠাৎ পাড়ার মেয়েদের মুখরোচক খোরাকে পরিণত হয়। এককান-দুকান হয়ে চলে আসে লালচাঁদের কানে। নূরবানুর ঘরে নাকি রাতের বেলা পরপুরুষ ঢুঁকে। কিন্তু সবাই বলে, আমি দেখিনি, শুনেছি। লালচাঁদ যার কাছে শুনেছে, সে অবশ্য বললো, আমি রিক্সা নিয়ে আসার সময় নিজ- চোখে দেখেছি। আর যাবে নাই বা কেন? যেমন একলা ঘরে একা থাকে, তেমনি তোর বউ- এর চেহারা সুন্দর! জোসনার আলো থুয়ে কি কেউ অমাবশ্যার অন্ধকারে যাবে? আসক্তি কেটে গেলে বউ-এর কথা মনে পড়ে লালচাঁদের। মনে পড়ে যায় ওর, আগেকার দিনের মানুষের প্রবাদ কথা, ‘মেয়েদের স্বামী পুরুষ, আর পুরুষের স্বামী হচ্ছে টাকা।’ এখুন আমার টাকা নাই ম্যা মানুষও নাই।
এর-ই মধ্যে ভারতের সীমান্তবর্তী গ্রাম চাঁইপাড়া থেকে খবর আসে, নূরবানু’র বাবা ভীষণ অসুস্থ! মরা-বাচাঁ অবস্থা। কিন্তু নূরবানু কিভাবে যাবে? আগেকার মত সীমান্ত এলাকা স্বাভাবিক নেই। বিএসএফ-এর কড়া পাহাড়া। এখন আর গুলি করতে কোনো জোয়ান-এর বুক কাঁপে না।
অবশেষে পাসপোর্ট করে ভারতে যায় নূরবানু। ছেলেদের রেখে যায় ওদের দাদা-দাদীর কাছে। চোখের পানি মুছে ছেলেদুটোকে বলে যায়, তোরা কান্দিসন্যা বাপ, তোহরে নানা ছুস্ত হল্যে আমি ফের তোহরে কাছে ফির‌্যা আসপো।
ছেলেদুটো ঘর থেকে রাস্তা অবধি মা’য়ের আঁচল ধরে কান্না করে বলেছিল, মা তুমি যাইয়ো না। বাপ জেলখানায়, তুমি নাই, কে আমাহারকে ভাল বাইসপে?
অনেক কষ্টে কান্না চেপে সেদিন গাড়িতে উঠেছিল নূরবানু। অবশেষে চাঁইপাড়া পৌঁছলো, কিন্তু শেষ রক্ষা আর হলো না। যখন সে বাবার ভিটেয় পা রাখলো, তার আধাঘন্টা পরেই মারা গেল জাবের চাঁই।
দেখতে দেখতে ২০টি দিন কেমন করে পার হলো বুঝতেই পারলো না নূরবানু। এক সময় ফুরিয়ে আসে শোকের মাতম! বাড়ির সবাই ঘিরে ধরে নূরবানুকে। বাবার একমাত্র আদরের মেয়ে সে, সকলেই চিন্তিত ওকে নিয়ে। আত্মীয়-পরিজন সিদ্ধান্ত নেয়, নূরবানু আর বাংলাদেশে যাবে না। নূরবানু এ সিদ্ধান্তের মুখে বাধা দিয়েও পারে না। কি আছে ওর বাংলাদেশে? কিসের জন্যে যাবে, কার জন্যে যাবে? একজন নারীর বেঁচে থাকার যে অবলম্বন সেটাই তো ঠিক নেই, ভঙ্গুর হয়ে পড়ে আছে জেলখানার বদ্ধ ঘরে। শেষমেষ নূরবানু ভাইদের বলেছিল, আমার শ্বশুর-শাশুড়ি তো আছে, অহারকে লিয়্যাই না হয় থাইকপো।
নূরবানু আরও অনেক কথাই বলেছিল। বলেছিল শেষ সম্বল ছেলে দুটোর কথা। কিন্তু ভাইদের সামনে কোনো যুক্তিই টেকেনি। সোজা কথা নেশাখোরের সন্তান কিন্তু তোর না, নেশাখোরের।
এদিকে নূরবানুর ভারত যাওয়া বেশ ক’মাস হয়ে এলো। শ্বশুর-শাশুড়ীরা উদ্বিগ্ন, কিন্তু কোনো খবর নেই। ফোন দিলেও ফোনে কল ঢুকে না। ছেলেদুটো মায়ের জন্যে কেঁদে কেঁদে কঙ্কালসার অবস্থা। ব্র্যাকের স্কুলে পড়ে। স্কুলের আপা চোখের জল মুছিয়ে দিয়ে আদর করে বলে, আহ্-হা-রে, এমন রাজপুত্রের মত ফুটফুটে সন্তান রেখে, কিভাবে আছে ওদের মা? ওকি আসলে মা নাকি ডাইনী?
একসময় ভারত যাওয়াটা সীমান্তবর্তী বাংলাদেশীদের কাছে ছিল মামুলি বিষয়, কিন্তু এখন দিনকাল সব বদলেছে। বিশেষ করে বিএসএফ-এর গুলির ভয়টাই বেশি ভাবিয়ে তুলেছে। তারপরও যে বর্ডার একেবারেই বন্ধ তা কিন্তু নয়। লুকিয়ে-চুরে মানুষ যাতায়াত করছে-ই। তবে সেটা মোটা অংকের টাকায় ম্যানেজ, অথবা রিস্ক নিয়ে। সাবের মিয়া নাতিদের কান্না সহ্য করতে না পেরে কয়েকবার খোঁজ নেয়ার চেষ্টা করেছে বউমা’র, কিন্তু কোনো হদিস মেলেনি।
এক বছর পর নূরবানু’র খবর নিয়ে এলো ঝড়–মাঝি। জাহাজঘাটের সানবাঁধা সিঁড়িতে বসে প্রকাশ্যে সবার মাঝে বলে, সে মেয়্যা তো আর আগের মুতন নাইখো। উ আবার বিহ্যা কর‌্যাছে। রাণীর মুতন চলাফিরা। মুখে আবার খিলিপান মারে। সোনার গহোনা গুলা শরীলে খালি ঝলমল কচ্ছে। আমি লিজ চোখে দেখ্যা আনু। ঘিন্যায় কু’নু কথায় বুলিনি ওর সাথে।
ক’দিন থেকে নূরবানুর ছোট ছেলেটি জ্বরে ভুগছে। মরার মত অবস্থা। মাস তিনেক আগে থেকে কোনো কিছুই খেতে চায় না। নূরবানু ভারত যাওয়ার পর একটি বারও ছেলেদের কাছে ফোন করেনি। ছেলে দুটো বারবার ফোন দেয়, কিন্তু কল ঐ নাম্বারে ঢুকে না। মা’য়ের জন্যে ছেলেটা আজ মরতে বসেছে। তবে বড় ছেলেটা আবার অন্য ধাঁচের। মা’য়ের কথা মুখেই আনে না। মা’য়ের মত মধুর শব্দটি ওর কাছে এখন বিষের মতো শোনায়!
নূরবানু’র নতুন স্বামীও স্মাগলার- এর ব্যবসা করে। লালচাঁদের মতো ভূঁইফোড় পাইঠ না, ছোটখাটো মহাজন-কাম পাইঠ বলা যেতে পারে। তবে ঝাঁনুমাল। জাহাজঘাট ইউসুফপুর এ-লাইনে কড়াকড়ি থাকায় গোদাগাড়ি-সুলতানগঞ্জ লাইন দিয়ে ব্যবসা চালায়। সে এখন দু’দেশের নাগরিক। বাংলাদেশেও জাল করে আত্মীয়দের সহায়তায় ভোটার আইডি কার্ড বানিয়েছে। দু’দেশেই তার সমান বিচরণ। মাঝে মাঝে রিস্ক নিয়ে হিরোইন-এর চালানও নিয়ে আসে।
ভোরের কুয়াশা ভেদ করে লালের বিশালত্ব নিয়ে সূর্যটা কেবল নদীর উপরে উঠেছে। ঐ সময়ে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসে নূরবানু ভাইদের বাড়িতে। বড়ভাইকে সামনে পেয়ে বলে, তুমাহারে জামই মালসহ বাংলাদেশে ধরা পড়্যাছে। কালু আইস্যা খবর দিলো, এখন উ রাজশাহীর জেলে। ছোট ভাইকে আমার সাতে দ্যেও— এখুনি য্যাতে হবে।
রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগার-এর সামনে। ভেতরে টিকিট পাঠিয়ে দাঁড়িয়ে আছে নূরবানু। কখন আসবে মোজাহার। কারারক্ষি ভেতরে গিয়ে মোজাহারকে বলে, নূরবানু কে তোমার?
আমার বউ।
তোমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছে, চলো।
মোজাহারের পাশ দিয়ে ঠিক ঐ সময়ে গোসলে যাচ্ছিল লালচাঁদ। ‘নূরবানু’ কথাটা ওর কানে বাজে। তারপর চলেই যাচ্ছিল, আবার ভাবলো, একবার দেখ্যাই আসি। লতুন ভাতার রাইখ্যা ও মাগিতো আর আমাকে দেখতে আসপে না। লালচাঁদ নূরবানুকে এখনও ভালোবাসে, নাকি ঘৃণা করে কোনটায় সে অনুমান করতে পারে না। কোনোদিন ভেবে দেখেনি, কিংবা মেপে দেখেনি তার হৃদয়ের ব্যারোমিটারটা কোথায় অবস্থান করছে। যখন সবকিছু নিয়ে ভাবে তখন মনের কোনে ঘৃণার উদ্রেক হয়, আবার যখন ঐ নামটা কারও মুখে শুনে, তখন আর নিজেকে স্থির রাখতে পারে না। তাই যদি হয় তবে, ভালবাসার মানুষের জন্যে সামান্য মাদককে কেন ছাড়তে পারলো না? এর জবাবও নেই তার কাছে, কারণ, মাদককে সে ছাড়তে চাইলেও মাদক তাকে ছেড়ে যেতে চায় না।
গ্রীলের বাইরে শুকনো চেহারায় ঠাঁই দাঁড়িয়ে নূরবানু। ভেতর থেকে সামনে গিয়ে দাঁড়ায় মোজাহার। মনের আকুতি ছড়িয়ে কথা বলছে দু’জন। মনে হচ্ছে, ছিঁড়ে যাচ্ছে দু’জনের আত্মা! গ্রীলের ফাঁক দিয়ে একে অপরের হাতের আঙুলগুলো ছোঁয়ার প্রাণন্তকর চেষ্টা। ঠিক ঐ সময় মোজাহারের পেছনে এসে দাঁড়ায় লালচাঁদ।
হঠাৎ কেউ যেন মুহূর্তে একছোপ কালির পোঁচ লেপটে দেয় নূরবানুর গোলাপী লাল চেহারায়। মুহুর্তে থেমে যায় আঙুলের সঞ্চালন, অদ্ভুত রকম থমকে যায় মুখের ভাষা। আকাশ থেকে না হোক, ভারত থেকে বাংলাদেশে আছড়ে পড়ে নূরবানু! বিষ্ময়ে চোখের পলক আটকে থাকে দীর্ঘ সময়!
এমন একটা পরিস্থিতিতে এতো ঘৃণার অবস্থানে থেকেও একটি উচ্চারণ না চাইলেও কণ্ঠ ভেদ করে বেরিয়ে আসে লালচাঁদের, নূরবানু, নূরবানু তুমি?
সঙ্গে সঙ্গে নূরবানু, মোজাহারের আঙুল ছেড়ে দিয়ে পলকহীন চোখে তাকিয়ে থাকে লালচাঁদের দিকে। নূরবানু কোনো কথা উচ্চারণ না করলেও, অসংখ্য শব্দের ধ্বনি, ওর চেহারায় প্রতিধ্বনি হয়ে হা-হা-কার করে ছুটে যাচ্ছে সামনের মানুষটির দিকে। তবে, সেই মানুষটি কে মোজাহার নাকি লালচাঁদ?

বিষয়সমূহঃTags: