রেদওয়ানুল হক
১৫ জুলাই, ২০১৯ | ০১:১১

পাখির মতো আল মাহমুদ

tesst

আল মাহমুদ কি পাখি হতে চেয়েছিলেন? কেনো চেয়েছিলেন? পাখির কী আছে যা মানুষের নেই। আল মাহমুদকে পাঠ করলে অন্তত এই প্রশ্নটি করাই যায়। আল মাহমুদ তার একাধিক লেখায় এই বাসনা স্পষ্ট করেছেন। তার পাখির মতো ছড়ায়-
আম্মা বলেন, পড় রে সোনা
আব্বা বলেন, মন দে ;
পাঠে আমার মন বসে না
কাঁঠালচাঁপার গন্ধে।

আমার কেবল ইচ্ছে জাগে
নদীর কাছে থাকতে
বকুলডালে লুকিয়ে থেকে
পাখির মতো ডাকতে।

সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়ে
কর্ণফুলীর কূলটায়
দুধভরা ঐ চাঁদের বাটি
ফেরেস্তারা উল্টায়।

তখন কেবল ভাবতে থাকি
কেমন করে উড়বো
কেমন করে শহর ছেড়ে
সবুজ গাঁয়ে ঘুরবো।

তোমরা যখন শিখছো পড়া
মানুষ হওয়ার জন্য,
আমি না হয় পাখিই হব
পাখির মতো বন্য।

সম্পূর্ণ ছড়াটি পাঠে আমাদের আর কারো বুঝতে বাকি থাকে না আল মাহমুদের পাখি হওয়ার বিষয়টি। বর্ণনা এমনই সহজ-সরল এবং স্বতস্ফূর্ততায় মুখর যে ছড়াটি একবার পড়ার পর আবার তা পাঠ করার ইচ্ছা জাগে। অনেকটা ভালো লাগায় স্বপ্নের মধ্যে নিয়ে যায়। সাহসের ডানায় ভর করে আমাদেরও সুর মেলাতে ইচ্ছে করে- ‘আমার কেবল ইচ্ছে জাগে/ নদীর কাছে থাকতে/ বকুলডালে লুকিয়ে থেকে/ পাখির মতো ডাকতে।’
এই ছড়ার শেষ স্তবকে কবি বলেন-‘তোমরা যখন শিখছো পড়া/ মানুষ হওয়ার জন্য,/ আমি না হয় পাখিই হব/ পাখির মতো বন্য।’ সাংঘাতিক কথা! যেখানে কাড়ি কাড়ি টাকার বই কিনে, স্কুল-কলেজে ভর্তি করিয়ে, কোচিং-এ পড়িয়ে, আরামের ঘুম হারাম করে পিতা-মাতারা স্বপ্ন বুনেন সন্তানকে মানুষ করার জন্য, সেখানে আল মাহমুদ কিনা বলছেন উল্টো কথা। ‘তোমরা যখন শিখছো পড়া মানুষ হওয়ার জন্য, আমি না হয় পাখিই হব পাখির মতো বন্য।’ কিন্তু কেনো বললেন আল মাহমুদ এই কথা? কেনো এই উদ্বেগ? কী আছে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায়, কেনো এমন হতাশাব্যঞ্জক উচ্চারণ? উত্তরটা আমাদের সমাজের দিকে তাকালেই বুঝতে পারবো। কী ঘটছে এখন? খবরের কাগজ খুললে কতশত শিক্ষিতজনের নোংরা কাহিনিতে ঠাসা থাকে পুরো পৃষ্ঠা। সামান্য কারণে হত্যা, খুন, ধর্ষণ, আরো কতো কি! যে ডাক্টার রোগীকে ঠেকিয়ে গলাকাটা বিল করেন, তিনি কোন শিক্ষায় শিক্ষিত? যে শিক্ষক শিক্ষার নামে অপশিক্ষার রাজনীতি করেন তিনি কোন শিক্ষায় শিক্ষিত? যে সেবক সেবার পরিবর্তে ক্রমাগত মানুষকে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দেন তিনি কোন শিক্ষায় শিক্ষিত? যে রক্ষক ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ, তাকে আমরা কোন সু শিক্ষায় শিক্ষিত বলবো? আমাদের সমাজের চেহারা কি পাল্টাতে পেরেছে তথাকথিত শিক্ষায় শিক্ষিতজনরা। পেরেছে কি তারা দুর্নীতিমুক্ত করতে দেশ? কলুষমুক্ত করতে আত্মা?
না, পারেনি। পারেনি বলেই এতো প্রশ্ন। এতো জিঘাংসা। আর এক্ষেত্রে আল মাহমুদেরই বা দোষ কোথায়? যে শিক্ষা মানুষকে মানুষ করে গড়ে তোলে না। যে শিক্ষা বিবেকের চক্ষু খুলে দিতে পারে না, যে শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে শিক্ষার অপমান করা হয়। সে গৎবাঁধা শিক্ষার গোলকধাঁধা থেকে বেরিয়ে আল মাহমুদ বরং প্রকৃত মানুষই হতেই চেয়েছেন। আর মানুষ হতে চেয়েছেন বলেই চিৎকার জুড়েছেন- ‘আমি না হয় পাখিই হব পাখির মতো বন্য।’ এটা শুধুমাত্র ঐসব শিক্ষিতজনের দিকেই কবি অঙ্গুলি নির্দেশ করেছেন, যে সব শিক্ষিতজনরা মানুষকে মানুষ হতে বাধা প্রদান করে।
‘আমি না হয় পাখিই হব পাখির মতো বন্য’- এখানে ‘পাখি’ শব্দটি স্বাধীনতা অর্থে ধরতে হবে। পাখি যেমন স্বাধীনভাবে নিজের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটাতে চেষ্টা করে, মুক্ত ডানায় ভর করে প্রকৃতির রস আস্বাদন করে, পৃথিবীকে দেখে আপন চোখে, কবি এমনই স্বাধীনভাবে বড় হতে চেয়েছেন, প্রকৃত মানুষ হতে চেয়েছেন। আমরা এখানে আমাদের প্রিয় কবি, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের নামটি স্মরণে আনতে পারি । কবি কাজী নজরুল ইসলামও এমনি পাখি হতে চেয়েছিলেন। তাঁর ‘খোকার সাধ’ কবিতায় তিনি বলেন-

আমি হব সকাল বেলার পাখি
সবার আগে কুসুম-বাগে উঠব আমি ডাকি।
সূয্যিমামা জাগার আগে উঠব আমি জেগে,
‘হয়নি সকাল, ঘুমো এখন’- মা বলবেন রেগে।
বলব আমি, ‘আলসে মেয়ে ঘুমিয়ে তুমি থাক,
হয়নি সকাল- তাই বলে কি সকাল হবে না ক!
আমরা যদি না জাগি মা কেমনে সকাল হবে?
তোমার ছেলে উঠলে গো মা রাত পোহাবে তবে!’

‘আমি হব সকাল বেলার পাখি’ বলে কবি নজরুল এখানে একেবারে স্পষ্ট করেছেন পাখির স্বাধীনতা, উদ্যমতা এবং পবিত্রতার বিষয়টি। পাখির কাছ থেকে তিনি মানুষকে জাগরণের শিক্ষা নিতে বললেন। ‘আলসে মেয়ে ঘুমিয়ে তুমি থাক’ বলে মানব জাতির জরাগ্রস্ততা, অলসতার চিত্রই ফুটে ওঠে। আর ‘আমরা যদি না জাগি মা কেমনে সকাল হবে?/ তোমার ছেলে উঠলে গো মা রাত পোহাবে তবে!’-এই সুমহান বাণী পাখির নিয়মানুবর্তী চরিত্রেরই প্রতিফলন। অর্থাৎ আমরা জাগলেই পৃথিবী সুন্দর। আলোকিত ও সৌরভমুখর। না জাগলে অন্ধকার। পচা-গলা দুর্গন্ধ।
কবি ফররুখ আহমদের কথা না বললেই নয়। কারণ তিনিও এই একই মন্ত্রবাণী উচ্চারণ করেছেন। তবে একটু ভিন্ন সুরে-
‘আয় গো তোরা ঝিমিয়ে পড়া দিনটাতে
পাখির বাসা খুঁজতে যাবো একসাথে’
ঝিমিয়ে পড়া দিনের অবসন্নতা থেকে মুক্তি পেতে হলে পাখির বাসা খুঁজতে হবে। কারণ পাখির আছে অক্লান্ত পরিশ্রমের শিক্ষা। ঝড়-বাদল উপেক্ষা করে বেঁচে থাকার লড়াই। আছে মমতার অবিচ্ছেদ্য মহাজাল। যাকে কবি জীবনানন্দ দাস বলেছেন-
‘পাখির নীড়ের মতো চোখ তুলে নাটোরের বনলতা সেন।’
পাখিকে এভাবে আমরা যতোভাবেই উপমিত করতে চাইনা কেনো তাতে পাখির মর্যাদার দিকটিই বেশি উন্মোচিত হবে। আর বেরিয়ে আসবে নতুন নতুন দরোজা। নতুন অধ্যায়।
আল মাহমুদের পাখি হওয়ার বাসনা তাই আজনম। সমস্ত যাত্রা এবং বিরতিতে। তিনি পরোয়া করেননি কোনো বাধা-প্রতিবন্ধকতা। চলেছেনে বীরদর্পে, এক অপরাজেয় সাহসী মানুষ হিসেবে। আর এভাবে মৃত্যুকেও হাসিমুখে বরণ করে নিলেন। চলে গেলেন একটি শাদা ফুটফুটে পাখির মতো।

পূর্বের সংবাদ

«

পরের সংবাদ

»