রাজু ইসলাম
২০ এপ্রিল, ২০১৯ | ০৩:০৪

প্রতিশ্রুতিশীল মানবতার কবি শাহিদ উল ইসলাম ও তার কাকাতুয়া তব হেরা

tesst

বিশ্ব কবি রবিন্দ্রনাথ ঠাকুর, কবি জসীম উদ্দীন সম্পর্কে বলেছিলেন ‘যে আছে মাটির কাছাকাছি সে কবির লাগিয়া আমি কান পেতে আছি।’ আমরাও ঠিক সেরকম কিছুই বলতে পারি প্রেম ও প্রকৃতির কবি শহিদ উল ইসলাম এর সম্পর্কে।
বাংলার কাদামাটি ছুঁয়ে যে কবির কেটেছে শৈশব ও কৈশোরবেলা। সে কবির কবিতা মা, মাটি ও মানুষের কথায় থাকবে টইটুম্বুর এমনটাই স্বাভাবিক। একজন আপাদমস্তক ভদ্র ও সামাজিক কবির সম্পর্কে খুব বেশি কথা বলতে হয় না। তবু তাঁর পঞ্চাশতম বসন্তের ফুলমাল্য গীতিতে কিছুতো বলতেই হয়।
বাল্যকাল থেকে গ্রামীণ পরিবেশ কবিকে দিয়েছে কবিতার পূর্ণ রসদ, অবাধে ছুটোছুটি করেছেন মাঠ, ঘাট, কাদা, মাটি ও ডোবা-নালায় ঘেরা গ্রামের জনপদে। গ্রামীণ জীবনের দু:খ কষ্ট ও স্ট্রাগল দেখেছেন খুব কাছ থেকে। তাই তার কবিতায় অন্তরীণ হয়েছে গ্রাম-বাংলার আবহমান চিত্র ও দুঃখ কষ্টে গড়া মানুষের হৃদয়ের স্পন্দন।
পিতামাতার জ্যেষ্ঠপুত্র বলে সংসারের উত্থান পতন দেখেছেন। দেখেছেন ভাঙ্গা গড়ার খেলা, শিখেছেন দায়ীত্ববোধ ও ধৈর্য্যকর্ম তাই শরীরে ও মনে লালন করছেন সীমাহীন সুবোধ ও আত্মনিরহংকার।
কবিতার মতো ব্যক্তি ও সমাজ জীবনে গড়ে তুলেছেন অত্যন্ত সুন্দর সাবলীল ও ধৈর্য্যশীলতার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ।
আত্মপ্রত্যয়ী কবিতার বেলাভূমি এ কবি একদম আত্মপ্রচার বিমুখ, আত্মপ্রচারবিমুখতার কারণে তার অনন্য অনেক আবিষ্কার জনসম্মুখে আসেনি, তার অনেক সৃজনশীল কর্মও আসেনি সবার সামনে। একাধারে তিনি একজন ভাস্কর। একজন সম্পাদক, একজন প্রোগ্রামার, সমন্বয়কারী ও কবিতা শিল্পী। রেডিও, টেলিভিশনে নিয়মিত প্রোগ্রাম করেছেন। সহ-সম্পাদক ছিলেন এক সময়ের লড়াকু সাপ্তাহিক পাঞ্জেরীর।
২০০০ সাল থেকে নিয়মিত লিখেছেন দৈনিক ইনকিলাব, দৈনিক সংগ্রামসহ দেশের বেশ কয়েকটি প্রধান দৈনিকে।

এবার বলি তার কবিতা সম্পর্কেঃ

কবিতায় অত্যন্ত সার্থকতার সাথে তিনি যুগকে ধরতে পেরেছেন। কালের সমসাময়িক বিষয় তার কবিতায় উঠে এসেছে আধুনিক কাব্যধারায়। উত্তরাধুনিকতা তার কবিতার প্রধান উপসর্গ। কবিতায় তিনি তুলে ধরেছেন গ্রাম-বাংলার ইতিহাস ঐতিহ্য। বাংলার মাঠ, ঘাট, নদী মাটি, প্রকৃতি, প্রেম ও বাংলার মানুষের দুঃখ দুর্দশার কথা। কবিতাই তার অনবদ্য ভালোবাসার উপকরণ তা কবির এই কবিতায় স্পষ্ট।

‘প্রিয়া, তোমার চাইতে অধিক প্রিয় আমার আলুথালু
কাব্য
নেই ক্ষতি নেই কোন এতে যদি আমার প্রতি তোমার
ভালোবাসা হলেও হয় নাব্য
……………………………………..
জুড়ে তাই কাব্য চাষ তোমার চেয়ে ঢের বেশী চষি বিশ্বাসে।’
-প্রিয়ার চেয়ে অধিক প্রিয়।

কবিতায় কি করে প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে প্রকৃতি, কবিতা কি করে পাবে অমরতা, কি করে কবিতায় চাষ হবে শব্দ ও কৃষকের স্বপ্নের চারণভূমি, কি করেই বা কবিতা প্রাণ পাবে শব্দের খেলায়, ন্যায্য অধিকারের কথা কোন কিছু বাদ যায়নি তার কবিতায়। ন্যায্যতার দাবীতে কবি তার প্লট এঁকেছেন এইভাবে-

‘শস্যবন্ত হয়ে উঠুক কালের কবি ওহে
তোমার চারণভূমি
………………………
লেখো খোদার রাহে
জমিনের সব কথা ও লাল গালিচার সমাচার,
লেখো ভূমির প্রতি
জলের, বৃক্ষের প্রতি কুঠারের অবিচার।’
-শিরোনামহীন কবিতা

বর্ষায় জলের জন্য কতক জলজ জীবন প্রাণ পায়, পায় বৃক্ষ প্রাণ, প্রাণ পায় জমিন চাষাবাদের নিমিত্তে। বর্ষায় যদি বর্ষণই না হয় তবে তা কিসের বর্ষা ? উত্তরাধুনিক যুগে গান গেয়ে গেয়ে ছেলে মেয়েরা বৃষ্টির আরাধনা করতো। আনন্দে গাইতো, আল্লাহ মেঘ দে, ছায়া দে, পানি দে…। তা-ই কবি তুলে এনেছেন এই কবিতায়।

‘বৃক্ষের লোলুপ দৃষ্টি আটকে থাকে নীলের মেঘ
এই দেখে যায় বোঝা এলোরে বাণ আকাশ ভেঙে।
আল্লাহ মেঘ দে ছায়া দে পানি দে কেউ উঠে গেয়ে
উলঙ্গ জমিন ও নেংটা বৃক্ষও শূন্যে থাকে চেয়ে।’
-জলকুমারী

উত্তরাধুনিকতার স্বাক্ষর রেখেছেন কবি আরো একটি কবিতায়-

‘আমার রূপ কথার ঘোড়া কদভানু দাদীজান
যেমন খোয়া গেছে, তেমন হারিয়েছে শরৎ।’
-শরৎ নেই শরতে।

কবিতায় কবির চিরচেনা শরতের প্রকৃত রূপ হারিয়ে গেছে। ঠিক যেমন হারিয়েছে দাদীজান। কাশবন আকাশ বাতাস প্রকৃতি কোথাও শরতের প্রকৃত রূপ নেই। বর্ষাই যেন খেয়ে নিয়েছে শরতের সুন্দর আকাশ ও নদ-নদী।

ভাষা চিরকাল পরিবর্তনশীল, প্রতি নিয়তই ভাষার সংস্কার পরিবর্তন পরিবর্ধন হচ্ছে। এতে কবি শংকায় পড়ে গেছেন কবির ভাষাই আবার না অবোধগম্য হয়ে যায়। অস্থিরতা থামিয়ে ভাষাকে স্থির হয়ে যেতে বলেছেন কবি তার এই কবিতায়।

‘ভাষা ও বিশ্বাস ঘাতক কেবলি খোলস পাল্টায়
কালের ঘষা মাজায় সে এক প্লাটফর্ম থেকে
অন্য প্লাটফর্মে দাড়ায়।
চন্ডিদাসের ভাষাও যেন আজ
বিশেষজ্ঞ ছাড়া গলাধকরণও ভীষণ দায়!
এখনো কি হয়নি সময়
ভাষা তোমার স্থির চিত্তে বসবাস করার!’
-বুঝে নিও কবির ভাষা।
শহুরে মেকী খাবারে বিরক্ত হয়ে শিশুরা গ্রামীণ ঐতিহ্য শিতের পিঠাপুলি আর গ্রাম্য পিঠায় মানুষ ফিরে যাবার ফুসরত না পেলেও শিশুরা দাদী নানীর কাছে শুনে শুনে শীতপিঠার প্রতি দূর্বল হয়ে পড়ে। শেষে দাবী জানায় জোড় দাবী। এবার শীতে তারা গ্রামে যাবেই যাবে। কবিতায়-

‘শিশুর দফায় এক দাবী দাদী বাড়ী যাবো।
খেজুর রসে ভেজা ভেজা চিতই পিঠা খাবো
পরগাছা সব হটডগে আর নেই তো আজ রুচি
ভাঁপা সেয়ই পাটিসাপ্টায় তাইতো রুচি খুঁজি।’
-কালের শীতের পাখি

আষাঢ়ে যখন আকাশ বর্ষাবতী হয়ে ওঠে, চাষীদের চাষাবাদের জন্য জমিন হয়ে ওঠে পূর্ণ যৌবনবতী, ফল ফসলে ভরে ওঠে গ্রাম বাংলা তখন প্রকৃতির সৌন্দর্য আর দেখে কে! শস্যের এ দেশ ভরে যায় তখন সোনার ফসলে কৃষাণের মুখে ফুটে সুখের হাসি। সাথে সাথে কবিও গেয়ে ওঠেন-

‘তোর নাঙলে রূপালী ঝিলিক থাকুক সারাক্ষণ
তোর গোলাটা উঠলে ভরে খুশিতে ভরে মন
তোর আঙিনায় কৃষাণীর পায় ধানের নূপুর বাজুক
তোর জাংলায় পুঁইয়ের ডগাটা তরুণ সাজে সাজুক।’
-এ দেশ আমার শস্যমালীর

গ্রামের নিত্যদিনের কর্মচঞ্চলতা যেন এক দারুণ আয়োজন। খাবার দাবারে চলে নানা গ্রাম্য আয়োজন। আর খাবার শেষে গাছতলায় গাছতলায় চলে গল্পের পসরা। উঠে সূর্য পূব আকাশে তার সাথে চলে কর্মযজ্ঞ। কবি তাকে বলেছেন- ‘পূর্ব কোনে উঠলো রে ভাই এক হলদে কদম ফুল/ ফুল বলে কে ফুল বলে কে ওযে আমার মায়ের কানের দূল।
খাবারের পর গাছতলায় বসে হাজার সালের গল্প উঠে, পাতার ফাঁকে যে সূর্য্যটি উঁকি দেয় কদম ফুলের মতো তাকে কবি মায়ের কানের দুলের সাথে তুলনা করেছেন। বিকেল বেলা পশ্চিমে সূর্য্য ঢলে পরলে তাকে রক্তজবা দ্বীপের সাথে তুলনা করে বলেছেন- ‘পশ্চিমে ভাই উঠে দুলে এক রক্তজবা দ্বীপ/ দ্বীপ বলো না দ্বীপ বলো না ও মা’র কপালের টিপ।/ এরই ছোঁয়ায় চলছে রে ভাই আমার গাঁওগেরামের দিন। (গাঁয়ের বিশাখা)

রাজনৈতিক বলি হয়ে রাস্তায় পরে থাকে লাশ। লাশগুলো কোনটি কোন দলের তা চিনে চিনে চলে আলাদাকরণ কিন্তু যে রক্ত পরে থাকে রাজপথে তার বিভাজন হয় না। হয় না কোন সনাক্তকরণ। তারই উজ্জ্বল বয়ান কবির এই কবিতায়-

‘হঠাৎ হঠাৎ চিৎকারে কেঁপে ওঠে
ক্যাম্পাসের বায়ু অতপর লাশ
…………………………..
অথচ পৃথকত্ব পায় না কোন রক্তে
খুনে লাল এক হয়ে যায় মাটি।’
– খুন এক ও অবিভাজ্য (পংক্তি)

এতকিছুর পরও কবি প্রেম ও প্রেয়সীকে ছোট করে দেখেননি। দেখেছেন এক উদার মূর্তি নিয়ে। উর্দ্ধে তুলেছেন হৃদয় সিংহাসনে।
ফুলের চেয়ে সৌন্দর্য্য ও সুসভিত বলেছেন প্রিয়াকে-

‘আমি ক্ষণজন্মা ফুল শুকি না
শুকি তোমার হৃদয়ের কোমল ঘ্রাণ
ফুলেতে তৃপ্তি আসে না আমার
খুঁজি আত্মার প্রেয়সী মহাপ্রাণ।’
-প্রত্যাবর্তন

অসাধারণ একটি কাব্য প্রতিভা কবি শাহিদ উল ইসলাম তার লেখায় অনন্তকাল আমাদের মাঝে বিরাজ করবেন এ আমার বিশ্বাস। আমরা তাঁর সর্বাঙ্গীন মঙ্গল কামনা করি। তিনি যেন আমাদের মাঝে আরো অনেক অনেক সাহিত্যের দ্যূতি ছড়িয়ে যান, অকাতরে বিলিয়ে যান তাঁর অমর সৃষ্টি আর তিনি দীর্ঘজীবী হোন সে আশাবাদ ব্যক্ত করি তার পঞ্চাশতম জন্মজয়ন্তীতে।

পূর্বের সংবাদ

«