কাজী নজরুল ইসলাম ফররুখ আহমদ হাসান আলীম আসলাম প্রধান আমিন আল আসাদ আফসার নিজাম রেদওয়ানুল হক ফারুক মোহাম্মদ ওমর মালেক মল্লিক রহমান মাজিদ রাজু ইসলাম আহমেদ খায়ের
১৩ এপ্রিল, ২০১৯ | ০৫:০৪

বৈশাখ সংখ্যা ১৪২৬

tesst

প্রলয়োল্লাস
কাজী নজরুল ইসলাম

তোরা সব জয়ধ্বনি কর!
তোরা সব জয়ধ্বনি কর!
ওই নূতনের কেতন ওড়ে কাল্-বোশেখীর ঝড়!
তোরা সব জয়ধ্বনি কর!
তোরা সব জয়ধ্বনি কর!
আসছে এবার অনাগত প্রলয়-নেশার নৃত্য-পাগল,
সিন্ধু-পারের সিংহ-দ্বারে ধমক হেনে ভাঙল আগল !
মৃত্যু-গহন অন্ধকূপে
মহাকালের চণ্ড-রূপে—
ধূম্র-ধূপে
বজ্র-শিখার মশাল জ্বেলে আসছে ভয়ঙ্কর !
ওরে ওই হাসছে ভয়ঙ্কর!
তোরা সব জয়ধ্বনি কর!
তোরা সব জয়ধ্বনি কর!
ঝামর তাহার কেশের দোলার ঝাপটা মেরে গগন দুলায়,
সর্ব্বনাশী জ্বালা-মুখী ধূমকেতু তার চামর ঢুলায়!
বিশ্বপাতার বক্ষ-কোলে
রক্ত তাহার কৃপাণ ঝোলে
দোদুল দোলে !
অট্টরোলের হট্টোগোলে স্তব্ধ চরাচর—
ওরে ওই স্তব্ধ চরাচর!
তোরা সব জয়ধ্বনি কর!
তোরা সব জয়ধ্বনি কর!
দ্বাদশ-রবির বহ্নি-জ্বালা ভয়াল তাহার নয়ন-কটায়,
দিগন্তরের কাঁদন লুটায় পিঙ্গ তার ত্রস্ত জটায়!
বিন্দু তাহার নয়ন-জলে
সপ্ত মহা-সিন্ধু দোলে
কপোল-তলে !
বিশ্ব-মায়ের আসন তারি বিপুল বাহুর ‘পর—
হাঁকে ওই “জয় প্রলয়ঙ্কর !”
তোরা সব জয়ধ্বনি কর !
তোরা সব জয়ধ্বনি কর !
মাভৈঃ মাভৈঃ! জগৎ জুড়ে প্রলয় এবার ঘনিয়ে আসে
জরায়-মরা মুমূর্ষুদের প্রাণ-লুকানো ওই বিনাশে!
এবার মহানিশার শেষে
আসবে ঊষা অরুণ হেসে
করুণ বেশে !
দিগম্বরের জটায় লুটায় শিশু-চাঁদের কর—
আলো তার ভরবে এবার ঘর!
তোরা সব জয়ধ্বনি কর!
তোরা সব জয়ধ্বনি কর!!
ওই যে মহাকাল-সারথি রক্ত-তড়িত চাবুক হানে,
রণিয়ে ওঠে হ্রেষার কাঁদন বজ্রগানে ঝড়-তুফানে!
ক্ষুরের দাপট তারায় লেগে উল্কা ছুটায় নীল খিলানে।
গগন-তলের নীল খিলানে!
অন্ধ কারার অন্ধ কূপে
দেবতা বাঁধা যজ্ঞ-যূপে
পাষাণ-স্তূপে!
এই ত রে তার আসার সময় ওই রথঘর্ঘর—
শোনা যায় ওই রথঘর্ঘর!
তোরা সব জয়ধ্বনি কর!
তোরা সব জয়ধ্বনি কর!!
ধ্বংস দেখে ভয় কেন তোর? — প্রলয় নূতন সৃজন-বেদন।
আসছে নবীন — জীবনহারা অ-সুন্দরে করতে ছেদন।
তাই সে এমন কেশে বেশে
প্রলয় বয়েও আসছে হেসে—
মধুর হেসে!
ভেঙে আবার গড়তে জানে সে চিরসুন্দর!
তোরা সব জয়ধ্বনি কর!
তোরা সব জয়ধ্বনি কর!!
ওই ভাঙা-গড়া খেলা যে তার কিসের তরে ডর?
তোরা সব জয়ধ্বনি কর!—
বধূরা প্রদীপ তুলে ধর!
কাল-ভয়ঙ্করের বেশে এবার ঐ আসে সুন্দর!—
তোরা সব জয়ধ্বনি কর!
তোরা সব জয়ধ্বনি কর!!

বৈশাখী
ফররুখ আহমদ

বৈশাখের মরা মাঠ পড়ে থাকে নিস্পন্দ যখন
নিষ্প্রাণ, যখন ঘাস বিবর্ণ, নিষ্প্রভ ময়দান,
যোজন যোজন পথ ধূলি-রুক্ষ, প্রান্তর, বিরান;
শুকনো খড়কুটো নিয়ে ঘূর্ণী ওঠে মৃত্যুর মতন;
সে আসে তখনি। তখনি তো ঘিরে ফেলে উপবন,
বন;-চোখের পলকে, মুছে ফেলে ঘুমন্ত নিখিল
সে আসে বিপুল বেগে। কণ্ঠে তার সুরে ইস্রাফিল
বজ্রস্বরে কথা কয়, জানে না সে গম্ভীর বন্ধন।

মানে না সে আহাজারি বিশুষ্ক মাঠের, মানে না সে
পথের হাজার বাধা, অরণ্যের ক্লান্ত আর্তস্বর,
বিদ্যুৎ চমকে তার সাড়া জাগে সমস্ত আকাশে,
জেগে ওঠে বজ্র রবে এক সাথে নির্জিত প্রান্তর,
দিক দিগন্তের পথে চলে যায় নিমেষে খবর;
ধ্বংসের আহ্বান নিয়ে অনিবার্য সে আসে সে আসে।

কাহাফের কুকুর
হাসান আলীম

পালাও জঙ্গল থেকে
গভীর অরণ্যে চিতাবাঘ, গড্ডল, গন্ডার,
গোখরো সাপের দৌরাত্ম চলছে,
এখানে কি আছে বোকার মতন
অযথা সাহস দেখাবার?

কাহাফের কুকুরও হিজরত করেছিল
বিশ্বাসী যুবকদের সাথে,
কোহেকাফে লুকিয়েছিল হাজার বছর।
না হয় তুমিও ঘুমিয়ে থাকো শীতনিদ্রার কম্বলে,
কখনো অলক্ষে অগোচরে
চলে যাওয়া পালিয়ে যাওয়া নয়,
পরাজয় নয়।

ভুলের তাজ, শেরপা মানায় না তোমার মাথায়,
অযথা গর্বে অনড় থাকা ভাল নয়,
এখন গভীর রাত্র,
রাত্রে ঘুমিয়ে থাকাই স্বাস্থ্যকর,
ঘুমাও দূরে কোথাও,
একটু পরেই সূর্য উদিত হবে।

দম্ভ করো না এখন
কাহাফের কুকুরের মত নিতান্ত বিশ্বাসী
অনুচর হয়ে যাও।

নববর্ষের প্রার্থনা
আসলাম প্রধান

এই বছরে হ্নদয়ভরে
সবার জন্যে আশীর্বাদ
বিপর্যয়ের কবল থেকে
দেশবাসী নিক হাসির স্বাদ!

অসুস্হ যে- সুস্হ হয়ে
বাঁচার আলো দেখতে পাক-
নতুন সালে কষ্ট ভুলে
স্বপ্ন-সুখে দিন কাটাক |

লোকসমাজে দ্বন্দ্ব-বিবাদ
অতিদ্রুত যাক মিটে
অশান্ত যে- সুশান্ত হোক
বাস্তহারা পাক ভিটে |

মনবাগানে আসুক ফিরে
স্নেহ-মায়া শ্রদ্ধাবোধ
পরস্পরের ভালবাসায়
দূর হয়ে যাক সব বিরোধ |

জীবন থেকে পালাক সকল
অবক্ষয়ের ক্লান্তিভয়
বিনয়বশে প্রার্থনা এই ,
জগতটা হোক শান্তিময় |

মানুষের আবরণ
আমিন আল আসাদ

মানুষের আবরণ পড়ে আছে কতগুলো
শকুন শ্বাপদ সরীসৃপ
সমাজে মিশে আছে মানুষের বেশে

ধারালো দন্তনখর উম্মোচিত করে ওরা মাঝে মাঝে
অপলক চেয়ে শুধু দেখি আমি বৈপরিত্ব
এরাই আবার পশুবৃত্তির বিরুদ্ধে বক্তৃতা দেয়
মানুষ হওয়ার উপদেশ দেয় মানুষকে
মানুষ হতে চায় ওরা বক্তৃতায় অথচ পারে না
যেমন পারে না ময়ূর হতে ঈশপের শৃগাল
মূষিকা মূষিকাই থাকে, হয় না মানবী
যতই বদলাক রং, গেছোব্যাঙ হয় না পাখি
আমি শুধু চেয়ে চেয়ে দেখি
মানুষের আবরণ পড়া মানুষগুলোকে
কি দারুণ হৃদয় ও কর্ণ জুড়ানো বাক্য ছড়িয়ে দেয়
অথচ নেমে এসেই ফোস করে ওঠে
ধারালো দন্তনখরে
মানুষের খোলস খুলে বেরোয় শ্বাপদ
আমি শুধু চেয়ে দেখি কতিপয় রক্তচক্ষুকে।

নতুন বাংলাদেশ
আফসার নিজাম

সকল বাঁধাকে উপেক্ষা করে আবার এলো বৈশাখ
আম কাঁঠালের মুকুল ভয়ে জড়ো সরো
সাঁঝের আঁধার নামার আগেই প্রচন্ড উল্লাসে
আকাশ চিরে নেলে আসলো কালবোশেখী
উড়ে গেলো জরাজীর্ণ পুরাতন
উড়ে গেলো দুঃখ ভরাক্রান্ত মন
উড়ে গেলো ফেসিবাদী কুরসি
জেগে উঠলো প্রজন্ম নতুন প্রাণ
সড়কে সড়কে কিশোর বিপ্লব
বিশ্ববিদ্যালয়ে ইনসাফের আন্দোলন
পুরাতন সুর্য অস্তমিত হয়ে নতুন সুর্য উঠার উপেক্ষা
বৃক্ষে বৃক্ষে পাতাশিশুরা মেলে দেয় আন্দোলনের সবুজ ডানা
প্রাণে প্রাণে জেগে উঠে নতুন প্রাণ নতুন বাংলাদেশ।

নতুন দিন
রেদওয়ানুল হক

নতুন দিনের নতুন হাসি
ছড়িয়ে যাক
সবার মনে আনন্দ রেশ
ভরিয়ে যাক।

কষ্ট-কলস ভেঙে কুয়ায়
গড়িয়ে যাক
চোখের কোণে স্বপ্ন আবার
জড়িয়ে যাক।

অন্ধকারের পিলারগুলো
নড়িয়ে যাক
নতুন দিনের নতুন হাসি
ছড়িয়ে যাক।

বৈশাখি উচ্চারণ
ফারুক মোহাম্মদ ওমর

বৈশাখ তুমি কমনে আছো? তুমি পুরুষ না মহিলা
নাকি উভয় লিঙ্গে বয়ে যাও সমান্তরাল
বাঙ্গালী বাংলাদেশীর নতুন রুপ রস ছন্দে
এক অন্য রকম মিলন মেলায়।

তুমি আসলে কি তিস্তায় পানি থৈ থৈ করবে
কিম্বা বিদ্যূতের দাম ভোটের অধিকার
তুমি আসলে কিন্তু রাস্তায় টোল দিয়ে চলতে পারবোনা
শিক্ষিত বেকার যুবক আমি
অবাধ গ্রেফতার বাণিজ্য আর দালালদের খপ্পরে পড়ে তুমি লজ্জা পওেনা।

বৈশাখ তুমি যদি নারী হও তোমার আঁচল ধরে যাবো রমনার বটমূলে
মেলার উৎসবে প্রণয় যদি হয়ে যায় তুমি হবে সবচেয়ে সুখী
ছিমছাম সংসার পাতাবো আমরা পূবপুরুষরে মতো ঘুরবো শহর থেকে শহরে
রঙ মেখে সঙ সেজে দেখাবো ভ্যারাইটি শো
নাগরদোলা ভানুমতির খলে ঢোল বাঁজবে তাকধুম।
আর যদি পুরুষ হও,ভাই বানাবো বন্ধু দেবো মায়রে ভালোবাসা সমানে সমান।

বৈশাখ চলো উভয় লিঙ্গ হয়ে যাই মানুষের কল্যাণে
প্রকৃতির মতো নদী আর পাহাড়ের মতো
বৈষম্য আর অত্যাচারের বিরুদ্ধে বিপরীত উচ্চারণ ৷

রূপান্তরের গল্প
মালেক মল্লিক

ইদানিং তুমি খুব বেশি মিথ্যে হয়ে যাচ্ছো
মিথ্যে হয়ে যাচ্ছে তোমার ভিতর-বাহির; সব-সবকিছু।
মিথ্যে হয়ে যাচ্ছে তোমার পঞ্চ মাটির দেহ :
কহেলাবলান, যুথি, ছাড়রা,তুরযিতান, তুরছিনা।
মিথ্যে খোলসে বন্দি তোমার শরীরস্থ পঞ্চ গুণ।
আজ-কাল খুব মিথ্যে হয়ে ওঠেছে
তোমার শ^াস-প্রশ^াসের পঞ্চবায়ু।
হয়তো অবসন্ন বিষাদে একদিন মিথ্যে শোনাবে
তোমার পঞ্চভূত সমাচার :
ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ, ব্যোম।
স্বাধীনতার মতো ভীষণভাবে বদলে যাচ্ছে
তোমার দেহের নান্দনিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলোও
আর রাংতার মতো ক্ষীণ হয়ে পড়েছে
তোমার আত্মস্থ প্রেম।
বার বার মুখস্ত করেও তোমার মুখটা
স্মরণ হয়না এখন আর।
সম্প্রতি তুমি বহুরূপী সরিসৃপ হয়ে গেছো।

একদিন নিজেই হবে অবাক,
হয়তো বা রূপকথার আর্শিতে-
তোমাকে আবার আবিষ্কার করতে হবে
আমার জগতে !

ক্রুদ্ধ দেবতা
রহমান মাজিদ

নগরের দ্বারে দ্বারে কুঁদে ফেরে মৃত্যুর দূত
রুগ্ন প্রতিরোধ, নড়বে না একচুল লাহাবের পুত
হেঁকে চলে ডাইনি পায়ে বাজে মৃত্যুনূপুর
মাংশল বাহুতে ধ্বংসের ট্যাটু আকে ক্রুদ্ধ দুপুর
ডানা বেয়ে দৈত্যের ঝরে রোজ খান্দানি যুদ্ধ
ভয়ে কাঁপে প্রজা ভারি দেবতারা ক্রুদ্ধ।

একটি ব্যক্তিগত কবিতা
রাজু ইসলাম

এক টুকরো সফেদ সাদা কাগজসম হৃদয়ে
অযথাই তোমাদের বিশ্রী আঁকিবুকি
বলেছিলাম সাদা কাগজ সাদাই ভালো
কেউ শুনলেনা বুঝলেও না
এক কণা বালু ঝাড়তে গিয়ে
মাখিয়েদিলে পৃষ্ঠাময়ধূলিময়লা
ভাগাড়ের উটকো শুঁটকিগুলো
এখন শোভা পায়ভদ্রলোকের হাঁড়িতে।
লোকে হাসে আর বলে, ‘হে হে হে
‘বানরের গলায়মুক্তোর হার।’
অদ্ভুত যুক্তি দেখিয়েবললে-
‘বাজারের নর্তকীও তো নেচে বেড়ায়
রাজ-রাজাদের হেরেম খানায়’
খোঁড়া যুক্তি আর অবহেলা তড়পায়
দুঃখিনী বৃদ্ধা মায়ের ভাতের থালায়।
বলতে পারো সভ্যতা চিরে গেল কার করাতে?
পাষাণের বুকে অযথাই টোকা মারে
বংশীবাদকের সুর। খোলে না দুয়ার।
দু’কদম পিছালেই যাকে ভুঁড়িভুঁড়িউপকারের নিদর্শন
অকৃতজ্ঞ মানবের মনে নেই আজ কোন কিছুই
সে এখন মোচে তা দিয়েদাক্ষিণ্য বিলায়।
শোনো পৃথিবী! ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না।

বোশেখ মানেই
আহমেদ খায়ের

বোশেখ মানেই ঝড় বুঝ আর
খুঁজে বেড়াও আমের বন
আমি কিছু বলার আগেই
ভাবো দেখি কিছুখখন,

পেলে কিছু খুঁজে?
এলো কিছু বুঝে?

শোন!
কালবোশেখি
প্রবল বেগে চলা শেখায়
সত্য কথা
বুক ফুলিয়ে বলা শেখায়
আরো শেখায়
শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা
মনের ভেতর
দুর্বলতা যায়না রাখা।

যেনো!
টিকে থাকে সাহসী –
শক্ত হয়ে দাঁড়ায় যে।
ঝরে যায় কাপুরুষ –
আস্তাকুঁড়ে হারায় সে।