উৎসঙ্গ সৃজন চিন্তন
৬ জুন, ২০২০ | ১৪:৩১

মতিউর রহমান মল্লিকের গান: একটি অনুপাঠ

tesst

মতিউর রহমান মল্লিকের গান: একটি অনুপাঠ
চৌধুরী আবদুল হালিম

আধুনিক কবিতা ও গীতিকবিতা যুগপদ চর্চায় থাকলেও মূলত গীতিকবিতা, যেগুলোতে সুরারোপ করা হয়েছে সেগুলো তাকে বাঁচিয়ে রাখবে নির্মল গান-পিয়াসীদের মাঝে। গীতিকবিতা বলতে সেসব ছন্দবদ্ধ, অন্তমিল সমৃদ্ধ ছোট আকৃতির কবিতাকে বোঝায় যেগুলো সহজবোধ্য,সাবলীল,উপমা সমৃদ্ধ যে গুলোতে সুরারোপ পূর্বক সহজে গানে রূপান্তর করা যায়। গীতিকবিতাগুলো প্রায়শঃ মাত্রাবৃত্ত ও অক্ষরবৃত্ত ছন্দের হয়ে থাকে । তালের দিক থেকে কবিতাগুলো প্রধানত দাদরা,কাহার্বা ও ঝুমুর তালের হয়ে থাকে। তবে কবিতা হিসাবে (আবৃত্তি কালে) যে তাল থাকে মাঝেমধ্যে সুরারোপ পূর্বক গানে রূপান্তরের ক্ষেত্রে প্রয়োজনে তাল পরিবর্তন করা যায় । গীতিকবিতা রচনায় শব্দ চয়ন হচ্ছে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয।
গীতিকবিতায় সুরারোপ করলে তা হয়ে যায় গান অর্থাৎ গীতিকবিতা + সুর= গানা। কিন্তু সুরারোপ না করা পর্যন্ত সেগুলো গীতিকবিতা রূপেই থাকে। সুতরাং গান মাত্রই গীতিকবিতা কিন্তু গীতিকবিতা মাত্রই গান নয় যতক্ষণ না এর উপর সুর প্রয়োগ করা হয়। আবার অনেক সময় সুর,তাল,লয় সৃষ্টির পর সেই অবয়বে লিখা হয় গীতিকবিতা। এক্ষেত্রে সুর+কথা= গান। সুতরাং গানের ক্ষেত্রে কথা আগে না সুর আগে এ প্রশ্নের উত্তর হচ্ছে-প্রায় কথার উপর সুরারোপ হয়ে থাকলেও সুরারোপের আলোকে কথামালা গাঁথার উদাহরণও কম নয়। আবার মরমী শিল্পীদের ক্ষেত্রে যুগপদ ভাবে কথা ও সুর তথা গান সৃষ্টির উদাহরণ বিদ্যমান।
মতিউর রহমান মল্লিকের ক্ষেত্রে সব বিকল্পই লক্ষণীয়। তিনি গীতিকবিতা রচনা করে এর উপর সুরারোপ করে গান সৃষ্টি করেছেন।( যেমনঃ পাহাড়ের পাশ দিয়ে চলে গেছে জলধারা, আমি তার জানি না কোন ঠিকানা) আবার তার অনেক গান আছে যেগুলোর প্রথম সুর সৃষ্টি হয়েছিল এবং ঐ সুরের উপর কথা সাজাইয়া গান সৃষ্টি করেছেন।(যেমন ওদের ঘরে সুখ দিও গো দিও সান্তনা) আবার সরাসরি গান সৃষ্টি তথা একই সাথে কথা ও সুর বেরিয়ে আসার ঘটনাও নিছক কম নয়। (যেমনঃ বিয়ের ব্যাপার আসলে ভাই যে সে ব্যাপার নয়।) তার খুব ছোট্ট কিন্তু মান ভালো একটি রেডিও ছিল। নিজের কাছেই রাখতেন। সুযোগ হলেই একান্তে দেশের এবং বিদেশের [বিশেষ করে আকাশ বাণী (বাংলা গানের জন্য), সিলন,পাকিস্তান (উর্দূ গানের জন্য), মধ্য প্রাচ্যের কয়েকটি দেশ (আরবী গানের জন্য)] পজিটিভ গান শুনতেন,সুরের দোলা খেয়াল করতেন, কিছু কিছু সুর ভেংগে নতুন সুর বাঁধবার চেষ্টা করতেন। অনেক ক্ষেত্রে মনের ভেতর দোলা খাওয়া সম্পূর্ণ নতুন সুর তাতক্ষণিক কথা রচনা করে ধরে রাখতেন।সম্ভবত আমার গানগুলো তার ভালো লাগতো।তিনি একদিন আমাকে বললেন “আমার যে কোন গানের সুর আপনি চাইলে নতুন করে দিতে পারেন” আমি বললাম আপনার প্রায় গানের সুরই চমৎকার।কিছু কিছু গানে তালটা সমন্বয় করা যায়।”
এখানে বলে রাখা ভালো মতিউর রহমান মল্লিক জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ছাত্র ছিলেন এবং আবদুল মান্নান সৈয়দের দারুণ সাহচর্য পেয়েছিলেন। তার বড় ভাই কবি আহমদ আলী মল্লিকও ছিলেন বাংলা সাহিত্যের প্রথিতযশা শিক্ষক। তার হাতেই মতিউর রহমান মল্লিকের ছন্দের হাতেখড়ি। তার চেয়ে বড় কথা হচ্ছে তার একটি কবিমন ছিল, ছিল একটা শিল্পীমন । সংগীতে তার শাস্ত্রীয় শিক্ষা ছিল না। গান সৃষ্টিতে এটা কোন প্রতিবন্ধকতা নয়। সুর নিয়ে বৈচিত্রময়ী খেলার জন্য তথা নানা রাগ-ঠাটের মিশ্রণে নতুন সুর সৃষ্টির জন্য বা উচ্চাঙ্গ সংগীতের জন্য বা সুর প্রকাশে কন্ঠের উপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের জন্য বা গবেষণার জন্য বা রাগ ভিত্তিক সংগীত চর্চা জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সঙ্গীতচর্চা প্রয়োজন। সাধারণ গান তৈরিতে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা অপরিহার্য নয়। বিশ্বের জনপ্রিয় গানগুলোর রচয়িতা বা সুরকারের অধিকাংশেরই এ বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক কোন শিক্ষা ছিল না। রবীন্দ্র সংগীত, নজরুল সংগীত, লালন গীতি, হাসন রাজার গান, শাহ আব্দুল করিমের গান বাংলা ভাষাভাষীদের মধ্যে ব্যাপকভাবে সমাদৃত। এদের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ ছোটকালে যদু ভট্ট ও বিষ্ণু চক্রবর্তীর কাছে ব্যক্তিগতভাবে কিছু তালিম নিলেও এবং নজরুল লেটো দল গঠনের পর ওস্তাদ জমির উদ্দিন খান এর নিকট কিছুটা শাস্ত্রীয় সংগীত চর্চা করলেও অন্যান্যদের প্রাথমিক তালিমও ছিল না। একই অবস্হা ভাওয়াই গানের “যুবরাজ” খ্যাত শিল্পী কছির উদ্দীনের, যার গান শুনে ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশে সরকারী সফরে আসা ভারতীয় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দ্রা গান্ধী তার গলার মালা নিয়ে কছির উদ্দিনকে পরিয়ে দিয়েছিলেন, যিনি অনেক জনপ্রিয় ভাওয়াইয়ার রচনাকারী ও সুরারোপকারী, যিনি সংগীতে দেশের সব গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কারসমূহ পেয়েছিলেন, তাঁরও সংগীতে কোন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল না। যদিও এদের সঙ্গীত নিয়ে উচ্চশিক্ষা, উচ্চ গবেষণা চলমান। বাস্তবে স্বাভাবিক গান রচনায় প্রয়োজন একটি কবি মন, সুরেলাকন্ঠ, সুরের প্রতি নিবিষ্টতা, নিয়মিত বিভিন্ন প্রকৃতির গান শোনা, নিয়মিত চর্চা তথা লেগে থাকা এবং ভাবা। মতিউর রহমান মল্লিকের মাঝে এই সব বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান ছিল। এসব বৈশিষ্ট্য যে কেউ চাইলেই অমনি অর্জিত হয় না। এসব সুকুমারবৃত্তি স্রষ্টার দানেই সম্ভব। এ বিষয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, প্রখ্যাত গজলশিল্পী মেহেদী হাসান, লতামাংগেসকার প্রায় একই ভাষায় বলেছেন “এটি স্রষ্টার অপার কৃপা ছাড়া সম্ভব নয়।” আমাদের দেশের সাম্প্রতিক সময়ের জনপ্রিয় গীতিকার, সুরকার ও শিল্পী আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল একটি প্রতিযোগিতায় বিচারকী অনুষ্ঠানে স্পষ্টই বলেছেন “গানের জন্য কন্ঠ, সুর স্রষ্টার বিশেষ দোয়া ছাড়া অসম্ভব।”
মতিউর রহমান মল্লিকও স্রষ্টার এই কৃপা থেকে বঞ্চিত হয়ননি। তিনি বিভিন্ন বিষয়ে গান রচনা করলেও এগুলোর মধ্যে স্রষ্টার প্রশংসা, রাসূলের প্রশস্তি,দেশ,মাটি ও মানুষ সম্পর্কিত গানগুলি বেশি গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। স্রষ্টার প্রশংসায় তার প্রচুর চমকপ্রদ সুরেলা গান রয়েছে। এসব হামদ থেকে একটি এখানে উদ্ধৃত করা হলো। গানটিতে চারটি প্যারা রয়েছেঃ

প্রথম প্যারাঃ
আমি পাখির কাছে বললাম আমি নদীর কাছে শুধালাম
তোমাদের গান তোমাদের সুর
কেন এমন মনোহর কেন এমন সুন্দর?
ওরা বলল শুধু বলল আমাদের কন্ঠে স্রষ্টার নাম,
অঙ্গে অঙ্গে তার সৃষ্টির দাম
আমাদের গান আমাদের সুর তাইতো এমন মনেহর
, তাইতো এমন সুন্দর।

২য় প্যারাঃ
আমি অলির কাছে বললাম কলির কাছে শুধালাম
তোমাদের মন কেন যে মোহন, কেন
এমন স্বপ্নিল, কেন এমন অনাবিল?
ওরা বলল শুধু বলল আমাদের স্বপ্নে স্রষ্টার ধ্যান
মর্মে মর্মে তার স্মরণ অম্লান
আমাদের ঘ্রাণ সুরভিত প্রাণ তাইতো এমন মনোহর,
তাইতো এমন সুন্দর।

৩য় প্যারাঃ
আমি বিলের কাছে বললাম ঝিলের কাছে শুধালাম
তোমাদের মুখ কেন উন্মুখ, কেন এমন টলমল,
কেন এমন ছলো ছল
ওরা বলল শুধু বলল আমাদের বক্ষে স্রষ্টার দাম
পুষ্পে শস্যে তার সুধা অফুরান
আমাদের রং আমাদের রূপ তাইতো এমন মনোহর
তাইতো এমন সুন্দর ।

৪র্থ প্যারাঃ
আমি মাঠের কাছে বললাম ঘাটের কাছে শুধালাম
তোমাদের গ্রাম বনানীর প্রাণ কেন এমন উজ্জল
কেন এমন উচ্ছল
ওরা বলল শুধু বলল আমাদের সঙ্গে স্রষ্টার প্রেম
লগ্নে লগ্নে সম্প্রীতি লেনদেন
আমাদের নীড়, সবুজের ভীড় তাই তো এমন মনোহর
তাইতো এমন সুন্দর।
চারটি প্যারার পুরো গানটি স্থায়ী সুরে গাওয়া। কিন্তু এত চমৎকার সুর,দোলা, শব্দ চয়ন,উপমা, অন্তমিল, প্রতি প্যারায় নতুন সুর মনে হয়। লক্ষ্য করুন স্থায়ী বা প্রথম প্যারায়” নদী ও পাখি “কে দ্বিতীয় প্যারায় “অলি ও কলি” কে তৃতীয় প্যারায়” বিল ও ঝিল” কে চতুর্থ প্যারায় “মাঠ ও ঘাট” কে তাদের এমনসব সুন্দর অবয়ব, কন্ঠ, সুর সম্পর্কে প্রশ্ন করে তাদের থেকে আবার উত্তরের মাধ্যমে চমৎকারভাবে স্রষ্টার প্রশংসা প্রকাশ করেছেন। বাংলায় এ পর্যন্ত প্রকাশিত “হামদ” এর মধ্যে শব্দ চয়ন, উপমা, অন্তমিল এবং দোলার এমন সাযুয্য খুব কম গানেই আছে।গানটি কাহারবা তালে সূরা করা হয়েছে।সুরও চমৎকার।প্রথম শোনাতেই শ্রোতা আকর্ষিত হয়।
রাসুলের প্রশস্তি গেয়েও প্রচুর লিখেছেন কবি মতিউর রহমান মল্লিক। এসকল নাতে-রাসুল থেকে একটি এখানে উপস্থাপন করলাম। গানটিতে কোন সঞ্চারি নেই তবে অন্তরা আছে সাতটি।সুরটি কবি নজরুলের ” বাগিচায় বুলবুলি তুই ফুল শাখাতে দিস নে আজি দোল”-গানটির অনুকরনে–
এল কে কাবার ধারে আঁধার চিরে চিনিস নাকি রে
ওকেও মা আমিনার কোল জুড়ে চাঁদ জানিস নাকি রে
মেতালিব আজকেকেন বেহুশহেন বক্ষে খুশির বান
বেদনার সুপ্ত ক্ষতে হাত বুলাতে কার ও আগমন
সাহারার হৃদয় ভরা ঝর্ণাধারা বইল নাকি রে।
বাগিচায় ছন্দ বিলায় বুলবুলি আজ সে দিওয়ানা
চুমু খায় প্রেমের ভাষায় গভীর নেশায় পেয়েই পরোয়ানা
গোলাপের অধর ভরে খোশবু ঝরে রয়না বাকী রে।
আকাশে ভোরের রবি মুগ্ধ কবি আবেগ ছল ছল
বাতাসে ছন্দ অতুল গন্ধ গোকুল সোহাগ টলমল
সাগরের উর্মিমালা দোদুলদোলায় কার এ রাখী রে।
বেদুইন থমকে দাঁড়ায় দৃষ্টি ছড়ায় নিবিড় আনন্দে
ছেওয়ারীর লেগাম টানে কাবার পানে জান্নাতী ছন্দে
হৃদয়ের গভীর দেশে কার পরশে খুললো আখিঁ রে।
লক্ষ্য করুন গানটির প্রতিটি অন্তরার প্রতিটি লাইনের ভেতরে অন্তমিল। আবার প্রতি দুই লাইনে অন্তমিল। তৃতীয় লাইনে স্থায়ী সাথে অন্তমিল। এই প্রকৃতির গীতিকবিতা বাংলা গানের ভান্ডারে খুব অল্প। লক্ষ্য করুন প্রতিটি লাইনের ভেতরে এবং প্রতি দুই লাইনে মিল সূত্র হচ্ছে:
ক ক গ
চ চ গ যেমনঃ
—–আজকে কেন, ——-বেহুশ হেন ——খুশির বান
——সুপ্ত ক্ষতে ———হাত বুলাতে ——–আগমন
——ছন্দ বিলাই ——-বুলবুলি হাই ——–দিওয়ানা
—–প্রেমের ভাষায় —–গভীর নেশায় ——পরোয়ানা
——ভোরের রবি ——–মুগ্ধ কবি ————-ছল ছল
——-ছন্দ অতুল ——–গন্ধ-গোকুল ——-*টলমল
——-থমকে দাঁড়ায়—– দৃষ্টি ছড়ায় ———-আনন্দে
——-লাগাম টেনে——-কাবার পানে ———*ছন্দে
এভাবে স্থায়ীর পর প্রতিটি অন্তরার প্রথম দুই লাইনে আছে হৃদয় গ্রাহ্য শব্দ চয়ন এবং অন্তমিল। আর তৃতীয় লাইনে আছে চমৎকার উপমা। যেমনঃ ” সাহারার হৃদয় ভরা ঝর্ণাধারা বইলো নাকি রে”- এখানে “সাহারা” তীব্র রোদ্র ভরা হাহাকারের প্রতীক হিসেবে এসেছে। সেই সাহারার হৃদয় জুড়ে তথা পুরো সাহারাই ঝর্ণা বয়ে গেল অর্থাৎ চরম হাহাকারের মাঝে শান্তির অমিয় ধারা প্রবাহিত হল রাসুলের আগমনে- এই ভাবটাই প্রতিফলিত হয়েছে।
“সাগরের উর্মিমালায় দোদুল দোলায় কার এ রাখী রে।”- এখানে ‘রাখী’ একতা/ বন্ধনের প্রতীক। রাসুলের আগমনে অশান্ত পৃথিবীতে মানুষ স্বার্থপরতা, গোত্র গোত্র দ্বন্দ্ব ভুলে আত্মার বন্ধনে একত্রিত হয়েছিল।- এই ভাবটাই এখানে প্রস্ফুটিত হয়েছে।
“হৃদয়ের গভীর দেশে কার পরশে খুললো আঁখি রে।”-এখানে গোমরাহ হৃদয় তথা অন্ধকারাচ্ছন্ন হৃদয় বা মৃতপ্রায় হৃদয় রাসুলের আগমনে জাগ্রত হল- এভাটাই উঠে এসেছে।
এভাবে প্রতিটি প্যারার তৃতীয় লাইনে চমৎকার উপমা, ভিতরের অন্ত্যমিল এবং স্থায়ীর সাথে অন্তমিল সহ চমৎকারভাবে উপস্থাপিত হয়েছে।
তার দেশের গানগুলো বেশ উদ্দীপনামূলক। এ ধরনের একটি গান হচ্ছেঃ
স্থায়ীঃ
সারা বাংলার গ্রামে গঞ্জে
শহরে নগরে উপকণ্ঠে
চির গৌরব নবযৌবন
জেগে উঠে যেন নব ছন্দে

প্রথম অন্তরাঃ
জনতা সাগরে আশার জোয়ার ডাকে বাণ
প্রতি প্রাণে প্রাণে জিরো চেতনার জাগে গান
আলো আধারের চির দ্বন্দ্বে।

দ্বিতীয় অন্তরাঃ
রোদের সাহসে আকাশের মেঘ কেটে যায়
চলার আবেগে নদী সে মোহনা খুঁজে পায়
পায় অজানা অচেনা পথের ঠিকানা
পাখি ও গতির অনুসঙ্গে।
চমৎকার সুরের এই দেশের গানটির প্রথম প্যারাতে সারাদেশে গৌরবের প্রতীক “নবীনদের” নতুন রূপে জেগে ওঠার চিত্র বিধৃত হয়েছে। জনতা ধীর চেতনায় আঁধার মাড়িয়ে আলোর দিকে ধাবমান– এই বক্তব্যটি চমৎকার উপমা ও অন্তমিল নিয়ে প্রথম প্যারায় ফুটে উঠেছে। ” রোদের সাহসে আকাশের মেঘ কেটে যায়”– এখানে রোদের সাহস বলতে জনতা/ নবীনদের অগ্রযাত্রাকে বোঝানো হয়েছে। এই অগ্রযাত্রায় নতুন নতুন দিক উন্মোচিত হবে। “পাখি ও গতির অনুসঙ্গ”— এখানে পাখি শান্তির প্রতীক হিসেবে এসেছে। এখানে যাত্রীরা শান্তি ও প্রগতির সাথে এগিয়ে যাচ্ছে– এইভাবে উঠেছে। এভাবে তার বিভিন্ন দেশাত্মবোধক গানে দেশের নানা রূপ, সৌন্দর্য এবং জনতাকে উদ্দীপ্ত করার মত ভাব ও ভাষা উঠে এসেছে।
মানুষের মুক্তির গান তথা তার গণসংগীতগুলো মানুষকে বিশেষভাবে টানে। এইসব গণসংগীত থেকে একটি এখানে দেয়া হলো। এটি একটি মিশ্র সুরের গান। স্থায়ী ছাড়া প্রথম প্যারাটা অন্তরা হিসাবে সুরারোপিত। দ্বিতীয় প্যারাটা অনেকটা সঞ্চারী হিসাবে সুরারোপিত হলেও শেষের দিকে গিয়ে আবার স্থায়ীতে ফিরে এসেছে।গানটি গণসংগীতের সুরের ঢং এ সুরারোপিত।রেকর্ড করা গানটির সুরে আামারও কিছু ভূমিকা ছিল।

স্থায়ীঃ
এখনো মানুষ মরে পথের পরে
এখনো আসেনি সুখ ঘরে ঘরে
কি করে তাহলে তুমি নেবে বিশ্রাম
কি করে তাহলে ছেড়ে দেবে সংগ্রাম

প্রথম অন্তরাঃ
এখনো আহত হয় শ্বেত কবুতর
এখনো চতুর দিকে শুধু হাহাকার
কি করে তাহলে তুমি নেবে বিশ্রাম
কি করে তাহলে ছেড়ে দেবে সংগ্রাম

সঞ্চারীঃ
শান্তির সন্ধানে মানুষের মিছিল ঐ
শান্তির সন্ধানে ঘুরে ঘুরে
মরীচিকার ঐ ঝলসানো রূপ দেখে
সেদিকে চলে গেল অগোচরে
কেউ বুঝি আজ ফের আবার
কেউ বুঝে নেই আজ পিছু ডাক বার
কি করে তাহলে তুমি নেবে বিশ্রাম
কি করে তাহলে তুমি ছেড়ে দেবে সংগ্রাম।

গানটির কথা সাদামাটা হলেও মনে দাগ কাটে। গানটি শুনলেই দুঃখী মানুষের জন্য শ্রোতার মন তৎক্ষণাৎ কিছুটা অনুভব করে। ” এখনো আহত হয় “শ্বেত কবুতর “–এখানে শান্তির প্রতীক হিসেবে কবুতর এসেছে। পৃথিবীটা এখনো কিছু অনিষ্ট লোকদের দ্বারা অশান্ত হচ্ছে এবং শান্তির সন্ধানে মানুষ বিভিন্ন মেকি পথে চললেও প্রকৃত শান্তির দিকে ফেরার জন্য কবি রাহবারকে আহ্বান করছেন। তার বিভিন্ন গণসংগীতে মানুষের অধিকার আদায়ের বক্তব্য চমৎকার ভাবে উঠে এসেছে।
তার দেহতত্ত্ব বিষয়ক গানগুলো মানুষকে ভাবায়। সহজ কিন্তু চমৎকার সুরে তার দেহ তত্ত্বের একটি গান হচ্ছেঃ
টিক,টিক,টিক, যে ঘড়িটা বাজে ঠিক ঠিক বাজে
কেউ কি জানে সেই ঘড়িটা লাগবে কদিন কাজে।
ঝকঝক ফক ফক করে যদ্দিন ঘড়ির চেহারা
তদ্দিন তারে কিনতে চায় যে খরিদ্দারেরা
সময় মত সময় দিলে সবখানে বিরাজে
কেউ কি জানে সেই ঘড়িটা লাগবে কদিন কাজে।

চকচক টক টক জীবনঘড়ি করে যত দিন
দাম থাকে তার সবার কাছে বন্ধু ততদিন
মনের মাধুরী সাজাই না না সাজে
কেউ কি জানে সেই ঘড়িটা লাগবে কদিন কাজে।
হায় হায় হায় আসল ঘড়ির অর্থ বুঝলাম না
সময় থাকতে সময়ের মূল অর্থ খুঁজলাম না
খাইলাম, দাইলাম, ঘুরলাম শুধু এই দুনিয়ার মাঝে
কেউ কি জানে সেই ঘড়িটা লাগবে কদিন কাজে।

যায় যায় (৪) দিন চলে যায় কোরআন পড়লাম না
কত নোবেল নাটক পড়লাম হাদিস ধরলাম না
সত্যিকারের খাঁটি মোমেন মুসলিম হলাম না যে
কেউ কি জানে সেই ঘড়িটা লাগবে কদিন কাজে।
এই অঞ্চলে দেহতত্ত্ব বিষয়ক গান সুদূর অতীত থেকে বানানো ও গাওয়া হলেও এই প্রকৃতির গান কে জনপ্রিয় করেছিলেন ফকির লালন শাহ। এরপর হাসন রাজা, পাগলা কানাই , নিধু বাবু, রমেশ শীল, ফিরোজ সাঁই, শাহ আব্দুল করিম সহ অনেকে দেহতত্ত্ব নিয়ে গান বানিয়েছেন এবং গানগুলো সমাদৃত হয়েছে। এ প্রকৃতির গানে শিল্পীরা দেহকে কখনো ঘড়ির সাথে, কখনো গাড়ির সাথে তুলনা করে গান বানিয়েছেন। এর পূর্বে ফিরোজ সাঁই সহ অনেকে মানব দেহকে ঘড়ির সাথে তুলনা করে গান করেছেন। এই গানটির টিক টিক শব্দটি নিঃশ্বাসের প্রতীক অর্থাৎ দমের প্রতীক। এই দম যতক্ষণ আছে ততক্ষণই মানুষ এখানে মূল্যায়িত হয় এবং এই টিক টিক কোন মুহূর্তে বন্ধ হবে সেটা কেউ জানে না। তাই শিল্পী সময় থাকতে সত্যিকারের মানুষ হওয়ার জন্য এখানে তাগাদা দিয়েছেন।
গীতিকবিদের আরেকটি বৈশিষ্ট্য–কোন একটা বিষয় চোখে পড়লে, মনে দাগ কাটলে সেটাকে নিয়ে সাথে সাথে অন্তমিল সমৃদ্ধ ছন্দে গীতিকবিতা রচনা করে ফেলেন যা আমরা দেখেছি লালন শাহ, হাসন রাজা, পাগলা কানাই, রমেশ শীল,শাহ আব্দুল করিম সহ অনেকের ক্ষেত্রে। মতিউর রহমান মল্লিকও এ থেকে আলাদা ছিলেন না। চট্টগ্রামে সাগরের তীরে বেড়াতে গিয়ে ওপারের পাহাড় দেখে কবির মনে হচ্ছিল পাহাড় ঘেঁষে সাগরের পানি প্রবাহিত হচ্ছে। এই চিত্র দেখে তখনই তিনি লেখা শুরু করলেন আর ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই তৈরি হয়ে গেল নিচের গীতি কবিতাটিঃ
পাহাড়ের পাশ দিয়ে চলে গেছে জলধারা
আমি তার জানি না কোন ঠিকানা
মনে হয় হয় তোবা নিসে গেছে অবশেষে
যেখানে নীল নীলিমার ঠিকানা
পাখিদের কলতানে ভরে গেছে মন
ভরে গেছে গানে গানে স্বপ্ন লবণ
হৃদয়টা ডানা মেলে হারিয়েছে অজানাই
আমি তার জানিনা কোন ঠিকানা
ঐ ধারে সাগর সে হাতছানি দিয়ে ডাকে অবিরাম
এই ধারে জনপদ যন্ত্রণা শুধু মরে অবিরাম
সবুজের আবাহনে আমি যেন আজ
ভুলে গেছি সবকিছু ভুলে গেছি কাজ
হৃদয়ের চাওয়া পাওয়া একাকার আজ
যেন বেদনার পরিচয় না না জানিনা।
পরদিন এই গীতিকবিতাতেই কবির উপস্থিতিতে সুরারোপ করা হয়। কবি মুখটা শুরু করেন। আমি বাকি অংশ সুরারোপ করি। কবি সহযোগিতা করেন। এ গানটিও কাহারবা তালের। এটি প্রকৃতিকে নিয়ে লেখা একটি রোমান্টিক গান যেখানে কবি প্রকৃতির মাঝে হারিয়ে যেতে চেয়েছেন।
এছাড়াও তিনি প্রকৃতি, প্রেম, সমাজের নানা অসঙ্গতি নিয়েও প্রচুর গান লিখেছেন। তার আধুনিক কবিতার কয়েকটি বই প্রকাশ ছাড়াও শুধু গীতিকবিতা বা তার গান নিয়ে বই প্রকাশিত হয়েছে পাঁচটি। তার অনেক গীতিকবিতাই ছন্দবদ্ধ আধুনিক কবিতা।
এই কবি সম্পর্কে দুই বাংলার জনপ্রিয় কবি আল মাহমুদ বলেছেন” সুস্হ সংস্কৃতি চর্চা ও দেশীয় সংস্কৃতি চেতনা এই প্রজন্মের কাছে উদ্বুদ্ধকরণে তিনি দারুন এক নাড়া দিয়েছেন।”
বাংলাদেশ সাহিত্য পর্ষদ কর্তৃক কবি ও সমালোচক আবদুল মান্নান সৈয়দও কবি মতিউর রহমান মল্লিককে এক অনুষ্ঠানে সংবর্ধনা ও সন্মাননা দেয়া হয়। ঐ অনুষ্ঠানে আবদুল মান্নান সৈয়দ বলেছিলেন ” আমি সংবর্ধিত বা পুরস্কার পাওয়ার চেয়েও খুশীর সংবাদ হচ্ছে- আমার ছাত্র কবি মতিউ রহমান মল্লিক মূল্যায়িত হচ্ছে।তার মধ্যে মৌলিকত্ব আছে।”
তবে তার নানা বিষয়ে অসংখ্য চমৎকার গান থাকা সত্ত্বেও গানগুলো সীমিত জনপদে সীমাবদ্ধ। এগুলোকে বিশেষ করে হামদ, নাত, দেশের গান, গণসংগীত, দেহতত্ত্ব সমৃদ্ধ গানগুলো সাধারণ জনপথে ছড়িয়ে দিতে প্রয়োজন প্রতিষ্ঠিত শিল্পীদের দিয়ে কিংবা নবীন কিন্তু চমৎকার সুরেলা কন্ঠের অধিকারীদের দিয়ে গানগুলোর অডিও, ভিডিও ক্যাসেট করা এবং বিভিন্ন ইলেকট্রনিক মিডিয়াতে প্রচারের ব্যবস্থা করা। তার জন্ম-মৃত্যু দিবসে বিভিন্ন মিডিয়াতে টকশো, লাইভ শো এর ব্যবস্থা করা যেখানে তার জীবনের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে আলোচনার ফাঁকে ফাঁকে ইতিমধ্যে গ্রহণযোগ্যতা পাওয়া তার কিছু গান স্বীকৃত শিল্পীদের দিয়ে গাওয়া বা পূর্বে এসব গানের চিত্রায়ন করে ক্লিপ দেখানো। “মল্লিকসংগীত মেলা”রও আয়োজন করা যেতে পারে যেখানে তার গানের বই, সিডি,গু রুত্বপূর্ণ বিভিন্ন ছবি, তার বিভিন্ন বাণী, আলোচনা, গানের আসর, স্মৃতিচারণ থাকতে পারে। আমার জানামতে কবি কাজী নজরুল ইসলামের পর স্রষ্টা, সৃষ্টি, দেশ, জনতা, মানবতা এবং ইসলামী ভাবধারার উপর বাংলাদেশের হাতেগোনা যে কজন গীতিকবি সবচেয়ে বেশি গান রচনা করেছেন তাদের মধ্যে কবি মতিউর রহমান মল্লিক অগ্রগামী। তার জীবদ্দশায় খুব একটা মূল্যায়ন না হলেও মানুষের প্রয়োজনে এই প্রজন্মের কাছে তাকে যথাযথভাবে তুলে ধরা উচিত।

*চৌধুরী আবদুল হালিম
অধ্যক্ষ, চট্টগ্রাম বন্দর কলেজ