আহমদ বাসির
২৫ নভেম্বর, ২০১৯ | ২০:০২

মতিউর রহমান মল্লিক সমুজ্জ্বল স্মৃতির একাংশ

tesst

তাঁর সঙ্গে আমার সরাসরি পরিচয় ১৯৯৮ সালে। আমি তখন মিরপুর এক নম্বর সেকশনের কলওয়ালাপাড়া এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা জনাব লোকমান হোসেনের সঙ্গে স্থানীয় কয়েকজন উৎসাহী ব্যক্তির সহযোগিতায় একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন গড়ে তোলা নিয়ে ব্যস্ত। অগ্নিবীণা সাহিত্য-সংস্কৃতি সংসদ। এই সংগঠনের অনেক কাজ। বিভিন্ন জাতীয় দিবসে শিশুÑকিশোরদের নিয়ে সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার আয়োজন, পুরস্কার বিতরণ, আলোচনা, নাটক তৈরি, বিহার্সাল ইত্যাদির পাশাপাশি পত্রিকা প্রকাশ। সংগঠনটি ১৯৯৮-৯৯ দুই বছর টানা গতিশীল ছিলো। সংগঠনের উদ্যোগে প্রকাশিত সাহিত্য পত্রিকার নাম ছিলো ‘অগ্নিবাণী’। পত্রিকাটির নাম দিয়েছিলেন কবি রেদওয়ানুল হক। এই সংগঠনের পিছনে অধ্যাপক মুহম্মদ মতিউর রহমানের অনুপ্রেরণাও স্মরণযোগ্য। ১৯৯৮ সালের ফ্রেব্রুয়ারি মাসে সংগঠনটির উদ্যোগে স্থানীয় বধুয়া কমিউনিটি সেন্টারে একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে কাকে প্রধান অতিথি করা যায়, এ নিয়ে আমরা বেশ চিন্তায় পড়ে যাই। তখন ওই লোকমান ভাই-ই বললেন, ‘চলেন আমরা মল্লিক ভাইয়ের কাছে যাই। উনার কাছে গেলে উনিই প্রধান অতিথির ব্যবস্থা করে দিবেন।’ মল্লিক ভাইয়ের নাম শুনে আমি বেশ উৎসাহী হয়ে উঠলাম, ‘কোথায় পাবো উনাকে?’ ‘এইতো মোহাম্মদপুর প্রত্যাশা প্রাঙ্গণে বসেন তিনি। চলেন আমরা আজকেই উনার কাছে যাই।’ সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে গেলাম। চলে গেলাম ৫/৫ গজনভী রোডের নিচতলায় প্রত্যাশা প্রাঙ্গণে। দেখা হলো কবি মতিউর রহমান মল্লিকের সঙ্গে। তিনি কাগজে কলমে ব্যস্ত ছিলেন। আমরা সরাসরি ঢুকে পড়লাম তাঁর কক্ষে। কাগজের ওপর কলম ঘুরাতে ঘুরাতেই তিনি আমাদের সঙ্গে কথা বলছিলেন। আমরা একজন ভাষাসৈনিক, জাতীয় ব্যক্তিত্বকে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি করতে চাই। শুনে তিনি বললেন, ‘আজ তো একটু ব্যস্ত আছি। ভাষা আন্দোলনের মাসে ভাষাসৈনিকরাও ব্যস্ত থাকেন। কথা বলে একজনকে ঠিক করতে হবে। আপনারা আগামীকাল আসেন।’

পরের দিন আমি একাই গেলাম। অফিসেই পেলাম তাঁকে। বসতে বললেন। ছোট ছোট প্রশ্ন করে আমার সম্পর্কে, এই সংগঠন সম্পর্কে জানলেন। তারপর আমার কাছে জানতে চাইলেন কাকে প্রধান অতিথি করা যায়। আমি অধ্যাপক শাহেদ আলীর নাম বললাম। তিনি জানালেন, শাহেদ আলী অসুস্থ অবস্থায় আছেন, অনুষ্ঠানাদিতে যেতে পারেন না। এরপর কিছুক্ষণ চিন্তা করে উনি বললেন, ‘তোমরা ড. কাজী দীন মুহম্মদকে প্রধান অতিথি করতে পারো।’ আমি বললাম, ‘স্যারকে পেলে তো কথাই নাই।’ মল্লিক ভাই বললেন, ‘স্যারকে ফোন দিতে ভয় পাচ্ছি। এতো বড় পান্ডিত মানুষ…। তার চেয়ে আমি একটা চিঠি লিখে দিচ্ছি। তুমি বরং চিঠিটা নিয়ে স্যারের কাছে সরাসরি চলে যাও।’ আমাকে কলাবাগানের ঠিকানা বুঝিয়ে দিতে দিতে উনি কাগজ-কলম টেনে নিলেন। আমি কাগজ কলমের দিকে তাকিয়ে থাকলাম, কী লেখেন ভাই দেখার জন্য। উনি লিখলেন, ‘পরম শ্রদ্ধেয় স্যার…’। কলম থেমে গেছে। হঠাৎই মল্লিক ভাই বলে উঠলেন, ‘ওরে আমার আল্লারে, আমার কলম কাঁপছে, কী লিখব? কোথায় যেনো আবার ভুল হয়ে যায়।’ মল্লিক ভাইয়ের কথার ভঙ্গিতে আমি হেসে ফেললাম। উনি আমার দিকে একবার তাকিয়ে এবার লিখতে শুরু করলেন। তিন বাক্যে পুরো চিঠি শেষ। নিচে আরবি ও বাংলায় স্বাক্ষর। চিঠিটা হাতে নিয়ে আমি যখন বিদায়ের জন্য দাঁড়িয়েছি তখনই তিনি বললেন, ‘আবার এসো, বেড়াতে এসো’। আমি আগে থেকেই মল্লিক ভাইয়ের অনুরাগী, এবার অভিভূত হয়ে ফিরলাম।

কবি মতিউর রহমান মল্লিকের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত সম্পর্কের এই হলো সূচনা। তারপর দীর্ঘ একযুগ একটানা তাঁর সান্নিধ্য পেয়েছিলাম। এই একযুগ ছিলো আমার জীবনের সোনালি যুগ। কতো স্মৃতি, কতো কথা; লিখতে গেলেও একযুগ পার হয়ে যাবে।

কবি যখন দেখলেন আমি শুধু সাংস্কৃতিক সংগঠনের গান, আবৃত্তি, অভিনয় নিয়েই ব্যস্ত নই, সঙ্গে লেখালেখি করছি, পত্রিকাও প্রকাশ করছি; তখনই তিনি আমার সঙ্গে আরও বেশি অন্তরঙ্গ হতে থাকলেন। আর আমিও অভিভূত হতে থাকলাম, মুগ্ধ হতে থাকলাম তাঁর প্রতি ক্রমাগত।

ওই সময় আমি আশির দশকের বিশ্বাসীধারার কবিদের বই সংগ্রহ করছিলাম। দুঃখের বিষয় যে, কোথাও মল্লিক ভাইয়ের কোনো বই পাওয়া যাচ্ছিলো না। অনেক খোঁজাখুঁজির পর হাতে পেলাম ‘ঝংকার’। জানতে পারলাম মল্লিক ভাইয়ের আরও তিনটি মৌলিক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। ১৯৮৭ সালে বেরিয়েছে তাঁর প্রথম কবিতার বই ‘আবর্তিত তৃণলতা’ এবং গীতিকবিতার বই ‘যতো গান গেয়েছি’। কোনো পুনর্মুদ্রণ না হওয়ায় দীর্ঘ এক যুগ পর বই দুটির একটিও বাজারে পাওয়া গেলো না। খুঁজলাম ১৯৯৬ সালে প্রকাশিত ‘নির্বাচিত প্রবন্ধ’। অনেক খোঁজখুঁজির পর এই বইটি পাওয়া গেলো কাঁটাবনে। আমার অন্তরের গভীরে তখন একটাই প্রশ্ন বারবার ঘুরপাক খাচ্ছিল, আশির অন্যান্য কবিদের মতো মল্লিক ভাইয়ের বই কেনো প্রকাশিত হয় না। পত্র-পত্রিকায় তাঁর অনেক কবিতা পড়ে মুগ্ধ হয়ে যাই, কিন্তু তাঁর বই নাই। কেনো?

এরই মধ্যে মল্লিক ভাইয়ের আহ্বানে আমি বিপরীত উচ্চারণের সাহিত্য সভায় যেতে শুরু করি। অবশ্য এই সাহিত্য সভার দাওয়াত প্রথম পাই কবি আফসার নিজাম ও কথাশিল্পী মাহমুদ বিন হাফিজের মাধ্যমে। প্রত্যাশা প্রঙ্গণেই তখন বিপরীত উচ্চারণের সাপ্তাহিক সাহিত্য সভা অনুষ্ঠিত হতো। এই সভা আমাকে এমনভাবে আকৃষ্ট করে যে, বহু বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে আমি এতে হাজির হয়ে যেতাম। শুধু সাহিত্য সভাই নয় বিপরীত উচ্চারণের অন্যান্য কর্মকান্ডেও আমি ব্যাপক উৎসাহের সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে ফেললাম। আমার এই স্বতঃস্ফুর্ত সক্রিয়তা তৎকালিন পরিচালক কবি ও অনুবাদক নাঈম মাহমুদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। কিছুদিনের মধ্যেই আমাকে সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব দেয়া হয়। আমি পুরোই মেতে উঠি বিপরীত উচ্চারণ নিয়ে। স্বাভাবিকভাবেই অগ্নিবীণার কর্মকান্ডে ভাটা পড়তে থাকে।

বিপরীত উচ্চারণের মূল কাজই হচ্ছে সৃজনশীল সাহিত্যের চর্চা। ফলে অন্যান্য সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের চাইতে সাহিত্য চর্চাকেই আমি সবচেয়ে জরুরি কাজ হিসেবে ঠিক করে নিলাম। আমার মাথায় তখন মল্লিক ভাইয়ের বই নিয়ে ওই একই প্রশ্ন আরও বেশি করে ঘুরপাক খেতে থাকলো। বিপরীত উচ্চারণে দায়িত্ব পাওয়ার পর আমি পুরোপুরিই মল্লিক ভাইয়ের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ি। এর কারণ শুধু এই ছিলো না যে, বিপরীত উচ্চারণের সাহিত্য সভা প্রত্যাশা প্রাঙ্গণে অর্থাৎ মল্লিক ভাইয়ের অফিসেই হয়ে থাকে; বরং মল্লিক ভাই ছিলেন এই সংগঠনের আজীবন তত্ত্বাবধায়ক এবং এই কাজটি তিনি যথাযোগ্য ভাবেই করতেন। বলতে গেলে, এই সংগঠনটির তিনিই প্রধান প্রতিষ্ঠাতা এবং এর পরিচালকও ছিলেন তিনি ছাত্রজীবনে। সেই সময় প্রকাশিত ‘বিপরীত উচ্চারণ’-এর সম্পাদকও ছিলেন তিনি।

এক পর্যায়ে আমি আমার মাথায় ঘুরপাক খাওয়া প্রশ্নটি চতুর্দিকে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলাম। বিপরীত উচ্চারণের নাঈম মাহমুদ, নিয়াজ শাহিদী, খালিদ সাইফ, মৃধা আলাউদ্দিন ছাড়াও আশির দশকের বেশ ক’জন কবির সঙ্গে কথা বললাম। কারো করো কাছে প্রশ্নটি বেশ গুরুত্ব পেলো, কিন্তু কারণটা কেউই ঠিক মতো বলতে পারলো না। এক পর্যায়ে আমি নিজেই মল্লিক ভাইয়ের সঙ্গে কথা বললাম। তিনি বললেন, ‘আমার বই কে প্রকাশ করবে? উপযুক্ত প্রকাশক পাই না বলেই বই বের হয় না।’ আমি জানার চেষ্টা করলাম উনার কাছে প্রস্তুত করা কোনো পান্ডুলিপি আছে কিনা। জানলাম সে রকম প্রস্তুত করা কোনো পান্ডুলিপি নেই। তিনি জানালেন, ‘খোন্দকার আবদুল মোমেন সম্পাদিত ত্রৈমাসিক ‘প্রেক্ষণ’ পত্রিকায় তাঁর কিছু কবিতা নিয়ে যে ক্রোড়পত্রটি বের হয়েছে, এই ক্রোড়পত্রের কবিতাগুলো বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা থেকে সংগ্রহ করে দিয়েছেন কথাশিল্পী রফিক মুহম্মদ।’ বললেন, ‘রফিক মুহাম্মদকে প্রতিটি লেখা সংগ্রহ করে দেওয়ার জন্য আমি মাত্র পাঁচ টাকা করে পারিশ্রমিক দিয়েছি, তবুও অনেক ধৈর্য্য ধরে, পরিশ্রম করে কবিতাগুলো সে উদ্ধার করে দিয়েছে।’ মল্লিক ভাইয়ের প্রাত্যহিক জীবনটা আমার ততোদিনে চিরচেনা হয়ে গেছে। মল্লিক ভাইয়ের মতো কবি পান্ডুলিপি নিয়ে কোনো প্রকাশকের কাছে যেতে পারেন না, কারণ পান্ডুলিপি তৈরি করার মতো সময় তাঁর হাতে নেই। লেখার তাড়া আছে তাই লেখেন। কবি বলেই কবিতা বের হয়ে আসে। পত্র-পত্রিকা-স্মারক-সংকলন-বার্ষিকীতে তার লেখা লাগবে, তিনি লিখছেন। শিল্পীদের জন্য গান লাগবে, তিনি লিখছেন। দুঃখ পাচ্ছেন, লিখছেন। আনন্দ পাচ্ছেন, লিখছেন। প্রেরণা পাচ্ছেন, লিখছেন। অবহেলা পাচ্ছেন, লিখছেন। স্বপ্ন দেখছেন, লিখছেন। আল্লাহর প্রশংসায় লিখছেন। রাসূলের ভালবাসায় লিখছেন। ঈমানের দাবিতে লিখছেন…। বই প্রকাশের তাড়া নাই, বইয়ের চাহিদা নাই, সে কারণে সে ব্যাপারে মাথা ঘামোনোর মতো সময়ও তাঁর হাতে নাই।

এদিকে মল্লিক ভাইয়ের বই নিয়ে নানাজনের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে ধরা পড়লো আরেকটা ব্যাপার। আমি অবাক হয়ে গেলাম যে, কেউ কেউ মল্লিক ভাইকে কবি হিসেবে স্বীকার করতেই রাজি নন। তারা বলেন, উনি উঁচু মাপের একজন গীতিকার। এই ধরনের মনোভাব পোষণ করতেন আশি ও নব্বই দশকের কয়েকজন কবি। তাদের এই মনোভাব আমাকে বেশ আহত করেছে। বিশ্বাসীধারার বাইরে দু’একজন কবি-সাহিত্যিককেও বলতে শুনেছি, ‘তোমরা মতিউর রহমান মল্লিককে কবি কবি বলছো, কিন্তু তার তো কোনো কবিতার বই-ই নাই। অথচ আমরা একদল তরুণ কবি মল্লিক ভাইয়ের অজ¯্র কবিতার মুগ্ধ পাঠক এবং প্রায়ই আমরা কোনো কোনো অগ্রজকে পেয়ে যাই যারা মল্লিক ভাইয়ের এমন সব কবিতার কথা উল্লেখ করেন, যেগুলো পাঠ করার সুযোগ আমরা পাইনি।

এরই মধ্যে বিপরীত উচ্চারণ সাহিত্য-সংস্কৃতি সংসদের ব্যানারে ১৭ সেপ্টেম্বর ১৯৯৯ সালে আমরা আয়োজন করলাম কবি মতিউর রহমান মল্লিকের একক কবিতা পাঠের আসর। প্রবন্ধ লিখলাম আমি। আমার হাতে তখন ‘আবর্তিত তৃণলতা’র ফটোকপি আর প্রেক্ষণের ক্রোড়পত্র। এর ওপর ভিত্তি করেই দাঁড় করালাম আমার প্রবন্ধ। অনুষ্ঠান উপলক্ষে কবির কবিতার ইংরেজি অনুবাদ করলেন আলী আজগর ও আতিয়া ইসলাম, আরবি অনুবাদ করলেন ওমর আল ফারুক। প্রধান অতিথি ছিলেন কবি আল মাহমুদ। এই অনুষ্ঠানের সংবাদ আগে ও পরে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় ছাপা হয়। অনুষ্ঠানে আল মাহমুদ প্রদত্ত অভিভাষণটি আমি অনুলিখন করি। আল মাহমুদ ভাই নিজে পড়ে দু’একজায়গায় সম্পাদনা করে এটি ছাপতে দেন। সাজজাদ হোসাইন খান সম্পাদিত ত্রৈমাসিক ‘কলম’ পত্রিকায় আল মাহমুদের এই অসাধারণ অভিভাষণটি ছাপা হয়। এই অনুষ্ঠানের পর মল্লিক ভাইকে যারা কবি হিসেবে অস্বীকার করার চেষ্টা করছিলো তারা চুপসে যায়।

এই অনুষ্ঠানের আগেই আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, মল্লিক ভাইয়ের যাবতীয় লেখালেখি সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও প্রকাশের ব্যাপারে আমাদেরকেই উদ্যোগ নিতে হবে। কথা বললাম কবি নাঈম মাহমুদের সঙ্গে। তিনি উৎসাহ দিলেন। আমি, কবি আফসার নিজাম, কবি রেদওয়ানুল হক, কথাশিল্পী মাহমুদ বিন হাফিজ নেমে পড়লাম মল্লিক ভাইয়ের লেখা সংগ্রহে। মাহমুদ বেশি সময় না দিলেও মাঝে মাঝে সহযোগিতা করতো, রেদওয়ান প্রায়ই, আর নিজাম বলতে গেলে সার্বক্ষণিক। অনুষ্ঠানের পর নতুন উদ্যমে মাস ছয়েকের মধ্যে ৪/৫টা পান্ডুলিপির মাল-মসলা জোগাড় করে ফেললাম আমরা।

কবিতার পান্ডুলিপি যখন প্রস্তুত হয়ে যায়, তখন পড়ে যাই আরেক বিপদে। এমন কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে বই বের করতে মল্লিক ভাই সম্মত নন, যে প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তিনি কোনো না কোনোভাবে যুক্ত আছেন। মল্লিক ভাইয়ের বই প্রকাশ করতে পারে এমন সব সম্ভাব্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেই তিনি যুক্ত ছিলেন। এমনকি বিপরীত উচ্চারণ থেকেও বই প্রকাশে তিনি সম্মত নন, যেহেতু এই সংগঠনের তত্ত্বাবধায়ক তিনি। আমরা একজন প্রকাশকের নাম বললে, অজ্ঞাত কারণে তিনি ‘না’ বলে দিলেন। এমতাবস্থায় বেশকিছু দিন গেলো সিদ্ধান্তহীনতায়।

মল্লিক ভাইয়ের বই প্রকাশের ব্যাপারে আমরা ছিলাম বদ্ধপরিকর। বিপরীত তখন ছাত্রদের সংগঠন, ঢাকা মহনগরী উত্তরের পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত। আমি তখন ধর্ণা দিলাম সভাপতি আবু সাঈদ মুহম্মদ ফারুক ভাইয়ের কাছে। আমি তাঁকে পরামর্শ দিলাম যে, আপনি মল্লিক ভাইকে বলুন, ‘এটা আমাদের সংগঠনিক সিদ্ধান্ত, এটা আপনাকে মানতে হবে।’ ফারুক ভাই তা-ই বললেন। মল্লিক ভাই সহসাই অনুমতি দিলেন না, বরং একটি বিশেষ বৈঠক আহ্বান করলেন। বৈঠকের আয়োজন হলো প্রত্যাশা প্রাঙ্গণে। ফারুক ভাইসহ মহানগরী উত্তরের নেতৃবৃন্দ আসলেন। আমরা সবাই মিলে মল্লিক ভাইকে ধরলাম। মল্লিক ভাই রাজি হচ্ছেন না, আমরাও ছাড়ছি না। অবশেষে মল্লিক ভাই রাজি হলেন, তবে শর্ত সাপেক্ষে। শর্ত হচ্ছে বিপরীতের সঙ্গে যারা যুক্ত তাদের সবার একটা করে বই বের হতে হবে। যাদের বই বের করার মতো লেখা পত্র-পত্রিকায় ছাপা হয়েছে, তাদের সবার বই হতে হবে, তাহলেই মল্লিক ভাই বই বের করার অনুমোদন দিবেন। ফারুক ভাই বললেন,‘তাহলে তাই হোক। কার কার বই প্রকাশ করা যায় তালিকা করেন।’ ওই বৈঠকে বসেই আমরা বারোটি বইয়ের তালিকা করলাম এবং ফেব্রুয়ারি ২০০১-এ আসন্ন একুশে বইমেলায় বইগুলো প্রকাশ করা হবে বলে সিদ্ধান্ত নিলাম। এই সিদ্ধান্তের ফলে আমাদের পরিকল্পিত বারোটি বইয়ের মধ্যে তিনটি প্রকাশ করা সম্ভব হলো, যার একটি ছিলো মতিউর রহমান মল্লিকের দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘অনবরত বৃক্ষের গান’; অন্য দুটি ছিলো নাঈম মাহমুদের ‘রোদের বিজ্ঞাপন’ এবং সৈয়দ সাইফুল্লাহ শিহাবের ‘ঐশ্বর্যের ঘ্রাণ’। এই বই বের হওয়ার পর মল্লিক ভাইকে কবি হিসেবে অস্বীকার করার স্পর্ধা আর কেউ দেখায়নি।

একই সঙ্গে আমরা মল্লিক ভাইয়ের একটা গানের বই এবং ছড়ার বইও প্রকাশ করার চেষ্টা করলাম। নতুন সংগৃহীত গানগুলো মরহুম কবি গোলাম মোহম্মদের শিল্পকোণে কম্পোজ করা হলো, প্রুফ দেখা হলো। মল্লিক ভাই একদিন আমাকে ডেকে বললেন, ‘কবি আবদুল হাই শিকদার ভাই একটা পান্ডুলিপি চাচ্ছে। তোমাদের কাছে কী আছে না আছে আমি তো জানি না।’ আমি জানতে চাইলাম, ‘শিকদার ভাই কী করবেন পান্ডুলিপি নিয়ে।’ মল্লিক ভাই জানালেন, ‘বাংলাবাজারের এক প্রকাশককে দিয়ে ছাপাবেন শিকদার ভাই। উনি খুব আগ্রহ করে চাচ্ছেন। বলছেন যে, আমার এতোগুলো বই বের হচ্ছে আর আপনার কোনো বই বের হবে না, এটা হতে পারে না। আপনি অবশ্যই আমাকে একটা পান্ডুলিপি দিবেন এবং আমার প্রকাশক সেটা ভালোভাবেই প্রকাশ করবে। আমি শিকদার ভাইকে তোমাদের কথা বলে দিয়েছি, আমার কাছে তো কোনো পান্ডুলিপি নেই। বাসির, নিজাম ওরা লেখা সংগ্রহ করছে।’ আমি খুব খুশি হয়ে মল্লিক ভাইকে বললাম, ‘কবিতার বইটা তো বিপরীত করছে, গানের বইটাও প্রায় রেডি। এখন ছড়া কবিতার একটা পান্ডুলিপি আমরা শিকদার ভাইকে দিতে পারি।’ মল্লিক ভাই সানন্দে রাজি হয়ে গেলেন। যথারীতি ‘রঙিন মেঘের পালকি’ গ্রন্থটির পান্ডুলিপি প্রস্তুত হয়ে গেলো। নামকরণ নিয়ে জটিলতা দেখা দিলো। বইয়ের জন্য একটা উপযুক্ত নাম খুঁজছিলেন মল্লিক ভাই। কয়েকটা নাম ঠিক করলেও পছন্দ হচ্ছিলো না মল্লিক ভাইয়ের। আমি আর আফসার নিজাম তখন উনার সামনে বসে আছি। পান্ডুলিপির পাতা উল্টাতে উল্টাতে নিজামই হঠাৎ বলে উঠলো ‘রঙিন মেঘের পালকি’। সঙ্গে সঙ্গে আমার ভালো লাগলো, মল্লিক ভাইও লুফে নিলেন নামটি। পান্ডুলিপির অন্তর্গত একটি ছড়া-গানের ভিতরে লুকিয়ে ছিলো এই নামটি।

নাম চূড়ান্ত হবার পর মল্লিক ভাইকে বললাম,‘কমপক্ষে আরও দু’টি ছড়া কবিতা দরকার এই বইয়ের জন্য। যদিও বইয়ে দেয়ার মতো যথেষ্ট লেখা আমাদের হাতে ছিলো, তবুও একটু কৌশল করলাম মল্লিক ভাইকে দিয়ে নতুন কিছু লেখানোর পরিকল্পনা থেকে। যদি বইটিকে কেন্দ্র করে দু’টি নতুন লেখা বের হয়ে আসে সেই আশায়। যথারীতি মল্লিক ভাইও দু’টি নতুন লেখা তৈরি করে দিলেন। এর একটি ছিলো ‘ফুলের মতো’ অন্যটি ছিলো ‘লড়াই’। মল্লিক ভাইয়ের ইচ্ছে ছিলো বইটি কবি আবদুল হাই শিকদার, কবি আহমদ বাসির ও কবি আফসার নিজামকে উৎসর্গ করার। সেই মোতাবেক তিনি উৎসর্গপত্র লিখে দিলেন একটি প্রুফ কপিতে। এটা দেখে আপত্তি জানালেন শিকদার ভাই। মল্লিক ভাই একদিন জানালেন, শিকদার ভাই উৎসর্গপত্রটি পছন্দ করেননি। তিনি অনুমান করে বললেন, ‘তোমরা তো এখনও সাহিতাঙ্গণে সেভাবে পরিচিত হয়ে ওঠোনি, শিকদার ভাই হয়তো অপরিচিত দু’টি মুখের সঙ্গে থাকতে চাচ্ছেন না।’ আমরা বললাম, ‘আমাদের নাম বাদ দিয়ে দেন, এটা শুধু শিকদার ভাইকে উৎসর্গ করেন।’ মল্লিক ভাই এ ব্যাপারে আর কিছু বললেন না। পরের দিন দেখলাম উৎসর্গপত্র পুরোটাই পরিবর্তন হয়ে গেছে। শিকদার ভাইয়ের নামও নাই। উৎসর্গপত্রে একটি অসাধারণ ছড়া-কবিতা। মল্লিক ভাই তাঁর আত্মীয়-স্বাজন ও বন্ধু-বান্ধবের ছেলে-মেয়েদের নিয়ে একটি অপূর্ব ছড়া-কবিতা বানিয়ে ফেলেছেন। পড়ে শোনালেন আমাদের। আমরা মুগ্ধ হয়ে গেলাম। বললেন, ‘শিকদার ভাইকে অন্য কোনো বই উৎসর্গ করবো। এবার থাক।’

যথারীতি দীর্ঘদিন পর একুশে বইমেলা ২০০১-এ একসঙ্গে প্রকাশিত হলো মল্লিক ভাইয়ের দু’টি বইÑ ‘অনবরত বৃক্ষের গান’ ও ‘রঙেন মেঘের পালকি’। এই বই দু’টি নিয়ে আমাদের উৎসাহের অন্ত ছিলো না। বই দু’টির লেখা সংগ্রহ ও প্রকাশের আরও অনেক স্মৃতি এখনও জ্বলজ্বল করছে। সেগুলো উঠে আসবে অন্য কোনো লেখায় ইনশাআল্লাহ। আজ শুধু এটুকুই বলি যে, এই বই দু’টি মল্লিক ভাইকে আবারও সৃজনশীল সাহিত্যের জগতে আলোচ্য করে তোলে।

‘রঙিন মেঘের পালকি’র তো প্রকাশক পাওয়া গেলো, কিন্তু ‘অনবরত বৃক্ষের গান’ আমাদের হাত দিয়েই বের হলো। ‘রঙিন মেঘের পালকি’র আগেই ছাপা হয়ে গেলো অনবরত বৃক্ষের গান’। বইটির নাম দেখে অনেকেই ভাবলো এটা গানের বই। উল্টানোর পর দেখলো এতে কোনো গান নাই, সব কবিতা। যে দিন বইটির কপি হাতে পেলাম, আমাদের সেদিনের আনন্দটা ভাষায় প্রকাশ করা একটু কঠিনই বটে। মল্লিক ভাইয়ের লেখা সংগ্রহ, এই বই প্রকাশ, গানের বই এবং বিপরীত উচ্চারণের ‘দ্রষ্টা’ প্রকাশ করতে গিয়ে দিনের পর দিন কেটেছে আমাদের সবজি আর তন্দুর রুটি খেয়ে। একপ্লেট সবজিতে দুইতিন জনে খেতাম দুই তিনটা রুটি। বইটি যেদিন হাতে পেলাম সেদিনও দুপুর কেটেছে সবজি-রুটিতে কোনো মতো। সন্ধ্যার পর বইয়ের কপিটি যখন হাতে পাই তখন আমাদের হাতে মিরপর পৌঁছানোর মতো গাড়ি ভাড়া ছিলো মাত্র। তারপরও সিদ্ধান্ত নিলাম, বইটি মল্লিক ভাইকে আজই পৌঁছাবো দরকার হলে হেঁটে হেঁটে যাবো মুহম্মদপুর, শেখের টেক। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী হেঁটেই রওয়ানা করলাম আমরা।

মগবাজার ওয়ারলেস রেলগেট থেকে হাঁটা শুরু করলাম। সম্ভবত আমরা চারজনইÑ আমি, আফসার নিজাম, রেদওয়ানুল হক, মাহমুদ বিন হাফিজ অথবা আজাদ ওবায়দুল্লাহ। মগবাজার রেলক্রস পার হয়ে এফডিসির মোড়ে এসে দেখলাম কদমা বিক্রি হচ্ছে। ভাবলাম বইয়ের সঙ্গে একটু মিষ্টি কিছু নিয়ে গেলে ভালোই হয়। অল্প ক’টাকা খরচ করে সামান্য কিছু কদমা কিনলাম এবং হেঁটে হেঁটেই মল্লিক ভাইয়ের শেখের টেকের বাসায় গিয়ে হাজির হলাম। কবির হাতে তুলে দিলাম,‘অনবরত বৃক্ষের গান’, সঙ্গে আমাদের নিয়ে যাওয় কদমা। মল্লিক ভাই বইটি উল্টে-পাল্টে বারবার দেখলেন। বললেন ‘তোমাদের কাজ না? সুন্দর তো হতেই হবে।’ মল্লিক ভাইয়ের স্বীকৃতি পেয়ে আমাদের আনন্দের মাত্রা যখন আরও বেড়ে গেলো ঠিক তখনই বিপত্তি বাঁধালো আমাদের নিয়ে যাওয়া কদমা। কদমায় কামড় দিয়েই মল্লিক ভাই চিৎকার করে উঠলেন, ‘ওরে আল্লারে, আমার দাঁত তো সব ভেঙ্গে যাবে রে।’ ততোক্ষণে আমরাও ওই কদমায় কামড় দিয়ে টের পেয়ে গেছি আসল ব্যাপার। কদমা যে পাথরের মতো শক্ত হতে পারে এটা আমাদের কারো ধারণার মধ্যেই ছিলো না।

পূর্বের সংবাদ

«

পরের সংবাদ

»