রাজু ইসলাম
২৫ নভেম্বর, ২০১৯ | ২০:০৮

রাজু ইসলাম’র কবিতা

tesst

এইসব হেমন্তমাখা দিন রাতে

চোখ বুজে থাকি নিয়ন আলোয়
হিম হিম হেমন্তমাখা রাতে
দরজার ফাক গলে উঁকি দেয়
রাতের তারা, বিমর্ষ স্মৃতিরা
আমি নিজেকে মেলে ধরি
নিগুঁঢ় অন্ধকারের মিহি আভায়
শিয়রে রাতভর জেগে কাটায়
গন্ধভর্তি কয়েলের ধূঁয়া,
আর উঠোনে অযত্নে বেড়েওঠা
তুলসি পত্রের চিকন ঘ্রাণ।
ঘরে ঘরে খুঁজে ফেরে ওরা
ক্ষণে ক্ষণে কেশে ওঠা সদ্য বধূ
অথবা সর্দিঝরা কোলের শিশু।
অজানা স্বপ্ন নিয়ে ভোর হয় নতুন
সারাদিন চলে খেপাটে কর্মযজ্ঞ
দুমুঠো অন্ন আর নাভিশ্বাস বাড়ানো
সবজির দাম জুগিয়ে ঘরে ফেরা।
অতপর আবার সেই রাত্রির বুকে
হেলান দিয়ে নিজেকে বিছিয়ে দেয়া
কতক নতুন স্বপ্নের আশায়।

ক্যামেরা

নিরবতা ভেঙে তুমি আমার সামনে আসো
তখন কি আমাকে তোমার ড্রেসিংটেবিল মনে হয়?
হতে পারে, কারণ কোথায় কি অসংগতি
তা তুমি শুধরে নাও আমার সম্মুখে।
তোমার প্রতি পদক্ষেপ তোমার সাফল্য
আমাকে আনন্দালোড়িত করে, বিস্ময়াভিভূত করে
স্মৃতিময় হয়ে ওঠে সকাল দুপুর রাত
যেন ফটো এলবামের মতো তুমি তোমার স্মৃতি
আমাতে রেখে নিশ্চিন্ত হয়ে যাও।
সিনেমা নাটকের মতো দৃশ্যপট পাল্টাও
একের পর এক দৃশ্য এবং সংলাপ পরিবর্তিত করো
যেমনটি ক্যামেরার সামনে ঘটে চলে।
তখন আমার নিজেকে ক্যামেরাই মনে হয়;
কারণ আমি তা দেখে থাকি, মস্তিস্কায়ন করি
এবং তা নির্দ্বিধায় প্লে-ও করতে পারি।
সুতরাং আমি এক সচল ক্যামেরা, কেবল তোমার।

অসীম শূন্যতায় বিগত

একদিন হয়তো এই পৃথিবীও চোখ বুজবে চরম কান্তিতে
নিবিড় শশ্রুষা চেয়ে, চেয়ে থাকবে আমার অপেক্ষায়
আক্ষরিক অন্ধকার জমে জমে পৃথিবীর বুকজুড়ে
নিদারুণ স্বপ্ন ভঙ্গের দ্রাঘিমা হুল্লোড়ে মেতে ওঠে
অসংখ্য রানা প্লাজা, অসংখ্যা রাত্রির জলযান
ওয়াপদার পাইপজুড়ে চি‎হ্ন আঁকে সীমাহীন শূন্যতার
প্রতিটি সুগভীর গর্তে ঘুরে ফিরে আসে জিয়াদ
সাড়ে তিন বছরের জিয়াদের আর্তচিৎকার
ভেসে বেড়ায় সাড়ে তিনশত বৎসর
ব্যর্থতার বুলি উড়িয়ে দেয় এদেশজুড়ে
সভ্যতার এই সময়ে এসেও;
ঘরে ঘরে বিষণ্নতা ঘরে ঘরে শূন্যতা আর শূন্যতা
আর আমি অসীম শূন্যতাকে আকড়ে—
ঝুলে থাকি কালের পেণ্ডুলামের মতো।

হৃদয় নদীর নিটোল ঢেউ

এই এক জীবনে তোমাকে হারানোর বেদনার
যে সুখ- তার পিপাসা মিটবে না বুঝি;
শুধু এইটুকু ভেবে সে সুখ ম্লান হতে ধরে
যে তুমি কেবল আমাকেই কষ্ট দিয়েছো।
সে বেদনা এই ভেবে কিছুটা ভুলে
থাকতে পারি যে- তুমি একই রোদের কণা
গায়ে মেখে শিশির পায়ে মাড়াও; একই
বাতাসে নি:শ্বাস ফেলো; যেরকমটি আমিও।
কেবল সে ফুলের সৌরভ তোমার কাছে পৌঁছে
কিনা আমি জানি না; যা কিনা আমার
হৃদয় স্পর্শ করে বাতাস তাকে চুম্বন এঁকে চলে যায়
তোমার কাছে, উড়িয়ে দেয় তোমার আচল।
তবু এই ভেবেই সান্তনা যে- যে চাঁদের জোসনা
এখন তোমার গায়ে আছড়ে পড়ে নিটোল ঢেউ
তুলে তোমার অঙ্গে; সে একবার হলেও
আমার উঠোনে খুশির বান ডেকেছিলো।

শরতের শুভ্রতা

যখন আমি নিদারুণ একা ছিলাম পুরোটা ঘরময়
তখন উত্তরের দরজাটি খোলা হতো না মোটেই
কি একটা নিষ্পেষিত চাপা অন্ধকার বাস করতো সেখানে।
একাকিত্ব ঘুচিয়ে তুমি এলে প্রণয়ের সৌরভ নিয়ে
বললে- ‘অন্ধকারকে ভয় পেলে জেঁকে ধরে বেশী’
তথাস্তু- তোমার ভালোবাসায় অন্ধকার পালাতে দেখলাম
ঘরময় ছন্দময় আলো হৃদয়ও আলোকময়;
হঠাৎ লোডশেডিংয়ের মতো আমাদের ভেজানো
দরজা ঠেলে ঢুকে পড়লো গাঢ় মিহি অন্ধকার
আলুথালু তোমার বসন তোমার চিবুকের
ছান্দসিক আলোড়ন
সে অন্ধকারে ঢেকে গেলো নির্বিকার আমাকে রেখে
যখন জোসনার শরীরে আছড়ে পড়লে তুমি
ততক্ষণে আমাকে গিলে খেয়ে নিয়েছে নিগুঢ় অন্ধকার
অতএব দেখা হলো না আমার—
আর নতুন কোন শরতের শুভ্রতা।

বৃক্ষজনম

খড়তাপে ভীষণ দাপাচ্ছে পৃথিবী
প্রতিদিন নতুন নতুন অতিথি হচ্ছে
কেউ না কেউ মৃতদের নতুন বাড়িতে।
বৃক্ষজন্মের সাধ আমার চিরকালের
তবে প্রতিদিন এমন হাহাকার আর
মৃত্যুর সাক্ষী হয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে থেকে
মুখ বুজে সব সহ্য করার বৃক্ষজীবন নয়;
কার্বনডাই অক্সাইড শুঁষে নিয়ে
অক্সিজেন সরবরাহ করে সবুজ শ্যামল
সুন্দর এক আগামী উপহার দেবার
ইচ্ছায় চিরকাল আমার বৃক্ষজন্মের সাধ!

প্রার্থনা

[কন্যা রোদসীর অসুস্থতার সময়ে সুস্থতা কামনায় লেখা]
দু’হাতে জড়ায়ে ধরে প্রেমের অঞ্জলি
হাঁটু গেড়ে বসেছি তোমার সম্মুখে
যে ভুলে ভুলেছি তোমার প্রতিদানের অর্ঘ্য
নিমেষে তা হারায়ে ব্যাকুল এ হৃদয়
জানি না কখন কবে হারিয়েছি তোমার-
ফুলেল অনুকম্পা, আর তোমার হৃদ্যতা
হাজারো ব্যথার প্রতিশোধ ভুলে
বুকে তুলেছিলে এ অধমেরে
জানি না আজ কোন ভুলের মাশুলে
পুড়ি বিষম ব্যথার ন্যায় চিন্তার অনলে
নতজানু এ হৃদয়ে যত ছিল অর্চনা
দয়ার হস্তে বুলাতে পিষ্ঠ; দিতে অনন্ত সরোবর
আজ যত কাঁদি, যত চাহি কৃপা তোমার
কঠোর চিত্তে লহ মুখ ফিরায়ে তোমার
প্রতি পদে প্রতি দমে তাই নিগ্রহ এতো!
তবু দুয়ারে তোমার ভিখ মাঁগি শত সহস্রবার
দিওনা ফিরায়ে এ হাত; অনুসূচনার মুখখানি
ক্ষমা করো আজ এই গোলামেরে ওহে পরোয়ার দেগার।

বিষয়সমূহঃTags: