মুহম্মদ মতিউর রহমান
১৭ মে, ২০১৯ | ০৩:২৮

শব্দ সংস্কৃতি

tesst

‘সংস্কৃতি’ একটি ব্যাপক অর্থবোধক শব্দ। যে সমস্ত উপাদানের ভিত্তিতে সংস্কৃতি পরিগঠিত হয় তার মধ্যে ভাষা বা শব্দ অন্যতম। বিশেষ একটি ভাষা বিশেষ কোন একটি সংস্কৃতির বাহন। অনেক সময় বিশেষ কোন শব্দ বা শব্দরাজিও কোন বিশেষ সংস্কৃতির বাহন হতে পারে। সেক্ষেত্রে শব্দ বা ভাষার বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ ব্যবহারে সংস্কৃতির পরিচয় সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। বর্তমান নিবন্ধে এ বিষয়টিই আলোচনার প্রয়াস পাব।
ভাষা মূলত শব্দের সমষ্টি। তাই বলতে গেলে, ভাষার আসল সম্পদ হলো শব্দ। যে ভাষার শব্দ-সংখ্যা যতবেশি, সে ভাষা তত সম্পদশালী বা সমৃদ্ধ এবং মনের বিচিত্র ভাব প্রকাশের জন্য তা ততবেশি উপযোগী। তবে কোন ভাষাই আদিতে ততটা শব্দ-সমৃদ্ধ থাকে না। গাছ যেমন বীজ থেকে অংকুরিত হয়ে ধীরে ধীরে লতা-পাতা, শাখা-প্রশাখা বিস্তার করে কালক্রমে মহীরুহে পরিণত হয়, ভাষাও তেমনি নানাভাবে শব্দ সংগ্রহ করে সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে। এজন্য ভাষাকে অনেকে প্রবহমান নদীর সাথে তুলনা করে থাকেন। নদী তার উৎস-মুখে থাকে ক্ষুদ্র স্রোতস্বিনী সদৃশ, প্রান্তর-জনপদের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হতে হতে তার আকার বৃহৎ থেকে বৃহত্তর হয়। তারপর এক সময় নদী সমুদ্রে গিয়ে মিলিত হয়। নদী যখন মাঝখানে তার গতি-পথ হারায় অথবা নানাভাবে পানি সংগ্রহে ব্যর্থ হয় তখন তা হয় বিশুষ্ক মরা নদী।
ভাষাও তেমনি সতেজ-সজীব থাকে নানাভাবে সংগৃহীত শব্দে সমৃদ্ধ হয়ে। নতুন নতুন শব্দ সংগ্রহ করে এবং পুরাতন শব্দের নব নব অভিব্যঞ্জনায় ভাষা প্রবহমান নদীর মতই প্রাণবন্ত রূপ লাভ করে। অন্যথায় যে কোন ভাষা মৃত ভাষায় পরিণত হয়। পৃথিবীতে এরূপ শত শত ভাষার পরিচয় আমরা জানি, যা এক সময় ছিল সজীব, প্রাণবান কিন্তু আজ তা মৃত, কেবল ভাষাতাত্ত্বিকদের গবেষণা ও প্রাচীন গ্রন্থাদির মধ্যেই তা সীমাবদ্ধ। গবেষকদের মতে, পৃথিবীতে সর্বমোট ভাষার সংখ্যা প্রায় ছয় হাজার। এর মধ্যে অধিকাংশ ভাষাই আজ মৃত ভাষায় পরিণত।
বাংলা ভাষা পৃথিবীর পঞ্চম বৃহত্তম ভাষা এবং একটি সমৃদ্ধশালী ভাষা। এ ভাষা একদিনে যেমন সৃষ্টি হয় নি, রূপ ও আকারেও তেমনি কখনো এক রকম থাকে নি। গাছ যেমন মাটির গভীর থেকে রস সংগ্রহ করে মোটা-তাজা, ফলে-ফুলে, লতা-পাতায় সুশোভন হয়ে ওঠে, পৃথিবীর সব বড় ভাষাও তেমনি কালে কালে, নানা ভাষার শব্দ-সংমিশ্রণে ও নানা শ্রেণির মানুষের সংস্পর্শে সজীব ও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। বাংলা ভাষাও তেমনি দীর্ঘকাল ধরে বিভিন্ন ভাষা থেকে শব্দ গ্রহণ করে, বিভিন্ন জনপদ, জনগোষ্ঠী, ধর্ম ও সংস্কৃতি থেকে অসংখ্য শব্দ সংগ্রহ করে সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছে।
বাংলা ভাষার উৎপত্তি বৌদ্ধ পাল আমলে। তবে শূন্য থেকে এর সৃষ্টি হয় নি। আমাদের দেশে প্রাচীন কালে প্রচলিত ভাষা নানা বিবর্তনের মধ্য দিয়ে পাল যুগে এসে বাংলা ভাষার রূপ পরিগ্রহ করেছে। বাংলা ভাষার আদিতে যে ভাষার সন্ধান পাওয়া যায় পণ্ডিতগণ তার নাম দিয়েছেন প্রাচীন প্রাকৃত। প্রাচীন প্রাকৃতের মার্জিত, সংস্কারকৃত বা বইয়ের ভাষাকে বলা হয় সংস্কৃত। সংস্কৃত ভাষার বিবর্তনের মধ্য দিয়ে এক সময় সৃষ্টি হয় পালি ভাষা। পালির পরবর্তী স্তরকে বলা হয় আধুনিক প্রাকৃত। আধুনিক প্রাকৃতের পরবর্তী স্তর হলো অপভ্রংশ। অপভ্রংশ থেকে হিন্দি, উড়িয়া, অহমিয়া ও বাংলা ভাষার উৎপত্তি।
আদিতে বাংলা ভাষার যে রূপ ছিল কালে কালে তা নানাভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। এ পরিবর্তনশীলতা প্রত্যেক ভাষার মৌলিক বৈশিষ্ট্য। এ পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষা একদিকে যেমন তার প্রাচীনত্বের খোলস বদলেছে, অন্যদিকে, তেমনি নতুন নতুন শব্দ আত্মীকরণের মাধ্যমে সমৃদ্ধতর হয়ে উঠেছে। বর্তমানে বাংলা ভাষা প্রাচীন প্রাকৃত, সংস্কৃত, পালি, আধুনিক প্রাকৃত, অপভ্রংশ, আরবি, ফারসি, তুর্কি, উর্দু, ইংরেজি, ফরাসি, পর্তুগীজ প্রভৃতি ভাষার অসংখ্য শব্দরাজিতে পূর্ণ হয়ে পৃথিবীর অন্যতম সমৃদ্ধতম ভাষায় পরিণত হয়েছে। সংস্কৃত পণ্ডিতগণ বাংলা ভাষার অসংখ্য শব্দের উৎপত্তি নিরূপণ করতে গিয়ে একে মোট চার ভাগে বিভক্ত করেছেন। এগুলো হলোÑ তদ্ভব, তৎসম, দেশী ও বিদেশী। তদ্ভব বলতে সংস্কৃত ভাষা থেকে উ™ভূত শব্দরাজিকে বুঝায়। তৎসম বলতে মূল সংস্কৃত শব্দের আংশিক রূপান্তরিত শব্দকে বুঝায়। দেশী বলতে বাংলাদেশের মাটির রসে সিঞ্চিত তথা স্থানীয়ভাবে উ™ভূত শব্দরাজিকে বুঝায় এবং বিদেশী বিভিন্ন ভাষা থেকে বিভিন্ন সময় যে সব শব্দ বাংলা ভাষায় স্থান লাভ করেছে, সেগুলোকে বিদেশী শব্দ বলা হয়।
সংস্কৃত পণ্ডিতদের এ ধরনের বিবেচনা নিতান্ত সেকেলে এবং সংস্কৃত ভাষার প্রতি নিতান্ত পক্ষপাতমূলক। বাংলা ভাষাকে ‘সংস্কৃতের দুহিতা’ হিসাবে প্রমাণ করার জন্যই তারা অযৌক্তিকভাবে এ ধরনের পক্ষপাতিত্ব প্রদর্শন করেছেন, তাতে সন্দেহের অবকাশ নেই। মূলত বাংলা ভাষার উৎপত্তি সংস্কৃত ভাষা থেকে নয়, তবে অন্যান্য ভাষার শব্দরাজি যেমন বাংলা ভাষায় আত্মস্থ হয়েছে, সংস্কৃত ভাষারও অনেক শব্দ সেভাবে বাংলা ভাষায় আত্মস্থ হয়েছে। সে হিসাবে সংস্কৃত ভাষা থেকে উদভূত শব্দরাজিকে যদি তদ্ভব ও তৎসম বলে আখ্যায়িত করা হয়, তাহলে অন্যান্য ভাষা থেকে উদভূত শব্দরাজিকেও ঐ একইভাবে চিহ্নিত করা উচিত। কিন্তু সংস্কৃতের প্রতি বিশেষ অনুরাগবশত সংস্কৃত পণ্ডিতগণ এক্ষেত্রে কেবলমাত্র সংস্কৃত শব্দ বা সংস্কৃতজাত শব্দকেই তদ্ভব ও তৎসম বলে আখ্যায়িত করেছেন।
বিভিন্ন সময় বৈদেশিক শক্তি কখনো দেশ শাসন, কখনো লুট-তরাজ, কখনো ব্যবসা-বাণিজ্য, কখনো পরিভ্রমণ, কখনো ধর্ম প্রচার আবার কখনো বাংলার উর্বরা জমিনের প্রতি প্রলুব্ধ হয়ে এদেশে এসেছে। বিদেশীরা যেভাবে ও যে উদ্দেশ্যেই এদেশে আগমন করুক না কেন, সে সব বহিরাগত মানুষের সংস্পর্শে আসার ফলে তাদের ভাষার সাথেও এদেশের মানুষের কম-বেশি পরিচয় ঘটেছে এবং বহিরাগতদের ভাষার শব্দরাজি বাংলা ভাষা নানাভাবে পরিগ্রহণ করে সুসমৃদ্ধ হয়ে উঠেছে। বলাবাহুল্য, বহিরাগতরাও কম-বেশি বাংলা ভাষার সাথে পরিচিত হয়েছে, তাতে সন্দেহ নেই। বহিরাগতদের মধ্যে একশ্রেণির লোক যারা এদেশে এসে নিজ নিজ স্বার্থ উদ্ধারের পর স্বদেশে ফিরে গেছে। তাদের ভাষার প্রভাব বাংলা ভাষার উপরে পড়লেও তা তেমন ব্যাপক নয় এবং তার স্থায়িত্বও স্বল্পকালিন। কিন্তু যে সব বহিরাগত এদেশে এসে স্থায়ীভাবে বসবাস করেছে, তাদের ভাষার প্রভাব বাংলা ভাষার উপর তুলনামূলকভাবে ব্যাপক ও স্থায়ী হয়েছে।
বাংলাদেশের আদি অধিবাসীদের সঠিক পরিচয় না জানার ফলে যেমন তাদের বলি ‘অনার্য’ (অর্থাৎ যারা আর্য নয়), আর্য-পূর্ব এদেশের ধর্মকেও তেমনি এককথায় বলা হয় অনার্য ধর্ম। অনার্য ধর্ম মূলত লোকজ ধর্ম। স্থান ও কাল বিশেষে তার মধ্যে যেমন বৈচিত্র্য ঘটেছে, তেমনি তার রূপ-বিভিন্নতাও ছিল ব্যাপক। হিন্দুধর্মে যেমন ‘রামায়ণ’ ও ‘মহাভারত’, বৌদ্ধধর্মে ‘ত্রিপিটক’, জৈনধর্মে ‘গ্রন্থসাহেব’ রচিত হয়েছে, বাংলাদেশের প্রাচীন তথা অনার্য জনগোষ্ঠির মধ্যে তেমন কোন ধর্মগ্রন্থের সন্ধান পাওয়া যায় না। ফলে তা বহুলাংশে লোক-ঐতিহ্য ও স্থানিক বিভিন্ন প্রভাবে প্রভাবান্বিত।
অনার্য-অধ্যুষিত প্রাচীন বাংলায় পরবর্তীতে আর্যদের আগমন ঘটে। বাংলায় তারা আর্যধর্ম প্রচার করে। আর্যধর্মের পর এদেশে পর্যায়ক্রমে জৈনধর্ম, বৌদ্ধধর্ম, দাক্ষিণাত্যের কর্নাটক থেকে আগত আর্য-ব্রাহ্মণ্য ধর্ম, মধ্যপ্রাচ্য থেকে আগত ইসলাম ধর্ম, ইউরোপ থেকে আগত খ্রীস্টান ধর্ম প্রভৃতি ধর্মের আগমন ঘটেছে এদেশে। সে সব ধর্ম ও জনগোষ্ঠির সংস্পর্শে এসে বাংলা ভাষা নানাভাবে সমৃদ্ধ হয়েছে। তাই বাংলাদেশ যেমন এক জাতির দেশ নয়, বাংলা ভাষারও তেমনি কোন আদি ও অপরিবর্তনীয় রূপ নেই। বিভিন্ন সময়ে দেশী-বিদেশী, তদ্ভব, তৎসম ইত্যাদি নানা জাতের অসংখ্য শব্দের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে ও সমৃদ্ধ হয়েছে বাংলা ভাষা।
বাংলা ভাষার উৎপত্তি ঘটার পর থেকে এ ভাষা নানা সংকট ও সম্ভাবনার মধ্য দিয়ে বর্তমান পর্যায়ে উপনীত হয়েছে। বৌদ্ধ পাল যুগে বাংলা ভাষার উৎপত্তি এবং ব্যাপক চর্চা হয়। অতঃপর সেন আমলে বাংলা ভাষার উপর অতর্কিতে হামলা শুরু হয়। ব্রাহ্মণ সেন রাজাগণ ভারতের কর্ণাটক থেকে আগত আর্য-ব্রাহ্মণ্য জাতিগোষ্ঠির অন্তর্ভুক্ত। তাদের ভাষা ছিল সংস্কৃত। তারা দেশীয় ভাষা বাংলার চর্চাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। সংস্কৃতি পণ্ডিতদের বিধান মতে :
“অষ্টাদশ পুরাণানি রামস্য চরিতানি
ভাষায়াং মানবঃ শ্রুত্বা বৌরব নরকং ব্রজেৎ।”
ফলে সে সময় বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের কোন চর্চা করা সম্ভব ছিল না। তখন রাজ-দরবারের ভাষা ছিল সংস্কৃত। সংস্কৃতজ্ঞ ব্রাহ্মণ ব্যতীত কেউ রাজ-সভাসদ হতে পারতেন না। ব্রাহ্মণ সেন রাজাগণ বাংলা তথা দেশীয় ভাষার প্রতি বৈরি ছিলেন। তারা এ ভাষাকে ‘পক্ষিভাষা’, ‘মেøচ্ছভাষা’ ইত্যাদি নানা তুচ্ছাত্মক শব্দে অভিহিত করতেন। বাংলা ভাষার এ দুর্দিনে বাংলা সাহিত্যের চর্চাও বিঘিœত হয়। ইতোপূর্বে বাংলা ভাষায় রচিত বিভিন্ন সাহিত্যকর্মও ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়, নতুবা কাল-গর্ভে বিলীন হয়ে যায়। ফলে সেন আমলকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের জন্য এক চরম দুর্দিন বা ‘অন্ধকার যুগ’ নামে অভিহিত করা হয়।
সেন রাজাদের পর বাংলায় মুসলমানদের রাজত্ব শুরু হয়। মুসলমানদের আগমনের পর বাংলায় কেবল রাজনৈতিক পট-পরিবর্তনই ঘটেনি, সামাজিক-অর্থনৈতিক, শিক্ষা-সাংস্কৃতিক, ধর্মীয়, ভাষা-সাহিত্য ইত্যাদি সর্বক্ষেত্রে এক সর্বাত্মক বিপ্লব সংঘটিত হয়। সর্বক্ষেত্রে যে ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটে, বাংলার ইতিহাসে তা অনন্য ও অভূতপূর্ব। এটাকে বলা যায় এক সর্বাত্মক বিপ্লব, যার শুভ পরিণতি ছিল অতিশয় তাৎপর্যপূর্ণ ও সুদূরপ্রসারী। তবে এক্ষেত্রে ভাষা-সাহিত্যের ক্ষেত্রে যে পরিবর্তন ঘটে কেবল সেটাই এখানে সংক্ষেপে আলোচনার প্রয়াস পাব।
মুসলিম শাসনামলে বাংলা ভাষার উপর আরোপিত সেন রাজাদের নিষেধাজ্ঞার অবসান ঘটে এবং মুসলিম রাজা-শাসক ও অভিজাত শ্রেণির প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ব্যাপক চর্চা শুরু হয়। এটাকে বাংলা ভাষার নবজš§ বলা যায়। বিজয়ী মুসলমানদের শাসন, জীবন-যাপন, শৌর্য-বীর্য-পরাকাষ্ঠা, সভ্যতা-সংস্কৃতি, মানবিক মহত্তম ধর্ম ইত্যাদির পাশাপাশি তাদের উন্নত ভাষা-সাহিত্যের প্রভাবও অনিবার্যভাবে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে প্রতিফলিত হয়। এরই ফলে আরবি-ফারসি-তুর্কি ভাষার অসংখ্য শব্দ বাংলা ভাষায় অনুপ্রবিষ্ট হয়। এ সময় শুধুমাত্র আরবি-ফারসি ভাষা থেকেই আড়াই হাজারের অধিক শব্দ বাংলা ভাষায় আত্মীকৃত হয়। এত অধিক সংখ্যক শব্দের দ্বারা যে কোন একটি জনম-লী মোটামুটি তার ভাব প্রকাশে সক্ষম। অর্থাৎ একটি স্বতন্ত্র ভাষা গঠনের জন্য এ বিপুল সংখ্যক শব্দই যথেষ্ট বলে বিবেচিত হতে পারে। সেন আমলের মৃতপ্রায় হত-দরিদ্র বাংলা ভাষা মুসলিম আমলে যখন নবজš§ লাভ করে এবং বাঙালি হিন্দু-মুসলিম উভয়েই স্বাধীন ও অনুকূল পরিবেশে ব্যাপকভাবে সাহিত্য-চর্চায় মনোনিবেশ করে তখন এরূপ শব্দ-সঞ্জীবনী সুধাপানে নব বলে উজ্জীবিত হওয়া বাঙালির জন্য এক রকম অপরিহার্য ছিল। তাই বাংলায় মুসলিম শাসনামলকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ‘স্বর্ণযুগ’ হিসাবে অভিহিত করা হয়।
ইংরাজ শাসনামলেও এমনকি, তার অনেক আগে থেকেই বিভিন্নভাবে ইংরেজি, ফরাসি, পর্তুগীজ প্রভৃতি ভাষারও অসংখ্য শব্দ বাংলা ভাষায় স্থান লাভ করে। এ প্রবণতা এখনো অব্যাহত রয়েছে এবং তা ভবিষ্যতেও থাকবে বলে আশা করা যায়। এটা ভাষার সজীবতা ও সমৃদ্ধির লক্ষণ। এভাবে বাংলা ভাষা সমৃদ্ধ হবার কারণেই প-িত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী বলেন :
“বাংলাটা যে একটা স্বতন্ত্র ভাষা, উহা পালি, মাগধী, অর্ধ-মাগধী, সংস্কৃত, পার্সি, ইংরাজী নানা ভাষার সংমিশ্রণে উৎপন্ন হইয়াছে গ্রন্থকারগণ (ব্যাকরণের) সে কথা একবারও ভাবেন না।”
প্রয়োজনে অন্য ভাষা থেকে গ্রহণ করা অন্যায় নয়। তবে জোর করে বা কৃত্রিমভাবে কোন কিছুই গ্রহণ করা সঙ্গত নয়। অন্য ভাষার শব্দ যা জনগণ সহজভাবে গ্রহণ করেছে, ব্যবহারিক কাজে স্বাভাবিকভাবে প্রয়োগ করেছে, কেবল সে সব শব্দই আমাদের নিজস্ব শব্দ-সম্পদে পরিণত হয়েছে। এর দ্বারা ভাষা অবশ্যই সমৃদ্ধ হয়েছে। তবে জোর করে বা কৃত্রিম উপায়ে কখনো কোন শব্দ গ্রহণ করা বাঞ্ছনীয় নয়, সেভাবে কোন শব্দ বা শব্দসমষ্টি গ্রহণের চেষ্টা কখনো ফলবতী হয় না। এর প্রকৃষ্ট নজীর আমরা দেখেছি ইংরাজ আমলে ফোর্ট উইলিয়ম কলেজের (স্থাপিত ১৮০০ সন) ইংরাজ পাদ্রী ও সংস্কৃতি পণ্ডিতদের দ্বারা তথাকথিত ‘সাধু বাংলা’ তৈরির প্রচেষ্টায়। তাঁরা বাংলা ভাষায় বহুল প্রচলিত আরবি-ফারসি-উর্দু-তুর্কি শব্দরাজি বাদ দিয়ে অপ্রচলিত ও দুর্বোধ্য সংস্কৃত শব্দমালায় আকীর্ণ এক কৃত্রিম বাংলা ভাষা তৈরি করে তার নাম দিলেন ‘সাধু বাংলা’। এ সাধু বাংলায় ফোর্ট উইলিয়ম কলেজের পাদ্রী ও সংস্কৃত পণ্ডিতগণ পাঠ্য-পুস্তক রচনা করে তা প্রচলনের কোশেশ করেন। কিন্তু সে চেষ্টা ফলবতী হয় নি। এ তথাকথিত ‘সাধু বাংলা’ সম্পর্কে প্রখ্যাত ইংরাজ ভাষাতাত্ত্বিক স্যার জর্জ গ্রীয়ারসন বলেন :
“শতকরা নব্বইটি প্রকৃত বাংলা শব্দের স্থলে উদ্দেশ্যমূলকভাবে সংস্কৃত শব্দ বসিয়ে বাংলা ভাষাকে তথাকথিত সাধু ভাষা বানানোর চেষ্টা করেছিলেন সংস্কৃত পণ্ডিতগণ।”
তাই সে ‘সাধু বাংলা’, প্রকৃতপক্ষে যা ছিল ‘সংস্কৃত’ বা কৃত্রিম বাংলা, জনগণের নিকট তা গ্রহণীয় হয় নি। বাংলা ভাষার স্বাভাবিক বিকাশের পথে তা ছিল অন্তরায় স্বরূপ। তাই ইংরাজ প-িত বহু ভাষাবিদ হ্যালহেড এ সম্পর্কে লেখেন :
“বাংলা গদ্যের এই নব রূপায়ণ ঐতিহ্য-বিরোধী এবং ভাষার স্বাভাবিক বিকাশকে ব্যাহত করেছে।”
ভাষার এ সংস্কৃতায়ন প্রচেষ্টা সাধারণ মানুষ গ্রহণ করেনি, তাদের মুখের ভাষায় প্রচলিত ‘যাবনি মিশাল’ বাংলাই চালু থাকে। এভাবে বাংলা ভাষা ‘সাধু’ ও ‘চল্তি’ দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। বাংলা ভাষার এ কৃত্রিম বিভাজন সম্পর্কে বেইন্স্ ১৯৯১ সনে আদম শুমারীর রিপোর্টে উল্লেখ করেন :
Bengali has no doubt been unfortunate in the circumstances that have attended its development. The vernacular has been split into sections: first the tongue of the people at large, which changes every few miles; secondly the literary dialect, known only through the press and not intelligible to those who do not also know Sanskrit. The latter form is the product of what may be called the revival of learning in East India, consequent on the settlement of the British on the Hoogly … Instead of strengthening the existing web from the same material, every effort was made in Calcutta, the then only seat of instruction, to embroider on the feeble old frame a grotesque and elaborate pattern in Sanskrit, and pilfer from that tongue whatever in the way of vocabulary and construction the learned considered necessary to satisfy the increasing demands of modern intercourse.
সংস্কৃত পণ্ডিতদের ‘সাধু ভাষা’ লেখ্য ভাষা হিসাবেও অনেকেই গ্রহণ করতে পারেন নি। কালীপ্রসন্ন সিংহ, টেকচাঁদ ঠাকুর প্রমুখ প্রকাশ্যেই তার বিরোধিতা করেছেন। এমনকি, রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এবং পরবর্তীতে প্রমথনাথ চৌধুরী ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ব্যাপকভাবে তাঁদের লেখায় তথাকথিত ‘সাধু বাংলা’কে অনেকটা সহজতর, বোধগম্য ও প্রসাদগুণসম্পন্ন করে তোলার প্রয়াস পেয়েছেন। ‘সাধু বাংলা’র এ সহজিকরণ প্রক্রিয়া শেষ পর্যন্ত কলকাতা-কেন্দ্রিক হিন্দু বাবু-সম্প্রদায়ের আধুনিক ঝঃধহফধৎফ ইবহমধষর খধহমঁধমব এ পরিণত হয়। তবে সাধারণভাবে বাঙালি মুসলিম ও বিশেষভাবে পূর্ববাংলার মানুষের ভাষার সাথে তার দূরতিক্রম্য ব্যবধান থেকেই যায়। বাঙালি মুসলমানের কথ্য-ভাষায় তখনো ‘যাবনি মিশাল’ ভাষা তথা ‘মুসলমানী বাংলা’রই প্রচলন থাকে। অবশ্য পাঠ্যবই-এর ভাষা ও সাহিত্যের ভাষা হওয়ার কারণে সে কৃত্রিম ‘সাধু ভাষা’র প্রভাব সর্বত্র, বিশেষত শিক্ষিত মহলে স্বাভাবিকভাবেই পরিলক্ষিত হয়। বিগত দুই দশক কাল পর্যন্ত তাই প্রমিত বাংলা বা ঝঃধহফধৎফ ইবহমধষর খধহমঁধমব হিসাবে কলকাতা কেন্দ্রিক ভাষার দৌরাত্ম্য বাংলাভাষী সকল শিক্ষিত মহলে কম-বেশি বিরাজমান থাকে।
১৯৪৭ সনে দেশ-বিভাগের পর ভাষার ক্ষেত্রে কলকাতার একাধিপত্য তথা হিন্দু বাবু-সম্প্রদায়ের অভিজাততন্ত্রের ক্রমান্বয়ে অবসান ঘটতে থাকে। ঢাকা তৎকালিন পূর্ব পাকিস্তানের এবং বর্তমানে স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানী হওয়ায় ঢাকা-কেন্দ্রিক বাংলা ভাষার একটি স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ে উঠতে শুরু করে। আস্তে আস্তে তা আমাদের সাহিত্যের বা বইয়ের ভাষায়ও ক্রমান্বয়ে স্থান লাভ করে। ১৯৭১ সনে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে ভাষার এ গণতন্ত্রায়ন প্রক্রিয়া স্বভাবতই আরো জোরদার হয়। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন এবং মাতৃভাষার রাষ্ট্রীয় মর্যাদা আদায়ের লক্ষ্যে সর্বাত্মক সংগ্রাম ও চরম আত্মত্যাগের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৯৯ সনের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান ইউনেস্কো কর্তৃক ২০০০ সন থেকে ২১ ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসাবে ঘোষণা দেয়ায় বাংলা ভাষার মর্যাদা যেমন বৃদ্ধি পেয়েছে, বাংলা ভাষার প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতাও তেমনি বেড়েছে। বাংলা ভাষা এখন চৌদ্দ কোটি বাংলাদেশীর নিরলস সংগ্রাম, সীমাহীন আত্মত্যাগ, জাতীয় গৌরব ও আত্মমর্যাদাবোধের মহত্তম প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
একটি ভাষার ভাণ্ডারে অসংখ্য শব্দ থাকে। সবগুলো শব্দের উপযোগিতা ও ব্যবহার এক রকম নয়। কোন কোন শব্দের ব্যবহার অত্যন্ত বেশি আবার এমন অনেক শব্দ আছে যার ব্যবহার কালে-ভদ্রে হয়ে থাকে, ক্রমান্বয়ে তা হয়তো অবলুপ্তও হয়ে পড়ে। অনেক শব্দ শিশু থেকে বৃদ্ধ, আপামর সাধারণ জনতা সব সময় নানাভাবে ব্যবহার করে থাকে। আবার অনেক শব্দ এমন আছে যা কেবল বিশেষ বিশেষ শ্রেণির লোকেরা বিশেষ বিশেষ অবস্থায় ব্যবহার করে থাকে। এছাড়া, ব্যবহারিক ক্ষেত্রে, বিভিন্ন পেশা ও বিষয়ের ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন অসংখ্য পরিভাষা রয়েছে, যা সাধারণ মানুষের জন্য সহজবোধ্য নয়। তাই শব্দের ব্যবহার বিশেষ অবস্থা, বিশেষ পরিপ্রেক্ষিত, উপযোগিতা ও প্রয়োজনের তাগিদেই হয়ে থাকে। পরস্পর কথোপকথনে আমরা যে ভাষা ব্যবহার করি, লেখার সময় সে ভাষা অনেকটা ভিন্ন রূপ পরিগ্রহ করে। লেখ্য ভাষার একটি গ্রহণযোগ্য স্ট্যান্ডার্ড রূপ আছে। বাংলা ভাষার ক্ষেত্রে এ স্ট্যান্ডার্ড রূপে ভিন্নতা রয়েছে। কলকাতা-কেন্দ্রিক স্ট্যান্ডার্ড রূপ থেকে ঢাকা-কেন্দ্রিক স্ট্যান্ডার্ড বাংলার রূপ দিন দিনই ভিন্নতর হয়ে যাচ্ছে। এছাড়া, কলকাতা-কেন্দ্রিক বাংলা ভাষা বর্তমানে হিন্দি, ইংরেজি ও ভারতের অন্যান্য আঞ্চলিক ভাষার প্রভাবে ক্রমান্বয়ে যেমন ম্রিয়মান ও সংকুচিত হয়ে পড়ছে, অন্যদিকে, ঢাকা-কেন্দ্রিক বাংলা ভাষা বাংলাদেশের রাষ্ট্র ভাষা ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষার মর্যাদা পেয়ে সগৌরবে বিশ্ব-পরিম-লে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পেরেছে। এদিক থেকে এর শক্তিমত্তা ও সম্ভাবনাও অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে।
কালক্রমে, বিভিন্ন প্রয়োজনে, বিভিন্নভাবে ভাষা নানা শব্দ গ্রহণে নিজস্ব ভা-ার পূর্ণ করে। যে ভাষা যতবেশি গ্রহণ-বর্জনে অভ্যস্থ, সে ভাষা ততবেশি প্রাণবন্ত ও সমৃদ্ধ। বাংলা ভাষা এ গ্রহণ-বর্জনের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সক্ষমতার পরিচয় দিয়েছে। ফলে এর ভাণ্ডারও সেভাবে পূর্ণ হয়েছে। জš§-লগ্ন থেকেই এ পরিগ্রহণ প্রক্রিয়া চালু রয়েছে। তবে বাংলা ভাষার এ পরিগ্রহণের ইতিহাসে মুসলিম শাসনামল এক ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ঐ আমলেই সেন আমলের মৃতপ্রায় বাংলা ভাষার নবজ ঘটে। অসংখ্য আরবি-ফারসি-তুর্কি শব্দ সমন্বয়ে বাংলা সুসমৃদ্ধ হয়ে ওঠে ও বিচিত্র ভাব প্রকাশের উপযোগি হয়। ভাষাতাত্ত্বিক বিচারে যদিও ওগুলো বিদেশী শব্দ কিন্তু ব্যবহারিক ক্ষেত্রে ওগুলো সাধারণ মানুষের একান্ত পরিচিত, বোধগম্য ও অনেক ক্ষেত্রে অপরিহার্য রূপে বিবেচিত হয়ে এসেছে। তাই সুদীর্ঘ প্রায় পাঁচশো বছর পর্যন্ত তা আমাদের কথ্য ও লেখ্য ভাষায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে ব্যবহৃত হয়। ইংরাজদের আগমন না ঘটলে আজো পর্যন্ত ঐ ধারা অব্যাহত থাকতো অর্থাৎ আরবি-ফারসি-উর্দু-তুর্কি মিশেল বাংলা ভাষাই হতো আমাদের মাতৃভাষা, ব্যবহারিক জীবনের ভাষা ও বইয়ের ভাষা।
যাই হোক, ঐ সময় বাংলা ভাষায় আরবি-ফারসি-তুর্কি-উর্দু ভাষার শব্দ এসেছে প্রধানত তিন ধরনের প্রয়োজন, উপযোগিতা ও প্রেক্ষপটে। প্রথমত, রাজকার্য, প্রশাসনিক ও ভূমি-ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে। দ্বিতীয়ত, আইন-আদালত ও বিচারিক প্রয়োজনে। তৃতীয়ত, সাধারণ ব্যবহারিক ও সাহিত্য-চর্চার ক্ষেত্রে এবং চতুর্থত, ধর্মীয় পরিভাষা হিসাবে।
প্রথমোক্ত কারণে যে সব আরবি-ফারসি-তুর্কি-উর্দু শব্দ বাংলা ভাষায় আত্মীকৃত হয় ও সাধারণভাবে আপামর জনসাধারণের ভাষার অপরিহার্য সম্পদে পরিণত হয় এরূপ কিছু শব্দের একটি তালিকা নিচে নমুনা হিসাবে পেশ করা হলো :
আমলা, ইজারা, ইস্তাফা, উজির, এজমালি, ওয়াক্ফ, কবালা, কুর্নিশ, খতিয়ান, খলিফা, খাজাঞ্চী, খাজানা, খাসমহল, খারিজ, গোমস্তা, গোয়েন্দা, চৌহদ্দি, জমাদার, জমি, জমা, জামানত, জমিদার, জঙ্গ, জরিপ, জাইগীর, জিজিয়া, তফসিল, তলব, তলবানা, তহসিল, তামাদ, তৌজি, দফতর, দফাদার, দখল, দফতরি, দফা, দফাওয়ারী, দফতরখানা, দরখাস্ত, দরবার, দস্তাবেজ, দাগ, দাদন, দাখিলা, দেওয়ান, দৌলত, দৌলতখানা, নক্শা, নবাব, নফর, নাজির, নামজারি, নায়েব, নোকর, পরগনা, পরচা, পরোয়ানা, পাইক, পালোয়ান, পিল, পিলখানা, পেয়াদা, পেশকার, ফরমান, ফৌজ, বন্দুক, বদর, বন্দোবস্ত, বায়না, বরকন্দাজ, বরখাস্ত, বাদশাহ, বেসরকারী, মহকুমা, মহাল, মহাফেজ, মুঘল, মালিক, মালিকানা, রায়ত, রায়তী, রেয়াৎ, লস্কর, লাখেরাজ, শাহী, সরকার, সরকারী, সুবা, সেরেস্তা, সুলতান, সুলতানা, সিপাহী, সেরেস্তা, সোলেহনামা, হলফ, হাজির, হাজিরা, হাবিলদার, হাসিল, হাতিয়ার, হুকুম, হুলিয়া ইত্যাদি।
দ্বিতীয়ত, আইন-আদালত ও বিচারিক প্রয়োজনে যে সব আরবি-ফারসি-তুর্কি-উর্দু শব্দ বাংলা ভাষায় প্রবিষ্ট হয় এবং কালক্রমে যা সকল বাঙালি অবলীলায় গ্রহণ করে তার কতিপয় দৃষ্টান্ত নিচে উদ্ধৃত হলো :
আইন, আদালত, আদল, আর্জি, আপস, আপসনামা, ইনসাফ, উকিল, এজলাস, এজাহার, ওকালতনামা, কয়েদ, কয়েদী, কয়েদখানা, কানুন, কাজী, খালাস, দেওয়ানি, নামঞ্জুর, নালিশ, নিখরচা, পেশকার, ফরিয়াদ, ফরিয়াদি, ফৌজদারী, বেআইন, মামলা, মকদ্দমা, মক্কেল, মোক্তার, মোক্তারনামা, সালিস, সালিশি, সোলেহ, সোলেহনামা, হলফ, হলফনামা, হাকিম, হাজত ইত্যাদি।
তৃতীয়ত, সাধারণ ব্যবহারিক প্রয়োজনে আরবি-ফারসি-তুর্কি-উর্দু ভাষার যে সব শব্দ বাংলা ভাষায় অনুপ্রবেশ ও কালক্রমে তা মুসলমান-হিন্দু নির্বিশেষে সকল বাঙালির নিকট গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে ও স্বতঃস্ফূর্তভাবে তারা দৈনন্দিন কাজে ও সাহিত্য-চর্চায় ব্যবহার করে তার একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা নমুনাস্বরূপ নিচে পেশ করা হলো :
অন্দর, অছিলা, আকসার, আক্কেল, আঁখি, আখড়া, আচকান, আঞ্জাম, আঞ্জুমান, আদব, আদমি, আদাব, আদায়, আধা, আওরাত, আনার, আওলাদ, আন্দাজ, আওয়াজ, আপদ, আফসোস, আফিম, আরক, আবকার, আবরু, আবলুস, আবওয়াব, আবহাওয়া, আবা, আবাদ আম (সাধারণ), অমিল, আমরুদ, আলখাল্লা, আলবৎ, আলবোলা, আলাদা, আশক, আশনাই, আসান (আহসান), আসমান, আস্তানা, আস্তিন, আয়না, আহম্মক, ইজার, ইজ্জৎ, ইয়ার, ইল্লৎ, ইশাদী, ইস্তক, উঁর্দি, একরার, এন্তেজার, এলম, এলাকা, ওয়াকিফ, ওরফে, ওস্তাদ, ওয়ালা, ওয়াস্তা, কমতি, কমজোর, কবুল, কমবক্ত, কসাই, কলম, কলমদানী, কসুর, কাজ, কাগজ, কদর, কেরামতি, কারখানা, কবুতর, কিস্তিমাৎ, কলিজা, কিসমৎ, কাপড়, কাবিল, কাঁবু, কামাই, কামানি, কারদানি (কেরদানী), কাহিল, কিম্মত, কিশমিশ, কিসম, কিস্তী, কুস্তি, কেচ্ছা, কৈফিয়ৎ, কোপ্তা, কোর্মা, কালিয়া, কোহিনুর, খতম, খতানো, খরিদ, খাতা, খাতির, খানা, খাতুন, খানকী, খানদান, খানসামা, খামাখা, খানুম, খাম খামখেয়ালী, খালি, খালু, খালা, খামার, খাসা, খাসি, খাদেম, খিদমত, খুন, খুশী, খুবসুরত, খুর্মা, খেজুর, খেসারত, খোজা, খোদ, খোশ, খোশবু, খোশামোদ, গজল, গয়রহ, গরজ, গরীব, গর্দা, গর্দান, গলদ, গলিজ, গাওয়া, গাফিল, গায়েব, গালিচা, গুজরান, গুম, গুমর, গুল, গুলজার, গোঁয়ার, গোলাব, গোলাম, গোস্তাকি, গদি, গন্ধ, গাড়ি, গামলা, ঘাবড়ানো, চক, চওড়া, চড়া, চমক, চরকা, চাওয়া, চাকতি, চাকর, চাকরানী, চালক, চাখা, চাঁদা, চাটাই, চাদর, চানা, চাপকান, চাপরাস, চাবুক, চামুক, চালাক, চালান, চালু, চিকন, চিড়িয়া, চিলমচি, চেরাগ, চোষা, চোস্ত, চৌকস, চৌকা, চৌকাঠ, চৌকি, চৌকিদার, চৌচালা, চৌচির, চৌপদী, চৌপায়া, চৌবাচ্চা, চৌমাথা, চৌরাস্তা, ছন্দ, ছবি, ছয়লাব, ছাউনি, ছাঁছি, ছাঁটি, ছাতি, ছাপ, ছাফাই, ছিলিম, ছেনি, জনাব, জবর, জবান, জবাব, জব্দ, জমা, জমাদার, জমানো, জরদ, জরদা, জরি, জরুর, জরুরী, জল্দি, জলুশ, জল্লাদ, জহর, জহুরী, জা, জাঙ্গিয়া, জাজিম, জাত, জাদা, জান, জানোয়ার, জানবাজ, জাফরান, জামদানী, জামা, জায়গা, জায়দাদ, জাল, জ্বালা, জালিয়াত, জাস্তি, জাঁহাপনা, জাহাজ, জ্বি, জিগর, জিদ, জিনিস, জিন্দেগী, জিম্মা, জিন্দাবাদ, জিয়ানো, জিলা, জুল্ফী, জুলুম, জেব, জেয়াদা, জের, জেরবার, জোব্বা, জায়ান, জোর, জোরওয়ার, ঝাড়, টিলা, টুটা, টুপি, ডর, ডুলী, ঢুলী, ঢুড়া, তক, তক্মা, তকলিফ, তক্ত, তক্তা, তছনছ, তছরূপ, তদবীর, তদারক, তগদির, তনখা, তন্দুর, তফাৎ, তবক, তবলা, তবিয়ৎ, তহবিল, তমসুক, তৈয়ার, তর, তরকারি, তরজমা, তরজা, তহবন, তরতিব, তরফ, তরফদারী, তরফা, তরবারি, তরমুজ, তর, তলাশ, তসবি, তহুরী, তাউই, তাউস, তাওয়া, তাক, তাকৎ, তাকাবী, তাকিয়া, তালিকা, তাগা, তাগার, তাগাদা, তাগিদ, তাজ, তাজিয়া, তাজ্জব, তাবিজ, তাঁবু, তাঁবে, তামাম, তামাসা, তামিল, তায়দাদ, তারিখ, তারিফ, তালিম, তালুক, তীর, তুফান, তেজ, তেজারৎ, তেজপাত, তেজালো, তেজী, তেসরা, তোড়া, তোতা, তোপ, তোবা, তোয়াক্কা, তোয়াজ, তোশক, তোশাখানা, তোষামদ, তোড়া, থলিয়া, দমিত, দরকার, দরকারি, দরজি, দরদী, দরদ, দরদালান, দরাজ, দরজা, দস্তখত, দস্তানা, দস্তুর, দস্তুরী, দহরম, দাওয়া, দাখিল, দাগা, দাগাবাজী, দাঙ্গা, দাদ, দাতা, দাবা, দাবি, দামামা, দারোয়ান, দারু, দালান, দাস্ত, দিক, দিল, দিলখোশ, দিলদার, দীন, দুম্বা, দুশমন, দেউড়ী, দেওয়াল, দেখা, দেখানো, দেদার, দেহাতী, দেনা, দেমাগ, দেরাজ, দেরি, দোকান, দোতরফা, দোতলা, দোপিয়াজা, দো-ফলা, দো-ভাষী, দোশালা, দোসর, দোসরা, দোস্ত, দোহারা, দৌলত, দুনিয়া, ধোকা, ধোনা, ধুনিয়া, ধোপ, ধোপা, ধোলাই, ধোয়া, ধোপদস্ত, ধোপদুরস্ত, নও, নওবত, নকল, নকলনবীশ, নকীব, নগদ, নগদা, নঙ্গর, নজর, নজরানা, নজর দেওয়া, নেক নজর, নজির, নথি, নফর, নবিস, নমুনা, নর্দ্দমা, নরম, নসিব, নহবৎ, নহর, না, নাখোদা, নাখোশ, নাকড়া, নাকচ, নাকাল, নাগাল, নাছোড়বান্দা, নাজেহাল, না-পছন্দ, নাপাক, নাম, নামজাদা, নামা, নারঙ্গি, নারাজ, নাল, নালা, নালায়েক, নাস্তা, নাস্তানাবুদ, নাহক, নিকা, নিমক, নিমকি, নিমখুন, নিমহাকিম, নিমরাজি, নিশানি, নিশানা, নিশানদিহি, দিশানদার, নেহাৎ, নোকর, নোকসান, পনির পড়া, পয়সা, পয়মাল, পরওয়ারিস, পয়ার, পরা, পরানো, পরোয়া, পর্দ্দা, পশম, পশমী, পাইকার, পাইকারী, পাগড়ি, পাঞ্জা, পাপোষ, পায়চারি, পায়দল, পায়া, পালঙ্ক, পালোয়ান, পিয়াজ, পেয়ার, পেয়ালা, পিয়াস, পিরান, পিয়ালি, পুকুর, পুছা, পুদিনা, পেয়ার, পেয়ারা, পেয়ালা, পেশ, পেশাদারী, পেশওয়ার, পেশওয়াজ, পেস্তা, পোক্ত, পৌঁছা, পোলাও, পোশাকী, পোষা, পোস্ত, পুল, পাজামা, পাঁয়তারা, পান, পানদান, পিকদান, পালঙ, পোষ, ফছাদ, ফকির, ফটক, ফতুর, ফতেহ, ফতুয়া, ফন্দি, ফন্দিবাজ, ফরক, ফরমাশ, ফারাগত, ফরাশ, ফরিয়াদ, ফরিয়াদি, ফর্দ্দ, ফলনা, ফসল, ফাঁকি, ফাজিল, ফাঁড়া, ফায়দা, ফাঁসী, ফি, ফিকা, ফিকির, ফিরত, ফিলহাল, ফুরসৎ, ফেয়ার, ফেরতা, ফেরি, ফেরেব, ফেরেববাজ, ফোয়ারা, ফৌত, বকরা, বকলম, বকশিশ, বকেয়া, বখরা, বখেড়া, বগল, বজ্জাত, বজ্জাতি, বদ, বদখেয়াল, বদমতলব, বদজবান, বদরাগী, বদহজম, বদসুরত, বদবখত, বদন, বদনা, বদবু, বদমাশ, বদমেজাজী, বদল, বদলা, বদলি, বনাত, বনাম, বনিয়াদ, বুনিয়াদ, বন্দ, বন্দর, বন্দী, বন্দুক, বন্দোবস্ত, বমাল, বয়ান, বয়েৎ, বরগা, বরতরফ, বরদার, বরদাস্ত, বরবাদ, বরাত, বরাদ্দ, বরাবর, বগী, বস্তা, বেকুব, বহর, বহি, বহিন, বহু, বহুত, বহুতর, বহুদর্শী, বহুদূর, বহুভাষী, বহুমূল্য, বহুরূপী, বহুবার, বহুল, বাউল, বাগ, বাগিচা, বাচ্চা, বাজ, বাজার, বাজি, বাজিমাৎ, বেহায়া, বাজু, বাজে, বাজেয়াপ্ত, বাড়া, বাড়ানো, বাড়াবাড়ি, বাত, বাতলানো, বাতাস, বাতিল, বাদ, বাদাম, বাঁদী, বাপ, বাফ্তা, বাবদ, বাবরি, বাবু, বাবুর্চি, বারকোশ, বারবরতদার, বারুদ, বালাই, বালাখানা, বালপোষ, বাসিন্দা, বাহবা, বাহাদুর, বাহানা, বাহার, বাহাল, বিগড়ান, বিগড়ানো, বিদায়, বিনামা, বিবি, বিমা, বিলকুল, বিলাত, বিলি, বুজরুক, বুজ, বুজা, বুজানো, বুঝা, বুঝ, বুঝানো, বুঝি, বুড়া, বুড়ানো, বুঁদ, বুঁদি, বুঁদিয়া, বুনা, বুরুজ, বুলবুল, বুলা, বে, বেআন্দাজ, বেআক্কেল, বেআদব, বেআবরু, বেইজ্জত, বেইমান, বেএক্তিয়ার, বেওজর, বেওয়া, বেওয়ারিশ, বেকসুর, বেকায়দা, বেকার, বেকুব, বেখরচা, বেখাপ, বেগতিক, বেগম, বেগায়ের, বেগার, বেগুরন, বেগুনে, বেগুনী, বেচারা, বেগোছা, বেফিকির, বেচা, বেজাত, বেজায়েজ, বেজার, বেড়া, বেতার, বেতাল, বেদখল, বেদম, বেদস্তুর, বেদানা, বেদুইন, বেনামা, বেপরোয়া, বেপার, বেফায়দা, বেফাঁস, বেবন্দোবস্ত, বেবাক, বেবাকী, বেমওকা, বেমালুম, বেয়াড়া, বেয়াদব, বেরাদার, বেলা, বেলুন, বেলোয়ারী, বেশী, বেসরকারী, বেশরম, বেসামাল, বেহদ্দ, বেহাত, বেহায়া, বেহিসাবী, বেহুঁস, বোচকা, বোরকা, বোল, ভরসা, ভাগ, ভিজা, ভিস্তি, মক্কেল, মক্তব, মখমল, মগজ, মগজি, মজদুর, মজবুত, মজলিস, মজা, মজুদ, মজুমদার, মঞ্জীল, মতলব, মতিচুর, মফস্বল, মদদ, মবলগ, ময়দা, ময়দান, ময়লা, মরদ, মরীচ, মরিচা, মর্জ্জি, মর্দ্দ, মর্ম্মর, মৌসুম, মলম, মলমল, মলিদা, মসগুল, মসলা, মহল, মাৎ, মাতব্বর, মাতোয়ারা, মাতোয়ালী, মানা (নিষেধ), মানা (মান্য করা), মানানো, মানে, মাফ, মামুলী, মায়, মারফৎ, মাল, মালখানা, মালগুজার, মালমশলা, মালাই, মালিকী, মালিশ, মালুম, মাশুল, মাস, মাসমাহিনা, মসকারী, মাসহরা, মাসিক, মাহিনা, মাহুত, মিছরি, মিলি, মিটা, মিটানো, মিঠা, মিনা, মিয়াদ, মিল, মিলানো, মিহি, মুচলেকা, মুচি, মুচ্ছুদী, মুদা, মুদিত, মুদ্দত, মুদ্দাফরাস, মুনাফা, মুনিব, মুফৎ, মুরগী, মুরাদ, মুরব্বী, মুর্দ্দা, মুলতবী, মুস্কিল, মুসাবিদা, মুজুরী, মুরতী, মেরজাই, মেজাজ, মেরামত, মেহনৎ, মেহনতী, মিন্তি, মেহদি, মেহেরবান, মেহেরবানি, মোকাবিলা, মোকাম, মোক্তা, মোছ, মোজা, মোতাবেক, মোতায়েন, মোরগ, মোরব্বা, মোলায়েম, মোসায়েব, মোসাহেবী, যাওয়া, যাদু, যাদুকর, যাদুঘর, য়ুনানী, যোয়ান, রওয়ানা, রোয়াক, রকমারি, রগ, রগড়ানো, রং, রংদার, রংরেজ, রংমহল, রঙ্গিলা, রদ, রদবদল, রদ্দী, রপ্ত, রপ্তানী, রফা, রফাওয়ারী, রবিখন্দ, রশি, রসুন, রসদ, রসানো, রসিদ, রাং, রাখা, রাখাল, রাজি, রায়, রাশ, রাস্তা, রাহা, রাহী, রিফু, রিসালা, রুমাল রেওয়াজ, রেকাব, রেজগি, রেজাই, রেশম, রেহাই, রোকা, রোজ, রোজানা, রোশনাই, রৌশন, রৌশনচৌকী, লটকানো, লপেট, লপেটা, লম্বা, লল্মমান, লম্বিত, লম্বোদর, লব, লবেজান, লহমা, লাগ, লাগো, লাগাদ, লাগাম, লাচার, লাঠি, লাথ, লায়েক, লাশ, লেখা, লু, লুটতরাজ, লেফাফা, লোচ্চা, লোনা, লোবান, শক্ত, শক্তিমান (শালী), শতরঞ্জ, শরম, শরাব, শরিক, শরিকানা, শহর, শহিদগা, শাহনামা, শাগরেদ, শাদি, শাল, শওকত, শামা, শামাদান, শামিয়ানা, শায়েস্তা, শিকার, শির, শিরদাঁড়া, শিরনামা, শিরোপা, শিশা, শিশি, শোহরৎ, শুমার, সওগাত, সওদা, সওদাগর, সওদাগরী, সওয়াব, সওয়াল, সখ, সড়ক, সদর, সদর দরজা, সন, সনদ, সনাক্ত, সপ্তাহ, সফর, সফেদ, সফেদা, সবুজ, সবুর, সবজি, সমঝ, সমঝদার, সমীহ, সরগরম, সরজমিন, সরঞ্জাম, সরফরাজ, সরফরাজী, সরবৎ, সরবরাহ, সরম, সহরদ্দ, সরাই, সরেশ, সরোজ, সর্দ্দার, সলা, সহবৎ, সহি, সাকিন, সাগরেদ, সাঁচ্চা, সাজশ, সাজা, সানাই, সাফ, সাবেক, সামনে, সামাল, সামিয়ানা, সামিল, সারা, সারাদিন, সারেঙ্গ, সাল, সালতামামি, সাহানা, সুদ, সুদখোর, সুপারিশ, সুমার, সুরৎ, সুরু, সুরুয়া, সুর্ম্মা, সেতার, সেমাই, সেয়ানা, সেরা, সেলাম, সোপর্দ্দ, সোরগোল, সেরা, সোরাই, সৌখীন, হক, হকিকৎ, হজম, হদিস, হদ্দ, হয়রান, হর, হরকৎ, হরকরা, হরফ, হরেক (হর-এক), হপ্তা, হলফ, হলফা, হস্তবুদ, হাওদা, হাওয়া, হাওলা, হাওলাৎ, হাঙ্গামা, হাজির, হাজার, হাজেরি, হাবশী, হামানদস্তা, হামাম, হামেশা, হায়া, হাল, হালাক, হলকান, হালুয়া, হাশিয়া, হাসিল, হিকমৎ, হিজরা, হিন্দু, হিম্ম, হিল্লা, হিস্সা, হিসাব, হুকা, হুজুর, হুজ্জৎ, হুন্ডি, হেনা, হেফাজৎ, হেস্তনেস্ত, হাউজ, হরগিজ, হরিয়াল, হার্মাদ, হল্কা, হল্লা, হাউস, হাঁক, হাঁকানো, হাঁকাহাঁকি, হাতিয়ার, হামবড়া, হুবহু, হুরী, হুঁশ, হেরফের প্রভৃতি।
উপরোক্ত শব্দগুলো বাঙালি সর্বসাধারণ হরহামেশা এন্তার ব্যবহার করে বলে তা বাংলা ভাষার সাধারণ শব্দ-সম্পদে পরিণত হয়। বাংলা ভাষায় খুব সহজ ও স্বাভাবিকভাবেই তা আত্মীকৃত হয়। অন্যকথায়, এসব শব্দকে বিদেশী শব্দ বলে পরিহার করলে বাংলা ভাষাই হীন-দরিদ্র হয়ে পড়বে এবং বাঙালির ভাব প্রকাশও দুঃসাধ্য হয়ে পড়বে। তাই এসব শব্দকে এখন আর বিদেশী শব্দ মনে করাই অযৌক্তিক। যা সহজ-স্বাভাবিকভাবে আমাদের ভাষায় আত্মীকৃত হয়েছে এবং জনগণ যা সহজভাবে গ্রহণ করেছে প্রকৃতপক্ষে তা-ই আমাদের ভাষার সাধারণ সম্পদে পরিণত হয়েছে। এভাবে পরিগ্রহণ ও আত্মীকরণের মাধ্যমেই ভাষা সমৃদ্ধ ও প্রাণবান হয়ে ওঠে। বাংলা ভাষাও এভাবে নিঃসন্দেহে উপরোক্ত এবং অনুরূপ শব্দ সম্পদ গ্রহণ করে ক্রমান্বয়ে সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছে।
চতুর্থত, ধর্মীয় পরিভাষা হিসাবে যে সব শব্দ এসেছে তা বিশেষভাবে বাঙালি মুসলমানের মধ্যে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত ও একান্ত পরিচিত হলেও সাধারণভাবেও তার একটা পরিচিতি ও গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। বাঙালি মুসলমান সমাজে এগুলো অপরিহার্য শব্দ হিসাবে বিবেচিত ও ব্যবহৃত। সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি যেহেতু মুসলমান সেহেতু এসব শব্দকে সাধারণভাবে বাংলা ভাষার শব্দ-সম্পদ হিসাবেই গণ্য করা বাঞ্ছনীয়। তাছাড়া, বাংলা ভাষায় এসব শব্দের কোন বিকল্প বা উপযুক্ত প্রতিশব্দ নেই। সর্বোপরি, এসব শব্দ ইসলামী বা মুসলমানী বা মুসলিম সংস্কৃতির পরিচয়-জ্ঞাপক হওয়ার কারণে সাংস্কৃতিক দিক থেকেও এর গুরুত্ব অপরিসীম। এ জাতীয় কিছু শব্দের একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা নিচে নমুনা হিসাবে পেশ করা হলো :
আল্লাহ, আক্দ, আকীকা, আওলিয়া, আখলাক, আখিরাত, আযান, আমল, আম্বিয়া, ইবাদত, ইকামত, ইজাব, ইমাম, ইসলাম, ইদ্দত, ইনসাফ, ইহরাম, ইহসান, ইহতিকাফ, ইলাহী, ইলহাম, ইফতার, ইস্তেখারা, ইস্তিহাদ, ইঞ্জিল, উম্মত, ওহী, ওজু, ওজীফা, ওলী, ওলিমা, ওস্তাদ, ওয়াজিব, কবর, কবুল, কলেমা, কাফ্ফারা, কারামাত, কাফন, কিতাব, কিবলা, কিয়ামত, কিয়াম, কুরআন, কুরআন খানি, কুদরাত, কুরবানী, খতিব, খতম, খোদা, গেলমান, গাজী, গায়েব, গায়রুল্লাহ, গোসল, জমজম, জবুর, জান্নাত, জাহান্নাম, জায়নামায, জিহাদ, জানাজা, জ্বীন, জুম্মা, তকদীর, তকবীর, তওবা, তাকওয়া, তারাবী, তালাক, তালকীদ, তৌহিদ, তৌরাত, দেনমোহর, দরূদ, দোয়া, দাফন, দ্বীন, দরগা, দরবেশ, দোযখ, নবী, নশর, নামায, নফল, নাত, নিয়ত, নেক, ফতোয়া, ফিতর, ফিরিশতা, ফযর, ফরয, বকরীদ, বন্দেগী, বান্দা, বিসমিল্লাহ খানি, বেদআত, বেহেশত, বেঈমান, বিতর, মকতব, মকরূহ, মওত, মওলানা, মনযিল, মরহুম, মসজিদ, মহররম, মাগফিরাত, মালায়েকা, মৌলভী, মুকতাদি, মুসাফির, মুবাল্লিগ, মুয়াজ্জিন, মেরাজ, মেহরাব, মিনার, মুনশী, মিলাদ, মুসলিম, মুসলমান, মোসলমানী, মোল্লা, মোবা, মুর্শিদ, যাকাত, যবেহ, যিকির, রওজা, রব, রমজান, রসূল, রুসুমাত, রোজা, রোজ কিয়ামত, রূহ, সওম, সদকা, সবর, সালাত, সুন্নাত, সেহরী, শহীদ, শয়তান, শাহাদাত, শির্ক, হজ্জ, হাজী, হারাম, হালাল, হিজাব, হাবিয়া, হাশর, হামদ, হাদিস, হিজরী, হিজরত, হুর ইত্যাদি।
এসব শব্দের সাথে ইসলামের বুনিয়াদী বিশ্বাস, বিধি-বিধান, আমল-আখলাক ইত্যাদির সম্পর্ক রয়েছে। তাই বাঙালি মুসলমান অবশ্যম্ভাবীরূপে এসব শব্দের সাথে শুধু পরিচিত নয়, দৈনন্দিন জিন্দেগীতে হরহামেশাই তা বেশুমার ইস্তিমাল করে থাকে। এসব শব্দের মধ্যে এমন অনেক শব্দ রয়েছে, প্রকৃতপক্ষে তার কোন বাংলা প্রতিশব্দ নেই। এসব শব্দ তাই ইসলামী ধ্যান-ধারণা ও বিশ্বাসের সাথে ওতঃপ্রোতভাবে জড়িত। এসব শব্দ সেদিক থেকে ইসলামী সংস্কৃতিরও অপরিহার্য অনুষঙ্গ। ফলে এক সময় বাঙালি মুসলমান এসব শব্দ ব্যবহারে অত্যন্ত যতœবান ছিলেন। সাধারণ বাঙালি মুসলিম সমাজে সহজ-স্বাভাবিকভাবে এসব শব্দ ব্যবহৃত হয়ে আসছে। কিন্তু অধুনা এক ধরনের তথাকথিত বুদ্ধিজীবী ও সংস্কৃতিসেবী এসব শব্দের তাৎপর্য উপলব্ধি না করে এসব শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ ব্যবহারের অপচেষ্টা শুরু করেছেন। ফলে আমাদের বিশেষ আক্বীদা বা ধারণা-বিশ্বাস ও সংস্কৃতির যে তাৎপর্যময় দিক এসব শব্দে প্রকাশিত হয়, বাংলা প্রতিশব্দ ব্যবহারে তা হতে পারছে না। দু’একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি স্পষ্ট হবে। যেমন, ‘আল্লাহ’ শব্দটি আরবি এবং ইসলামের একটি বিশেষ পরিভাষা। এর প্রতিশব্দ হিসাবে ইংরাজিতে ‘গড’, বাংলাতে ‘ঈশ্বর’, ‘ভগবান’, ‘বিধাতা’ ইত্যাদি শব্দ রয়েছে। কিন্তু ‘আল্লাহ’ শব্দের যে অর্থ ও তাৎপর্য তা এর কোন একটি শব্দের দ্বারাও সম্যক উপলব্ধি করা যায় না। ‘আল্লাহ’ শব্দের লিঙ্গ ভেদ বা বচনভেদ নেই, এটা একটি মৌলিক শব্দÑ কোনভাবেই যা ভাষান্তরিত করা সম্ভব নয়। কিন্তু উল্লিখিত শব্দগুলোর মধ্যে লিঙ্গভেদ ও বচনভেদ আছে। অতএব, ‘আল্লাহ’ শব্দের কোন প্রতিশব্দ, অনুবাদ, বা বিকল্প হতে পারে না, ‘আল্লাহ’ শব্দের সাথে ‘তৌহিদ’ শব্দের যে অর্থ ও তাৎপর্যগত সম্পর্কÑ তাও অন্য কোন শব্দের দ্বারা সম্যক উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। বরং অন্য সব শব্দ তৌহিদের বিপরীতÑ শির্কের সাথে সেগুলোর সম্পর্ক রয়েছে। অতএব, তৌহিদে বিশ্বাসী কোন মানুষেরই ‘আল্লাহ’ শব্দের কোন বিকল্প খুঁজে বের করার চেষ্টা করা উচিত নয়।
এভাবে ইসলামের পরিভাষামূলক অনেকগুলো শব্দ রয়েছে যার সাথে ইসলামী ধারণা-বিশ্বাস ও সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক বিদ্যমান এবং এসব শব্দের দ্বারা ইসলামী সংস্কৃতি পরিচয় সুস্পষ্ঠ হয়ে ওঠে। উদাহরণস্বরূপ এখানে কয়েকটি শব্দের উল্লেখ করা যায়। যেমন, ইবাদত, ইন্তিকাল, ওজু, ওহী, কুরবানী, জিহাদ, তওবা, তৌহিদ, দ্বীন, মরহুম, মাগফিরাত, মে’রাজ, মেহরাব, মুসলিম, রব, রাসূল, সওম, সালাত, শহীদ ইত্যাদি। এ সবগুলো শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ বা অর্থ আজকাল করার অপচেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু উপরোক্ত শব্দগুলোর মধ্যে যে ধর্মীয় তাৎপর্য ও বিশেষ ইসলামী ধারণা-বিশ্বাস বিদ্যমান তা এর প্রতিশব্দের মধ্যে খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়। যেমন ‘ইবাদত’ শব্দের অর্থ করা হয় পূজা, উপাসনা ইত্যাদি। ‘ইন্তিকাল’ শব্দের অর্থ করা হয় মৃত্যু, দেহত্যাগ ইত্যাদি। ‘ওহী’ শব্দের অর্থ করা হয় প্রত্যাদেশ, ‘ওজু’ শব্দের অর্থ করা হয় হস্ত-পদ ধৌতকরণ, ‘কুরবানী’ শব্দের অর্থ করা হয় ‘পশু হত্যা’, ‘জিহাদ’ শব্দের অর্থ ধর্ম-যুদ্ধ, ‘তৌহিদ’-এর অর্থ একেশ্বরবাদ, ‘দ্বীন’-এর অর্থ ধর্ম, ‘মাগফিরাত’-এর বাংলা প্রতিশব্দ করা হয় স্মৃতি-তর্পণ। ‘রোযা’ বা ‘সওম’-এর অর্থ বা প্রতিশব্দ করা হয় উপবাস, ‘শহীদ’-এর অর্থ জীবনদান ইত্যাদি। এসব প্রতিশব্দ বা অর্থের দ্বারা ইসলামের যে বিশেষ তাৎপর্য ও ভাব-সঙ্গতি তা রক্ষিত হয় না। এসব শব্দের দ্বারা শুধু ইসলামের ধারণা-বিশ্বাসের যেমন প্রতিফলন ঘটে, তেমনি ইসলামী সংস্কৃতির পরিচয়ও বিদ্ধৃত হয়। উপরোক্ত পরিভাষাসমূহ ইসলামী জীবনবোধ ও সংস্কৃতির পরিচয় বহন করে। তাই সেগুলোর অনুবাদ বা প্রতিশব্দের দ্বারা ইসলামী জীবনবোধ ও সংস্কৃতির পরিচয়কে বিকৃত করা হয়। তাছাড়া, উপরোক্ত পরিভাষাসমূহের অনুবাদ বা প্রতিশব্দ খোঁজার আদৌ কোন প্রয়োজন নেই। কারণ, সেগুলো বাঙালি মুসলমানের নিকট অতিশয় পরিচিত এবং ব্যবহারিক জীবনে সেগুলো ব্যাপকভাবে সকলের মধ্যে প্রচলিত রয়েছে এবং এর দ্বারা ইসলামী সংস্কৃতি পরিচয় সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে।
উপরোক্ত প্রতিটি পরিভাষাই ব্যাপক অর্থবোধক ও বিশেষ তাৎপর্যবহ। এর সাথে ইসলামের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও কোন কোন ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটও জড়িত। যেমন ‘ইবাদত’ শব্দের দ্বারা পূজা-অর্চনা-উপাসনা নয়, বরং এর প্রকৃত অর্থ আল্লাহর হুকুম মানা। এ হুকুম মানা শুধু নামায, রোযা, হজ্জ-যাকাতের ক্ষেত্রে নয়, জীবনের সকল ক্ষেত্র, সকল কাজে আল্লাহর হুকুম যথাযথভাবে পালন করার নামই ইবাদত। এভাবে ‘ওহী’র অর্থ শুধু প্রত্যাদেশ বললেই হবে না, স্রষ্টার পক্ষ থেকে তাঁর বিশেষ মনোনীত ব্যক্তির (রাসূল) মাধ্যমে মানবজাতির জন্য যে শাশ্বত নির্দেশনা বা হুকুম-আহ্কাম অবতীর্ণ হয়েছে, তারই নাম ওহী বা ওয়াহী। ‘ওজু’ও তেমনি নিছক হাত-পা ধৌত করার নাম নয়, মহান প্রভুর সান্নিধ্যে উপস্থিত হওয়ার জন্য দৃঢ় সংকল্প ও পবিত্র ইরাদা নিয়ে নির্দিষ্ট নিয়মে বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ পরিষ্কার-পরিছন্ন করার নাম ওজু। ‘ইন্তিকাল’-এর যথার্থ অর্থ হলো স্থানান্তর, ইহলোক থেকে পরলোক বা আখিরাতে গমন। এর সাথে আখিরাতের প্রতি বিশ্বাস এবং জীবনের শেষ পরিণতির বিষয় সুস্পষ্ট হয়। ‘মাগফিরাত’-এর বাংলা প্রতিশব্দ করা হয় স্মৃতি-তর্পণ। অথচ মাগফিরাত অর্থ মৃত ব্যক্তির রূহের শান্তি কামনায় দোয়া-খায়ের করা বুঝায়, বাংলা প্রতিশব্দে তা বুঝায় না। এভাবে প্রত্যেকটি পরিভাষারই এক নির্দিষ্ট অর্থ, তাৎপর্য ও সাংস্কৃতিক দিক রয়েছে, যা বাংলা প্রতিশব্দে ঠিক মত প্রকাশ পায় না বা প্রকাশ করা সম্ভব নয়। নিচের বর্ণনা থেকে বিষয়টি স্পষ্ট হবে :
একজন বাঙালি মুসলমান সুব্হে সাদিকে মুয়াজ্জিনের আযানের মধুর আওয়াজ শুনে ঘুম থেকে জেগে ওজু করে মসজিদে গিয়ে জামায়াতের সাথে ফযরের ফরয সালাত (নামায) আদায় করে। সালাত শেষে আল্লাহর কাছে দোয়া করে খানিকক্ষণ কুরআন তিলাওয়াত করে মসজিদ থেকে বের হয় এ দোয়া পড়ে যে, ‘আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকা মিন ফাদলিকা’Ñ অর্থাৎ আমি আল্লাহর কাছে রহমত ও রিযিক কামনা করছি। এরপর নাশ্তা খেয়ে ‘বিসমিল্লাহ’ বলে দিনের কাজ শুরু করে।
উপরোক্ত বর্ণনার মধ্যে বিশেষ কয়েকটি আরবি-ফারসি শব্দ (যা বাঙালি মুসলমান হর-হামেশা ব্যবহার করে ও বুঝতে পারে) ব্যবহার করে একজন সাধারণ বাঙালি মুসলমানের যে বিবরণ দেয়া হয়েছে এবং তার দ্বারা তার যে বিশেষ সাংস্কৃতিক জীবন-চিত্র ফুটে উঠেছে, ঐসব আরবি-ফারসি শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ ব্যবহার করে তা কখনো ফুটিয়ে তোলা সম্ভব নয়।
এমনিভাবে, একজন বাঙালি মুসলমানের ঘরে সদ্যজাত শিশুর কানে আযান দেয়া থেকে শুরু করে তার সুন্দর নাম রাখা, আকীকা করা, খৎনা করা, বিসমিল্লাহ খানি করা বা কুরআনের ছবক দেয়া, নামায-দোয়া, ওজু-গোসল, পাক-নাপাক, হালাল-হারাম শেখানো, আকদ্-রুসুমত, এমনকি, ইন্তিকালের পর কাফন-দাফন-জানাজা, দোয়ায়ে মাগফিরাত, কুলখানি ইত্যাদি সব ক্ষেত্রেই বিশেষ মুসলমানী পরিভাষা রয়েছে যা মূলত আরবি-ফারসি শব্দ হলেও বাঙালি প্রতিটি মুসলমান তার অর্থ বোঝে এবং ব্যবহার করে। আজকাল একশ্রেণির শিক্ষিত মুসলমান আমাদের ‘মরহুম’দের ‘প্রয়াত’ বলেন, মৃত ব্যক্তির লাশের ‘গোসল-কাফন-দাফন-জানাজা’ না করে ‘মৃতের সৎকার’ করেন, ‘দোয়ায়ে মাগফিরাত’ না করে কিছুক্ষণ বোবার মত নীরবে দাঁড়িয়ে ‘স্মৃতি-তর্পণ’ করেন।
অথচ এসব আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে যে ধর্মীয় ভাব-গাম্ভীর্য্য, পবিত্রতা ও জীবন-দর্শন রয়েছে এবং সর্বোপরি এর মাধ্যমে বাঙালি মুসলমানের যে সাংস্কৃতিক জীবনধারার পরিচয় আবহমান কাল থেকে সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে তা আজ সংকটের মুখে। আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি আজ বিজাতীয় অপসংস্কৃতির আগ্রাসনে বিক্ষত। ধর্মীয় বিশ্বাসের ভিত্তিতেই একটি বিশেষ সংস্কৃতির উদ্ভব ঘটে। সাংস্কৃতিক সত্তার মূলে আঘাত হানলে ক্রমান্বয়ে তা ধর্মীয় মূল বিশ্বাসেও ধ্বস নামায়। ফলে ক্রমান্বয়ে একটি জাতির স্বতন্ত্র সত্তা বিনষ্ট হয়। অথচ আমরা কেউ বুঝে এবং অনেকেই না বুঝে এ আত্মঘাতি পথে পা বাড়িয়েছি। যারা বুঝে-শুনে এটা করছেন তারা নিশ্চয়ই সুপরিকল্পিতভাবে আমাদের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ সংস্কৃতি ও ধর্মকে বিক্ষত করার অপচেষ্টায় লিপ্ত। তাদের এটা জানা আছে যে, একটি জাতির আত্ম-পরিচয়ের জন্য তার স্বকীয় বৈশিষ্ট্যপূর্ণ সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য অপরিহার্য। এর অবর্তমানে জাতি আত্ম-পরিচয়হীন হয়ে পড়ে। আত্ম-পরিচয়হীন জাতি স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার অযোগ্য বিবেচিত হয়। আর আমাদের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে বলতে গেলে, বাঙালি মুসলমানের স্বকীয় বৈশিষ্ট্যপূর্ণ সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যই আমাদের জাতীয়তার মূলভিত্তি, এর ভিত্তিতেই ইংরাজ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘ স্বাধীনতা সংগ্রাম, সাতচল্লিশে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা ও একাত্তুরে রক্তাক্ত সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়।
অতএব, এ স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক চেতনা মুছে ফেলার চেষ্টা আত্মঘাতিরই নামান্তর। বাঙালি মুসলমানের যেমন একটি ভৌগোলিক পরিচয় রয়েছে, তেমনি রয়েছে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয়। রয়েছে এক গৌরবোজ্জল ইতিহাস-ঐতিহ্য। এর কোন একটিকে বাদ দিয়ে বাঙালি মুসলমানের পরিচয় সম্পূর্ণ হতে পারে না। তার অস্তিত্ব রক্ষা ও আত্ম-পরিচয়ের জন্য এ দু’টোই অপরিহার্য। এর ভিত্তিতেই বাংলাদেশের স্বাধীন-সার্বভৌম অস্তিত্ব গড়ে উঠেছে এবং এ ভিত্তি মজবুত করার উপরই আমাদের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব সুরক্ষিত হতে পারে, আত্ম-সম্ভ্রম ও মর্যাদাবোধ সমুন্নত হতে পারে এবং জাতির ভবিষ্যত সম্ভাবনা উজ্জ্বলতর হয়ে উঠতে পারে। তাই এ ব্যাপারে আমাদেরকে বিশেষভাবে সজাগ ও সচেতন হতে হবে।
যারা জেনে-বুঝে এ আত্মহননের পথে অগ্রসর হচ্ছেন, তারা বাঙালি সংস্কৃতির দোহাই দিয়ে থাকেন এবং বাংলা ভাষার প্রতি অতিভক্তির পরিচয় দিতে উদগ্রীব। তাদের অবগতির জন্য বলা দরকার যে, ‘বাঙালি সংস্কৃতি’ বলে নির্ভেজাল কোন সংস্কৃতি এদেশে কোন কালে ছিল না এবং এখনো নেই। এদেশে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সংস্কৃতি বিদ্যমান ছিল এবং আছে। এগুলো হলো বৈদিক সংস্কৃতি, আর্য সংস্কৃতি, অনার্য সংস্কৃতি, জৈন সংস্কৃতি, বৌদ্ধ সংস্কৃতি, হিন্দু সংস্কৃতি, মুসলিম সংস্কৃতি ইত্যাদি। এছাড়া, অন্য আর এক ধরনের সংস্কৃতি সর্বদাই পরিলক্ষিত হয়েছে তা হলো সংকর সংস্কৃতি বা মিশ্র সংস্কৃতি।
একথা ঐতিহাসিকভাবে সত্য যে, সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি মুসলমান হওয়ায় এবং তাদের সংস্কৃতি উপমহাদেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠি থেকে স্বতন্ত্র ও সুস্পষ্ট বৈশিষ্টসম্পন্ন হওয়ায় তারা বৃহত্তর জনগোষ্ঠির পৌত্তলিক সংস্কৃতির অস্বচ্ছ সরোবরে অবগাহিত হয়ে আত্মবিলুপ্তি ঘটাতে চায়নি। তাই তারা তাদের সাংস্কৃতিক জীবনধারা অব্যাহত রাখার অপরিহার্য তাগিদেই ভারত বিভক্ত করে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা করেছে এবং তারই চূড়ান্ত পরিণতি বর্তমান বাংলাদেশ।
অতএব, ‘বাঙালি সংস্কৃতি’র দোহাই দেবার কোন অবকাশ নেই। ইংরাজ আমলে উপমহাদেশের মুসলমানদের আযাদী সংগ্রাম, মীর কাশিমের বিদ্রোহ, ফকির আন্দোলন, ফরায়েজী আন্দোলন, তিতুমীরের সশস্ত্র প্রতিরোধ, সিপাহী বিদ্রোহ, খেলাফত আন্দোলন, পাকিস্তান আন্দোলন ইত্যাদি আন্দোলন-সংগ্রামের মাধ্যমে ১৯৪৭-এ পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা এবং পরবর্তীতে ১৯৭১ সনে রক্তাক্ত মুক্তিযুদ্ধের ফলে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যূদয়Ñ এ সবের পেছনে মুসলমানদের ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও জাতীয় স্বতন্ত্র-চেতনা এককভাবে ক্রিয়াশীল। স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব অক্ষুণœ রাখা ও সংহত করার অপরিহার্য তাগিদে আমাদের এ স্বাতন্ত্র্য-চেতনাকে দৃঢ়বদ্ধ করতে হবে। অন্যথায় জাতীয়তার মূলভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়তে বাধ্য।
বাংলা ভাষার প্রতি অতিভক্তি প্রদর্শনকারীদের জানা থাকার কথা যে, ব্রাহ্মণ সেন আমলের ‘রৈরব’ নামক নরকের ভয়ে যারা বাংলা ভাষা-সাহিত্য চর্চা থেকে দূরে ছিল, মুসলিম শাসনামলে তারাই মুসলিম রাজা-বাদশাহদের পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে মৃতপ্রায় বাংলা ভাষার চর্চায় আত্মনিয়োগ করে। বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে হিন্দিকে উপমহাদেশের সাধারণ ভাষা (খরহমঁধ ঋৎধহপধ) হিসাবে গ্রহণ করার জন্য মোহনচাঁদ করমচাঁদ গান্ধী, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ডক্টর সুনীতকুমার চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ হিন্দু নেতাদের জোর দাবি উত্থাপিত হয়, তখন সৈয়দ নবাব আলী চৌধুরী, ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, আব্দুল করিম সাহিত্য-বিশারদ, মাওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ প্রমুখ মুসলিম নেতৃবৃন্দ বাংলাকে ভারতের সাধারণ ভাষা করার জন্য যুক্তিপূর্ণ জোর দাবি উত্থাপন করেন। সাতচল্লিশে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসাবে প্রতিষ্ঠার জন্য বাঙালি মুসলমানেরাই আন্দোলন-সংগ্রাম করেছে এবং প্রাণ দিয়েছে। ১৯৯৯ সনেও কতিপয় বাঙালি মুসলিম যুবকের দাবির কারণেই ২১ ফেব্রুয়ারি ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসাবে স্বীকৃতি লাভ করেছে।
অতএব, যাদের হাতে নবজš§, যাদের হাতে বিকাশ, যাদের রক্তের বিনিময়ে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা লাভ এবং যাদের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন, তাদের হাতেই বাংলা ভাষার সর্বোচ্চ নিরাপত্তা, সংরক্ষণ ও সুবিকাশ নিশ্চিত হতে পারে, তাতে সন্দেহের বিন্দুমাত্র অবকাশ নেই। তাই ষড়যন্ত্রকারীদের দুরভিসন্ধি বানচাল করে মাতৃভাষার সুবিকাশ ও যথাযথ মর্যাদা বিধানে আমাদের সচেতন ও দায়িত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। এ ব্যাপারে জাতীয়ভাবে আমাদের মধ্যে গভীর আত্মপ্রত্যয় ও সচেতনতাবোধ সৃষ্টি হওয়া প্রয়োজন। এর ফলে আমাদের নিজস্ব ভাষার পরিচয় যেমন অবিকৃত থাকবে, তেমনি এ ভাষা আমাদের সংস্কৃতিরও অনিবার্য বাহন রূপে চিহ্নিত হবে।

লেখক পরিচিতি: ফররুখ গবেষণা ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি।

পূর্বের সংবাদ

«