শাহীন রায়হান
৩০ নভেম্বর, ২০১৯ | ১৮:৩৩

শাহীন রায়হান’র কবিতা

tesst

মহাকাব্যিক মা

মাকে নিয়ে একটি কবিতা লিখবো বলে-
হতবিহবল হয়ে কতকাল প্রজাপতির ডানায়
‘ম’ বর্ণটির কাল্পনিক স্বপ্ন এঁকেছি
অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থেকেছি ভোরের জানালায়
গাছের সবুজ পাতার ক্লোরোফিল ভেদ করে
নিশাচর প্রাণীর মতো হেঁটে চলেছি
নিভৃত নিশীথে।

না, ভাবনাক্লান্ত আমি
প্রকম্পিত কলমে একটিও কবিতা লিখতে পারিনি।

মাকে নিয়ে একটি কবিতা লিখবো বলে –
হৃদয়ে বর্ণমালার পাহাড় গড়েছি
প্লাকার্ড উড়িয়ে পাখির ডানায়
রাতের ঘন অন্ধকার মাড়িয়ে
ভাষা সিন্ধুকে তন্ন তন্ন করে খুঁজেছি।

না, শব্দভ্রান্ত আমি ঝলসানো হৃৎপিন্ডে
একটিও কবিতা লিখতে পারিনি।

মানব অরণ্যে প্রাণের পিরামিড
ত্যাগের ইতিহাসে অমর মহাকাব্যিক মা-কে
বর্ণ প্রত্যাখ্যাত ভাষাপাপী আমি-
কিছু পাথর বর্ণমালায় বাঁধবো কেমন করে!

আমি চলে যাবার পর

জানি
আমি চলে যাবার পর
পরিবর্তিত আবহাওয়ার মতো পাল্টে যাবে তুমি
তারা খসার মতো খসে যাবে তোমার ভালোবাসা
স্মৃতিগুলো গুম হবে হিমায়িত ডিপ ফ্রিজে।

জানি
আমি চলে যাবার পর
তোমার বন্ধ দুয়ার আবার খুলে যাবে
বিধ্বস্ত ডানায় গজাবে শুভ্র পালক
হৃদয় ব-দ্বীপে পুনর্গঠিত হবে ভালোবাসা।

জানি
আমি চলে যাবার পর
তোমার কোমল দু’হাতে মেহেদীর ভ্রুণ
গজাবে
চেহারায় জেগে উঠবে কাজল মাশকারা
সুঘ্রাণ ছড়াবে শ্যাম্পু করা চুল।

জানি
আমি চলে যাবার পর
তুমি পুনরায় কুমারী হবে
কিন্তু চরিত্রহীন লম্পট হবো আমি।

রক্তাক্ত কুমারিত্ব ও কতগুলো বুক ভাঙা আর্তনাদ

রাতের দেয়ালে ঠেস দিয়ে এখনও দাঁড়িয়ে আছে
বুক ভেঙে বেড়িয়ে আসা কতগুলো রক্তাক্ত আর্তনাদ।
এক অনাবৃত ক্ষত বিক্ষত বৃন্তচ্যুত অপরূপ
দেহের স্থায়ী বাসিন্দা ছিলো ওরা।

দেহটা ছিলো বিনম্র লাজুক মাধবীলতা
তার স্বপ্ন ছিলো ঝর্ণার মতো উচ্ছল মনটা ছিলো
বাতাসের মতো দূরন্ত।
ছিলো মহাপ্রাচীরের মতো কুমারিত্ব এভারেস্টসম
উচ্চতায় অনন্ত যৌবনের অহংকার।
নিঃস্বার্থ বাঁচা বাঁচানোর স্বপ্নে বিভোর
আগামীর সম্ভাবনাময়ী রাজকন্যা।
.
আজ-ও স্বপ্ন অবরুদ্ধ এক কফিনবদ্ধ লাশ
যার কুমারিত্ব বিবস্ত্র যৌবন ভূ-লুন্ঠিত
প্রতিবাদী ঠোঁটে হিংস্রতার অগণিত দাগ।
দেহটা দুর্বিনীত ঘাতকের পাশবিকতায় ক্ষত -বিক্ষত
এক বিক্ষিপ্ত বিরাণভূমি।

দেবদাস

রাতের প্রিয়তম অন্ধকার মুছে ক্লান্ত রোদে ডানা মেলেছে অচেনা উন্মুক্ত শহর
ধাবমান ট্রেনের ঝুলন্ত বগিতে নিরুদ্দেশ যাত্রীর মতো
অফুরন্ত ভালোবাসার আনাগোনা বেড়েই চলেছে।

তোমার নিষ্পলক দুটি চোখে চৈতালী প্রেমের অসমাপ্ত কাব্য
ভালোবাসার নীলাভ সবুজ আভায় মুখচ্ছবির মতো
জেগে উঠেছে রৌদ্রস্নাত সুনীল আকাশে।

আমার প্রেমময় প্রশান্ত হৃদয়ে চিরসুন্দরের অমর মহাকাব্য-
আমার পার্বতী তখন শুধুই তুমি।
নিষিদ্ধ দিনের অফুরন্ত ক্লান্তিতে দীঘল রাতের ধূসর স্বপ্নে
অবিরল বিষাদে ক্ষুতার্ধ ভালোবাসায় ধ্যানে জ্ঞানে অভিমানে
শুধুই তোমার জেগে থাকা মুখশ্রী।

আজ তুমি নেই
তবু তোমার কামনার মদে রঙিন কাগজের পসরা সাঁজাই
প্রেমের প্রচ্ছন্ন বারুদে নিজেই নিজেকে পোড়াই
নিজেই নিজকে বলি পারুর দেবদাস।

ছলনার শোপিচ

প্রতীক্ষার জানালায় এখন আর সোনালী সূর্যটা দেখি না
অবিরল বৃষ্টিতে ধুয়ে গ্যাছে গাছের সবুজ
তবু পুরনো ইচ্ছেগুলো নিঃশব্দে কড়া নাড়ছে
সমাধিত প্রেমের ঘুমন্ত দরোজায়।

ডুবে যাওয়া চাঁদ অভিযাত্রীর মতো এক মনে হেঁটে চলেছে
অবাধ্য অন্ধকার মাড়িয়ে নিভৃত ভালোবাসার নিরুত্তাপ সীমান্তে।
যেখানে বিরহী কাঁটাতার বিভক্তির চিহ্ন এঁকে দিয়েছে প্রিয়তম মরুদ্যানে।

অস্ফুট ভালোবাসায় জেগে ওঠা বকুল গাছটা এখন আর নেই
কাঁকর রঙা মালাটা সেই কবে ছিঁড়ে গ্যাছে
পাঁজর ভাঙা দূরন্ত বাতাসে।

শুধু পড়ে আছে কুয়াশা কাতর মৃদু অন্ধকারে রক্তাক্ত ছলনায়
তোমার ফেলে যাওয়া হতভাগ্য পুরনো শোপিচটা।

অতঃপর নিসর্গ

শুধুই শাপ এসে জমা হয় বুকের কফিনে
ওরা যেন নিরুদ্দেশ দ্রুতগামী মাল ট্রেন
বিষাদের ছায়া মাড়িয়ে পাঁজর ভেঙে ভেঙে আসে
আবার সীমারের মতো রক্তাক্ত করে
ঘুরে ঘুরে চলে যায়-
তারপর নিঃস্তদ্ধ আমি পরিত্যাক্ত বর্জের মতো পরে থাকি
তোমার প্রেমময় বিষণ্ন উঠোনে।

শুধুই শাপ এসে জমা হয় বুকের কফিনে
তারপর নগ্ন হৃৎপিণ্ড ধমনী শিরায়
লোহিত শ্বেত অনুচক্রিকা ভেঙে ভেঙে এঁকে দেয়
তোমার অমোছনীয় নগ্ন প্রতিচ্ছবি।

এ শাপ এখন শুধুই অভিশাপ
যা অনবরত বিদীর্ণ করে আমাকে।
তাকে ফেলে দিয়েও ফেলতে পারি না
উম্মাদের মতো বারবার ছুঁয়ে দেখি ভিতর বাহির।
অতঃপর নিসর্গ ভেবে এক সমুদ্র ভালোবাসায়
রেখে দিই বুকপকেটে।

রিসাইকেল বিন

ইদানিং হারিয়ে যাওয়া স্বপ্নগুলো নিউরন কোষে
উন্মাদ হয়ে ঘুরে বেড়ায়
প্রতিনিয়ত প্রেমময় নীল যন্ত্রণায় ভূগী
হৃদয় শ্মশানে অতীত সুখানুভূতির
এক ব্যর্থ দামাল ঘোড়া উষ্ণ শ্বাস-প্রশ্বাসের বুদবুদে ডুবে যায় অবিরাম।

নিঃস্ব আমি অবাঞ্ছিত চিন্তার পরাজিত মসনদে-
তোমার চির অমর ভালোবাসার
রিসাইকেল বিনে তোমাকে হাতড়ে বেড়াই
কামনার শরাবে।

বিষয়সমূহঃTags:

পূর্বের সংবাদ

«