স্টিফেন ভিনসেন্ট বেনেট অনুবাদ : মাহমুদ বিন হাফিজ
১ মে, ২০১৯ | ০৫:৪৫

শয়তানের সাথে এক রাত

tesst

লেখক Stephen Vincent Benet এমন একটি পরিবারে জন্মেছেন যারা আমেরিকার ভাষা প্রতিষ্ঠার জন্য পরিচিত। তিনি জন্মগ্রহণ করেন ১৮৯৮ সালে। সতের বছর বয়স থেকে Stephen একজন স্বীকৃত কবি। আর দশজন তরুণ লেখকের মতো না হয়ে অচিরেই তিনি প্রমাণ করে দিলেন, তার সাহিত্যকর্ম বাস্তব ও আসল। তাঁর অসামান্য প্রতিভা বিকশিত হয়েছে তাঁর গল্পে, উপন্যাসে যেমন The Beginning of The Wisdom Ges Spanish Bayonet বিভিন্ন কাব্যগ্রন্থে এবং শেষে ভিন্ন আঙ্গিকে উপস্থাপিত Civil War এর মহাকাব্যে একটা বিজয়ন্মত্ব নিখুঁত কাব্যিক বর্ণনা, শক্তিশালী অনুভূতিশীলতা, আবেগঘন গতিময়তা Jon Brown’s Body.
The Devil and Daniel Webster প্রথম প্রকাশিত হয় Saturday Evening Post নামক মেগাজিনে। তখনই এটি একটি অসামান্য কৃর্তীরূপে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এ গল্পের জন্য তিনি O. Henry Memorial Award Committee কর্তৃক বছরের প্রথম পুরষ্কার লাভ করেন। ইতমধ্যে এটি আমেরিকার একটি উপকথারূপে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এটিকে নির্ভর করে All That Money Can Buy নামে একটা আবেগঘন চলচিত্র নির্মিত হয়েছে।
মানবীয় কল্প-বিশ্বাসপূর্ণ এ রসঘন উপকথা যে দানিয়েল ওয়েবস্টারের চিত্রের যোগান দেয় তা প্রকৃত সত্য থেকে বেশী দূরে নয়। তার সময়ে তার মত শক্তিশালী বক্তা একজনও ছিল না। তার চেহারা ও শরীর সবার মনে ত্যাজকৃয়তা ছড়াত যেন। ইংরেজ ব্যক্তি Carlyle লিখেছিলেন তাঁর বন্ধুকে, “বেশিদিন হয়নি, নাস্তার টেবিলে একদিন দেখেছি বিখ্যাতদের বিখ্যাত ব্যাক্তি দানিয়েল ওয়েবস্টারকে। আসলেই তিনি স্মরণকালের উদাহরণ। সমগ্র বিশ্বকে বলতে পার, এই আমাদের ইয়াংকি ইংলিশম্যান, এরকম বাহুই আমরা ইয়াংকির মাটিতে তৈরী করি। (সংকলকের ভূমিকা থেকে)

১.
সীমান্ত অঞ্চলে, যেখানে মেসাচ্যুসেট নিউ হ্যাম্পশায়ারের সাথে মিলিত হয়েছে সেখানে সবাই গল্পটা বলে। দানিয়েল ওয়েবস্টার ইহলোক ত্যাগ করলেন। তারা তাকে সমাহিত করল। কিন্তু মার্শফিল্ডের চারদিকে ঝড়োহাওয়া বয়। তারা বলে, আকাশের মধ্যে তাঁর কাঁপা কাঁপা কণ্ঠ শোনা যায়। তারা আরও বলে, যদি কেউ তার কবরস্থানে পরিষ্কার কণ্ঠে চিৎকার করে ডাকে, “দানিয়েল ওয়েবস্টার! দানিয়েল ওয়েবস্টার!!” তখন ভূমি কাঁপতে শুরু করে, গাছগাছালী অর্ধবৃত্তাকারে দুলতে থাকে। কিছুক্ষণ পরে একটা গম্ভীর কণ্ঠকে বলতে শোনা যায়, “প্রতিবেশী! ইউনিয়নের কী অবস্থা?” তখন সুন্দরতম উত্তরটা হল, “ইউনিয়ন তেমনই আছে যেমন পূর্বে ছিল। তামার পাতের মতো কঠিন ভিত্তির ওপরÑ এক এবং অবিভাজ্য।”
তিনি দেশের একজন মহান ব্যক্তি ছিলেন। তিনি কখনো রাষ্ট্রপতি হতে পারেননি। তবুও তিনি মহাপুরুষ ছিলেন। হাজার হাজার মানুষ খোদার সার্বোভৌমত্বের পর তাঁর প্রতি অনুগত ছিল। তারা তাঁর সম্পর্কে এবং তাঁর সম্পর্কিত সব কিছু নিয়ে গল্প করত যেভাবে মানুষ গল্প করে প্রাচীন নেতা যেমন ইব্রাহীম, ইসহাক এঁদের নিয়ে। তারা বলত তিনি যখন কথা বলার জন্য দাঁড়াতেন, আকাশের তারকারা তখন বাইরে বেরিয়ে আসত। তিনি একবার একটা নদীকে ময়লার নর্দমা বানিয়ে দিয়েছিলেন। তারা গল্প করত, তিনি যখন তাঁর মাছ ধরার ছিপ নিয়ে বের হতেন জলাশয়ের পাশ দিয়ে, তখন মাছেরা তাঁর থলির মধ্যে নিজে নিজেই লাফিয়ে উঠে আসত। কারণ তারা জানত তাঁর বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা বৃথা। তিনি যখন কোন মামলা লড়তেন তখন দেবতাদের সুর এমনকি ভূমিকম্পকেও পরিবর্তন করে দিতে পারতেন। তিনি একজন দয়ালু মানুষ ছিলেন। মার্শফিল্ড ছিল তাঁর কাছে খুবই প্রিয় স্থান। তিনি যে মুরগীর মাংস উৎপাদন করতেন সেগুলো পায়ের গোড়ালীতক খাঁটি ছিল। আপন সন্তানের মতো গরুগুলোকে পালতেন। তাঁর একটা বড় মেষ ছিল। তিনি ডাকতেন গোলিয়েথ, শিংগুলো সকালের ধুসর আঙ্গুর গাছের মতো পাকানো। সে লোহার কপাট গুতিয়ে ছিদ্র করতে পারত। দানিয়েল ওয়েবস্টার আর দশজনের মত এক কৃষকই ছিলেন না। তিনি মাটির গন্ধ বিষয়েও অবগত ছিলেন। তিনি রাতে মোম হাতে ঘুরে ফিরে দেখতেন করার মতো কোন কাজ আছে কিনা। দানিয়েল ওয়েবস্টার ছিলেন দক্ষ ঘ্রাণেন্দ্রিয় সম্পন্ন। পাহাড়ের মত উঁচা কপাল ছিল তার, চোখ ছিল যেন জ্বলন্ত কয়লা। সবছে বড় যে মামলা তিনি লড়েছেন সেটি কোন আইনের কিতাবে লেখা ছিল না। কারণ এটা তিনি লড়েছেন শয়তানের বিরুদ্ধে। মামলাটি কোন আদালতে উঠেনি আর তা ছিল অলৌকিক। গল্পটা ছিল এরকম:

লোকটা নিউ হ্যাম্পশায়ারের ক্রসকর্নারে বাস করত। নাম জাবেজ স্টোন। শুরু থেকেই লোকটা খারাপ ছিল না কিন্তু দুর্ভাগা। তার বোনা ফসলগুলো সবসময় রোগ বালাইতে নষ্ট হয়ে যেত। যেমন তার মোটা আর সবল হাঁটুওয়ালা ঘোড়াটাই হয়তো মারাত্মকভাবে পাগল হয়ে যেত আর সেটি দিয়ে দিতে হত বিনে পয়সায় প্রতিবেশীকে। এরকম সুযোগ সুবিধা ভোগ করার মতো লোকেরও অভাব ছিল না। এমন করতে করতেই একসময় জাবেজ স্টোনের দুর্ভাগ্য চুড়ান্ত আকার নিল। সেদিন সে সকাল থেকেই জমি চাষ করছিল আর হঠাৎ করেই একটা বড় পাথরে লেগে তার লাঙলের ফলা ভেঙ্গে গেল। গতকালও সে পাথরটা এখানে দেখতে পায়নি। আর যখন সে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে লাঙলের ফলা দেখছিল তখনই ডান পাশের ঘোড়াটা কাশতে শুরু করল; আঠার মতো কাশি, যার অর্থ অসুস্থতা তারপর ঘোড়ার ডাক্তার। দু’টি শিশু হামে আক্রান্ত, বউ অসুস্থ আর তার নিজের আঙ্গুলে ক্ষত। এ যেন তার জন্য সবরের শেষ সীমানা। “খোদার কসম!” দিশাহীন হতাশ চোখে একবার চারদিকে তাকাল, “খোদার কসম! নিজের আত্মাকে শয়তানের কাছে বিক্রি করে দেয়ার জন্য এই যথেষ্ট। দু’সেন্টের জন্য হলেও আমি তা করতাম!”
কথা শেষ হলে সে অনুভব করল, একটা অদ্ভুত আচ্ছন্নতা তাকে ঘিরে ধরেছে। স্বাভাবিকতা সে একজন নিউ হ্যাম্পশায়ার তাই এমন শপথ তার ফিরিয়ে নেয়ার কোন ক্ষমতাই ছিল না। কিন্তু তৎসত্বেও যখন সন্ধা হয়ে গেল, তার কাছে যতদূর মনে হল, মানসিকভাবে সে স্বস্তিই অনুভব করল। অথচ সে কোন সতর্কতাই গ্রহণ করেনি। সে ছিল একজন ধর্মপরায়ণ। সতর্কতা সাধারণত সব সময়ই গ্রহণ করা হয়, আগে বা পরে, যেমন কোন পবিত্র কিতাবে উপদেশ হিসাবে লেখা থাকে।
ঠিক পরের দিন প্রায় রাতের খাবারের সময়, মৃদুভাষী, কালো পোশাক পরে এক বিদেশী সম্ভ্রান্ত ঘোড়ার গাড়ি চালিয়ে এসে জাবেজ স্টোনকে খোঁজ করল।
জাবেজ স্টোন তার পরিবারবর্গকে জানাল, লোকটি একজন আইনজীবী, তার উত্তরাধিকার সম্পত্তির বিষয়ে কথাবার্তা বলতে এসেছে। কিন্তু সেই জানত লোকটি কে। সে লোকটির দৃষ্টিকে একেবারেই পছন্দ করত না, তার দাঁত দেখানো হাসিকেও না। তার দাঁত খুবই শাদা আর প্রচুর। তার কাছে খারাপ লাগল যখন তার কুকুরটা লোকটিকে একবার মাত্র দেখে দু’পায়ের মাঝখানে লেজ গুটিয়ে চিৎকার করতে করতে চলে গেল। তাদের কথা কম বেশী কেউ শুনে ফেলবে ভেবে তারা গোলাঘরের পিছনে চলে গেল। তারা যুক্তি-পরামর্শ করে চুক্তিতে আবদ্ধ হল। জাবেজ স্টোন তার আঙ্গুল ইশারা করল সাক্ষর করার জন্য। লোকটি তাকে একটি রূপার কলম দিল। তার ক্ষত ভোজবাজির মতো শুকিয়ে গেল। শুধু একটু শাদা দাগ থেকে গেল।

২.
তারপর হঠাৎ করেই জাবেজ স্টোনের সবকিছুর জৌলুশ এসে গেল এবং তার সবকিছুতে উন্নতি হতে থাকল। তার গরু-বাচুর মোটা তাজা হতে থাকল। ঘোড়াগুলো চকচকে হল। তার জমির ফসলাদি দেখে প্রতিবেশীরা হিংসায় মরে যেতে থাকল। বজ্রপাত গোটা উপত্যকাকে খতম করে দিলেও তার গোলাঘর বহাল তবিয়তে থাকত। খুব তাড়াতাড়ি সে হয়ে গেল দেশের গন্যমান্য সনামধন্যদের একজন। লোকজন তাকে ইলেকশনে দাঁড়াতে বললে সে দাঁড়াল; তাকে স্টেট সিনেট সদস্য বানানোর কথা হচ্ছিল। সর্বসাকুল্যে বলতে গেলে স্টোন ফেমেলী গোয়াল ঘরের বেড়ালের মতো সুখি হয়ে গেল। অন্তত জাবেজ স্টোন ছাড়া সবাই।
প্রথম কয়েকটা বছর সে যথেষ্ঠ পরিতৃপ্ত ছিল। যখন বিপদ ঘুরে আসে তখন সেটা বিশাল হয়ে আসে। চিন্তার বাইরে আরো অনেককিছু তাড়িয়ে নিয়ে আসে। সত্যসত্যই, যখন তখন বিশেষ করে ঝড় বৃষ্টির দিনে আঙ্গুলের শাদা ক্ষতটা তাকে যথেষ্ঠ কষ্ট দিতে থাকল। আর প্রতিবছর ঘড়ির সময়ানুবর্তিতার মতো যথাসময়ে একটা ঘোড়ার গাড়ি চড়ে চলে আসত সেই বিদেশী। এভাবে ষষ্ঠ বছরেও বিদেশীর উদয় হল আর এ বছরটা শেষ হলেই তার সাথে জাবেজ স্টোনের চুক্তি শেষ হবার কথা।
বিদেশী নীচু জমির ওপর দিয়ে জাবেজ স্টোনের বাড়িতে উঠে আসছিল তার হাতের লাঠির সাথে সমতালে বুট পরা পা দু’টি ছুড়তে ছুড়তে। কালো বুট জোড়া খুবই চমৎকার ছিল দেখতে জাবেজ স্টোন সেগুলোর দিকে তাকাতে ঘৃণাবোধ করত বিশেষ করে আঙ্গুলের ডগার দিকে। দিনের আলো থেকে সূর্য বিদায় নিলে বিদেশীর সাথে জাবেজ স্টোনের কথা হল। বিদেশী বলল, “মি. স্টোন, আপনি ভাগ্যবান, একটা বিরাট প্রপার্টির মালিক হয়ে গেলেন।”
“জি, কারো কাছে খুব প্রিয় আর কারো কাছে খুব অপ্রিয়।” জাবেজ স্টোন বলল যেভাবে একজন নিউ হ্যাম্পশায়ার বলে থাকে।
“আপনার পরিশ্রমকে ছোট করে দেখার কোন প্রয়োজন নেই” বিদেশী খুব সহজভাবে বলল। স্পষ্ট হাসিতে তার দাঁতগুলো ঝলসে উঠল। “সর্বোপরি আমরাতো সবই জানি, সবকিছুইতো চুক্তি অনুসারে হয়েছে। সুতরাং যখন আগামী বছর চুক্তির মেয়াদ শেষ হবে তখন আপনার আপত্তিযেন না থাকে।”
“বন্ধকীর কথা বলছেন মিস্টার?” জাবেজ স্টোন অসহায়ভাবে একবার আসমান-জমিনের চারদিকে তাকাল। “শুরু থেকেই এ ব্যপারে আমার দু’একটি সন্দেহ ছিল। ”
“সন্দেহ!” বিদেশী মনক্ষুন্ন হয়ে বলল।
“জি, কেননাÑ” জাবেজ স্টোন বলল, “এটা ইউ এস এ, আর আমি সবসময়ই একজন ধার্মিক লোক।” সে তার গলা পরিষ্কার করল একটু সাহস সঞ্চার করার জন্য। “শুরু থেকেই সেই চুক্তির ব্যপারটা কোর্টে উঠানোর বিষয়ে আমার কিছু চিন্তা-ভাবনা ছিল।”
“কোর্ট, কোর্ট শুধু কোর্ট!” দাঁতে দাঁত ঘষে বিদেশী বিড়বিড় করল, এখনও আমরা অর্জিনাল ডকুমেন্টটা দেখে নিতে পারি।” লোকটি একটা কালো পকেট বই তার পকেট থেকে বের করল আর সেটি কাগজে পরিপূর্ণ। “শেয়ার উইন, ¯ে¬টার, স্টিভেন, স্টোন” সে বিড় বিড় করল, “আমি-জাবেজ স্টোন, সাত বছর মেয়াদীÑ একেবারে যথাযথÑ আমি মনে করি।”
কালো পকেট বই থেকে কিছু একটা লাফিয়ে লাফিয়ে বেরিয়ে আসতে দেখল জাবেজ স্টোন। তাই সে লোকটার কোন কথাই শুনতে পায়নি। সেটা দেখতে কিছুটা মথের মত কিন্তু কোন পতঙ্গ নয়। সে স্থির দৃষ্টিতে দেখছিল যখন, তার মনে হল তা তাকে তীক্ষè ছোট স্বরে কিছু একটা বলতে চাচ্ছে, ভয়ঙ্কর ছোট, ভয়ঙ্কর চিকন কিন্তু অত্যন্ত মানবিক।
সেটি চিঁ চিঁ করে ডাকল, “প্রতিবেশী স্টোন, প্রতিবেশী স্টোন, আমাকে সাহায্য করুন, খোদার দোহাই, আমাকে সাহায্য করুন।” কিন্তু জাবেজ স্টোন তার হাত পা নড়াচড়া করার আগেই লোকটা গলায় বাঁধা একটা রুমাল বের করল। প্রাণীটাকে তার ভেতর বন্দী করল ঠিক একটা প্রজাপতির মতো । তারপর সে রুমালের কোনাগুলো গিট দিয়ে দিল।
“বিরতি হওয়ার জন্য দুঃখিত” লোকটা বলল, “যা বলছিলামÑ”
কিন্তু জাবেজ স্টোন কাঁপছিল থরথর করে ক্ষতরোগী ঘোড়ার মতো । সে কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বলল, “এটা মি. স্টিভেনের কণ্ঠ! আপনি তাকে রুমালের ভিতর বন্দী করলেন!!” বিদেশী কিছুটা হতবুদ্ধির মতো তাকাল। “জি, প্রকৃতপক্ষে আমার উচিৎ ছিল তাকে আগেই কালেক্টিং বক্সে স্থানান্তর করা।” সে বোকার মত হেসে বলল, “আসলে সেখানে কিছু অপ্রয়োজনীয় নমুনা প্রাণী রয়েছে, আমি চাইনি তাদের বিড়ম্বনা হোক। ভালো, ভালো, এরকম ছোটখাট কিছু অপ্রিতিকর ঘটনা ঘটবেই।”
“আমি বুঝি না, আপনি ছোটখাট ঘটনা বলতে কী বোঝাচ্ছেন” জাবেজ স্টোন বলল, “কিন্তু এটাতো স্টিভেনের কণ্ঠ! আর সে মৃত! এটা হতে পারে না। সে মৃত! তাকে ঠিক মঙ্গলবারেও দেখেছি এতটা প্রাণচঞ্চল, এতটা জঘন্যÑ ”
“জীবনের মাঝখানেÑ শুনুনÑ ” বিদেশী কিছুটা আন্তরিক হয়ে বলল। জাবেজ স্টোন শুনতে পেল উপত্যকার ওপর একটা ঘণ্টাধ্বনি কেঁপে কেঁপে বাজছে। একটা ভয় তার মুখমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ল কারণ সে বুঝতে পারল, এ ঘণ্টাধ্বনি স্টিভেনের মৃত্যু সংবাদই প্রচার করছে।
“এসব জীবনের দীর্ঘতর হিসাব” বিদেশী একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, “আসলেই সবাই এদের সান্নিধ্য ঘৃণা করে কিন্তু ব্যবসা তো ব্যবসাই।”
“রুমালটা তখনো তার হাতেই ছিল আর সেটি খুব নড়ছিল। জাবেজ স্টোন দেখে খুব অস্বস্তি বোধ করল।
“সবাই কি এরই মতো ছোট?”
“ছোট? দেখি আপনার ধারণা কি? যেহেতু তারা অনেক।” সে জাবেজ স্টোনকে মেপে নিল আর দাঁত দেখিয়ে একটু হাসল, “চিন্তা করবেন না মি. স্টোন, আপনাকে সম্মানজনকভাবেই নেয়া হবে। আমি আপনাকে কখনো কালেক্টিং বক্সের বাহিরে রাখব না। যাক সে কথা, এখন, দানিয়েল ওয়েবস্টারের মতো একজন… … ভালো কথা, আমাদেরকে তার জন্য একটা স্পেশাল বক্স তৈরী করতে হবে এখনই। আমার বিশ্বাস তার শক্তি আপনাকে হতবাক করে দেবে। সে আসলেই একটা জিনিস। আমার ধারণা, তার ব্যপারে আমাদের রাস্তা পরিষ্কার। আপনার ব্যপারে বলছিলামÑ”“রুমালটা ফেলে দিন” জাবেজ স্টোন বলল। তারপর অনেক অনুনয় বিনয় করে সে সর্বোচ্চ যা পেল, নানারকম শর্তসহ অতিরিক্ত আরো তিন বছর।
কিন্তু যে যাই বলুক না কেন চারটা বছর কত দ্রুত চলে যেতে পারে সে ব্যপারে হয় তো কেউ ধারণা করতে পারে না। এ সময়ের শেষদিকে জাবেজ স্টোন সমস্ত দেশে পরিচিত হয়ে গেল। তখন তাকে গভর্নর বানানোর কথা হচ্ছিলÑ কিন্তু সবকিছুই তার কাছে ছাই-পাসের মতো । প্রতিদিন সে যখন ঘুম থেকে উঠত, ভাবতো আরো একটা রাত চলে গেল আর প্রতি রাতে সে যখন শুতে যেত, সেই কালো পকেট বই আর মি. স্টিভেনের আত্মার কথা ভাবত। এসব চিন্তা তার মনকে ক্রমশ অসুস্থ করে ফেলত। শেষমেষ সে এসব নিয়ে আর ভাবতে পারত না। শেষবছরের প্রান্তের দিকে সে একদিন দানিয়েল ওয়েবস্টারের খোঁজ করার জন্য তার গাড়িতে ঘোড়া জুড়ে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। দানিয়েল ওয়েবস্টার নিউ হ্যাম্পশায়ারে জন্মেছিলেন, ক্রসকর্নার হতে কয়েক মাইল মাত্র। সবাই ভালভাবেই জানত যে, তিনি প্রত্যেক প্রতিবেশীর জন্য কোমল হৃদয়ের লোক।

৩.
জাবেজ স্টোন যখন মার্শফিল্ডে পৌঁছল তখন প্রায় ঊষালগ্ন। কিন্তু দানিয়েল ওয়েবস্টার তখন উপরে চলে গিয়েছিলেন। তিনি কিছু সময় ফার্মের শ্রমিকদের সাথে ল্যাটিন বললেন, মেষ গোলিয়েথের সাথে কুস্তি লড়লেন কিছুক্ষণ, একটা পাগলা ঘোড়াকে বশে আনতে চেষ্টা করলেন এবং শেষে জন সি কেলানের সাথে তর্ক করছিলেন। যেই তিনি শুনলেন একজন নিউ হ্যাম্পশায়ার তার সাথে দেখা করতে এসেছে তৎক্ষণাত সব কিছু ফেলে তিনি চলে এলেন। কারণ এটাই তার নিয়ম ছিল। তিনি জাবেজ স্টোনকে নাস্তা-পানি দিলেন যা আর দশজন পায় না। তারপর তিনি ক্রসকর্নারের খোঁজ-খবর নিলেন। সবশেষে তার আসার কারণ জানতে চাইলেন।
জাবেজ স্টোন তাকে জানাল, একটা বন্ধকী মামলা নিয়ে সে এসেছে।
“জি, আমি অনেক দিন কোন বন্ধকী মামলা নিয়ে কাজ করিনি। আর এখন তো সুপ্রিম কোর্টের মামলা ছাড়া ওকালতিই করি না” দানিয়েল বললেন, “কিন্তু আমি আপনাকে সাহায্য করব।”
“গত দশ বছরের মধ্যে প্রথমবার আশাকরে আমি আপনার দ্বরস্থ হয়েছি।” জাবেজ স্টোন তার কাছে সবকিছু খুলে বলল।
দানিয়েল পায়চারি করলেন যতক্ষণ তিনি জাবেজ স্টোনের কথা শুনলেন। হাত দু’টি তার পিছনে বাঁধা, মাঝে মধ্যে দু’একটি প্রশ্ন, মাঝে মধ্যে তার দু’চোখ মেঝেকে তুরপুনের মতো বিদ্ধ করত। জাবেজ স্টোন শেষ করলে তিনি কয়েকবার জোরে জোরে মুখদিয়ে গালভর্তি বাতাস ছাড়লেন। তারপর যখন তিনি জাবেজ স্টোনের দিকে ফিরলেন, একটা নির্মল হাসি তাঁর মুখমণ্ডলে ভেঙ্গেচুরে পড়ল যেন মোনাডলোকের উপর সূর্য উদিত হল।
“মি. স্টোন, আপনি তো নিজেকে পুরোপুরি নরকের ইবলিসের কাছে বেচে দিয়েছেন। তবুও আমি আপনার মামলা গ্রহণ করলাম।”
“আপনি এ মামলা নিবেন? এ যে বিশ্বাস করা দুঃসাহস।”
“নেব, আমার হাতে প্রায় পঁচাত্তরটা কাজ আছে, তবুও আমি আজ আপনার মামলা নেব। কারণ আজ যদি দু’জন নিউ হ্যাম্পশায়ার শয়তানের বিরুদ্ধে এক না হয় তবে সহজেই ইন্ডিয়ানদের দেশ ফিরিয়ে দিতে হবে।”
তারপর তিনি জাবেজ স্টোনের কাঁধে হাত রেখে ঝাঁকি দিলেন। বললেন, “আপনি কি অতিসত্তর এখানে আবার আসতে পারবেন?”
“জি, আমি সময় করে নেব, আমি কথা দিলাম।”
“আগে আপনি ফিরে যান” দানিয়েল বললেন। তিনি তার গাড়িতে ঘোড়া দ্রুত দিতে বললেন। ঘোড়া দু’টির ধুসর বর্ণের ভিতর একটির সাদা পা বেশ মানাত। তারা দৌড়াত যখন ঘোড়াটির সামনের সেই সাদা পা’টি বিজলির মত চমকাতো।
পুরো স্টোন পরিবার কতটা আনন্দিত ও উত্তেজিত ছিল মহান দানিয়েল ওয়েবস্টারকে মেহমান হিসাবে পেয়ে তা বলে বোঝান সম্ভব নয়। জাবেজ স্টোন তার টুপি হারিয়ে ফেলল রাস্তায় দ্রুতগতিতে বাতাসকে অতিক্রম করতে গিয়ে কিন্তু তা সে হিসেবেই নিল না। রাতের খাবারের পর সে তার পরিবার বর্গকে বিছানায় পাঠিয়ে দিল তার সাথে মি. ওয়েবস্টারের নির্দিষ্ট কাজ থাকায়। মিসেস স্টোন চাইলেন তারা বারান্দায় বসুক কিন্তু দানিয়েল ওয়েবস্টার রান্নাঘরকেই উপযুক্ত মনে করলেন। তাদের সামনে টেবিলের ওপর একটা পানিয়ের জগ আর চুলার ভিতর উজ্জ্বল শিখার আগুন নিয়ে তাঁরা বিদেশীর জন্য অপেক্ষা করতে থাকলেন। পূর্বকথা মতো মধ্যরাতে তার আসার কথা ছিল।
কোন লোকই দানিয়েল আর এরূপ পানিয়ের জগের চাইতে ভাল কিছু কল্পনা করতে পারে না সঙ্গী হিসাবে। কিন্তু ঘড়ির কাঁটার প্রতিটি টিক টিক শব্দের সাথে ক্রমশ জাবেজ স্টোন বিষিয়ে উঠতে থাকল ভয়ে। তার দৃষ্টি চারদিকে ঘুরছিল। জগের দিকে সে তাকিয়ে আছে মনে হলেও তার দৃষ্টি সে ব্যপারে আগ্রহী ছিল না। অবশেষে সাড়ে এগারটার দিকে সে পুরোটাই ধৈর্য হারিয়ে ফেলল। সে দানিয়েলের দু’বাহু জড়িয়ে ধরল।
“মি. ওয়েবস্টার! মি.ওয়েবস্টার!!” তার কণ্ঠ কাঁপছিল ভয়ে, উত্তেজনা আর হতাশাব্যঞ্জক সাহসে। “আল¬ার কসম মি. ওয়েবস্টার, যত দ্রুত পারেন আপনার ঘোড়া নিয়ে এখান থেকে পালিয়ে যান।”
“বন্ধু, আপনি আমাকে এত দূর নিয়ে এসেছেন একথা বলার জন্য যে আমার সঙ্গ আপনার অপছন্দ” দানিয়েল শান্ত স্বরে বললেন জগটা টানতে টানতে।
“আমি যে চরম দুর্ভাগা!” জাবেজ স্টোন আর্তনাদ করে উঠল। “আমি আপনাকে শয়তানের পথে নিয়ে এসেছি আর আমার বোকামি দেখছি। তার ইচ্ছা যখন আমাকে নিয়ে যেতে দিন। আমি আর বাঁচার লোভ করব না। আমি সব সইতে পারব। আপনি হলেন ইউনিয়নের একমাত্র সহায় আর নিউ হ্যাম্পশায়ারের গর্ব। সে আপনার নাগাল কখনো পেতে পারে না। সে আপনাকে কখনো পেতে পারে না।”দানিয়েল একবার দিশেহারা লোকটার দিকে তাকালেন। আগুনের আলোতে সবকিছু কাঁপছিল আর ধূসর দেখাচ্ছিল। তিনি তার একটা হাত জাবেজ স্টেনের কাঁধে রাখলেন।
“আমি আপনার কাছে কৃতজ্ঞ মি. স্টোন,” তিনি ভদ্রতার সাথে বললেন, “দয়া করে একবার ভাবুন তো, টেবিলের ওপর একটা জগ আর হাতে একটা মামলা। আমার জীবনে এ মামলা আর কোন অর্ধসমাপ্ত মামলা রেখে যাইনি।”
ঠিক সেই মুহূর্তে দরজায় করাঘাতের শব্দ হল।
“আপনার ঘড়িটা নিশ্চয়ই কিছুটা পিছিয়ে” দানিয়েল বললেন খুব নিু কণ্ঠে। তিনি উঠে গিয়ে কপাট খুলে দিয়ে বললেন, “আসুন, ভেতরে আসুন।” বিদেশী ভেতরে এল। লম্বা আর আগুনের আলোতে মনে হল কালো, বিমর্ষ। সে তার বাহু বেস্টন করে একটা বাক্স বহন করছিলÑ কাল, উজ্জ্বল, বার্ণিশ করা একটা বাক্স। বাক্সের ওপর বায়ু চলাচলের জন্য একটা ছিদ্র। বাক্সটা দেখেই জাবেজ স্টোন একটা আর্তনাদ করে উঠল। সে রুমের এক কোনায় গিয়ে জড়সড় হয়ে বসে থাকল।
“আমি নিশ্চিৎ আপনি মি. ওয়েবস্টার” বলল লোকটা বেশ সম্মানের সাথে। কিন্তু তার চোখ জ্বলছিল গভীর বনের ধূর্ত শেয়ালের
মতো । “জাবেজ স্টোনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের উকিল” দানিয়েল বললেন। তার চোখ দু’টিও জ্বলছিল। “আমি কি আপনার নাম জানতে পারি?”
“আমি এমন অনেক পার করে এসেছি” বিদেশী তাচ্ছিল্যের স্বরে বলল, “সম্ভবত এসব জীবন-সন্ধার আয়োজন। সাধারণত এরূপ অবস্থায় আমার ডাক পড়ে।”
তারপর সে টেবিলে বসল, জগ থেকে পানীয় ঢেলে পান করতে থাকল। জগের পানীয় ছিল খুব ঠাণ্ডা কিন্তু গ্লা¬স থেকে ধোঁয়া উঠছিল।
বিদেশী দাঁত দেখিয়ে হাসল, বলল, “আপনাকে ডাকতাম একজন আইন অনুগত নাগরিক হিসাবে আমার সম্পত্তিগুলো পাওয়ার জন্য।”
এভাবে তাদের বিতর্ক শুরু হল। তর্ক ক্রমশ গরম হয়ে উঠল আর গভীর থেকে গভীরতর হল। শুরুতে জাবেজ স্টোনের মনে একটা কম্পমান আশার আলো ছিল যেটা মিটমিট জ্বলছিল কিন্তু যখন দেখল দানিয়েল ওয়েবস্টার যুক্তির পেছনে যুক্তি দিতে গিয়ে পিছিয়ে পড়ছেন সে তখন শুধু কেবল কোণায় বসে হতাশায় মোড়ামুড়ি করতে থাকল। তার দৃষ্টি সেই কালো বার্নিশ করা বাক্সটার ওপর নিবন্ধ ছিল। আসলে দলিল-দস্তাবেজের মধ্যে কোন ফাঁক ছিল নাÑ সেটাই ছিল তার দুর্ভাগ্য। দানিয়েল ওয়েবস্টার বিষয়টাকে অনেক পেঁচালেন, ঘোরালেন, টেবিলের ওপর মুষ্ঠাঘাত করলেন কিন্তু তিনি বেশী দূর এগোতে পারলেন না। তিনি লোকটাকে একটা আপোস মীমাংসায় আসতে অনুরোধ করলেন কিন্তু সে তাতে কর্ণপাত করল না। সে বরং প্রপার্টির মূল্যমানের ওপর ইঙ্গিত করল আর বোঝাতে চাইল, একজন স্টেট সিনেটের দাম বেশী হওয়া উচিৎ। বিদেশীকে আইনের প্রতি বেশ শ্রদ্ধাশীল মনে হল। তাকে মনে হল বড় মাপের আইনজীবী। দানিয়েল ওয়েস্টারও। কিন্তু সেরা কে? মনে হল যেন প্রথম বারেরমতো দানিয়েল তাঁর যোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বির মুখোমুখি হয়েছেন। বিদেশী ছোট একটা হাই তুলল। “আপনার মক্কেলের সমর্থনে এরূপ সতেজ শক্তি প্রয়োগ আপনাকে আস্থাবান করে মি. ওয়েবস্টার। যদি আপনার সামনে এগুবার মতো বিষয় না থাকে তাহলে আমার বরং সময় কম।” বিদেশীর বক্তব্য শুনে জাবেজ স্টোন কিছুটা কেঁপে উঠল।দানিয়েলের মুখমণ্ডলকে মনে হল বজ্রমেঘের মতো কালো। “সময় থাক আর না থাক আপনি এ লোকটাকে পাচ্ছেন না।” তিনি বজ্রকণ্ঠে চিৎকার করে বললেন, “মি. স্টোন একজন আমেরিকান নাগরিক আর কোন আমেরিকানের ওপর কোন বিদেশী রাজাও শক্তি প্রয়োগ করতে পারে না। আমরা বার সালে এর জন্য ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে লড়েছি। দরকার হলে আমরা সকল নারকীয় শয়তানের বিরুদ্ধে লড়ব।”
“বিদেশী!” লোকটি বলল, “কে আমাকে বিদেশী বলে?”
“আমি কখনো শুনিনি শয়.. .. আপনার অদ্ভুত আমেরিকান হওয়ার কথা” দানিয়েল অবাক হয়ে বললেন।
“কার কথা বেশী সত্য?” বিদেশী বলল, একটা ভয়ঙ্কর রকম হাসি দিল সে। “যখন প্রথম ইন্ডিয়ানের উপর জুলুম হল, আমি ছিলাম সেখানে। যখন প্রথম দাস বহনকারী জাহাজ কঙ্গোর পথে রওয়ানা দেয়, আমি ছিলাম তার ডেকের ওপর। আপনার বইতে, গল্পে, আপনার বিশ্বাসে, প্রথম থেকেই কোথায় আমি নেই? ইংল্যান্ডের প্রতিটি গির্জায় আমি আলোচিত হই না? একথা সত্য, আমাকে উত্তর দাবী করে দক্ষিনের জন্য আর দক্ষিন দাবী করে উত্তরের জন্য কিন্তু আমি নির্দিষ্ট করে করোরই নই। আমি প্রকৃতপক্ষে আপনার মতই একজন সৎ আমেরিকান নাগরিক। উত্তম আলোচনার জন্য, সত্য বলার জন্য, মি. ওয়েবস্টার, যদিও আমি বলা পছন্দ করিনা, আমার নাম এ দেশে আপনার চেয়েও পুরোনো।”
“আহা!” তিনি ভাগ্যের কাছে পরাজয় স্বীকার না করে স্বদম্ভে বললেন, “তবুও আমি নিয়ম মেনে চলি। আমি আমার মক্কেলের জন্য একটা বিচার সভা দাবী করি।”
“এ মামলা একটা সাধারণ কোর্টের জন্য কঠিন” চোখ দুলিয়ে লোকটা বলল, “আর প্রকৃতপক্ষে সময়ের অপচয়।”
“যে কোন কোর্ট হতে পারে, তবে অবশ্যই আমেরিকান জর্জ ও আমেরিকান জুরিবোর্ড হতে হবে।” দানিয়েল গর্বের সাথে বললেন, “তা জীবীত কিংবা মৃত যাই হোক না কেন আমি মেনে নেব।”
“আপনি যা চান” বিদেশী তার আঙ্গুল দরজার দিকে নির্দেশ করল। এবং সেই সাথে সম্পূর্ণ হঠাৎ করেই বাইরে একটা ঝড় বাতাস উঠল আর অনেকগুলো পদ-শব্দ শোনা গেল। তারা রাতের ভিতর দিয়ে আসল, সুস্পষ্ট এবং স্বাতন্ত্র। কিন্তু তাদের পদ-শব্দ জীবন্ত মানুষের মতো ছিল না।
“হায় খোদা, এত রাতে আবার কারা আসল” জাবেজ স্টোন তীব্র ভয়ে আর্তনাদ করে উঠল।
“মি. ওয়েবস্টার বিচারকমণ্ডলী দাবী করেছেন” বিদেশী বলল তার তপ্ত গ্লাসে চুমুক দিয়ে। “তাদের দু’একজনের খারাপ ব্যবহার অগ্রাহ্য করতে হবে; তারা অনেক দূর হতে আসবে।”

৪.
দরজাটি খুলে গেল আর একে একে বারজন লোক ভিতরে প্রবেশ করল। আগুন নীল হয়ে জ্বলছিল তখন।যদি জাবেজ স্টোন এতক্ষণে ভয়ে অসুস্থ হয়ে গিয়ে থাকে তাহলে এখন ভয়ে তার অন্ধ হয়ে যাওয়ার কথা। কারণ সেখানে ওয়াল্টার বাটলার ছিল, একজন আইনজীবী, বিপ¬বের সময় যে ম্যানহোয়াক উপত্যকায় আগুন ছড়িয়ে দিয়েছিল এবং ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল। সেখানে ছিল সিমন গ্রিটি, স্ব-ধর্মত্যাগী, খুঁটির সাথে বাঁধা সাদা মানুষদের পুড়তে দেখেছিল আর অট্টহাসিতে ফেটে পড়েছিল যখন রেড ইন্ডিয়ানরা পুড়ে মরছিল। তার চোখ বুনো বিড়ালের মতো সবুজ ছিল। তার ছেঁড়া শার্টের দাগ কোন ভেড়ার রক্ত থেকে আসেনি। সেখানে ছিল কিং ফিলিপ যে কিনা জীবীত থাকাকালে বুনো আর অহংকারী ছিল। সেই মহান থেতলানো আঘাত তখনো বর্তমান ছিল যা তার মৃত্যু নিশ্চিত করেছিল। আরো ছিল গভর্নর ডেল, মানুষদের সে চাকায় পিষ্ট করত। ছিল মরটন অব মেরী মাউন্ট, যে তার জ্বলজ্বলে, ঢিলে, সুদর্শন চেহারা আর প্রভূত্বকারী টুপি দিয়ে পে¬মাউথ কলনীর সবাইকে অত্যাধিক জ্বালিয়ে মেরেছিল। সেখানে ছিল রক্তপিপাসু জলদস্যু, তার বুকে কোকড়ানো কালো পশম। আরো এসেছিল দ্যা বেভারেন্ট জন স্মিথ, তার শ্বাসরোধকারী হাত দুটি নিয়ে আর তার মন্ত্রির কালো আচ্ছাদনসহ। এমন সুকুমার ছন্দে হাঁটছিল যেন তাকে ফাঁসির আদেশ দিতে হবে। ফাঁসি-রজ্জুর লাল দাগ এখনো তার গলায় আঁকা কিন্তু সে একহাতে একটা সুগন্ধি রুমাল বহন করছিল। নরকের আগুনের গন্ধসহ প্রত্যেকে কামরায় প্রবেশ করল। বিদেশী তাদের প্রত্যেকের নাম আর কর্মকাণ্ডের পরিচয় দিচ্ছিল। সে সত্য কথাই বলছিল। তারা প্রত্যেকেই আমেরিকায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
“আপনি কি জুরিদের নিয়ে সন্তুষ্ট?” বিদ্রুপাত্মক সুরে বলল লোকটা। ততক্ষণে আগুন্তুকগণ নিজ নিজ আসন গ্রহণ করছিলেন।
“বেশ সন্তুষ্ট, যদিও আমি জেনারেল আর্নল্ডের সঙ্গ হতে বঞ্চিত হলাম” বললেন দানিয়েল। “ভিনডিক্ট আর্নল্ড অন্য একটা কাজে জড়িত আছেন” বিদেশী বলল একটু ভ্রুকুটি করে, “ওহ! আপনি সম্ভবত একজন বিচারকের কথা বলছেন।” সে পুনরায় আঙ্গুল দরজার দিকে নির্দেশ করল। লম্বা, গুরুগম্ভীর পারশিয়ান পোশাক পরিহিত একজন লোক প্রবেশ করল। অতিশয় গোঁড়া মানুষের দৃষ্টি তার চোখে। সে বিচারকের আসনে বসে পড়ল। বৃদ্ধবিচারক নির্দেশ দিল “আর দেরী নয়, সবকিছু উপস্থাপন করুন, সবকিছু।” এবং সে এমনভাবে বিড়বিড় করল যে জাবেজ স্টোনের অন্তরাত্মায় বরফ জমে গেল।
বিচারকার্য শুরু হল। সাধারণত যেরূপ আশা করা হয়, সেখানে তেমন আত্মরক্ষার কোন পথই ছিল না। জাবেজ স্টোনের সপক্ষে কোন সাক্ষ্য পাওয়া গেল না। সে একবার শিমন গ্রিটির দিকে চাইল এবং একটা তীক্ষè চিৎকার করে মুর্ছিত হয়ে গেল। তারা তাকে ঘরের এককোণে তাদের পেছনে রেখে দিল।
বিচার কার্য মুলতবি করা হয়নি যেমন সাধারণত করা হয়। সভা অব্যাহত থাকল। দানিয়েল ওয়েবস্টার তাঁর জীবনে অনেক কঠোর জুরিবোর্ডের মুখোমুখি হয়েছেন এবং অনেক জর্জের সামনে মামলা উপস্থাপন করেছেন কিন্তু কখনো এমন কঠিন অবস্থার মুখোমুখি হননি। আর তিনি সফলও বটে। উপস্থিত সকলে তাদের জ্বলজ্বলে চোখ নিয়ে বসে আছেন। বিদেশীর নরম কণ্ঠ বেজে চলছিল।
প্রত্যেকবার যখন সে আপত্তি উত্থাপন করত, বলা হত ‘অবজেকশন সাসটেইন’ কিন্তু দানিয়েল ওয়েবস্টার যখন করতেন, বলা হত ‘অবজেকশন ডিনাইড’। আসলে মি. স্কেচ এর মত লোকদের পক্ষ হতে খাঁটি বিচার আশা করা যায় না।
শেষে দানিয়েলও তাই আরম্ভ করলেন। যখন তিনি দাঁড়ালেন তাঁর বক্তব্য উপস্থাপন করার জন্য তিনি আইনের প্রচলিত ধারায় বিদেশী, জুরিবর্গ এবং জর্জের সমালোচনা করলেন। তিনি আদালত অবমাননার ওপর কর্ণপাত করলেন না। তিনি কি বলবেন ভাবতে গিয়ে তিনি যেন পাগল হয়ে যাচ্ছিলেন। এমনকি তিনি যত ভাবছিলেন ততই যেন সব মনের ভিতর গুলিয়ে ফেলছিলেন।
তখনপর্যন্ত, শেষবারের মতো, সেটাই ছিল তাঁর নিজ পায়ের ওপর দাঁড়াবার সময়। তিনি ভয়-ভীতি ধমক দিয়ে দমন করার চেষ্টা করলেন কিন্তু শুরু করার আগে তাঁর অভ্যাস মত বিচারক ও জুরিবোর্ডের ওপর মুহূর্তের জন্য নজর বুলিয়ে নিলেন। তিনি লক্ষ করলেন তাদের চোখ আগের চেয়ে দৃঢ়তায় জ্বলজ্বল করছে এবং সবাই সামনের দিকে ঝুঁকে আছে। তাদের তখন রক্ত-পিপাসু কুকুরের মত মনে হল ঠিক একটু আগে যেমন শেয়ালের মত মনে হয়েছিল। ঘরের ভিতর নীল শয়তানের ধোঁয়ায় আরও আচ্ছন্ন হয়ে উঠল। তিনি একটুখানি তার করনীয় নিয়ে ভাবলেন। তিনি একটু মাথা ঝাঁকালেন যেন তিনি কোন উপায় খুঁজে পেয়েছেন যেরূপ কোন লোক অন্ধকারে গর্তে পড়ে যাওয়া থেকে রক্ষা পেয়ে করে থাকে। আসলে তারা শুধু জাবেজ স্টোনের জন্যই আসেনি তাঁর জন্যও এসেছিল। তিনি তাদের উজ্জ্বল চোখের ভাষায় সবকিছু পড়ে ফেললেন এবং বিদেশী একসময় তার হাত দিয়ে মুখ ঢেকে ফেলল। যদি তিনি তাদের অস্ত্র দিয়ে তাদের সাথে লড়ে যেতেন তবে তিনি তাদের শক্তির ভিতর বিলীন হয়ে যেতেন। কিন্তু তিনি জানতেন না সেটি কিভাবে হতো। আসলে তাদের চোখেমুখে বিরাজ করছিল তাঁরই নিজস্ব ক্রোধ আর আতঙ্ক। তাঁর কাজ ছিল, হয় সেই উজ্জ্বলতা ও ক্রোধ নিভিয়ে ফেলা নয়তো মামলা হেরে যাওয়া। তিনি মুহূর্তের জন্য দাঁড়ালেন। তার চোখদু’টি জ্বলন্ত অঙ্গারের মত জ্বলছিল। তিনি শুরু করলেন তাঁর কথা।
তিনি শুরু করলেন একেবারে সাধারণ বিষয় দিয়ে যা প্রত্যেক মানুষ জানে এবং সহজে অনুধাবন করেÑ “সকাল বেলার সুন্দর সতেজতা যখন আপনি যুবক, খাবারের স্বাদ যখন আপনি ক্ষুধার্ত, একটা নতুন দিন যা প্রত্যেক দিনের জন্য প্রযোজ্য যখন আপনি শিশু”। তিনি এসব বিষয় তাদের সামনে উপস্থাপন করলেন। এসব প্রত্যেকের জন্যই ভালো জিনিস। কিন্তু স্বাধীনতা ছাড়া এসবকিছুই অর্থহীন। যখন তিনি এসব পরাধীন লোকজন আর তাদের দুঃখ-দুর্দশার কথা বর্ণনা করলেন তখন তাঁর কণ্ঠ বড় বড় ঘণ্টা-ধ্বনির মত কেঁপে কেঁপে উঠল। তিনি আমেরিকার প্রথম দিনগুলির কথা স্মরণ করলেন। বললেন সেসব লোকদের কথা যারা সেই দিনগুলো উপহার দিয়েছিলেন। এগুলো কোন উড়ন্ত ঈগলের দেখা গল্প নয়। এসব সবাই দেখেছে। তিনি সেসব ভুলের কথাও বললেন যেগুলো তখনকার লোকেরা করেছিল। এভাবে তিনি তুলে ধরলেন ভুল-নির্ভুল, ক্ষুধা-দুর্ভোগ আরো অনেক নতুন বিষয়। আর উপস্থিত সবাই এতে অংশগ্রহণ করল এমনকি বিশ্বাসঘাতকেরাও।
তিনি জাবেজ স্টোনের দিকে ফিরলেন। বললেন সে কেমন ছিলÑ একজন সাধারণ মানুষ যার ভাগ্য ছিল সবসময়ে খারাপ। সে তার ভাগ্যকে পরিবর্তন করতে চাইল। তাই এখন তার সমস্ত কৃতভুলের প্রায়শ্চিত্ত করতে যাচ্ছিল। তারপরেও জাবেজ স্টোনের অনেক ভাল গুণ ছিল যার পরিচয় সে দিয়েছে। সে দরিদ্র ছিল। কোন কোন ব্যপারে খুব কঠোর ছিল। তদুপরি সে একজন মানুষ। তার জন্য মানুষ হওয়া খুব দুঃখের বিষয় কিন্তু গর্বের বিষয়ও। আর সে যে তা প্রমাণ করল সেটি অবশ্যই সবাই স্বীকার করবেন। এমনকি একজন নরকবাসীও তা স্বীকার করে নেবে যদি সে সত্যিকার মানুষ হয়ে থাকে। জাবেজ স্টোন কখনো কারো বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ করেনি যদিও তার কণ্ঠ একটা করুণ বেহালার মতো বাজত সব সময়। তিনি সফলতার কথা বললেন, ব্যর্থতার কথা বললেন, বললেন মানুষের শেষযাত্রার কথাÑ তারা প্রতারিত হত, ফাঁদে পড়ত, বোকা বনত কিন্তু তার পরেও সেটা মহান যাত্রা। আর এমন কোন প্রেতাত্মা ছিল না যে গাধার বাচ্ছার মত এর সারমর্ম বুঝতে পারেনি।

৫.
চুল্লি¬র মধ্যে আগুন প্রায় নিবু নিবু। বাহিরে ভোরের বাতাস বইছিল। ঘরের ভিতর আলো ধুসর রঙ ধারণ করল যখন দানিয়েল ওয়েবস্টার তার কথা শেষ করলেন। তার কথা যেন ভেসে আসছিল নিউ হ্যাম্পশায়ার থেকে। এমন একটা স্থান হতে, ভূমির ওপর যে স্থানটাকে সবমানুষ ভালবাসে। তিনি তার একটা চিত্র আঁকলেন এবং প্রত্যেক জুরি ও জর্জকে বললেন তাদের দীর্ঘ বিস্মৃতির কথা। তিনি সবার হৃদয় স্পর্শ করতে পারলেন যা তাঁর জন্য ছিল তাঁর শক্তিমত্তার পুরষ্কার। তাঁর কণ্ঠ কারো কাছে ছিল অরণ্য ও তার রহস্যের মতো আর কারো কাছে ছিল সাগর ও তার গর্জনের মতো । এর মধ্যে কেউ দেখে তার জাতীর কান্না আর কেউ দেখে খুব ছোটখাট ক্ষতিকর দৃশ্য যা কখনো স্মরণ করার মত নয়। কিন্তু প্রত্যেকেই কিছু না কিছু দেখে। যখন দানিয়েল ওয়েবস্টার শেষ করলেন তখনো তিনি বুঝতে পারেননি জাবেজ স্টোনের জন্য তিনি কিছু করতে পেরেছেন। কিন্তু তিনি বুঝতে পেরেছিলেন তিনি একটা ভেলকি দেখিয়ে দিয়েছেন। তাদের চোখের সে উজ্জ্বলতা আর থাকল না। মুহূর্তের জন্য তারা আবার যেন মানুষ হয়ে গেল।
“আত্মপক্ষ সমর্থন শেষ” দানিয়েল বললেন। তিনি পর্বতের মতো দাঁড়িয়ে থাকলেন। তাঁর কানে এখনো তাঁর কথাগুলো বেজে চলছে। তিনি ততক্ষণ পর্যন্ত যেন কিছুই শোনেননি যতক্ষণে জর্জ হেথর্ন বলল, “জুরিবর্গকে মামলার রায় বিবেচনা করার জন্য অনুরোধ করছি।”
ওয়াল্টার বাটলার তার জায়গায় উঠে দাঁড়াল। তার মুখমণ্ডল অন্ধকার। তবুও গর্বের আভাস সেখানে। “জুরিবর্গ এ মামলার রায় বিবেচনা করেছেন” পরিপূর্ণ দৃষ্টিতে বিদেশীর দিকে তাকিয়ে বলল, “আমরা জাবেজ স্টোনের মুক্তি প্রস্তাব করছি।”
সেই সাথে বিদেশীর মুখের হাসি উবে গেল কিন্তু ওয়াল্টার বাটলার থামেনি। “সম্ভবত এরায় প্রমাণের সাথে যথাযথ সামঞ্জস্যশীল নয় তবুও মি. ওয়েবস্টারের বাক পটুতাকে নরকবাসী সম্মান করে।”
মোরগের ডাক সকালের ধুসর আকাশটাকে ভেঙ্গে টুকরো টুকরো করে দিল। জর্জ ও জুরিবর্গ কামরা থেকে বের হয়ে গেল একটা ধোঁয়ার কুণ্ডলীর মতো যেন তারা কখনো এখানে ছিল না। বিদেশী দানিয়েল ওয়েবস্টারের দিকে ফিরল এবং একটুকরো বিকৃত হাসি হেসে বলল, “মেজর বাটলার একজন ধৃষ্ট লোক। আমি ভাবিনি সে এতটা ধৃষ্ট হতে পারে। যাহোক, আপনার প্রতি আমার অভিনন্দন, যেরকম দু’জন ভদ্র লোকের মধ্যে হওয়া উচিৎ।”“যদি কিছু মনে না করেন” দানিয়েল বললেন, “প্রথমত কাগজটা চাইব।” তিনি চুক্তিপত্রটা নিয়ে চার টুকরো করে ফেললেন। “আর এখন আপনাকে দরকার।” তাঁর একটা হাত ভাল¬ুকের মত বিদেশীর একটা বাহুকে আঁকড়ে ধরল। বিদেশী হাত মুচড়িয়ে ছুটতে চেষ্টা করল কিন্তু পারল না। “উহ্ মি. ওয়েবস্টার ছাড়–ন। অর্থস্বল্পতা হাস্যকর। যদি আপনার সমস্যা হয় তবে ব্যয়ভার আমিই বহন করব। তাহলে আমিও গর্ববোধ করতাম।”
“অবশ্যই আপনিই বহন করবেন” দানিয়েল বললেন, “আপনি বসুন, এইমর্মে একটা প্রমাণপত্র করে দিয়ে যান যে, আর কখনো জাবেজ স্টোনকে বিরক্ত করবেন না এমনকি তার চুলটিকেও না। আর কেয়ামত পর্যন্ত অন্য কোন নিউ হ্যাম্পশায়ারকেও নয়। যে কোন নরক আমরা আমাদের রাজ্য থেকে উপড়ে ফেলে দেব। কোন বিদেশীর সাহায্য ছাড়াই আমরা তা পারব।”
“উহ্! তারা কখনো সফল হবে না। কিন্তুÑ উহ্ Ñ আমি মেনে নিলাম।”
বিদেশী বসল এবং একটা দলিল করে দিল। কিন্তু দানিয়েল ওয়েবস্টার তার কলার ধরে রাখলেন।
“এখন আমি যেতে পারি?” লোকটি বলল নরম কণ্ঠে। দানিয়েল ওয়েবস্টার দেখে নিলেন দলিলটা যথযথ কিনা।
“যাবেন?” দানিয়েল তাকে একটা ধাক্কা দিয়ে বললেন, “আমি ভাবছি আপনার সাথে আমার কিরূপ ব্যবহার করা উচিৎ কারণ আপনি লেনদেনটা মীমাংসা করে দিলেও আমার সাথে আপনার কোন মীমাংসা হয়নি। আমি ভাবছি আপনাকে মার্শফিল্ডে নিয়ে যাব।” একটু ভেবে আবার বললেন, “সেখানে গোলিয়েথ নামের একটা মেষ আছে। গুতিয়ে লোহার দরজা ছিদ্র করতে পারে। আমি আপনাকে তার সামনে ছেড়ে দিয়ে দেখতে চাই সে আপনাকে নিয়ে কি করতে পারে।”
এরপর বিদেশী অনুনয় বিনয় শুরু করল। এতটা নরম হয়ে লোকটা অনুনয় করতে থাকল যে দানিয়েল ওয়েবস্টারÑ সত্যিকারের একজন নরম দিলের মানুষ, শেষে তাকে যাওয়ার অনুমতি দিলেন। বিদেশীকে প্রচণ্ড কৃতজ্ঞ মনে হল। বন্ধুসুলভ মনোভাব দেখিয়ে সে দানিয়েল ওয়েবস্টারের ভাগ্য গণনা করতে চাইল। তিনি রাজি হলেন যদিও এর আগে কখনো ভাগ্য গণনা করেননি।
তাঁর কাছে বিদেশীকে কিছুটা অন্যরকম মনে হল। সে গর্বিত চিত্তে দানিয়েলের হাতের রেখাগুলো দেখতে থাকল। সে অনেকগুলো লক্ষণীয় ঘটনার কথা বলল কিন্তু সবই অতীতের ঘটনা।
“সবই তো অতীতের কথা এবং সত্যই বটে। ভবিষ্যতের কথা বলুন।”
বিদেশী খুশি হয়ে পুনরায় হস্তরেখা পাঠ করতে থাকল। “ভবিষ্যত আপনি যেরূপ ভাবছেন সেরূপ নয়। কিছুটা অন্ধকার। আপনার একটা বিরাট উচ্চাকাঙ্খা আছে মি. ওয়েবস্টার।”
“হ্যাঁ, আছে” দানিয়েল সহজভাবে বললেন। সবাই জানত তিনি প্রেসিডেন্ট হতে চাইতেন।
“মনে হচ্ছে আপনার আয়ত্বের ভিতরে কিন্তু অর্জন করতে পারবেন না। সবলোক তো আর প্রেসিডেন্ট হতে পারে না আর আপনিও তা এড়িয়ে যাবেন।”
“যখন আমি প্রেসিডেন্ট হতে পারব তখনও দানিয়েল ওয়েবস্টারই থাকব। বলে যান”
“আপনার দু’জন সামর্থবান সন্তান থাকবে, ছেলে।” বিদেশী বলল তার মাথা দুলিয়ে, কিন্তু দু’জনেই যুদ্ধে মারা যাবে।”
“বেঁচে থাকুক আর মারা যাক তারা সব সময়ই আমার সন্তান।”
“আপনি অনেক মহান বানী বলেছেন। এরকম আরো বলবেন।”
“আহ! বলে যান।”“কিন্তু শেষে এ মহান বানীগুলো আপনার বিরুদ্ধেই ব্যবহৃত হবে। তারা আপনাকে ‘আইকেবোর্ড’ (কোথায় গর্ব) বলে ডাকবে। তারা আপনাকে আরও অন্যান্য নামেও ডাকবে। এমনকি নিউ ইংল্যান্ডের কিছু লোক বলবে, আপনি বিশ্বাস ঘাতকতা করে নিজের দেশকে বেচে দিয়েছেন। আর আপনার মৃত্যুর পর তাদের কণ্ঠ আরও শক্তিশালী হবে।”
“সুতরাং বানীটি নির্ভুল, মানুষ কি বলল সেটা কোন ব্যপার নয়” দানিয়েল বললেন। তারপর তিনি বিদেশীর দিকে তাকালেন পলকহীনভাবে।
“একটা প্রশ্ন” বললেন তিনি, “আমি সারাজীবন ইউনিয়নের জন্য লড়েছি। আমি কি তাদের বিরুদ্ধে বিজয় দেখে যেতে পারব যারা এটিকে ভাঙ্গার জন্য চেষ্টা করছে?”
“যতদিন আপনি জীবীত আছেন ততদিন নয়” বিদেশী বলল মুখটা কালো করে, “কিন্তু এটা বিজয় লাভ করবে। আপনার মৃত্যুর পর হাজার হাজার লোক এর জন্য লড়াই করবে।”
“কারণ তুমি তখন দীর্ঘস্থায়ী বন্ধি, কুচকানো গাল ভাগ্যগণনাকারী।” দানিয়েল ওয়েবস্টার উচ্চ হাসিতে ফেটে পড়লেন। বললেন, “থামো, তোমাকে আগে মূল্যায়ন করার স্থানটা ঠিক করে নেই! কারণ মাত্র তেরটি কলোনি নিয়ে আমি ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠা করব।”
তিনি নিজের একটা পা পিছনের দিকে টেনে নিয়ে গেলেন তাকে একটা লাথি মারার জন্য। কিন্তু লোকটি তার কালেক্টিং বক্স নিয়ে উড়াল দেয়ার মতো করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
“তারপর, দেখি জগে কি আছে। সারারাত কথা বলার মতো শুকনা কাজ করেছি” জাবেজ স্টোনকে অচেতন অবস্থা থেকে জাগতে দেখে তিনি বললেন, “মি. স্টোন, মনে হয় নাস্তা করার মতো কিছু পিঠা আছে।”

সবাই বলে যে, যখনই শয়তান মার্শফিল্ডের নিকটে আসে, সবসময় তাকে এড়িয়ে চলে। তারপর হতে আজ পর্যন্ত তাকে নিউ হ্যাম্পশায়ারের এ তল¬াটে দেখা যায়নি। অবশ্য মেসাচ্যুসেট কিংবা ভারমন্টের কথা আলাদা।

পূর্বের সংবাদ

«