নয়ন আহমেদ
২৭ জুলাই, ২০১৯ | ১৬:৪৯

সাজ্জাদ বিপ্লবের কবিতা : একটি পর্যালোচনা

tesst

সাজ্জাদ বিপ্লব এর আবির্ভার নব্বই-এর দশকে। প্রখর মেধাদীপ্ত এ কবি বাংলা সাহিত্যে জায়গা করে নিয়েছেন ইতোমধ্যেই। সূচনালগ্নে সম্পাদনা করেছেন সাহিত্যের ছোটোকাগজ “স্বল্পদৈর্ঘ্য”। এই কাগজটিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে একদল সাহসী কবি, তারা সাহিত্যে তৈরি করেছেন নিজস্ব বোধ ও ব্যাপ্তির জগৎ। এ কাজটিকে নব্বই দশকের জন্য আশীর্বাদ হিসেবে গণ্য করা হয়। নব্বই দশকের কবিদের নিয়ে একটি উল্লেখযোগ্য সংকলনও করেছেন তিনি। এটি বহুল সমাদৃত হয়েছে। “নব্বইযের কবিতাঃ অন্য আকাশ ”- নামের এই কবিতা সংকলনটি তার সুচারু সম্পাদনার পরিচয় বহন করছে। বর্তমানে তিনি উত্তর আমেরিকায় বসবাস করছেন। তার সাথে আছে তার বাংলাদেশ, আবহমান সংস্কৃতি আর কবিতা। “বাংলারিভিউ” নামে অনলাইন সাহিত্য পত্রিকা সম্পাদনা করছেন সেখানে বসেই। বাংলাভাষা ও সাহিত্য বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিতে নিরন্তর সাধনা করে যাচ্ছেন তিনি।
কবিতার একনিষ্ঠ কর্মী হিসেবে এ যাবৎ ৪টি বই প্রকাশ পেয়েছে তার। লিখে চলেছেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক সহ অন্যান্য অনলাইন পত্রিকা ও প্রিন্টিং মিডিয়ায়। তার ২০১৬-এ প্রকাশিত কবিতার বই “তুমি ছাড়া আমার কোনো বসন্ত নেই”। এই গ্রন্থের উপজীব্য প্রেম। কিন্তু তা বহুরৈখিক ভাবনার অধীশ্বরা। দৃশ্যমান ভাবের বর্ণমালা তার কবিতা। যাপিত জীবনের নির্যাস তার কবিতাকে সমৃদ্ধ করেছে। গ্রন্থটিতে ২৬টি কবিতা রয়েছে । পৃষ্ঠা সংখ্যা ৩২। কবিতাগুলোর শিরোনাম নেই। আমার অভিমত- শিরোনাম থাকলে বিষয় ও ভাবনার পূর্ণাঙ্গতা পেতো। এটি কাব্যরীতি- একটি পরিচ্ছন্ন শিল্পিত রূপের স্মারক।
কবিতা মূলত আত্মচরিত, আত্মনির্মিতি এবং তারই মধ্য দিয়ে বিশ্ববোধের দর্শন মেলে। “আমি”- এর রূপকে এই বোধ নির্মিত হয়। ব্যক্তি আমি-ই তখন বিশ্বজগতের অস্তিত্বের প্রতিরূপে প্রকাশ পায়। ব্যক্তির মধ্যেই জীবনের সব সম্ভাবনা ফুটে ওঠে- ব্যক্তি ছাড়া বিশ্ব অর্থহীন। সাজ্জাদ বিপ্লব বলেন-
“আমাকে হারালে থাকে না কিছুই
না স্বপ্ন না চিত্রকল্প
থাকে না পৃথিবীর প্রাচীন মুদ্রা
থাকবে না কোন প্রত্ন পাথর
কালো অক্ষর
অদৃশ্য
দৃশ্যমান সব ভাবের বর্ণমালা
চিত্রকলা
এমন কি
তোমারও ছলাকলা”-
প্রেমের কবিতাগুলোতে সাজ্জাদ বিপ্লব পরিচিত দৃশ্যপট থেকে শব্দ চয়ন করে একটা সম্পূর্ণতা দেবার চেষ্টা করেছেন। নর-নারীর সম্পর্ক চিরকালের-দাম্পত্য সম্পর্কের ভিত্তিই হলো বিশ্বাস, পরস্পরের প্রতি বিশ্বস্ততা। সেটা হারালে জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে, অর্থহীনতায় পর্যবসিত হয়। তার ভাষাচিত্র অঙ্কণ করেছেন এভাবে-
“সেই বিশ্বাসই যদি এখন
হারিয়ে যায় পৃথিবী থেকে
কি আর থাকবে, বলো?
আমরা হারাবো অপরিসীম
আনন্দ, ভালোবাসা, আদব-লেহাজ,
সন্তান- সন্তুতি
সম্পর্ক, আলো, আশা, রঙ ও জীবন”।
হৃদয়ের পরিচর্যা করলেই হৃদয় পাওয়া যায়, পৃথিবী শান্তিময় হয়ে ওঠে। সে শান্তি শুরু হয় গার্হস্থ্য জীবন থেকে, আর ছড়িয়ে পড়ে পৃথিবীর সর্বত্র। কবি গৃহগত জীবনের প্রতি আসক্তি ও অনুরাগ প্রকাশ করেছেন। প্রেয়সীর প্রতি মমত্বের বন্ধন নির্মাণ করেছেন। এ হলো চিরন্তন প্রীতি ও শুভ্রবোধ। কবি একেই মান্য করেছেন কবিতায়। তার জন্য একটি সহজ অথচ হৃদয়জ অনবদ্য ভাষা ব্যবহার করেছেন। একটু নমুনা দেই-
“সবুজ ঢেড়সের মতো
তাজা ও সতেজ
এই হৃদয়
মোটেও সহজলভ্য নয়
পাবে না দোকানে
রাস্তার মোড়ে
কিম্বা বিলাসবহুল ভিলায়”।
“তুমি বলতে ফ্রিজের কথা
সুসজ্জিত কিচেনে
এই একটিমাত্র যায়গা
যেখানে তুমি রান্না করে
আবার রান্না না করেও গুছিয়ে
রাখতে তোমার উপকরণ ও ব্যঞ্জন…
…কিন্তু, আমি যে তোমাতে পাগল”।
সাজ্জাদ বিপ্লব তার পাঠককে নিয়ে যান প্রাত্যহিকতার অভ্যাস ও অভ্যস্ততায়। জীবনকে তিনি সহজ ও স্বাভাবিকরূপে পেতে চান। তার কবিতা এই স্বতঃস্ফূর্ত আবেগ-বিজ্ঞানে পূর্ণ। কোমল ও মধুর, গীতল ও প্রাণস্পর্শী তার ভাষা-এ যেন এক নিবিড় প্রার্থনা। এখানেই সাজ্জাদ-এর ব্যক্তিভাষা তৈরি হয়েছে। তার কাব্যভাষা ব্যতিক্রমী- আলাদা। তিনি স্বাক্ষর রেখে চলেছেন প্রেমের মধ্য দিয়ে স্বস্তি ও আস্থার পৃথিবী নির্মাণে-একটি মানবিক জগৎ সৃষ্টির উল্লাসে। একটি পূর্ণাঙ্গ কবিতা দিয়ে এই আলোচনা ইতি টানছি-
“রুয়ে দিলাম
আমার ভালোবাসা
তোমার জমিনে
পত্র-পুষ্প-পল্ল­বে
ভরে যাক
এ রঙিন গ্রহ
দ্রোহ থেকে প্রেমে
আমাদের জীবন-যৌবন
ওঠে যেনো ঘেমে”।
-এই কবিতাটি আমাদের জীবনের পূর্ণাতার কথা বলে। সাজ্জাদ বিপ্লব এই ভাষারই নির্মাতা, জীবনশিল্পী।
…………………………………….
তুমি ছাড়া আমার কোনো বসন্ত নেই : সাজ্জাদ বিপ্লব
প্রচ্ছদ: মইম সুমন,
প্রকাশ: ২০১৬। প্রকাশক: রহমান তাওহীদ। বগুড়া, বাংলাদেশ।
মূল্য: ৫০ টাকা।

পূর্বের সংবাদ

«