সোলায়মান আহসান
১২ জুন, ২০১৯ | ০১:৩২

সারমেয় অনুভব

tesst

বাসায় কেউ নেই। ঘরের দরোজায় সিঁড়িতে তাই নিশ্চিন্তে শুয়ে। অন্যদিন হলে এখানে শোয়ার মওকা তার হতো না। বারান্দার এক কোণে পানির ট্যাংকি সংলগ্ন এক চিলতে উঠোনে তার স্থান। ওখানেই শুয়ে বসে খানিকটা প্রভু ভুক্তির পায়চারি করে দিব্যি তা রদিন যাচ্ছে। এ বাসায় তাকে নিয়ে আসে যখন তার বয়স ছিল খুবই কম। যে বয়সে ওদের জাতের স্বভাব মত মা হারা হয়ে পথে-প্রান্তরে ঘুরে, চড়ে, জীবন কাটে, তারও আগে। এ বাসায় তার আশ্রয় জুটে যাওয়া ভাগ্যবান সে দুবেলা খাবার এবং নিরাপদ বিশ্রামের জন্যে তাকে কোন চিন্তা করতে হয় না। এসব জুটে যায় যার কল্যাণ সে এ বাসার ছোট্ট ছেলে পুটন। একদিন রাস্তা থেকে গলায় দড়ি বেঁধে টানে-হেঁচড়ে তাকে ঘরে তুলে। প্রথমটায় ভেবেছিল তার কপালে দুঃখ আছে। এ অবুঝ শিশু অভিভাবক হয়তো বা খেলার ছলে তার জীবন সংহারই করবে। কিন্তু না, বাসায় পৌঁছে দেখল ভিন্ন এক জগত। নেড়ি কুকুরজাত হওয়া সত্ত্বেও তার শিশু অভিভাবক তার সুখ স্বাচ্ছন্দ্যের কোন কমতি করলো না। গলায় অবশ্য একটা শক্ত দড়ি পড়লো, তা পড়া খুবই স্বাভাবিক, এতো সাধ করে নিয়ে এসছে, যদি সে বেতমিজী করে পালিয়ে যায়। তাছাড়া বাসার অন্যান্যরাও তাকে সহ্য করতে চাইছিল না। উটকো ঝামেলা বলে তাড়িয়ে দিতেই উদ্যত হয়েছিল পুটনের মা। কিন্তু একমাত্র ছেলের শখ মেটাতে অবশেষে মেনে নিলেন। কিন্তু মেনে নিলেন না পুটনের দাদী। কুকুর হচ্ছে নাপাক পশু। বাসার উঠোন দিয়ে চড়ে বেড়াবে। বারান্দায় উঠবে কখনো ঘর পর্যন্ত এটা ভেবে প্রবল আপত্তি তুললেন তিনি। পুটনকে অনেক বোঝান হলো। কুকুরের পরিবর্তে খরগোশ এনে দেয়া হবে।
কিন্তু পুটন পুটন নড়নচড়ন নট কিচ্ছু। ঠিক হলো কুকুরটি যাতে অবাধ বিচরণ না পারে সে জন্য ওর গলায় দড়ি বেঁধে রাখা হবে। তাতে অবশ্য তার খুব একটা খারাপ লাগেনি। গলায় দড়ি বা চেন বেঁধে দেয়ার রেওয়াজ মানুষ সমাজে অনেক পুরনো। পশুদের বেঁধে রাখার মধ্যেই মানুষ জাতি জগতের কল্যাণ অন্বেষণ করে। কিন্তু তাদের মনের পশুকে বাঁধতে পারল ক’জনা?
পুটন অল্প কদিনের মধ্যেই তার নাম দিয়েছে ‘টাইগার’। তার নাম নির্ধারণের ঘটনা খুব মজার। পুটনের খালত ভাই অনীক বেড়াতে এসেছিল। সে-ই পুটনকে তার নাম রাখতে চেপে ধরে। সবাই তার নাম নির্ধারণ নিয়ে কয়েকদিন থাকে মেতে। পুটনের ছোট চাচাকে নিয়ে বেশ কয়েকটি মিটিং সিটিং চাঁদনী রাতে এই উঠোনেই হল। শেষে পুটনের চাচা এই যুক্তিতে তার নাম ‘টাইগার’ রাখলেন। নামের তাসির নাকি স্বভাবে প্রভাব রাখে। তাই সে জাতে নেড়ি হলেও ঐ নামের সুবাদে তার স্বভাব টাইগারের হয়ে যেতে পারে। মনে মনে সেদিন হেসেছিল। মানুষের এসব অদ্ভূত কাজ-কারবার দেখে হাসে। নাম দিয়েই সবকিছু উদ্ধার করতে চায় ওরা।
টাইগার এখনো মনে আছে পুটন অনীকের উৎসাহে তার রাখার একটা ছোট্ট অনুষ্ঠানও হয়েছিল। প্রচুর আইসক্রিম খাইয়েছিল সবাইকে পুটনের চাচা খোকন। তার দুঃখ যে, নাম রাখা অনুষ্ঠানের সে-ই খাওয়া তার কপালে জুটেনি। আইসক্রিম নাকি কুকুরের খাদ্য নয়। লোভাতুর দৃষ্টিতে ওদের খাওয়া দেখে ইচ্ছে করেছিল তার কারো হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে চেখে দেখে জিনিসটা কেমন। কিন্তু তার গলায় দড়ি। এমন অনেক ইচ্ছেই তার দড়ির নিষ্ঠুর বাঁধনে মৃত্যু ঘটে।
বেশ কয়েকদিন হলো এ বাসায় একটা পরিবর্তন সে লক্ষ্য করেছে। লোকজনের আনাগোনা বেশি। পুটনের খালারা, নানী কে কে এসেছে। সে জানে ওদের আসার কারণ। এ বাসায় আরেক নুতন অতিথি আগমনের সময় নাকি নজাদিক। সে অতিথি পুটনের মার পেটের ভেতর ধীরে ধীরে বেড়ে উঠেছে। মানে পুটন আর একা থাকবে না। ভাই বা বোন একটা পেয়ে যাবে। তখন কি পুটন তাকে আগের মতোই ভালবাসবে? টাইগারের মনে এমন সংশয় জাগে।
কয়েকদিন আগে ঘটনা। একটা গাড়ি এসে তাদের বাসার সামনে থামে। হর্ন বাজল একটু ভিন্ন ধরনের। পুটনের মাকে ধরাধরি করে সবাই গাড়িতে উঠাল। সে তখন মুক্ত জীবনযাপন করে। তাই সে-ও গেট থেকে বের হয়ে রাস্তায় এসে পুটনের মাকে বিদায় জানাল। পুটনও উঠল সে গাড়িতে। হাত দিয়ে তাকে উদ্দেশ্য করে বলল, হসপিটালে যাচ্ছি, আমার বোন আনতে। তুই বাসা পাহারা দিস।
পুটনের কথায় সে লেজ নেড়ে তার জবাব দেয়, ঠিক আছে, তুমি কিছু ভেবো না। সে জানে পুটন না থাকলে এ বাসায় তার কিছুটা অযতœ হবেই। আর পুটনের দাদী তো তাকে সহ্যই করতে পারেন না। বয়স হলে মানুষ এমন নিষ্ঠুর হয় কেন? টাইগার ভেবে কুল পায় না। একদিন রেগে তেড়ে গিয়েছিল বুড়িকে। সেকি বুড়ির হাউমাউ কান্না। পুটনের মাকে ডেকে তার চৌদ্দগোষ্ঠী উদ্ধার করলো। কুকুর পুষে নাকি কুকুর স্বভাবের লোক। এমন কথাও পুটনকে উদ্দেশ্য করে বলল। শুনে রাগে শরীর জ্বলে যাচ্ছিল।
এতোদিনে এ বাসার সবাই তাকে ভালবেসে ফেলেছে। তাছাড়া একতলা বাসা বলে নানা রকম ভয় থাকে। টাইগার আছে বলে সবাই মনে একটা ভরসা পায়। সে-ও তো আগের মতো ছোটইট নয়। খেয়েদেয়ে বেশ বেড়ে উঠেছে। হৃষ্টপুষ্ট। সত্যিকার টাইগারের তিন ভাগের এক ভাগ তো বটেই। হালুম হুলুম ডেকে নামের যথার্থতা প্রমাণ করতে না পারলেও ঘেউ ঘেউ ডাকটায় যে বেশ জোর আছে তা সবাই জেনে গেছে। হবে না, পুটন তাকে রেগুলার কাঁচা গোশত খেতে দেয়। অবশ্য বাজারের বাসি ফেলা গোশতই তার কপালে জোটে। তাইই দেয় ক’জনা?
পুটনের মা চলে যাবার পর বাসাটা অনেকটা ফাঁকা হয়ে গেল। লোকের আনাগোনাও কমে গেল। শোনা গেল পুটনের মার শারীরিক অবস্থা ভাল নয়। বয়সকালে বাচ্চা হতে গিয়ে খানিকটা মুশকিল দোয়া করানো হল। তিনদিন পর আবার সবার মুখে হাসি। মিষ্টি খাওয়ার ধুম। পুটনের নাকি বোন হয়েছে। সবার কাক্সিক্ষত অতিথি এসেছে। পুটনও মনে মনে চেয়েছিল বোন। পুটনের আব্বুও। তাই খুশির জোয়ার বয়ে গেল বাসা জুড়ে। টাইগারের আদর যতœও ফিরে এলো আগের মতো। পুটনের মা এখনো বাসায় ফিরেনি। পেট কেটে বের করেছে পুটনের বোনকে। তাই কয়েকদিন থাকতে হবে তাকে হসপিটালে।
পুটনের আব্বু থাকেন সউদী আরব। সেখানে পাঠান হলো চিঠি শুভ সংবাদ জানিয়ে। চিঠিতে নতুন অতিথির জন্য কসমেটিক্স সেট, পেন্টি, নরম টাউয়াল, গরম জামা ইত্যাদি পাঠাতেও লেখা হলো। অবশ্য না লিখলেও এসব এসে হাজির হতো। ইমাদউদ্দিন উদার প্রকৃতির লোক।
শুধু আপন স্ত্রী ছেলেমেয়ের জন্যে নয় আত্মীয়-স্বজন সবার প্রতি তার দীলে প্রচুর মহব্বত। সবার দুঃখে ব্যথিত হওয়া, কষ্ট লাঘবে এগিয়ে আসা তার স্বভাব। দু’হাতে লোকজনকে উপহার দেয়ার মধ্যে সে আনন্দ পায়। তারা বাবা বলতেন, বাবা, হাতের তালু পেতে রাখবে না উপুড় করে রাখবে, দেখবে তাতেই আনন্দ। ইমাম সত্যি সত্যিই দিয়ে আনন্দ পায়। নিজের ছোট ভাই দুটোকে লেখাপড়া করানো বোনটিকে বিয়ে দেয়া সবকিছুই ইমামউদ্দিন অত্যন্ত সুষ্ঠুভাবে সমাধা করেছে। সে বিশ্বাস করে এসব সে করেনি আল্লাহ করিয়েছেন। আল্লাহ যদি এভাবে বিদেশ বাড়িতে পাড়ি দেবার সুযোগ করে না দিতো তবে এসব হতো না।
ঢাকা শহরে তার বাড়ি হবে তা সে কোনদিন স্বপ্নে ও ভাবেনি। কিন্তু আজ তা বাস্তব। মিরপুর কাজীপাড়ায় একখণ্ড জমি কিনে টিনশেড বাড়ি বাড়িয়েছে গেল বছর। টাইগার অবশ্য পুটনের আব্বুকে দেখেনি। লোকজনের মুখে মুখে লোকটি সম্পর্কে এতো গুণকীর্তন শুনেছে যে মনে মনে ভালবেসে ফেলেছে। পুটনের মতোই তার আব্বুকে সে ভালবাসতে এবং মনিব হিসেবে ভাবতে শিখেছে। তার ধারণা দীলওয়ালা ঐ লোকটি এলে তাকেও ভালবাসা দেবে।
হঠাৎ যেদিন রাতে বাসায় হৈচৈ পড়ে গেল। কান্নাকাটিও শোনা গেল ভেতর। টাইগার ভেবে পায় না কি ঘটল! উদ্বেগ নিয়ে পায়চারি করতে থাকে সারা বাড়ি। পুটনও বাসায় নেই। তার কাছেও কেউ আসছে না। জানার সুযোগও ঘটেছে না। একটু পর টাইগার বুঝতে পারে ঘটনা সৌদি থেকে বাঙালিদের জাহাজে করে বাংলাদেশ পাঠিয়ে পুটনের আব্বু তাদের মধ্যে একজন। জাহাজে অমানবিক আচরণ, সৌদি আরবে ফেলে আসা টাকা-পয়সা মালপত্র এবং চাকরি হারিয়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা ভেবে ইমাদউদ্দিন এ সেই মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছেন। সে কারণেই সবার মনে উদ্বেগ ও কষ্ট। অর্থকড়ি সম্পদ হারিয়ে এসেছে এতে দুঃখ ছিল না ছেলে তার অসুস্থ হয়ে ফিরেছে এই দুঃখে পুটনের দাদী অঝোরে কাঁদছেন। পুটনের ফুফু চাচা সবাই।
টাইগারের মন খারাপ হয়ে গেল। আনন্দময় পরিবেশ হয়ে উঠলো বিষাদের। উৎকণ্ঠা নিয়ে রোজকার দায়িত্ব পালন করতে টাইগার চলে গেল গেটের পাশে। সকালে হয়তো দেখা হবে পুটনের আব্বুর সঙ্গে। যার সম্পর্কে তার রয়েছে কৌতূহল। একজন দীলদার মানুষকে দেখার আকাক্সক্ষা কত দিনের!
সকাল বেলা। লোহার গেট খোলার জন্যে পুটনের চাচা এলো। লেজ নেড়ে শুভেচ্ছা জানাল। পুটনের চাচার কোন ভাবান্তর ঘটল না। অন্যদিন হলে বলত, কী টাইগার, কেমন আছি? একটু পর ঘর থেকে বের হলো কালো প্যান্ট পরা খালি গা মোটা একজন লোক। টাইগারের চিনতে কষ্ট হয় না এই সেই পুটনের আব্বু। যাকে নিয়ে রাতে সবাই সোরগোল কাঁদামাটি করেছে। টাইগার ট্যাংকির কাছে নির্দিষ্ট স্থানে বসে সকালের খাবারের অপেক্ষা করছিল। দেখল, পুটনের আব্বু একটা দিয়ে কুপিয়ে খানিকটা মাটি সরালেন। টাইগার, শেয়াল ও অন্যান্য হিংস্র পশু গর্ত করে নিজের আশ্রয় যেভাবে তৈরি করে ঠিক সে রকম। তারপর একটা লোহার চেয়ার বসালেন। ধীরে ধরে তিনি চেয়ারটায় বসলেন। এরপর মুখে আবলতাবল কি যেনো বকছেন আর হাত দিয়ে নানা ভঙ্গি করছেন। টাইগার বুঝতে পারে লোকটির মাথা ঠিক নেই। কেমন মায়া হতে থাকে। এমন সুন্দর লোকটির মাথায় গোল ধরেছে ভাবতেই তার খুব কষ্ট হচ্ছিল। মাথা ঠিক না থাকলে জীবের মাঝে বুঝি কোন তফাৎ থাকে না।
ইমাম উদ্দিন বসে থাকলেন। সকাল দুপুর বিকেল গড়িয়ে গেল। কেউ এলো না তাকে ডাকতে। কেউ তার সামনে খাবার এনে যাচনা করল না। রাতের অর্থেকও কেটে গেল। টাইগার তার নিজ জায়গায় একঠায় বসে রইল। আজ তার পাহারা দেবার দায়িত্ব বাসা নয়, পুটনের আব্বুকে। মাথা খারাপ লোকটা যদি ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়ে, তবে চিৎকার শুরু করবে। কিন্তু না, ইমাদ তা করল না।
মধ্যাতে ইমামউদ্দিনকে ঘরে তুলে নিতে এলেন মা। এতক্ষণ কেউ তার কাছে ঘেঁষতে সাহসই পাচ্ছিল না। ইমাদ সুবোধ বালকের মত মার সঙ্গে গিয়ে উঠলো। পরদিন সকালে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি। ইমামদউদ্দিন কোদাল দিয়ে গর্ত করা স্থানটি আরো বড় করল। কবরের আকৃতির। এক সময় শুয়ে পড়ল তাতে। চিৎকার করে বলে যাচ্ছেÑ আমি মরা, আমি মারা গেছি, আমারে কবর দে তোরাÑ।
সাহস করে কেউ তাকে তুলতে এলো না। হাতে একটা লোহার বল্লম এবং কোদাল তাই কাছে ঘেঁষতে সাহস পেলো না। টাইগার অবশ্য দু একবার লোকটির খুব কাছে গিয়ে ঘেউ ঘেউ করে ভয় দিতে চেয়েছে। কিন্তু লোকটি নির্বিকার। মৃত্যুর জন্যে যে নিজেই কবর খুঁড়েছে, তার মতো কুকুরের ঘেউ ঘেউ শব্দে ভয় পাবে কেন!
সন্ধ্যা উতরিয়ে গেল। লোকটি ওভাবে শুয়ে-বসে কাটিয়ে দিলো আজও। কিচ্ছু খেলো না। টাইগার ভাবে, এভাবেই বুঝি মারা যাবে? খাওয়া-দাওয়া ছাড়া গ্রীষ্মের খররোদে এভাবে পড়ে থাকলে মানুষ বাঁচে? কিন্তু সে কিইবা করতে পারে। আপন মানুষই যখন তাকে ভয় পেয়ে নিরাপদ দূরত্বে থাকছে। যারা একদিন তার খুব কাছে ভিড়তে উৎসাহী ছিল।
ইমাদউদ্দিনকে তেমন ভয়ঙ্কর বলে মনে হয় না। তার সম্পর্কে শুনে শুনে টাইগারের মনে লোটির ব্যাপারে এমন সহানুভূতি প্রচ্ছন্ন, মন্দ কিছু ভাবতেই পারে না সে। কিন্তু ইতর প্রাণী হিসেবে তার অনুভূতির কি দাম আছে?
মসজিদের মাইকে এশার আযান। আকাশে প্রচুর মেঘ। হয়তো বৃষ্টি হবে। ঐ অন্ধকারে ইমামউদ্দিন বসে। এমন সময় ইমাদের ছোট ভাই, বড় লোক ভগ্নিপতি, বোন, আত্মীয়-স্বজন দশ বারোজন সোরগোল করে এলো গাড়িতে। সঙ্গে একজন ডাক্তারও।
ইমামউদ্দিনকে ধরে নিয়ে আসে প্রথমে ঘরে। ইমামউদ্দিন চিৎকার করে বলতে থাকে আমারে কবর থেকে উঠাস্ কেন্Ñ আমি মারা গেছিÑ আমি মরা মানুষ…
বলশালী লোকটির সঙ্গে পেরে উঠছিল না সবাই। ধস্তাধস্তি করে তো একটা মানুষকে কাপড় পরানো গাড়িতে তোলা সম্ভব নয়। তাই ডাক্তার ইনজেকশন পুশ করল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ইমাদউদ্দিনের দেহ অসাড় হয়ে পড়ল। কোন নড়াচড়া নেই। মুখেও কোন কথা নেই। মৃত মানুষের মত। পাঁচ ছ’জন লোক ধরাধরি করে তোলা হলো তাকে গাড়িতে।
টাইগার গেটের বাইরে এসে ইমাদউদ্দিনকে তুলে নেয়া দৃশ্য দেখে মনে কষ্ট পেল। নীরবে দাঁড়িয়ে থাকল। চলে যাবার পরও অনেকক্ষণ বাড়ির বাইরে পায়চারি করল মনের কালো মেঘ দূর করার জন্য। কিন্তু না, কিছুতেই ঐ যন্ত্রণা কাতর মুখটিকে চোখের সামনে থেকে সরাতে পারছিল না।
আজ বাসায় কেউ নেই। রাতে তাকেই পাহাড়া দিতে হবে একা।
এমন গুরু দায়িত্ব নিয়ে ঘরের বারান্দার সিঁড়িতে শুয়ে আছে সে। সারাদিন কোন খাবারও জুটেনি। পেটে আগুনের মতো ক্ষুধা। কে দেবে একটু খাবার?
বাসা ছেড়ে বের হলে হয়তো ডাস্টবিনে কিছু একটা জুটে যেতো। কিন্তু বাসা ছেড়ে যাবে? না। সবাই গেলেও সে পারবে না। না খেয়ে মরে গেলেও না। পুটনের আব্বু যদি দুদিন না খেয়ে থাকতে পারে, সেও পারবে। চাইগার মাথা তুলে ওপরের দিকে তাকায়। পাওয়ারফুল লাইট জ্বলছে। তার মনে হতে থাকে এটা লাইট নয়, দিনের সূর্য।

বিষয়সমূহঃTags: