উৎসঙ্গ সৃজন চিন্তন
২১ সেপ্টেম্বর, ২০২০ | ১২:৪৮

সায়ীদ আবুবকর-এর ছড়া

tesst

খোকার প্রার্থনা

অনেক ভালো-
কেমন ভালো?
এমন ভালো,
নেই যে ভালোর শেষ;
যাক না ভরে সেই ভালোতে
আমাদের এই দেশ।

অনেক শান্তি-
কেমন শান্তি?
এমন শান্তি,
যে-শান্তিতে জুড়ায় দেহ-মন;
থাকে যেন সে-শান্তিতে
দেশের মানুষজন।

প্রাতে যেন সূর্য ওঠে,
রাতে ওঠে চাঁদ;
পেটে যদি অন্ন জোটে,
নেই আর কোনো সাধ।

অনেক আলো-
কেমন আলো?
এমন আলো,
যে-আলোতে আঁধার মুছে যায়,
মনের কোণে জমাটবাঁধা
দুঃখ ঘুচে যায়;
সেই আলোতে দাঁড়াক সবাই এসে,
স্বর্গ নেমে আসুক সারা দেশে।

ফুলের মেয়ে তাসনিয়া

একটি মেয়ে তাসনিয়া
ছিলো ফুলের চাষ নিয়া।
গোলাপ গাঁদা সূর্যমুখী
ফুটিয়ে সে ছিলো সুখী;
সুখী ছিলো দশ জনে তার
সেই ফুলের সুবাস নিয়া।

ফুলের মেয়ে তাসনিয়া
হাঁটতো কোলে হাঁস নিয়া।
তাই দেখে সব মোরগ এসে
কাঁধের ’পরে বসতো হেসে,
গরুগুলো থমকে যেতো
মুখে সবুজ ঘাস নিয়া।

হায়, সে মেয়ে তাসনিয়া-
কি যে হলো, হঠাৎ করে
চাঁদ-তারাদের রাস্তা ধরে
ফুড়ুৎ করে উড়ে গেল
সবার দীর্ঘশ্বাস নিয়া।

সূর্য-সুইচ

সবাই যখন ঘুমে বিভোর,
খোকন তখন জেগে
নিত্য নতুন গবেষণায়
থাকে সদাই লেগে।

একটা মিশন নিয়েছে সে,
ঘুম হয়েছে হারাম
ভুলে গেছে খেলাধুলা
আহার নিদ্রা আরাম।

মধ্যরাতে চেঁচায় খোকন,
“ইউরেকা! ইউরেকা!”
মা এসে কয়, “গাধার মতো
চেঁচাস কেন একা?”

“দ্যাখো না, মা, এই সুইচটা
আমার দখলে;
অন করে দাও, ভিমড়ি খাবে
তোমরা সকলে।”

মা বলে, “এই সুইচ দিয়ে
কী হবে তাই শুনি!”
“দেখলে বলো শুনতে কে চায়,
বলে জ্ঞানী-গুণী;

চুপটি করে দ্যাখো, ও মা,
এক টিপে কী হয়-”
বলেই খোকন টিপলো সুইচ,
অমনি জগৎময়
ঝলমলিয়ে উঠলো হঠাৎ
অবাক সূর্যোদয়।

মোরগ জেগে হাঁক ছাড়লো,
গেল সবার কানে;
লাঙল-জোয়াল নিয়ে কৃষক
ছুটলো মাঠের পানে।

দোয়েলেরা জ্ঞান জুড়লো
জোড়া দিঘির জলে
কর্মজীবী মানুষেরা
ছুটলো দলে দলে।

মা বললো, “হায় রে খোকন
এখন যে মাঝরাত-
ভাত খেয়ে সব ঘুমিয়েছিল,
হজম হয়নি ভাত

অমনি দিলি দিন বানিয়ে,
এখন উপায় কী?”
খোকন বললো, “চিন্তা কিসের,
সুইচ টিপে দি!”

অফ করে যেই দিলো সুইচ,
সূর্য নিভে গেল
দিন পালালো, রাতের জা’গায়
রাতে নেমে ফের এলো;

ঘরে আবার ছুটলো সবাই,
ভোরের নিউজপেপার
ফলাও করে লিখলো রাতের
আজগুবি এই ব্যাপার।

খোকন বললো, “দেখলে ও মা,
আমার আবিষ্কার?”
“কাউকে যেন এই কথাটা
কসনে খবরদার!

জানতে পারলে আসবে পুলিশ”
খোকন কাঁপে ডরে
“ ও বাবা গো মাগো” বলে
লুকিয়ে থাকলো ঘরে।

কাঁঠাল পাকায় কিলিয়ে

লোকটা শুনি অনেক গুণী,
কাঁঠাল পাকায় কিলিয়ে।
সেই কাঁঠাল সে বিনা মূল্যে
মানুষকে দেয় বিলিয়ে।

পাকানো সেই কাঁঠাল যারা
চায় না নিতে, ’ছন্নছাড়া!’
বলে তাদের ধরে এনে
নেয় সে কাঁঠাল ছিলিয়ে।

তারপরে দুই কান ধরিয়ে
হাঁসের মতো হাঁ করিয়ে
সেই কাঁঠালের কোয়াগুলো
দেয় তাদেরকে গিলিয়ে।

গেঁয়ো ভূত

গেঁয়ো ভূত
অদ্ভুত
দাঁতগুলো ওঁচা,
নাক বোঁচা বোঁচা
আর চোখ ট্যারা;
সেই চোখে এরা
সবই দ্যাখে ফুটো,
একটাকে দুটো,
খোলাকে যে ঢাকা,
কাঁচাকে যে পাকা,
পাকাকে যে কাঁচা,
চাচীকে যে চাচা।

তো এক ভূত
গেছে এক বাড়ি;
লালপেড়ে শাড়ি
পরে এক চাচী
রাঁধছিল মাছ;
ভেবে সাত-পাঁচ
বললো, “ও চাচা,
রাঁধতেছো হাঁচা,
করবো না মিচ,
দাও এক পিচ।”
এই শুনে চাচী,
ছিলো কাছাকাছি
বাসি এক ঝাঁটা,
তাই তুলে “বেটা,
আমি তোর চাচা?”
বলে দিলো মার
গোটা তিন-চার।
“বাঁচা! বাঁচা! বাঁচা!”
বলে সেই ভূত
প্রাণ নিয়ে ছোটে
যেন বিদ্যুৎ।”

গেঁয়ো ভূত
অদ্ভুত,
কুমড়োর পেট,
মূর্খ নিরেট;
ব্যাঙের ছাতা
তার গোটা মাথা;
সে-মাথায় ভরা
কেবলি গোবর।
হতবাক করা
শোনো হে খবর:
বুদ্ধির ঢেঁকি
সেই ভূত নাকি
জো”চুরি করে
ঢুকেছে শহরে।
সাবধান ভাই!
মনে রাখা চাই
গেঁয়ো ভূত এরা,
চোখ ট্যারা ট্যারা,
সবই দ্যাখে ফুটো,
একটাকে দুটো।

দয়ালু চোর

নিউ মার্কেটের এক বস্ত্রের দোকানে
গেল এক ধূর্ত চোর কিনতে ওখানে
একখানা শার্ট। তার হয়েছে পছন্দ
যে-শার্টটা, দেখতে তা নয় মোটে মন্দ।
শার্টটা সে হাতে নিয়ে ওল্টায়-পাল্টায়,
টিপে টিপে দ্যাখে আর ভাবে, সকালটাই
হবে মাটি বাগাতে না পারে যদি শার্টটা।
টেনশনে ধুকপুক করে তার হার্টটা।
দোকানদার হেসে বলে, “কী ভাবেন, ভাই?
এরচেয়ে ভালো শার্ট এ-মার্কেটে নাই।
নারিন্দার শার্ট এ যে, কিং-শার্ট নাম!”
ক্রেতা তার বলে, “তাই? কত এর দাম?”
“সাত শ লাগবে পুরো”, দোকানদার কয়।
ক্রেতা বলে, “নেবো, যদি দুই শ-তে হয়।”
দোকানদার বলে, “না, না, পাঁচ শত দেন।”
ক্রেতা বলে, “ না রে, ভাই, তিন শত নেন।”
“নেবেন কি চার শ-তে?” দোকানদার বলে।
“সাড়ে তিন দিতে পারি”, ক্রেতা বলে চলে।
দোকানদার রেগে বলে, “ দেন সাড়ে তিন-ই!”
অমনি শার্টটা নিয়ে, ক্রেতা ছিলো যিনি,
মারলো মুরগি-দৌড় দাম না দিয়েই।
দোকানদার ছোটে আর বলে, “এই, এই,
চুরিই করবি যদি, করলি ক্যান্ তবে
দর কষাকষি, তোকে বলতেই হবে।”
দূর থেকে বলে চোর, “তা না হলে, বস,
হতো যে তোমার পুরো সাত শ-ই লস।”
থমকে দাঁড়ায় পথে দোকানদার শুনে,
বলে, “হেন চোর মেলে কপালেরই গুণে।”

মানুষ হতে চাই

সবাই বলে, ‘বড় হয়ে কী হতে চাও, খোকা?’
যত ভাবি ততই আমি যাই যে বনে বোকা।

ডাক্তার, না পাইলট হবো? নাকি ইঞ্জিনিয়ার?
ব্যারিস্টার, না রাজনীতিবিদ-হতে পারি কী আর?

যত ভাবি, চোখের সামনে কত ছবি ভাসে
দেখতে দেখতে সেসব ছবি, দুচোখ ভিজে আসে।

দাদু বলেন, ‘ডাক্তার হ, বাড়বে প্রতিপত্তি।
বাড়ির স্বপ্ন, গাড়ির স্বপ্ন হয়ে যাবে সত্যি।’

কিš‘ চোখের চশমা খুলে দেখুন দাদুমশাই,
ডাক্তার হতে গিয়ে সবাই হ”েছ কেমন কসাই!

দাদী বলেন, ‘পাইলট হ, মজা হবে কত
ফুড়–ত করে উড়ে যাবি ঈগল পাখির মতো।’

কিন্তু‘ কারা বোমা ফ্যালে আকাশ থেকে ধুলায়?
কাঠের মতো পোড়ে মানুষ জাহান্নামের চুলায়।

না রে, দাদী, মানুষমারা দানব হবো না রে!
শুনে দাদী মুখের দিকে তাকায় বারে বারে।

আব্বা বলেন, ‘ব্যারিস্টার-ই হইও, খোকা, শোনো-
স্বাধীন পেশা, স্বাধীন জীবন, দাসত্ব নেই কোনো।’

‘কিš‘ কারা আইন দিয়ে মানুষ ঝোলায় ফাঁসে?
নিরপরাধ মানুষ মরে-ব্যারিস্টাররা হাসে।’

মুখের দিকে ফ্যালফেলিয়ে তাকিয়ে থাকেন মা,
‘তাহলে তুই, খোকনসোনা, কিছুই হবি না?’

আমি বলি, ‘মাগো ওসব মাথামুন্ডু ছাই
চাই না হতে, কেবল আমি মানুষ হতে চাই।’

বিষয়সমূহঃTags:

পরের সংবাদ