মুহাম্মদ রেজাউল করিম শাহীন সৈকত ফারুক মোহাম্মদ ওমর হাসান নাজমুল মুহম্মদ হেলাল উদ্দীন অনিক মাযহার রহমান মাজিদ
২৫ মার্চ, ২০১৯ | ১১:৫০

স্বাধীনতা সংখ্যা ২০১৯

tesst

অনন্ত জীবনের ঘ্রাণ
মুহাম্মদ রেজাউল করিম

মসজিদের গম্বুজের মতো হৃদয় যার
আমি তার কাছে যাই
দুপুরের সবুজ গন্ধ ঝেড়ে,
পরম বিশ্বাসের ঝড় তোলে
আমি হাত রাখি তার হাতের ওপর
পার্থিব সকল দরোজা বন্ধ করে
আমি পাঠ করি চিরন্তন শপথ বাক্য
আমি ছুঁড়ে দেই আমার সমগ্র জীবন
অসীম বৃত্তের ভেতরে।
আমার চোখ থেকে ঝরে পড়ে অলস উচ্ছ্বাস
আমার বুকের আঙিনায় জমে অনন্ত জীবনের ঘ্রাণ ॥

নতুন প্রাণের সন্ধানে
শাহীন সৈকত

যাদের কথা মনে করে আমি সারা দিনমান পার করে যাই
সন্ধায় ফিরে আমি দেখি, কেউ তারা আমায় মনে রাখে নাই।
হতাশা আর ব্যার্থতা নিয়ে, যখন রাত্রি নামে আমার ঘরে
নির্ঘুম চোখে পার হয় রাত আমার চোখে না পলক পরে।
মোহের পিছনে ছুটছে যারা আমিতো তাদের দলের নই
কাজ হীন এই জীবনে আমি ভেজেই চলেছি পরের খই।
তোমরা যারা ধোকায় ফেলে আমাকে তিমিরেই রাখতে চাও
অভিশাপ নয়, অনেক বেশী তোমাদের জন্যে, করুণা, নাও।
এখনও আমি বেশ ভালই আছি
তোমরা কেমন? জানি না তা,
শীত বুঝি যায় ঝরিয়ে দিয়ে গাছের সকল হলুদ পাতা।
এখানেই পাবে আগমন ধ্বনি বসন্ত লাগুক সবার প্রাণে
ফুলে ফলে হেসে উঠবে সবাই
নতুন কোন প্রেমের টানে।

স্বাধীনতা তুমি স্বাধীন হও
ফারুক মোহাম্মদ ওমর

স্বাধীনতা তুমি স্বাধীন হবে এই আশায় কেটে গেছে কতো যৌবন
তবুও বার্ধক্যে তুমি স্বাধীন হও
আমার স্বাধীনতা তুমি স্বাধীন হও।

এই ভূ-খন্ডের তিনপাশে যে আগ্রাসী প্রেসক্রিপ্সন
তার হুকুমে ঔষধ খাওয়ার স্বাধীনতা
কিম্বা গৌন সংস্কৃতির নামে তারুণ্যের মগজে গৌণধোলাই
আমি মানতে পারিনা মানতে চাইনা
আমাকে স্বাধীনও করে না
স্বাধীনতা আমার প্রজন্মের স্বাধীনতা
তুমি স্বাধীন হও।

সবুজের বুকে লাল তোমার আমার লালিত্য চেতনা
মিছিল হবে বিশ্বময় বাংলাদেশ
এই নাও আমার দেশের স্বাধীন পতাকা
হাতে হাতে ছড়ানো স্বপ্নময় বিশ্বাস
পতাকার মতো স্বাধীন হও স্বাধীনতা।

স্বাধীনতা তুমি স্বাধীন না হলে
আমি যুদ্ধে যাবো সাহসী মানুষ হবো
ভূ-খন্ডের আকাশে সিমান্ত ঈগল যেমন ঠিক তেমন
যদি তুমি স্বাধীন হও আমি স্বাধীন হবো
বারবার স্বাধীন হওয়ার জন্য এ স্বাধীনতা

স্বাধীনতা তুমি আবার নতুন করে স্বাধীন হও।

দেখেছি হাসির ক্ষয়
হাসান নাজমুল

হাসিদের ভিড়ে আমি গিয়েছিলাম কালকে, কিন্তুু পারিনি মানাতে,
আমি তো দুখীর সাথী, কিভাবে হাসিতে মিশি, কিভাবে থাকি যে সাথে,
আমার কান্নাই ভালো, আমি হাসির শরীর দেখেছি দু’হাতে ধরে,
সেখানে মনুষ্যত্ব নেই, পেয়েছি দুর্গনধ তাতে, শরীর গিয়েছে মরে,
মানুষেরা হাসি পেলে অমানুষ হয়ে যায়, মানুষও হাসি হয় !
হাসি-খুশি বোধহীন,এরা বিবেক বোঝে না, দেখেছি হাসির ক্ষয়।

অনেক রঙে রঙিন হয়ে ওঠে স্বাধীনতা
মুহম্মদ হেলাল উদ্দীন

অনেক রঙের সমাহারে একটি মুখ স্পষ্ট হয়ে ওঠে
হৃদয় গভির থেকে টেনে আনা মুষ্টিবদ্ধ সাহসের রঙ
ঘামে মেশা মাটির রঙে চোখে মুছে নেয়া রাগ নদীর রঙ
প্রাকৃতিক নিয়মে শক্তি যোগানো কলিজার বাঁধ ভাঙা ক্ষোভিত রঙে
চোখের মনির সাথে সূর্যের মিশে যাওয়া রঙে হেসে ওঠে
সাগর জলোচ্ছ্বাসের মতো ফুলে ওঠা বুকে
বিদ্যুত চমকের মতো জয় রঙ বৃষ্টির উল্লাসে
পৃথিবীর সকল গোলাপের কাঁটায় বিদ্ধ হয়ে আমাদের বুক
শাপলার রঙের মতো হেসে ওঠে, স্বাধীনতা।
কলিজার বিষুব রেখায় তিন পৃথিবীর রঙ নিয়ে
রক্ত ঘন ইতিহাস রঙ
ছিটকে পড়া মগজে মানচিত্রের বাস্তব রেখা রঙ
নদীর নরম রঙে মেশা সকাল নিয়ে জাগে
তুষের সাথে রক্ত মিশে যাওয়া রোদের বিক্ষোভি রঙ
হৃদয় ফাটা রক্তে শষ্যের ভিজে ওঠা রঙে
জমাট বাঁধা রক্তে আলোর বুক ঝলসে, বারুদেরথথ
বিস্ফোরণের মতো গর্জে ওঠা মৃত্যুর সাথে
না দেখা রক্তের মিছিলে
হারিয়ে আসা স্লোগানে
অস্ত্রের শব্দ পরিবর্তন নিয়ে আসা ঋতু,
যখন বুকের আকাশ ভরিয়ে দেয় পতাকার রঙ
মায়ের আঁচল থেকে স্নেহ মমতার রঙ এনে
এমন এমন অনেক রঙে রঙিন হয়ে ওঠে স্বাধীনতা।

বীর বাঙালী
অনিক মাযহার

তোমরা যারা দূরেই ছিলে দূরেই তারা থাকো,
আগের মতো এই হৃদয়ে আসতে হবে নাকো।
এখন আমি সুখেই আছি সঙ্গী-সাথী বিনে,
স্বপ্নগুলো উঠছে ভেসে সূর্য রঙিন দিনে।
আগের মতো এখন আমার চোখ ভাসে না জলে,
দুঃখগুলো ভুলে গিয়ে আছি সুখের তলে।
শত্রু এলে এখন আমি আর না কভু ডরাই,
বিশাল সাহস বুকে নিয়ে এই যে জমিন ভরাই।
কাঁথার তলে মুখগুলোকে আর না লুকায় রাখি,
রক্ত দিয়ে এখন সবে দেশের ছবি আঁকি।
ঘামের মাঝেও এখন সবার সুখের সুবাস থাকে,
উঁচু শিরে এখন সবাই হাজার সাহস রাখে।
আমরা স্বাধীন বাঁধনহারা বীর বাঙালীর দল,
শত্রুগুলো কেমন করে আনবি চোখে জল?
আঁধার পথেও হাঁটতে এখন আমরা না ভয় পায়,
অজানাকে জানতে এখন সবাই ছুটে যায়।
বীর বাঙালী মহীর মাঝে উঠছে দেখো জেগে,
দিনের আলো ফোঁটার আগে শত্রু যাবে ভেগে।

বাংলা কবিতায় স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ
রহমান মাজিদ

স্বাধীনতা মানুষের জন্মগত অধিকার। পৃথিবীর প্রতিটি প্রাণীই স্বাধীনতা নিয়ে মায়ের গর্ভ থেকে মাটির পৃথিবীতে আগমন করে। তাই জীব মাত্রই চায় স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকতে , কথা বলতে, চলাফেরা করতে, এমনকি স্বপ্ন দেখতে। অনন্ত আকাশে সুখের তরী ভাসিয়ে মুক্ত বুনো বাতাস ভরা সজিব নি:শ্বাস কার না ভাল লাগে? পৃথিবীর দিকে-দিকে মাঠে-ময়দানে, ডাঙ্গায়-জলে আসমান কিংবা পাতালে স্বর্গে বা মর্তে অতিথি পাখির মত অবাধ বিচরণ জীব মাত্রেরই ঐকান্তিক ভাল লাগার অন্যতম স্বাধীন অনুষঙ্গ। কিন্তু মানুষের এই স্বাধীনতা,স্বাধীন চলাফেরা, স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি, স্বাধীন মুক্ত চিন্তা, স্বাধীন ক্রিয়া কর্ম, স্বাধীন স্বপ্ন বুনন, বারবার বাঁধাগ্রস্থ হয়েছে তাদেরই স্বজাতীয় অপর মানুষদের দ্বারা। তাবৎ পৃথিবীর দিকে দিকে কালে কালে যুগে যুগে দেশে দেশে মানুষের স্বাধীনতাকে আটকে দেয়া হয়েছে বন্দুকের নল দিয়ে, কখনও বুটের তলা দিয়ে, কখনও বা ইস্পাত কঠিন লৌহ তারের কংক্রিট সীমানা দেয়াল মনের উপর তুলে দিয়ে। আর এটি করা হয়েছে সাধারণ প্রজা বৎসল নিরীহ শান্তিপ্রিয় জনগণের উপর মোড়ল, মাতব্বর, গুন্ডা প্রকৃতির এক নায়কতন্ত্র সা¤্রাজ্যবাদী মাস্তানদের পক্ষ থেকে। ষড়যন্ত্রের ফাঁদ পেতে মুক্ত বনের পাখিকে কঠিন লৌহ পিঞ্জরে আটকে রেখে মানুষরূপী এ সকল প্রতারকেরা প্রতিবাদী ডানা ঝাপটানোকে অট্টহাস্যে পৈচাশিক উন্মাদনায় উপভোগ করেছে। মুখের উপর মাসকিন টেপ লাগিয়ে ইচ্ছার উপরে নানা রকম ধারা আরোপ করে পিঞ্জরাবদ্ধ প্রাণীর মত নিয়ন্ত্রনের চেষ্টা করেছে। কিন্তু কুচক্রী মোড়লদের অপতৎপরতা মন থেকে মেনে নেয়নি নীরব কিন্তু বারুদী জনতা। প্রতিবাদ, প্রতিরোধ সংগ্রামের মাধ্যমে মুক্ত করেছে আপন ভূখন্ডকে। আপামর জনসাধারণ ঝাপিয়ে পরেছে যুদ্ধের ময়দানে। কেউ লড়েছে অস্ত্র হাতে সম্মুখ সমরে। কেউ বা আবার কন্ঠযোদ্ধা। গোলামীর জিঞ্জির ভেঙ্গে পরাধীনতার নাগপাশ ছিন্ন করতে সমাজ সচেতন ব্যক্তি রাজনৈতিক নেতা, সাংস্কৃতিক কর্মী বুদ্ধিজীবীদের সাথে বাদ যান নাই কবি সাহিত্যিকরাও। কলম যোদ্ধা হিসেবে তারা উৎসাহ যুগিয়েছেন তাদের ক্ষুরধার লেখনির মাধ্যমে।
উনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় ভাগের শেষ লগ্নে জন্ম নেয়া কবি রঙ্গলাল বন্দোপাধ্যায় বুঝেছিলেন স্বাধীনতা ছাড়া বেঁচে থাকা অর্থহীন। পরাধীন দেশের সম্মানিত নাগরিক হয়ে থাকার চেয়ে স্বাধীন দেশের মুটে,কুলি শ্রমিকের জীবন শ্রেয়। তাই তিনি লিখেছেন তার কাল জয়ী অমর কবিতা

স্বাধীনতা হীনতায় কে বাঁচিতে চায় হে
কে বাঁচিতে চায়?
দাসত্ব শৃঙ্খল বল কে পরিবে পায় হে
কে পরিবে পায়
কোটি কল্প দাস থাকা নরকের প্রায় হে
নরকের প্রায়
দিনেকের স্বাধীনতা, স্বর্গ-সুখ তায় হে
স্বর্গ সুখ তায়।
স্বার্থক জীবন আর বাহুবল তার হে
বাহু বল তার।
আতœনাশে যেই করে দেশের উদ্ধার হে
দেশের উদ্ধার।
অতএব রণভূমে চল ত্বরা যাই হে
চল ত্বরা যাই।
দেশহিতে মরে যেই,তুল্য তার নাই হে
তুল্য তার নাই।
বাবুই পাখি আর চড়–ই পাখির জীবন থেকে আমরা যেমন জেনেছি স্বাধীন দেশের কষ্টের জীবন পরাধীন দেশের সুখের জীবন অপেক্ষা অধিক সম্মানজনক ঠিক তেমনি রঙ্গলাল বন্দোপাধ্যায় এর আলোচ্য কবিতাটিও আমাদের সেই দীক্ষাই দিয়েছে।

ভারতের স্বাধীনতা সুর্য অস্ত যাওয়ার পর অত্র অঞ্চলের মানুষের জীবনে পাধীনতার যে অন্ধকার অমানিশা নেমে এসেছিল তা ভাষায় বর্ণনা করা অসম্ভব প্রায়। লবণ ব্যবসায়ের ছদ্মাবরণে ষড়যন্ত্রের যে অভিসন্ধি নিয়ে এদেশে এসেছিল বৃটিশ কুচক্রীরা তার খেসারত দিতে হয়েছে ভারত বর্ষের মানুষের প্রায় ২০০ শত বছর। ইংরেজদের সীমাহীন জুলুম, পীড়ন, আর নির্যাতনে অতিষ্ট হয়ে হিন্দু মুসলিম সকলেই মুখে মাসকিন টেপ লাগিয়ে ঘরের কোণে আবদ্ধ থাকতে বাধ্য হয়। অবশেষে হিন্দুরা ইংরেজ গোলামী করার সিদ্ধান্ত নিলে মুসলমানদের উপর নেমে আসে ঘোর আঁধারের মহা দূর্যোগ। হাটে, ঘাটে, পথে মাঠে ঘরে সকল জায়গায় মুসলমানরা নিগ্রহের শিকার হলে আলোর মশাল হাতে নিয়ে এগিয়ে আসেন মুসলিম জাগরনের অন্যতম পথিকৃত অনল প্রবাহের কবি সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজী। ডিনামাইটের চেয়েও প্রবল গতিতে বিস্ফোরিত হয় তার কলম। তিনি লেখেন

যতদিন নাহি হয় বিশ্বব্যাপি অভ্যুত্থান
ততদিন না করিব রঙ্গরসে যোগদান।
যতদিন নাহি ঘোচে অধীনতা অমানিশা
ততদিন না করিব কোনরুপ হাসিখুশি।
যতদিন নাই হয় প্রতি বাহু বীর্য্যবান।
ততদিন বল হেতু কর শক্তি সমাধান।
ধ্বংসিতে অরাতি গ্রামে কর গুঢ় মন্ত্রণা
বাঁচিবারে চাহ যদি শিখ অস্ত্র সঞ্চালনা।
সমর কৌশল বলে হও সবে গরীয়ান
তবেই পাইবে মুক্তি তবে হবে অভ্যুত্থান
উত্থানের মহা মন্ত্র সকলে করহ জপ
উত্থানের সাধনায় কর সবে মহাতপ।
পরাধীন বাংলাদেশে আবির্ভূত হয়েছিলেন অনল প্রবাহের এই বিখ্যাত কবি। ইংরেজ শাসনামলে বাংলাদেশের জনগনের অশিক্ষা, কুশিক্ষা, নিরাশা এবং দারিদ্র্যের কষাঘাতে নিষ্পেসিত ও জর্জরিত অবস্থা অবলোকন এবং বিশেষত অবহেলিত মুসলমানদের করুণ যন্ত্রণাকিøষ্ট জীবন যাপন দেখে কবি অত্যন্ত ব্যাথিত হন। স্বজাতির হৃত গৌরব ফিরিয়ে আনতে কলম হাতে ঝাঁপিয়ে পড়েন। হারানো সম্মান ফিরে না আসা অবধি কবি সকল প্রকার আরাম আয়েশ সুখ ভোগ পরিত্যাগ করার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যাক্ত করেন উক্ত কবিতায়।

১৭৫৭ সালের ২৩শে জুন পলাশীর আ¤্রকাননে নবাব সিরাজ উদ্দৌলার রক্তে ক্লাইভের খঞ্জর রঞ্জিত হওয়ার মধ্য দিয়ে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্ত যাওয়ার সাথে সাথেই জনগনের উপর নেমে এসেছিল পরাধীনতার নিকশ কাল আমবস্যার গাঢ় অন্ধকার। যার সুবহে সাদিক হতে ১৯০ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল এই অঞ্চলের অধিবাসীদের। ঐ সময়ে সারা পৃথিবীর প্রায় ৭২ শতাংশ দেশ উপনিবেশ আর ৭০ শতাংশ মানুষ ছিল পরাধীন। ভারতীয় উপমহাদেশে বসবাসরত জনগোষ্ঠীও এর বাইরে ছিল না। বৃটিশ বেনিয়াদের উপনিবেশিক শাসন, শোষণ আর বঞ্চনা যখন সহ্য সীমার চুড়ান্ত পর্যায়ে উপণীত ঠিক তখনই ধরার মাটিতে সৃষ্টিকর্তা পাঠালেন চির উন্নত শিরধারী, চির প্রতিবাদী, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামকে। বয়বৃদ্ধির সাথে সাথে তিনি উপলব্ধি করলেন আবাসভূমের অমূল্য সম্পদ সাত সমুদ্র তেরো নদীর ওপারে পাচার, ইংরেজ সৃষ্ট দারিদ্রের নির্মম কষাঘাত,আর শ্বেত চর্মের জটিল মানুষের কুটিল মস্তিস্ক প্রসূত ষড়যন্ত্রে হিন্দু মুসলিম সংঘাত। এন্টি ব্লাষ্টিক মিশাইলের চেয়েও দূর্বার গতিতে গর্জে উঠলো তার কলম। ১৯২২ সালের ১৩ই অক্টোবর প্রকাশিত ”ধুমকেতু” সংখ্যার কভার পেজে লিখলেন “সর্বপ্রথম ধুমকেতু ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতা চায়”। আর ভিতরের পেজে লিখলেন

“আর কতকাল থাকবি বেটি মাটির ঢেলার মূর্তি-আড়াল?
স্বর্গ যে আজ জয় করেছে অত্যাচারী শক্তি চাঁড়াল।
দেব শিশুদের মারছে চাবুক, বীর যুবাদের দিচ্ছে ফাঁসি
ভূ-ভারত আজ কসাইখানা, আসবি কখন সর্বনাশী?
দেব সেনা আজ টানছে ঘানি তেপান্তরের দীপান্তরে
রণাঙ্গনে নামবে কে আর তুই না এলে কৃপাণ ধরে?।
পরাধীনতার নাগপাশ ভেঙ্গে গোলামীর জিঞ্জিরে শৃঙ্খলিত জনতাকে স্বাধীনতার স্বাদ পাইয়ে দিতে কবি আহ্বান জানাচ্ছে তার জাতীর অকুতোভয় সন্তানদের। দেব শিশু আর বীর যুবাদের উপর অত্যাচারের করুণ ছবি তুলে ধরে ঘুমন্ত জাতীর চোখ খোলানোর চেষ্টা করেছেন কবি উক্ত কবিতার মাধ্যমে।
লবণ ব্যবসার ছলে ভারতের মাটিতে আগত মানুষদের কুটিল ষড়যন্ত্রে স্বদেশের মানুষ যখন দিশেহারা। তাদের স্বাধীন মানচিত্র গ্রাস করে ফেলেছে মানুরুপী বিশাল আজদাহার বংশধরেরা। দিনের পর দিন ভুলুন্ঠিত হচ্ছিল তাদের মানবতা ও স্বাধীন ইচ্ছা শক্তি। সেই সময় কলম হাতে বিজলী চমকের মত ছুটে এসেছিলেন সাহিত্য সমুদ্রের অকুতোভয় নাবীক, কাব্যালোকের আবর্জনা আর জঞ্জাল পরিচ্ছন্ন কবি ফররুখ আহমদ। পরাধীন জাতির ভুলের খেসারত হিসেবে প্রাপ্ত অবর্ণনীয় দু:খ কষ্ট ও নির্মমতার বাস্তব চিত্র দর্শনে পীড়িত হয়ে তিনি লিখেছিলেন-

“রাত পোহাবার কত দেরী পাঞ্জেরী?
এখনও তোমার আসমান ভরা মেঘে
সেতারা হেলাল এখনও উঠেনি জেগে?
তুমি মাস্তুলে আমি দাড় টানি ভুলে
অসীম কুয়াশা জাগে শূণ্যতা ঘেরি।
রাত পোহাবার কত দেরি পাঞ্জেরী?
সওদাগরের দল মাঝে মোরা ওঠায়েছি আহাজারি
ঘরে ঘরে ওঠে ক্রন্দন ধ্বনি আওয়াজ শুনছি তারি
ওকি বাতাসের হাহাকার -ওকি
রোনাজারি ক্ষুধিতের!
ও কি দরিয়ার গর্জন ওকি বেদনা মজলুমের
ওকি ধাতুর পাঁজরায় বাজে মৃত্যুর জয়ভেরী।
পাঞ্জেরী?
বৃটিশ রাজের কাছ থেকে কষ্টার্জিত স্বাধীনতার সুখ এতদাঞ্চলের মানুষের কপালে বেশিদিন স্থায়ী হয় নাই। বৃটিশের পাতলা মাথার চিকুন বুদ্ধিতে স্বাধীনতা লাভের পরেও ঘরের শত্রু বিভীষণ হিসেবে আর্বিভূত হয়। হিন্দু মুসলিম জাতিদ্বয়ের পারস্পরিক সন্দেহ, এবং ঘৃণার বিষবাষ্পে সৃষ্ট অবিশ্বাসের কারণে ১৯৪৭ সালেস্বাধীন ভারত ভেঙ্গে দুটি আলাদা স্বাধীন রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটে। ভারতের পাজর ভেঙ্গে পাকিস্তান নামক এক নতুন রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয় সংখ্যা গরিষ্ঠ মুসলিম অঞ্চল নিয়ে। সঙ্গত কারণেই বাংলাদেশ তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের একটি প্রদেশ হিসেবে পূর্ব পাকিস্তান নামে আতœপ্রকাশ করে। ফলে বাংলাদেশের জনগণ সমুদ্রচারী জলদস্যুদের কবল থেকে মুক্তি পেয়ে উদ্ভট ডাকাতের হাতে ধৃত হয়। শোষণ, জুলুম আর পাহাড় সমান বৈষম্যের বিরুদ্ধে অবশেষে বীর বাঙালী আন্দোলন শুরু করে। ১৯৭১ সালের রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানী শাসকদের শোষণের বিরুদ্ধে স্বশস্ত্র আন্দোলনের ডাক দেন। ২৫ শে মার্চের অন্ধকার রাতে হানাদার বাহিনী হিং¯্র পশুর মত ঝাঁপিয়ে পড়ে নিরস্ত্র শান্তি প্রিয় বাঙালীর উপর। নির্বিচারে হত্যা করতে থাকে এদেশের তরুণ, যুবক, প্রবীন বুদ্ধিজীবী সাংবাদিক, কবি, সাহিত্যিক ও সংস্কৃতি কর্মীদের। বাংলা সাহিত্যের পল্লী কবি খ্যাত কবি জসিম উদ্দীনের কলম ট্যাংক বিধ্বংসী কামানের গোলার মত গর্জে ওঠে। তিনি লিখলেন-

“কী যে কী হইল পশ্চিম হতে নরঘাতকেরা আসি
সারা গাঁও ভরি আগুনে জ্বালায়ে হাসিল অট্টহাসি।
মার কোল থেকে শিশুরে কাড়িয়া কাটিল যে খান খান
পিতার সামনে শিশুরে কাটিল করিল রক্ত ম্লান।
কে কাহার তরে কাঁদিবে কোথায়, যুপকাষ্ঠের গায়
শত সহ¯্র পড়িল মানুষ ভীষণ খড়গ ধায়।
পশ্চিম পাকিস্থানের বর্বর উর্দিধারী কর্তৃক নিরীহ নিরস্ত্র বাঙ্গালীদের উপর নির্বিচারে হত্যা, লুণ্ঠন, জ্বালাও পোড়াও এর নির্মম ছবি একেছেন কবি অত্র পঙক্তিতে।
যুগে যুগে পৃথিবীর দেশে দেশে আধিপত্যবাদীদের রাহুগ্রাস থেকে স্বাধীনতার ভেলা মুক্তির মোহনায় নিরাপদ নোঙরের জন্য অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে স্বাধীনতা পাগল মুক্তিকামী মানুষের। শ্বাপদ সংকুল বিপদ আবৃত দীঘ বন্ধুর পথ পাড়ি দিতে হয়েছে জান বাজী রেখে। দীর্ঘ নয় মাসের রক্ত পিচ্ছিল পথ পাড়ি দিতে গিয়ে বাংলা মায়ের দামাল ছেলেদের যে অপেক্ষা, প্রবাহিত রক্ত নদীর যে নির্মমতা, স্বতিত্ব হারানো নারীর যে বোবা কান্না তা তুলে এনেছেন মুক্তি সংগ্রামের আরেক প্রত্যক্ষদর্শী কবি শামসুর রহমান ঠিক এভাবে

তোমাকে পাওয়ার জন্য হে স্বাধীনতা
তোমাকে পাওয়ার জন্যে
আর কতবার ভাসতে হবে রক্ত গঙ্গায়?
আর কতবার দেখতে হবে খান্ডবদাহন?
তুমি আসবে বলে হে স্বাধীনতা
সাকিনা বিবির কপাল ভাঙ্গলো
সিঁথির সিঁদুর মুছে গেল হরিদাসীর
তুমি আসবে বলে হে স্বাধীনতা
শহরের বুকে জলপাইয়ের রঙ্গের ট্যাঙ্ক এলো
দানবের মত চিৎকার করতে করতে
তুমি আসবে বলে হে স্বাধীনতা
ছাত্রাবাস বস্তি উজাড় হলো।
রিকয়েললেস রাইফেল আর মেশিনগান
খই ফোটালো যত্রতত্র।
একটা জাতির বৈধ অধিকার স্বাধীনতা পাওয়ার জন্য কত মায়ের কোল খালি করতে হবে? কত রক্তের গঙ্গা বইতে হবে, কত বোনকে বিধবার থান পড়তে হবে, কত গোলা বারুদ আর কামানের শব্দে বাতাস দূষিত হবে এমন হাজারো প্রশ্ন বানে জর্জরিত করেছেন তিনি “তোমাকে পাওয়ার জন্য হে স্বাধীনতা” নামক উক্ত কবিতার মাধ্যমে।

মানুষের পায়ে যখন পরাধীনতার শিকল আটকে থাকে দীর্ঘদিন, তখন তার পাথুরে মন তা ভাঙ্গার জন্য হয়ে উঠে ব্যাকুল। সে স্বাধীনতার মন্ত্রে উদ্বেলিত হয়ে উঠে। অবশেষে তা স্বশস্ত্র সংগ্রামে রূপ নেয়। মুক্তি পাগল মানুষ ছুটতে থাকে মুক্তির মোহনার দিকে। শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। দীর্ঘ নয় মাসের মুক্তি সংগ্রামে এদেশের মানুষকে অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। আমরা পেয়েছি একটি লাল সূর্যের পতাকা। বিশ্ব মানচিত্রে স্থান করে নিয়েছে একটি স্বাধীন দেশ বাংলাদেশ। তিনশত বছর বন্দী জীবন কাটানো বাঙালীর দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন স্বাধীনতাকে পাওয়ার জন্য কেউ আহত হয়েছে কেউ পঙ্গু হয়েছে আর অসংখ্য মা বোনেরা হারিয়েছে তাদের গর্বের স্বতিত্ব। পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীদের নির্মম হত্যাযজ্ঞ, অমানুষিক জ্বালাও পোড়াও এর বিরুদ্ধে বাংলা মায়ের দামাল ছেলেরা বুক পেতে দিয়ে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছেন সহাস্যে। বাংলাদেশের খ্যাতিমান কবি রণাঙ্গনের অকুতোভয় সৈনিক বীর মুক্তিযোদ্ধা কবি আল মাহমুদ তুলে এনেছেন সেই বিভৎসতার একটি খন্ড চিত্র।

দ্যাখো আজ পতাকা দেখারই ছিল
কলরব করে ওঠো, উচ্চারণ কর
মুক্তির ভাষা। আমিও তোমাদের সাথে দেখতে থাকি।
তোমাদের সাথে আমার অপরিচ্ছন্ন দৃষ্টির অশ্রুসজল চোখ দুটি মেলে দাঁড়িয়ে থাকি।
কী লাল, সবুজ পতাকার মধ্যে গোল হয়ে বসে আছে
মনে হয় যেন পৃথিবীর মুক্তিকামী মানুষের রক্তের লোহিত কণায় অঙ্কিত হয়েছে এ সূর্য।
আমার ভেতরে কলরব করে উঠে কত মুখ কত আকাঙ্খার উজ্জ্বল দৃষ্টি। যারা আর ফিরে আসেনি।
কুষ্টিয়ায় ঝাপিয়ে পড়েছিল ছেলেটি
কুষ্টিয়ার কাষ্টমস কলোনির পাশে
সে ঝাপিয়ে পড়েছিল শত্রুদের জিপকে উড়িয়ে দিতে।
খন্ড খন্ড হয়ে উড়ে গিয়েছিল তার বাহু
উরু ও পিঠের কিছু অংশ।
হাসিবুল ইসলাম, আল্লাহু আকবার বলে সে আক্রমণ করেছিল।
তার বুক থেকে কলজে উড়ে গিয়ে ওই পতাকায় লেগে আছে।
লেখো তার শেষ উচ্চারণ আল্লাহু আকবার।
মুক্তির নেশায় বুদ হয়ে থাকা যুবকেরা সেদিন আল্লাহু আকবার স্লোগান দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল শত্রু সেনার কামানের সামনে। বুক পেতে দিয়েছিল বুলেট আর স্টেনগানের কাল নলের মাথায়। ডিনামাইট বুকে বেধে হানাদার বাহিনীর জিপ উড়িয়ে দেবার দুঃসাহস দেখিয়েছিল তরুণেরা। সম্মুখ সমরে অংশগ্রহণ করে শরীরের রক্ত মাংস অস্থি মজ্জা উড়িয়ে দিয়েছিল বাতাসের আঁচলে। কুমিল্লা কুষ্টিয়াসহ দেশের আনাচে কানাচে ঘটমান তরুণ মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বগাঁথা ফুটিয়ে তুলেছেন কবি ”এই পতাকার সূর্য স্বাক্ষী” নামক কবিতার মাধ্যমে।

স্বাধীনতার পরে স্বাধীন দেশে কিছু বিপদগামী লোকের বিতর্কিত কর্মকান্ডে দেশটা আবার নরক কুন্ডে পরিণত হয়। যে আশা আকাক্সক্ষা নিয়ে মানুষ স্বাধীনতার মন্ত্রে দীক্ষা নিয়েছিল তা যেন আজও অধরা রয়ে গেছে। স্বাধীন দেশে মানুষের স্বাধীন স্বপ্ন বারবার হোচট খেয়েছে এসকল দেশদ্রোহীদের দ্বারা। যে জুলুম আর বঞ্চনার অবসানকল্পে মানুষ পরাধীনতার সুতো ছিড়তে উদ্যত হয়েছিল তার চেয়েও প্রবল শক্তিতে অত্যাচার অনাচার ধেয়ে আসে নিজের আপন জাতি ভাইয়ের কাছ থেকে। এ যেন ঘরের শত্রু বিভীষণ হিসেবে দেখা দেয় সদ্য স্বাধীন দেশের দোর গোড়ায়। মুক্ত দেশের মুক্ত মানুষের উপর মুক্ত মানুষ দ্বারা নীপিড়নের এই বিভৎসতায় আঁতকে ওঠে কবি নির্মলেন্দু গুণের মানবদরদী মন। আহত মনের ভিতর থেকে তাই বেরিয়ে আসে তার কালজয়ী অমর কবিতা ” স্বাধীনতা-উলঙ্গ কিশোর”

জননীর নাভিমূল থেকে ক্ষত চিহ্ন মুছে দিয়ে
উদ্ধত হাতের মুঠোয় নেচে ওঠা, বেঁচে থাকা
হে আমার দু:খ, স্বাধীনতা, তুমি পোশাক পরো
ক্ষান্ত করো উলঙ্গ ভ্রমণ, নয়তো আমার শরীর থেকে
ছিঁড়ে ফেলো স্বাধীনতা নামের পতাকা।
দীর্ঘ নয় মাসের স্বাধীনতা সংগ্রামের রক্ত পিচ্ছিল পথ পাড়ি দিতে গিয়ে যে ক্ষতি বরণ করতে হয়েছে পুরো বাঙালী জাতিকে যে অপেক্ষার প্রহর গুনতে হয়েছে তাতে কবিকে করেছে অত্যন্ত বিচলিত। অপরদিকে অর্জিত স্বাধীনতা রক্ষার জন্যও কবি কম চিন্তাম্বিত ছিলেন না। স্বাধীনতার স্বপ্ন স¦াদ যেন অল্পতেই তেতো হয়ে না যায় সেই প্রার্থনাই করেছেন তিনি স্বাধীনতাকে দীর্ঘজীবী হওয়ার আহ্বান জানানোর মধ্য দিয়ে।
আবহমান বাংলার প্রাচীনতার দিকে যদি আমরা একটু দৃষ্টিপাত করি, তবে দেখা যাবে গ্রাম বাংলার মা বোনেরা ছিল অত্যন্ত লাজুক প্রকৃতির অথচ অতিথিপরায়ন। পর পুরুষের সামনে যাওয়ার ব্যাপারে ধর্মীয় বিধি নিষেধ থাকায় পর্দার আড়ালে থেকে আগত মেহমানের জন্য স্বহস্তে রান্নাকৃত খাবার পরিবেশন করে চেয়ে থাকতেন। মাথা লম্বা করে ললাট বাড়িয়ে ফুসকি দিতেন। আত্মতৃপ্তি বোধ করতেন অতিথিকে ভালমত আপ্যায়ন করতে পেরে। পথে প্রান্তরে রাস্তা ঘাটে পুরুষের সাথে দেখা হয়ে গেলে আজও নারীরা পথ ছেড়ে দিয়ে বৃক্ষের আড়ালে মুখ লুকায় মহান পর্দা প্রথা রক্ষা করার জন্য। ফজর ও মাগরিব নামাজের শেষে মা-মেয়ে মিলে দীর্ঘক্ষণ পবিত্র কুরআনের উপর চোখ রেখে তেলাওয়াত করে অমর বাণী। অথচ সেই নিষ্পাপ ধার্মিক নারীর প্রতি দস্যু হানাদার বাহিনী চালায় পৈশাচিক যৌন উন্মাদনা। যা চোখ এড়ায়নি সত্তর দশকের বিখ্যাত কবি আসাদ চৌধুরীর কলমের। তিনি লিখেছেন-
প্রাচ্যের গানের মত শোকাহত, কম্পিত চঞ্চল,
বেগবতী তটিনীর মত ¯িœগ্ধ মনোরম-
আমাদের নারীদের কথা বলি, শোনো।
এ সব রহস্যময়ী রমণীরা পুরুষের কন্ঠস্বর শুনে
বৃক্ষের আড়ালে সরে যায়-
বেড়ার ফোকড় দিয়ে নিজের রন্ধনে
তৃপ্ত অতিথির প্রসন্ন ভোজন দেখে
শুধু মুখ টিপে হাসে।
প্রথম পোয়াতী লজ্জায় অনন্ত হয়ে
কোচরে ভরেন অনুজের সংগৃহীত কাঁচা আম, পেয়ারা, চালিতা-
সুর্যকেও পর্দা করে এসব রমণী।
অথচ যোহরা ছিল নির্মম শিকার
স্বকৃতজ্ঞ লম্পটেরা
সঙ্গীনের সুতীব্র চুম্বনে গেঁথে গেছে
অমি তার সুরকার-তার রক্তে স্বরলিপি লিখি।
মানুষ নামের নরপশুরা যখন বন্দুকের নলের ভয় দেখিয়ে বাংলার লক্ষ লক্ষ ধর্মপ্রাণ নিরীহ নারীর স্বতীত্ব হরণ করেছে তখন লজ্জায় শোকে ঘৃণায় শুকনেরাও মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। আর শয়তান ভয়ে পালিয়ে গেছে দূরে বহুদূরে। যোহরা, মরিয়মসহ অসংখ্য নারীর সম্ভ্রম হারানোর করুণ কাহিনী উঠে এসেছে আসাদ চৌধুরীর রিপোর্ট ১৯৭১ নাকম উক্ত কবিতায়।
একাত্তুরের উত্তাল দিনগুলো বাংলার স্বাধীনচেতা বীর যুবাদের চোখের ঘুম করেছ হারাম। আরামকে পদদলিত করে নারী পুরুষ নির্বিশেষে ঝাঁপিয়ে পড়েছে শত্রু সেনার কামানের উপরে ব্যাঘ্র গর্জনে। স্বাধীনতারসুখ পুরোপুরি উপভোগের জন্য বিদেশী দস্যুদের দেশ ছাড়া করার জন্য অন্যায়, অত্যাচার, শোষন, বঞ্চনা আর অনিয়মরে বুকে লাথি মেরে বিদায় করার জন্য অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিল বীর জনতা। বাংলা সাহিত্যের বিখ্যাত কবি দার্শনিক ফরহাদ মজহারও বাদ যান নাই সেই মিছিল থেকে। তিনি লিখেছেন তার মনের কথা কাব্যিক ছন্দে ঠিক এভাবে-
আমাকে তুমি দাঁড় করিয়ে দিয়েছো ইতিহাসের সামনে-
আমার কাঁধে দিয়েছো স্টেনগান,
কোমরবন্ধে কার্তুজ,
আঙ্গুল ভর্তি ট্রিগার
বারুদে বিস্ফোরণে উৎকর্ণ আমার শ্রুতি
আমার দৃষ্টিতে ভবিষ্যত
আমি সেই ভবিষ্যতের দিকে নিশানা তাক করে উঠে দাঁড়িয়েছি
আমার গন্তব্য ফুটে উঠেছে প্রতিটি রাস্তায়
প্রতিটি রাজ পথে
প্রতিটি আয়ল্যান্ডে
মোড়ে মোড়ে টগবগ করে উঠেছে লাল ঝান্ডা
তারা আমাকে ট্রাফিক নির্দেশ দিচ্ছে
আমাকে তুমি দাঁড় করিয়ে দিয়েছো পরিবর্তনের সামনে
এখন আমার আর ফেরার উপায় নেই।
আমার এখন তৈরি হবার সময়
আমি মিস্ত্রির মতো নিজেকে মেরামত করে নিচ্ছি
রাঁদায় ঘষে, করাতে কেটে, ধারালো বাটালি দিয়ে আস্তে আস্তে
নিষ্ঠুর অস্ত্রপ্রচারে খসে যাচ্ছে আমার দোদুল্যমানতা
আমার নড়বড়ে পিছুটানগুলোকে পেরেক মেরে গেঁথে এসেছি পেছনে
পরিত্যাক্ত করিডোরে
আমার এখন তৈরি হবার সময়।
আমি মজবুত করে নিচ্ছি আমার নাজুক ইন্দ্রিয়ের গ্রন্থি
নতুন করে বুনে নিচ্ছি আমার ¯œায়ুতন্ত্র
আমি জেগে উঠছি নিজের ভেতর থেকে নিজে
বড় দীর্ঘকাল আমি অপেক্ষা করে ছিলাম
উত্তাল উনসত্তুর আমাকে ডেকে এনেছে রাস্তায়
প্রণয়ীর মতো মাটিকে আলিঙ্গনে বেঁধে রাখে যে চাষা
তার ঔরসে আমার জন্ম
প্রতিটি কৃষক বিদ্রোহে আমি ছিলাম উলঙ্গ শড়কির হিংসা
পলাশীর আ¤্রকাননে আমি ছিলাম মীর মদনের তলোয়ার
১৮৫৭-য় সিপাহী বিদ্রোহের কার্তুজ
আমি ছিলাম তীতুমীরের বাঁশের কেল্লা
ইংরেজের বিরুদ্ধে ওয়াহাবীদের ঘৃণা
একাত্তরে শত্রুভুক স্টেনগানের বঙ্কিম ভঙ্গী নিয়ে
ঘুরে বেড়িয়েছি মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে
তরুণ বিপ্লবীর স্বশস্ত্র তৎপরতা নিয়ে
ছড়িয়ে আছি গ্রামে গ্রামে
শহরে শহরে
বন্দরে বন্দরে
সর্বত্র
জালিমের বিরুদ্ধে এ যেন কবির আজন্ম সংগ্রাম। যে সংগ্রাম তিনি শুরু করেছিলেন সিপাহী বিদ্রোহ থেকে তা যেন আজও শেষ হয় নাই। উল্টোকে ঘার ধরে সোজা করে দেবার জন্যই কবি আজোও ঘুরে বেড়াচ্ছেন বন্দুক, বুলেট, কার্তুজ আর স্টেনগান হাতে। ”আমাকে তুমি দাড় করিয়ে দিয়েছো বিপ্লবের সামনে” কবিতায় একথারই প্রতিধ্বনি আমরা শুনতে পাই।
বাংলার সবুজ ভূমি নরপিচাশের নাপাকি ও আগাছা মুক্ত করার জন্য চাষা, মুটে, মজুর, কুলিরা যে হাতুড়, বাটাল, কোদাল, কাস্তে, দা, বোটি, শাঁবল, খুন্তা হাতে তুলে নিয়েছিলেন, দীর্ঘ সহবস্থানের কারণে ঐ সকল অস্ত্রের সাথে গড়ে উঠেছিল মুক্তিসেনাদের গভীর সখ্যতা। তাইতো মাতৃভূমিকে জঞ্জাল মুক্ত করার পরে এ সকল অস্ত্র সমর্পনের সময় দামাল ছেলেদের যে প্রাণের আকুতি তা উঠে এসেছে হেলাল হাফিজের ”অস্ত্র সমর্পন” কবিতায়। তিনি লিখেছেন-
মারণাস্ত্র মনে রেখো ভালবাসা তোমার আমার।
নয় মাস বন্ধু বলে জেনেছি তোমাকে কেবল তোমাকে।
বিরোধী নিধন শেষে কতদিন অকারণে
তাঁবুর ভেতরে ঢুকে দেখেছি তোমাকে বারবার কতোবার।
মনে আছে, আমার জ্বালার বুক
তোমার কঠিন বুকে লাগাতেই গর্জে উঠে তুমি
বিস্ফোরণে প্রকম্পিত করতে আকাশ,
আমাদের ভালবাসা মুহূর্তেই লুফে নিত অত্যাচারী শত্রুর নি:শ্বাস।
মনে পড়ে তোমার কঠিন নলে তন্দ্রাতুর কপালের মধ্যভাগ রেখে
বুকে রেখে হাত, কেটে গেছে আমাদের জঙ্গলের কতো কালোরাত।
মনে আছে, মনে রেখো
আমাদের সেই সব প্রেম ইতিহাস
কারাগারের কাল কক্ষে অস্ত্র সমর্পন করার পরে কবি নয় মাসের অন্তরঙ্গ বন্ধুর বিয়োগ ব্যাথা লাঘবের জন্য শান্তনার বাণী শোনাচ্ছে। আবার যদি কখনও মানুষে মানুষে ভালবাসার অভাব পরিলক্ষিত হয়, জীবের সাথে জীবের প্রেমে যদি শিথিলতা আসে, হিংসা, বিদ্বেষ, অসাধুতা যদি আবার মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে তবে কারাগারের কাল দেয়াল ভেঙ্গে আবার বন্ধুত্ব ঝালাই করে নেবার আকুতি বর্ণিত হয়েছে উক্ত কবিতায়।
পৌনে এক বছর ব্যাপি চলমান বাংলার স্বাধীনতা স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় হানাদার বাহিনী মুক্তিযোদ্ধা গেড়িলাদের ধরে নিয়ে কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে আটকে রেখে চালায় অমানুষিক নির্যাতন। নাকে,মুখে,ঠোটে, জোড়া বুটের লাথি, জলন্ত সিগারেটের আগুনে বুক পিঠ, দগ্ধ করা, হাত পা বেধে উপুর করে শুয়ে ঘাড়ের উপর পা তুলে দাঁড়িয়ে থাকাসহ হেন এমন কোন নির্যাতনের পন্থা নাই যা বাদ পরেছে। মুক্তি সেনাদের উপর পাকিস্থানী সেনাদের নির্মম এই নির্যাতনের চিত্র এঁকেছেন কবি রুদ্র মোহাম্মদ শহিদুল্লাহ তার ”কনসেনট্রেশন ক্যাম্প” কবিতায়। তিনি লিখেছেন
তার চোখ বাধা হোল
বুটের প্রথম লাথি রক্তাক্ত করলো তার মুখ।
থ্যাতলানো ঠোটজোড়া লাল-রক্তে একাকার হলো
জিভ নাড়তেই দুটো ভাঙ্গা দাঁত ঝড়ে পড়লো কংক্রিটে।
মা….মাগো….চেঁচিয়ে উঠলো সে
পাঁশশো পঞ্চান্ন মার্কা আধখাওয়া একটা সিগারেট
প্রথমে স্পর্শ করলো তার বুক।
পোড়া মাংসের গন্ধ ছড়িয়ে পড়লো ঘরের বাতাসে।
লাঠি চার্জ আমাদের ফেরাতে পারেনি
কাঁদানে গ্যাস আমাদের ফেরাতে পারেনি
রাইফেল আমাদের ফেরাতে পারেনি
মেশিনগান আমাদের ফেরাতে পারেনি
আমরা এসেছি
আমরা আমাদের গৃহহীনতার কথা বলবো।
বুটের লাথিতে মুখের দাঁত ভেঙ্গে ফেলা, বেয়েনেটের খোচায় শরীর রক্তাক্ত করা, বন্দুকের হাতলের আঘাতে পাঁজরের হার ভেঙ্গে ফেলা, ইলেট্রিক শক দেয়া, সিগারেটের আগুনে শরীরের মাংস পুড়িয়ে ঝলসা করে দেয়া এসবই ছিল মুক্তি সেনাদের উপর বর্বর পাকিস্থানীদের নিত্য অত্যাচারের মহড়া। তার পরেও বাংলার দামাল ছেলেরা কাঁদানে গ্যাস, রাইফেল, মেশিনগান, এবং লাঠিচার্জকে উপেক্ষা করে অধিকার আদায়ের ময়দানে কিভাবে অটল ছিলেন তার বিস্তারিত বিবরণ উঠে এসেছে আলোচ্য কবিতাটিতে।
২৫শে মার্চের ভয়াল রাতে পাকিস্থানী হানাদার বাহিনীদের দ্বারা বাংলার সবুজ ভূখন্ড আক্রান্ত হবার পরে সর্বত্র জারি করা হয় সান্ধ্য আইন। রাস্তার মোড়ে মোড়ে ব্যাড়িকেড দিয়ে আটকে দেয়া হয় জনসাধারণের চলার পথ। বাধা প্রদান করা হয় বৈধ অধিকার আদায়ে আহুত মিছিল মিটিং-এ। এ যেন সাত কোটি জনতার হৃদস্পন্দন বন্ধ করে দেবার পৈচাশিক ষড়যন্ত্র। শিরা উপশিরা ছাপিয়ে হৃতপিন্ডে প্রবাহিত রক্তের গতিকে থামিয়ে দেবার জঘন্য কলাকৌশল। কিন্ত বাঙালী তো থেমে থাকার জাতি নয়। মনুষ্যত্ব বিকিয়ে দিয়ে গোলামি মেনে নেবার বান্দা নয়। তাই সব বাধা পেরিয়ে মুক্তির সোনালী ভোর ছিনিয়ে আনতে বাংলার বীর জনতার যে হৃদ্যিক প্রচেষ্টা, স্বাধীনতার আকাক্সক্ষা তার ছবি একেছেন বাংলা সাহিত্যের আরেক বিখ্যাত কবি শহীদ কাদরী ঠিক এভাবে-
মধ্য দুপুরে ধ্বংস স্তুপের মধ্যে, একটা তন্ময় বালক
কাঁচ, লোহা, টুকরো ইট, বিদীর্ণ কড়ি-কাঠ
এক ফালি টিন
ছেড়া চট, জংধরা পেরেক
জড়ো করলো এক নিপুন ঐন্দজালিকের মতো যতো
এবং অসতর্ক হাতে কারফিউ শুরু হওয়ার আগেই
প্রায় অন্যমনস্কভাবে তৈরি করলো কয়েকটা অক্ষর
স্বা….ধী….ন….তা
এ যেন স্বাধীনতার জন্য পাগলপ্রায় একটা জাতির প্রাণের আকুতি, হৃদয়ের ঐকান্তিক বাসনা। যার অগ্নি স্ফূলিঙ্গে মাত্র নয় মাসের প্রচেষ্টায় দখলদারদের সাজানো বাসর পুড়ে খাক হয়ে যায়। মাটি হয়ে যায় তাদের অন্তরে পুষে রাখা দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন। ভোঁতা হয়ে যায় তাদের শোষন আর শাসনের হতিয়ারগুলো। ফিকে হয়ে যায় তাদের সা¤্রাজ্যবাদী মনোভাব। পূর্ব পাকিস্থান হয়ে যায় স্বাধীন বাংলাদেশ। বিশ্বের মানচিত্রে একশত একানব্বইতম স্বাধীন দেশ হিসেবে নিজের আসন দখল করে আমার সোনার বাংলা। লাল সবুজের পবিত্র পতাকা পত পত করে উড়তে থাকে স্বাধীন দেশের স্বাধীন বাতাসে।