নোমান সাদিক
৪ এপ্রিল, ২০১৯ | ১৫:৩৪

হাসান আলীমের কাব্যগ্রন্থ একটি চেয়ারের গল্প

tesst

কবি হাসান আলীম বাংলা কবিতার এক অনন্য কণ্ঠস্বর। আশির দশকে যার উত্থান। এছাড়াও তিনি একজন গবেষক, ছড়াকার, প্রাবন্ধিক ও গল্পকার। তবে কবিতায়ই তার শক্তির পূর্ণ বিকাশ। ৩০ এর অধিক বই তার প্রকাশিত হয়েছে। এখনও লিখছেন সমান তালে। তারই ধারাবাহিকতায় কবিতাগ্রš’ একটি চেয়ারের গল্প এবার প্রকাশিত হয়েছে। ৩৪ টি কবিতা সম্বলিত ৪৮ পৃষ্ঠার গ্রš’টি প্রকাশ করেছে ইনভেলাপ পাবলিকেশন্স।

একটি চেয়ারের গল্প কবিতাগ্রন্থে আমি তিনটি জিনিসের উপস্থিতি ভালোভাবে পেয়েছি।

প্রথমত রূপক। আগে কয়েকটি উদ্ধৃতি দেয়া যাক-
দলে দলে গাভীরা গভীর আদরে পোয়াতী হচ্ছে;
ষাড়টি দারুণ সুখে আছে-
বিয়ে নেই শাদী নেই, নেই জাত পাত
অথবা আপন পর…
কেবল নিমুষ্ক বলদ গরুরা
হিসেবের বেড়াজালে কঠিন প্রকারে কাটা”েছ প্রকার জীবন।
[ গো জীবন ]

আরেকটি-
শুধু দুগ্ধ নয়, নিজের শরীর মেলে দেয়
দুগ্ধপোষ্য জন্ত কিংবা মুষ্য মতন নয়…

একটি মাকড়শা মায়ের অনন্য উপমা।
[ মা-মাকড়শা]

সার্থকভাবে বাংলা কবিতায় রুপকের ব্যবহার ভয়াবহভাবে কমে গেছে। কিš‘ আনাড়িপনা অব্যাহতই থাকেনি বেড়েও গেছে। যার ফল হলো কবিতা থেকে মানুষ অনেক সরে গেছে। কবিতা পাঠকপ্রিয় হবে না এটা চিরায়ত কথা। কিন্ত এভাবে নয়। আমরা ঈশপের গল্প পাঠ করলে দেখবো- তিনি সরা সরি উপদেশ দিতে পারতেন। কিš‘ বিভিন্ন পশুপাখি তথা রুপকের আশ্রয় নিয়েছেন। কিংবা শেখ ফরিদুদদিন আত্তার ও রুমির দর্শন প্রায় একই। তবু রুমির কবিতা যেভাবে মানুষের মগজে মননে গেথে গিয়েছিল শেখ আত্তার সেভাবে নন। শেখ আত্তারের কবিতা আমাকে মহৎ হতে উদ্বুদ্ধ করে। কিš‘ রুমি আমাকে চারদিক থেকে সম্মোহিত কওে ফেলে। অর্থাৎ- হেরে গেছো বৎস, দীক্ষা নাও এরকম ব্যাপার ।

হাসান আলিমের কবিতায় আমি সম্মোহিত না হলেও অভিভূত হয়েছি।
কালবৈশাখীর ঝড়ে
ইলেকট্রিক তারে
ঝুলে আছে কাক, কৃষ্ণপদ্ম
লক্ষ লক্ষ কাক ফেলানীর মতো
ঝুলে আছে কাঁটাতারে…

দ্বিতিয়ত যাদু বাস্তবতা। বাংলা সাহিত্যে ম্যাজিক রিয়েলিজম নেই বলা যাবে না। আবার আছেও বলা যায় না। এটা প্রতিষ্ঠিত নয় বলা যায়। হয়তো সচেতনভাবেই কবিতা বিদেশী জিনিস আমদানী করবেন না। (অবশ্য অনেক কিছুই আমদানি হয়েছে ও হচছে।) আর তা না হলে এব্যাপারে জানাশোনা নেই।
বাংলা কবিতায় হাসান আলীমই সম্ভবত এই ম্যাজিক রিয়েলিজম সবচেয়ে বেশি ব্যাবহার করেছেন। কাব্য মোজেজা নামে তার অনবদ্য কাব্যগ্রš’ও আছে। সার্থকতা বিচার আমার কাজ নয়। আমি আগ্রহী পাঠক।
একটি চেয়ারের গল্প কবিতাগ্রন্থেও দেখতে পাই যাদুবাস্তব কবিতা রয়েছে।
Ñএকখন্ড রুমাল ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দিলাম
সে রুমাল উড়তে উড়তে হয়ে গেল
শ্বেত কবুতর

মানুষের সিমাবদ্ধতা খুব। তবে কল্পনা বিস্তৃত। যাদুবাস্তবতা তারই প্রতিফলন।

তৃতিয়ত: তারুণ্য। এটা খুব বড় একটা ব্যাপার। এই শক্তি এমন যা নিশে:ষ হয় না। এটা দেহের সাথে যতটা তারচে মানসিক বেশি।
নজরুল সারাজীবনই এর গান গেয়েছেন। আরও পূর্বে সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজী, রবীন্দ্রনাথ আরপরে ফররুখ, আহসান হাবীবরা। আসলে বিশেষত কারও নাম না বললেও চলে। কারণ তারুণ্যের বিপরীত বার্ধক্য ব্যাহৃত হলেও অন্তর্নিহিত অর্থ সম্ভবত মৃত ।

কবিতার বয়স হয় না বটে। তবে বার্ধক্য, তারুণ্য ও কৈশোর আছে। একবার বিদ্রোহী কবি কাকে যেন ধমকে বলেছিলেন- বয়স কত তোমার? এমনভাবে কবিতা লিখছো যেন বুড়োলোক। আমাকে দেখো- সমুদ্র দেখলে ঝাঁপিয়ে পড়েছি। কি হবে না হবে ভাবিনি। ( বক্তব্যটা এরকমই)
অনেক তরুণের কবিতা পড়ি। দেশ নিয়ে ভাবেন। তবে সে ভাবনা টা এমন যেন ছেলে মেয়ে বিয়ে দিয়ে শেষ বয়সে পড়েছে। দেশটাকে মরবার আগে একটু ভালো দেখে যেতে চায়। আনন্দের বিষয় যারা কবিতা, মননে তারুণ্য এখনও ধরে রেখেছেন। তবে একটি চেয়ারের গল্প কবিতায় সে তারুণ্য প্রত্যক্ষ ও প্রোজ্জল নয়। এসেছে পরোক্ষ।

ওরা এখন এখন রুমাল নাড়িয়ে, পাপড়ি ছাড়িয়ে কামিনি ফুলের
স্বপ্ন দেখে না।
বলে না ভাইয়া আসবেন

হিসেবের খাতা ছিড়ে ফেল
কি লাভ হিসেব নিকেশ করে গভীর এ জঙ্গলেÑ
তোমার লেখার আগে লেখা হয়ে গেছেÑ

কিš‘ এ তারুণ্য মানে ঔদ্ধত্য নয়। পরম বিশ্বাসে উজ্জিাবত হওয়ার সাথে একক মহাশক্তির কাছে নত হওয়া।
পুরোনো দিনের ভুলভাল ভুলে যাও
ভুলের কপাট বন্ধ করে নতুনের আবাহনে
জমায়েত হও সত্য সুন্দরের প্রার্থনা সভায়।

রূপক, তারুণ্য ও যাদুবাস্তবতায় এই হলেন কবি হাসান আলীম। অবশ্য এই তিন বিষয়ের সমানই আরেকটা বরাবরের মতো এ কাব্যগ্রন্থে , আর তা হলো ঐতিহ্যচেতনা বা বোধ। কিš‘ এ বিষয়ে পুর্বে নাতিদীর্ঘ আলোচনা করেছি। তাই পুনরুক্তি না হলো।

পূর্বের সংবাদ

«

পরের সংবাদ

»