ড. সদরুদ্দিন আহমেদ
১১ অক্টোবর, ২০১৯ | ১৮:৫০

হুইটম্যানের ‘সঙ অব মাইসেল্ফ ও নজরুলের ‘বিদ্রোহী’

tesst

সম্ভবতঃ বিনয় কুমার সরকারই প্রথম ওয়াল্ট হুইটম্যানের সঙ্গে কাজী নজরুল ইসলামের সাদৃশ্যের কথা উল্লেখ করেন। ১৯৪৩ সালের ৮ই জুন সুবোধ কৃষ্ণ ঘোষালের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে বলেনঃ ‘বিদ্রোহী’ দেখামাত্র নজরুলের ভেতর আমি হুইটম্যান আর রবীন্দ্রনাথ দুজনকে একসঙ্গে পাকড়াও করেছিলাম। তবুও বুঝে নিলাম কোন কোন দিক দিয়ে তিনি হুইটম্যানকে ছাড়িয়ে গিয়েছেন বলে মত প্রকাশ করেছেন। কিন্তু ১৯৫৪ সালে প্রকাশিত এক গ্রন্থে সৈয়দ আলী আহসান নজরুলকে হুইটম্যানের পদাঙ্ক অনুসরণকারী হিসাবে চিহ্নিত করেন। তার ভাষায়ঃ “Whitman-এর প্রভাব নজরুল ইসলামের উপর অত্যন্ত বেশী স্পষ্ট, দীপ্ত ও প্রত্যক্ষ। বিদ্রোহ, বিপ্লব ও যৌবনের আবেগ যেখানে তার কাব্যের উপপাদ্য হয়েছে, সেখানে তিনি Whitmanকে অনুসরণ করেছেন নিঃসঙ্কোচে। তাজ উদ্দীন খান এবং আতাউর রহমানও নজরুল কাব্যে হুইটম্যানের প্রভাব সর্বাধিক’ বলে মনে করেন।
তবে এ ব্যাপারে ভিন্নমতও আছে। মযহারুল ইসলাম বলেন যে কেউ কেউ জরুলের বিদ্রাহ বা বিপ্লবাত্মক চিন্তাধারায় হুইটম্যানের প্রভাব দেখলেও তার চোখে ইকবালের প্রভাবই বড় হয়ে ধরা পড়েছে। কাজী আব্দুল মান্নান হুইটম্যানের প্রভাবের ধারণা সম্বন্ধে প্রশ্ন তুলেছেন, তার মতে নজরুলের কবিতাটির পটভূমিতে রয়েছে বাংলা কাব্যে সুদীর্ঘকালের বিদ্রোহের ঐতিহ্য এবং যুগধর্ম।
বলা বাহুলা, যাঁরা প্রভাবের কথা বলেছেন তাঁরা হয় তা শুধু উল্লেখ করেছেন অথবা উভয় কবির কবিতায় কতিপয় চরণের ক্ষীণ ভাবগত সারাংশের ভিত্তিতে মন্তব্য করেছেন। অপরপক্ষে যাঁরা ভিন্নমত পোষণ করেছেন তারা ঐ ভাবগত সাদৃশ্য অস্বীকার করেছেন মাত্র। সাহিত্যে প্রভাব নিয়ে আলোচনা ফলপ্রসু হয় না। এতে হয়তো এটা প্রমাণ করা যেতে পারে যে একজন অন্যজনের লেখা পড়েছেন। কিন্তু কোনো শিল্পকর্ম শুধু প্রভাবের সমষ্টি নয়-তা একটা স্বয়ংসম্পূর্ণ যার মধ্যে অন্যের কাছ থেকে আহরিত সামগ্রী অপরিবর্তিত অবস্থায় বিরাজ করে না, প্রতিভার জারক রসে আত্মস্থ হয়ে যায়। তবে যেহেতু হুইটম্যানের সঙ্গে নজরুলের সাদৃশ্যের কথাটা উঠেছে তাই বিষয়টি পর্যালেচনার দাবী রাখে। এই প্রসঙ্গে ‘সঙ অব মাইসেল্ফ’ ‘বিদ্রোহী’ কবিতার একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণ ফলপ্রসু হতে পারে। তাছাড়া, এ ধরনের লেখা সাহিত্য সমালোচনার সুদীর্ঘকালের একটি স্বীকৃত পদ্ধতি।

।।২।।
প্রবন্ধের মূল বিষয়বস্তু উপস্থাপন করার আগে হুইটম্যানের কাব্যের সঙ্গে নজরুলের কোনো পরিচয় ছিল কিনা তা বলে নেওয়া ভালো। নজরুলের ‘অগ্রপথিক’ কবিতাটি হুইটম্যানের Pioneer O pioneer কবিতার অনুকরণে’ রচিত। তার বর্তমান বিশ্বসাহিত্য প্রবন্ধে তিনি হুইটম্যানের One’s Own Self কবিতা থেকে নিয়েছেন। একটি চিঠিতে তিনি হুইম্যানকে ‘পশ্চাত্য ঋষি’ বলে অভিহিত করেছেন এবং তার Song of Myself থেকে দুটি চরণের উদ্বৃতি দিয়ে চারণদুটির বক্তব্যের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করেছেন। তাই একথা মনে করা অযৌক্তিক হবে না যে নজরুল হুইটম্যানের অনুরাগী ছিলেন এবং তার কাব্য মনোযোগের সঙ্গে পড়েছিলেন।
প্রসঙ্গত: উল্লেখ করা যেতে পারে যে ব্যক্তি হুইটম্যান সঙ্গ ব্যক্তি নজরুলের কিছু মিল লক্ষ করা যায়। উভয়ই ছিলেন বলিষ্ঠদেহী, প্রাণ-চঞ্চল, বোহেমিয়ান। উভয়রই কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল না, তবে এলোমেলোভাবে পড়াশুনা ছিল যথেষ্ট। উভয়ই সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। হুইটম্যানের যুদ্ধের অভিজ্ঞতা ছিল। তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে নার্স হিসাবে কাজ করেছিলেন। নজরুল যুদ্ধে যাননি তবে সৈনিক জীবন যাপন করেছিলেন কিছুদিন। উভয়ই ছিলেন সাধারণ মানুষের কবি।
‘সঙ অব মাইসেল্ফ’ ও ‘বিদ্রোহীর উৎপত্তি একই রকম বলে মনে হয়। কোনো পূর্বাভাষ ছাড়াই একজন সাংবাদিকের কলম দিয়ে ‘সঙ অব মাইসেল্ফ’-এর মতো কবিতা কিভাবে বেরিয়ে এল তা নিয়ে সমালোচকরা নানা ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু সেসব অনুমান-নির্ভর। হুইটম্যান নিজে কবিতাটিকে তথা কব্যাগ্রন্থের প্রথম সংস্কার একটা বা অতিপ্রাকৃতিক প্রেরণার ফসল বলে মনে করতেন। আশ্চর্যের বিষয় ‘বিদ্রোহীর উৎপত্তি সম্বন্ধে অনুরূপ বক্তব্য পাওয়া যায়। কাজী আব্দুল ওদুদ জানাচ্ছেনঃ “বিদ্রোহী’ যে একটি বিশেষ প্রেরণার ফলে সে কথা নজরুল ঢাকায় এক সাহিত্য সভায় নিজেই বলেছিলেন। বলেছিলেন এই লেখাটি তিনি কেমন করে লিখেছিলেন তা নিজেও তিনি ভালো করে জানেন না। তবে বিশেষ প্রেরণার সঙ্গে সঙ্গে দেশ ও কালের গুরুত্বও অস্বীকার করা যায় না। হুইটম্যান নিজেই বলেছেন: উনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধ ছাড়া অন্য কোন সালে এবং গণতান্ত্রিক আমেরিকা ছাড়া অন্য কোনো দেশে তার এই কবিতা তথা সমগ্র কাব্যগ্রন্থ রচনা করা হয়তো সম্ভব হতো না। নজরুল এ ধরনের কোনো উক্তি করেন নি। তবে অধিকাংশ সমালোচক ‘বিদ্রোহী’র রাজনৈতিক ও সামাজিক পটমভ’মির উপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। তাই হুইটম্যানের উক্তির প্রতিধ্বনি করে বলা যায় যে, অন্য কোনো দেশে অন্য কোনো যুগে ‘বিদ্রোহী লেখা সম্ভব হতো কিনা সন্দেহ।

।।৩।।
হুইটম্যানের ‘সঙ অব মাইসেল্ফ’ তার কাব্যগ্রন্থ লিভস অব গ্রাস এর (Leaves of Grass) প্রধান কবিতা। ৫২টি অসমান স্তবকে বিভক্ত ১৩৪৬ লাইনের এই দীর্ঘ কবিতা আত্মজীবনীমূলক। বস্তুতঃ সমগ্র কাব্যগ্রন্থটিতে তার নিজের আবেগ প্রকাশ করার চেষ্টা করেছেন বলে কবি উল্লেখ করেছেনঃ Leaves of gtass has mainly been the outcropping of my own emotional and personal and perscnal nature an attempt to put a person a human being (myself in the latter half of the nineteenth century) freely, fully, truthfully on record’ এই ব্যক্তব্য অবশ্য আক্ষরিক অর্থে সত্য নয়। যদিও ‘সঙ অব মাইসেল্ফ-এ সর্বনামটি অসংখ্যবার পুনরাবৃত্তি করা হয়েছে এবং এই নিজেকে ৩৭ বছর বয়স্ক ম্যানহাটনের সন্তান ওয়াল্ট হুইটম্যান বলে পরিচয় দিয়েছে, তবু তাকে ইতিহাসের হুইটম্যানের জীবনের সব কিছু এতে নেই বরং এমন অনেক ঘটনার বিবরণ আছে, এমন আনেক চরিত্র-বৈশিষ্টের প্রতিফলন আছে যার সঙ্গে সঙ্গে ব্যক্তি হুইটম্যানের কোনো সম্পর্ক ছিল না। দ্বিতীয়ত: সাহিত্য ব্যক্তিত্বের আত্মপ্রকাশ, লেখকের নিজস্ব আবেগ, অভিজ্ঞতার বানীচিত্র এ ধারণা সত্য নয়। কোনো শিল্পকর্মে জীবন হুবহু রূপায়িত হয় না। তাতে লেখকের স্বপ্ন প্রতিফলিত হতে পারে। তাছাড়া যে শিল্প মাধ্যম ব্যবহৃত হয় তাতে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, অবিকল উপস্থাপিত হয় না- রূপান্তরিত হয়। তাই ‘সঙ অব মাইসেলফ’কে একটি persona, একটি কাল্পনিক চরিত্র হিসাবে দেখাই যুক্তিসঙ্গত।
এই চরিত্র নিজেকে celebrate করছেন, আপনা মহিমা প্রচার করছেন। সুবাসিত, সুসজ্জিত ঘর ছেড়ে প্রচলিত রীতি ধ্যান-ধারণা স্থগিত রেখে উলঙ্গ হয়ে সমস্ত ইন্দ্রিয় অবারিত করে বনের ধারে সমুদ্রতীরে অলসভাবে ঘোরাফেরা করতে তিনি ভালবাসেন। তিনি উচ্ছল, প্রাণচঞ্চল, আত্মতৃপ্ত। তিনি নাচেন, হাসেন গেয়ে ফেরেন। তার ভাষার তিনি turbulent, fleshy, sensual, eating, drinking, breeding” বার বার উজ্বল স্বাস্থ্য দৈহিক শক্তি প্রখর ইন্দ্রিয় অনুভূতির উল্লেখ করেছেন। তার দেহ থেকে যে প্রচন্ড জ্যোতি বিচ্ছুরিত হয় তা সূর্যর রিশ্মকে প্রতিহত করে দেয়। তিনি সুমহান, অজর, অমর, নিজের ভিতর-বাহিরকে তিনি ঐশ্বরিক বলে বর্ণনা করেছেন। নিজেকে বস কিছুর কেন্দ্রবিন্দু বলে চিত্রিত করেছেন। তাকে অনুসরণ করার জন্য সবাইকে উদাত্ত আহবান জানাচ্ছেন। তার মধ্যে প্রকান্ড অহমিকা আছে এবং এই অহমিকা সম্বন্ধে তিনি সচেতন: “I know perfectly well my own egotism.
অহমিকা কোনো আকর্ষণীয় গুণ নয়: তা সুরুচির পরিচয় দেয় না। কিন্তু হুইটম্যানের ‘আমির অহমিকা আমাদের মনে কোনো বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে না। এর কয়েকটি কারণ আছে। প্রথমতঃ উনশিংশ শতাব্দির শেষার্ধে আমেরিকার মতো দেশে দৈহিক শান্তি সামর্থে বলীয়ান দুর্গম গিরি, নদী, অরণ্যানী অধুষ্যিত বিশাল ভূখন্ডকে করায়ত্ব করার, তার বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ করার দুঃসাহসিক অভিযানে অংশগ্রহণের উদ্যোগ উৎসাহে উজ্জীবিত এক নতুন জাতির পটভূমিকায় এই অহমিকা সহজে বোধগম্য। উল্লেখ্য যে, হুইটম্যান নিজে তার কবিতার American origin উপর গুরুত্ব আরোপ কারেছেন। দ্বিতীয়তঃ তিনি তার কবিতাকে ‘a song of the great pride of man in himself’ বলে অভিহিত করেছেন। এ থেকে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে ‘আমির’ কোনো ব্যক্তি বিশেষের নয়, তা মানুষের অত্মপ্রতায় বা আত্মশক্তির সদম্ভ প্রকাশ। এটা রোমান্টিক মানসিকতা থেকে উদ্ভূত এবং হুইটম্যানের ক্ষেত্রে এই মানসিকতা আমেরিকান পরিবেশ দ্বারা কিছুটা প্রভাবিত। জনৈক সমালোচকের ভাষায়ঃ “He (Whitman) was a European romanticist modified by the American encironment.” তৃতীয়তঃ ‘আমি যে শুধু একজন ব্যক্তি নন, একজন প্রতিনিধিত্ব তা কবিতার শুরুতেই উল্লেখ করা হয়েছেঃ “I celevrate myself, and sing myself/and what I assume you shall assum” তার প্রতিনিধিত্বকারী ভূমিকা আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে যখন তিনি বলেনঃ I am of old and of young, of the foolish as well as the wise../Maternal as well as paternal, achild as well as man” চতুর্থতঃ তিনি সামাজিক গণতন্ত্র এবং মানবতাবোধেরও প্রতীক। তার কাছে কেউ ছোট নয় কেউ বড় নয়। সব মানুষের প্রতি আছে তার অপরিসীম দরদ ও ভালোবাসা। সব নিপীড়িত, লাঞ্ছিত, বঞ্চিত মানুষের আর্তনাদ তার কন্ঠে ভাষা পায়। দুর্বল, রুগ্ন হতাশাগ্রস্ত মানুষকে শক্তি ও সাহস যোগাতে তিনি তড়িতে এগিয়ে আসেন। তিনি শুধু বর্তমানের নন, সকল কালের, সকল যুগের। সকল অভিজ্ঞতা তার মধ্যে মিলিত হয়েছে যেমন তিনি এর সঙ্গে সমুদ্র যাত্রা করেছিলেন, এক আক্রান্ত দুর্গের বন্দুকধারী ছিলেন। অদূরে জেলে হিসাবে মাছ ধরেছেন ইত্যাদি। এমন কি তিনি বিবর্তনবাদেরও প্রতীক। তিনি সুষ্টির অধিকাল থেকে উপস্থিত ছিলেন, যুগ যুগ ধরে ঘুমিয়ে কাটিয়েছেন, ডায়নোসোরের মুখে মুখ ঘষেছেন। সৃষ্টিকর্তা সম্বন্ধে সব রকম ধারণা তার মধ্যে বিরাজ করেছেঃ Taking myself the exact dimensions of Jehova/Lithographing Kronos his son and hercules his grandson/Buying drafts of osiris, Lsis, Belus, Brahma, Budlha…” কবিতার সমাপ্তিতে তিনি আমাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে মৌলিক প্রাকৃতিক উপাদানে অন্তহিত হয়ে যাচ্ছেন এবং সর্বত্র বিরাজমান বলে জানিয়েছেন।

অতএব দেখা যাচ্ছে যে হুইটম্যানের ‘আমি’ আত্মকেন্দ্রিক বা আপন সত্তার কারাগারে বন্দি কোনো ব্যক্তি নন; তিনি দেহ ও আত্মায় সম্বন্ধয়ে গঠিত মানুষের সীমাহীন আত্মশক্তির চেতনায় উদ্দীপ্ত এমন এক ব্যক্তি যিনি বিভিন্ন identity অবলম্বন করে, বিভিন্ন ভূমিকায় অবর্তীর্ণ হয়ে এক ব্যাপক প্রতিনিধিত্বকারী সত্তায় পরিণত হয়েছেন সকল যুগের, সকল মানুষের, সকল অভিজ্ঞতার, সকল ধ্যান-ধারণার মতৃপ্রতীক হয়ে উঠেছেন এবং এর ফলে তার অহমিকা transmuted হয়ে একটি উন্নতর পর্যায়ে রূপান্তরিত হয়েছে। আমেরিকার সাহিত্যে তথা বিশ্বসাহিত্যে এ ধরনের চরিত্র এই প্রথম।
নজরুলের ‘বিদ্রোহী কবিতাতেও অনুরূপ একটি চরিত্র পাওয়া যায়। তিনিও অসংখ্যবার ‘আমি’ সর্বনামটি ব্যবহার করে নিজের আত্মপরিচয় তুলে ধরেছেন। যে কারণে ‘সঙ অব মাইসেল্ফ’-এর ‘আমি’ এবং কবি এক ব্যক্তি নন, সেই একই কারণে ‘বিদ্রোহী’র ‘আমি’-কেও ব্যক্তি নজরুলের সঙ্গে এক করে দেখা হয় না। হুইটম্যানের ‘আমি’র মতো নজরুলের ‘আমি’ও একটি একটি কাল্পনিক চরিত্র।
তিনি নিজেকে বিদ্রোহী হিসাবে চিত্রিত করেছেন। হিমালয়ের চেয়েও উন্নত তার শির। তিনি মহাকাশ ফেড়ে, চন্দ্র সূর্য ছেড়ে, খোদার আরশ ভেদ করে চিরবিস্ময় হিসাবে আবির্ভূত রয়েছেন। তিনি উছৃঙ্খল, উন্মাদ, স্বেচ্ছাচারী, ত্রাশ সঞ্চারকারী। তিনি যখন রুশে উঠে মহাকাশে ছুটে চলেন তখন সবগুলো নরক কেঁপে কেঁপে নিভে যায়। তিনি বিধির দর্প চূর্ণ করতে চান, ভগবানের বুকে লাখি মারতে চান। এই সব উক্তির অনেকগুলো তার প্রবল অহমিকার স্বাক্ষর বহন করে এবং এদিক দিয়ে ‘সঙ অব মাইসেল্ফ এর আমির সঙ্গে তার সাদৃশ্য লক্ষ্য করা যায়। তার অহমিকারও পটভূমি আছে এবং সে অহমিকাও ব্যক্তিগত সীমানা অতিক্রম করে নতুন গতিতে ভাস্বর হয়ে উঠেছে।
পরাধীনতার অভিশাপে যে হীনমান্যতা, লাঞ্ছনা, বঞ্চনা দীর্ঘকাল ধরে পঞ্জিভূত হয়েছিল, রাজনৈতিক পরিমন্ডল এবং গতানুগতিকতা যে ভাবে মনুষত্বকে খর্ব করছিল, আমির দৃপ্ত অহংকারকে তার বিরুদ্ধে একটা আবেগময় প্রতিক্রিয়া হিসাবে ব্যাখ্যা করাটা হয়তো কষ্টকল্পিত হবে না। তবে এটা স্পষ্ট যে ‘আমি’ শুধু একজন ব্যক্তি নন, তিনি এমন একজন অপূর্ব জাগরণের মহানন্দে উচ্চকিত। তিনি নিজেকে ‘বিশ্ব- তোরণে বৈজয়ন্তী মানব-বিজয় কেতন বলে ঘোষণা করেছেন। তিনি সহসা নিজেকে চিনতে পেরছেন। তিনি এখন সকল বন্ধনমুক্ত আপনাকে ছাড়া অন্য কাউকে কুর্নিশ করেন না। তিনি অজর, অমর, জগদীশ্বর-ঈশ্বর পুরুষত্তোম সত্য। এসব উক্তি হুইটম্যানের ভাষায় ঃthe great pride of man in himsalf এর বহিঃপ্রকাশ বলা যেতে পারে এবং এসব এমন একটা দিৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় বহন করে যা রোমানটিসিজমের সঙ্গে সম্পর্কিত। বস্তুত: নজরুল হুইটম্যানের মতোই একজন রোমানটিসিস্ট। তাছাড়া, ‘সঙ অব মাইসেল্ফ’-এর আমির মতো বিদ্রোহী’র ‘আমি’ ও বিভিন্ন ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন, অন্য মানুষের অভিজ্ঞতার সঙ্গে নিজেকে এক করে দেখেছেন। চিরগুহা হারা পথিকের ব্যখ্যা, অবমানিতের মর্মবেদনা, হতাশ প্রেমিকের লঞ্ছনা, অভিমানী চিরক্ষুব্ধ হৃদয়ের কাতরতা, বিধবার ক্রন্দনশ্বাস তিনি অনুভব করেন। তিনি পৃথিবীর সব বিষয় পান করে কৃষ্ণের মতো নীলকন্ঠ হতে চান। পরধীনতার উৎখাত করতে চান; পৃথিবীতে যতদিন অত্যাচার চলবে, উৎপীড়িতের ক্রন্দনরোল ধ্বনিত হবে, ততদিন তিনি শান্ত হবেন না। তাই বলা যায় তার প্রতিনিধিত্বশীল ভূমিকা, অন্য মানুষের প্রতি তার সমমর্মিতা, অত্যাচার নিপীড়নের বিরুদ্ধে তার আপোষহীন সংগ্রামী মনোভাব তার অহমিকাকে একটা উচ্চতর, মহত্বতর পর্যায়ে উন্নীত করেছে।
হুইটম্যানের ‘আমি’র মধ্যে যথেষ্ট স্ববিরোধিতা আছে। একদিকে তিনি নিঃসঙ্কোচে তার সত্তা ও প্রখর ইন্দ্রিয় অনুভূতির কথা বলেছেন অন্যদিকে তিনি তার অতিন্দ্রিয় অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিচ্ছেন; কখনো তিনি ভাবপ্রবণতামক্ত আত্মপ্রতায়ী, অহঙ্কারী, আবার কখনো বা দ্বিধাগ্রস্ত, লাজনম্র, নারীসুলভ আবেগে আপ্লুত কখনো দেখি তিনি বরকে ঘর থেকে বের করে দিয়ে তার নববধূকে জড়িয়ে ঘরে সারারাত কাটাচ্ছেন। আবার কখনো দেখি তিনি সেজেগুজে বসে আছেন অন্যের করুণার প্রতীক্ষায় কখনো তিনি ভবঘুরে বিশ্ব পরিব্রাজকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হচ্ছেন, কখনো বা নিষক্রিয়ভাবে দূরে দাঁড়িয়ে বিনম্র দৃষ্টিতে সব কিছু পর্ষবেক্ষণ করেছেন। হুইটম্যানের ‘আমি’ তার এই সবিরোধিতা সম্বন্ধে সচেতন। তিনি বলেন “Do I contradict myself? Very well then I contradict (I am large. I contaion mulititudes.)” আমি যেখানে বিভিন্ন Identity অবলম্বন করছেন সেখানে স্ববিরোধিতা অনিবার্য।
‘বিদ্রোহী’তেও স্ববিরোধিতা আছে। এর ‘আমি’ কখনো প্রশান্ত, কখনো অশান্ত। তার এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী, অন্য হাতে রণতুর্য্য। একদিকে তিনি রূদ্র, সব ভেঙ্গে চুরমার করতে চান, অন্যদিকে তিনি আবার গোপন প্রিয়ার চকিত চাহনীতে বাধা প্রড়েন, তার কাঁকনচুড়ির কন কন তাকে মুগ্ধ করে; এমনকি তিনি যৌবনভীতু পল্লীবালার কাচলি হতে চান। হুইটম্যান তার স্ববিরোধিতার ব্যাখ্যা দিয়েছেন; নজরুল দেননি। কিন্তু সমালোচকদের কাছ থেকে আমরা বিভিন্ন ব্যাখ্যা পাই। একজন বলেছেন যে “কবিতায় আবেগকে একটানা প্রলম্বিত করা যায় না, আবেগের উঠানামা প্রয়োজন” তাই মাঝে মাঝে সুর নামানো হয়েছে। আর একজন মনে করেন যে “এই চাপা কন্ঠস্বর পতন নয়, আঘাতের জন্য শাস্তি সঞ্চয়। আর একটি মত এই যে নজরুল যে একই সুরকে অক্ষুন্ন রাখতে পারেননি তার জন্য তার আত্মগত গীতিপ্রবণ মন দায়ী। অন্য আর একটি মত “বিদ্রোহীর বক্তব্যে আপাত-স্ববিরোধিতা গভীর -বোধেরই প্রকাশ। সব শেষে আর একটি মত উল্লেখ করা যেতে পারে। তা হলো এই যে, কবিতাটিতে যেটা বড় হয়ে দেখা দিয়েছে সেটা কোনো ‘বিদ্রোহবাণী নয়, অপরিশীম আত্মপ্রত্যয়। ‘আত্ম-আবিষ্কার ও সিদ্ধির আনন্দ’ যা রোমানটিসিজমের একটা দিক এবং যার সঙ্গে প্রেমের আর্তি ও মানবতার প্রতি সমর্মিতার তেমন কোনো দূরত্ব নেই।
সবগুলো ব্যাখ্যার মধ্যে কিছু যুক্তি আছে সন্দেহ নেই। কবিতাটিতে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিদ্রোহ যেমন অস্বীকার করা যায় না তেমনি অস্বীকার করা যায় না। আত্মপ্রত্যয় বা আত্ম-আবিষ্কার, নিপীড়িত মানুষের প্রতি সমর্মিতা এবং প্রেমের আকুতি। এদের কোনটা কোনটাকে ছাপিয়ে উঠেছে তা নিয়ে ঐ গন্তব্যে পৌঁছানো সহজ নয়। তবে বিভিন্নমুখী অথবা বিপরীতমুখী ভাব ও আবেগ শিল্পের খাতিরে ব্যবহৃত হয়েছে অথবা একটি বিশেষ মানসিকতা থেকে সেগুলো উৎসারিত অথবা সেগুলোর দূরত্ব সামান্যই বলে ব্যাখ্যা না করে কবিতার Persona বিভিন্ন সত্তা অবলম্বন করায় অন্যের অভিজ্ঞতার সঙ্গে একান্ত প্রকাশ করায় সেগুলো অনিবার্য হয়ে উঠেছে বলে ব্যাখ্যা করা অধিকতর যুক্তিসঙ্গেত মনে হয়। তবে ‘সঙ অব মাইসেল্ফ’ এ বিপরীত ভাব ও আবেগের প্রকাশ কোনো সমস্যা সৃষ্টি করে না, কারণ সেখানে জীবনের সমগ্র রূপ তুলে ধরা হয়েছে। কিন্তু ‘বিদ্রোহী’র শিরোনাম থেকে মনে হয় যে জীবনের একটি বিশেষ দিক বা আবেগ প্রকাশই তার লক্ষ্য। বিভিন্নমুখী অথবা বিপরিতমুখী ভাব ও আবেগের সমাবেশ এই লক্ষ্যকে ব্যাহত করে কিনা সে প্রশ্ন তোলা যেতে পারে, তবে তার মীমাংসা সন্তব নয় কারণ সাহিত্যে শেষ কথা বলে কিছু নেই।
‘সঙ আব মাইসেল্ফ’-এ যে আঙ্গিক ব্যবহার করা হয়েছে তাকে Repetitive structure বলে অন্য কথায় একে theme variation বলা যেতে পারে। এই আঙ্গিকে বক্তব্য ধাপে এগোয় না আবতিত হয়। একই বক্তব্য নানাভাবে পূর্ণব্যক্ত করা হয়, সম্প্রসারিত করা হয়। বিভিন্ন চিত্রকল্প একই আবেগ বা মেজাজ প্রকাশ করে; একই চরিত্র বিভিন্ন অবস্থায় নিজের identity তুলে ধরে। স্তবকগুলো পরস্পর অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত নয়। তাদের অবস্থান পরিবর্তনযোগ্য। উদাহরণসরূপ, কবিতাটির প্রথম কয়েকটি চরণ লক্ষ করা যাক। প্রথম চরণ: “I celevrate myself, and sing myself.” এতে দুটো clause আছে, দুটোই প্রায় সমার্থক অথবা বলা যেতে পারে দ্বিতীয়তটিতে প্রথমটির বক্তব্য কিঞ্চিৎ পরিবর্তিত অবস্থায় পুনর্ব্যক্ত হয়েছে। পরিবর্তী চরণদুটি এইরূপঃ “What I assume you shall assume/For every atom belonging to me as good belongs to you.” এখানে আমি অন্যান্য সত্তার সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন এবং নতুন চিত্রকল্পের মাধ্যমে তার বক্তব্যকে সম্প্রসারিত করেছেন। সমস্ত কবিতাটিতে ‘আমি’র বিভিন্ন রূপের নাটকীয় উপস্থাপনা আছে। তাতে ভাবের, আবেগের, মেজাজের পুনরাবৃত্তি, সংযোজন, সম্প্রসারণ ঘটেছে। কবিতাটির গতি আবর্তনমূলক এবং ন্তবক-গুলো পরস্পরের সঙ্গে যুক্তিসম্মতভাবে সম্পর্কিত নয়। উল্লেখ্য যে বিষয়বস্তু নির্বাচনে ও প্রকাশভঙ্গিতে সর্বত্র সংযম এবং শিল্পবোধের পরিচয় পাওয়া যায় না।
‘বিদ্রোহী’তেও একই আঙ্গিক লক্ষ্য করা যায়। প্রথমে ‘উন্নত শির’ এই চিত্রকল্পের মাধ্যমে ‘আমি’ তার বিদ্রোহী মূর্তি প্রকাশ করেছেন। পরবর্তী চরণগুলোতে বলা হয়েছে যে তার শির হিমাদ্রির শিখর ছাড়িয়ে গেছে এবং তিনি মহাকাশ ফেঁড়ে চন্দ্র সূর্য গ্রহ ভেদ করে দুলোক ভুলোক গোলক ছেদ করে খোদার আরশ অতিক্রম করে ললাটে রুদ্র ভগবানের জয়টীকা নিয়ে বিশ্বের চির-বিস্ময় হিসাবে অবির্ভূত হয়েছেন। এসব চিত্রকল্প তার মূল বক্তব্যকে জোরদার করেছে, সম্প্রসারিত করেছে। পরবর্তী চারটি স্তবকে নতুন নতুন চিত্রকল্প ব্যবহৃত হয়েছে, কিন্তু সবগুলোতে বিদ্রোহের সুর বা মেজাজ ধ্বনিত- প্রতিধ্বনিত হয়েছে। এরপর ‘আমি’র কোমল-মধুর মূর্তি প্রকাশ পেয়েছে এবং সেখানেও বিভিন্ন চিত্রকল্প একই ভাব বা আবেগ ফুটিয়ে তুলেছে। শেষের দিকে আবার বিদ্রোহের সুর বেজে উঠেছে কিন্তু প্রকাশ ভঙ্গীতে নতুনত্বের চমক আছে। বস্তুতঃ বক্তব্য, সুর বা মেজাজ বার বার ঘুরে এসেছে। স্তবকগুলোর পূর্বাপর সম্পর্কে সব ক্ষেত্রে খুব স্পষ্ট নয়। শব্দ প্রয়োগ সংযমের অভাব আছে। আর ‘সঙ অব মইসেল্ফ’-এর তুলনায় ‘বিদ্রোহী’ অনেকটা বাহুল্যবর্জিত এবং এর কাঠামো অধিকতর সুডৌল।
উভয় কবিতায় সাদৃশ্য যেমন আছে তেমনি আছে বৈসাদৃশ্য। ‘সঙ অব মাইসেল্ফ’ মুক্ত ছন্দের কবিতা (Vers livre) সমান্তরলতা (Parallelism) এবং বিভিন্ন রকম পুনরাবৃত্তিমূলক কৌশল (reiterative devices) কবিতাটির ছন্দের ভিত্তি। টি, এস, এলিয়টের ‘দি ওয়েস্ট ল্যান্ড’-এর মতো ‘সঙ অব মাইসেল্ফ-এ অসাধারণ বৈচিত্র আছে। এতে গীতি কবিতার বৈশিষ্ট্য আছে, বর্ণনা আছে কাহিনী আছে নাটকীয়তা আছে। সর্বোপরি কবিতাটি ব্যক্ততার ভঙ্গীতে লেখা। ‘আমি’ মাঝে মাঝে পাঠকদের সম্বোধন করেছেন এবং তিনি যে অনুপ্রাণিত হয়ে ভাষণ দিচ্ছেন তা সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
পক্ষান্তরে বিদ্রোহী’ সমিল মুক্ত মাভ্রাবৃত্ত ছন্দে রচিত। শব্দ-বিন্যাসের চাতুর্যে। এই ছন্দ অপূর্ব গতিশীলতা লাভ করেছে। তবে হুইটম্যানের কবিতাটিতে যে বৈচিত্রের কথা বলা হলো তা ‘বিদ্রোহী’তে নেই। এটি আগাগোড়া গীতিকবিতার বৈশিষ্টেমন্ডিত। এতে চড়া সুর আছে, সুরের ওঠানামা আছে, উন্মাদনা আছে, তবে ‘বিদ্রোহী’কে ভাষণ না বলে স্বগতোক্তি বললে হয়তো ভুল হবে না।
‘সঙ অব মাইসেল্ফ-এ দেহ ও আত্মা উভয় দিকের উপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। তবে দৈহিক সত্তার উপর বেশি জোর দেওয়া হয়েছে বলে মনে হয়। বিভিন্ন ইন্দ্রিয় অনুভূতির বিস্তৃতি ও নিঃসঙ্কোচ বর্ণনা আছে। যৌন সম্পর্কিত চিত্রকল্পে কবিতাটি ভরপুর। এই দিকটায় বলিষ্ঠদেহী কবির ব্যক্তিগত ছাপ পড়েছে বলে কেউ কেউ মনে করেন। অপরপক্ষে, ‘বিদ্রোহী’তে আত্মপ্রত্যয়, আত্মজাগরণ, অমিত তেজ, সংগ্রামী মনোভাব এ সব প্রাধান্য পেয়েছে। এগুলো দৈহিক সত্তাকে নাকচ করে দয় না, তবে সেই সত্তা কবিতায় সরাসরি বা প্রবলভাবে উপস্থাপিত হয়নি। এখানে আবেগ, আত্ম আবিষ্কারের আনন্দ মুখ্য ইন্দ্রিয় অনুভূতি নয়।
হুইটম্যান সমাজে ও সভ্যতাকে প্রত্যাখ্যান করে আদিম জীবনের বন্দনাগান গেয়েছেন। ব্লেক ওয়ার্ডসওয়ার্থ এর মতো কবিদের সঙ্গে তার তুলনা করলে দেখা যায় যে তার ব্যক্তির অনভিজ্ঞতা থেকে অভিজ্ঞতায়, নির্জনতা থেকে সমাজে উত্তরণের উপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন; কিন্তু হুইটম্যান অভিজ্ঞতা থেকে অনভিজ্ঞতায় ফিরে যেতে চেয়েছেন। সমাজ, সভ্যতাকে পরিত্যাগ করার আহবান জানিয়েছেন। নজরুল এ ধরনের জীবনদর্শনের প্রবক্তা নন। সমাজের অনেক কিছুই তিনি ভাঙতে চেয়েছেন, গতানুগতিকতা, আত্মবিকাশের পথে সর্বপ্রকার প্রতিবন্ধকতা তিনি নির্মূল করার বাসনা প্রকাশ করেছেন। অত্যাচার নিপীড়নের বিরুদ্ধে তিনি সংগ্রামমুখর। কিন্তু তার লক্ষ্য এমন একটা সমাজ, এমন একটা পৃথিবী সৃষ্টি করা যা সংস্কারমুক্ত, শোষণমুক্ত, যেখানে ব্যক্তি বুক উঁচু করে, শির উন্নত করে দাঁড়াতে পারে।
‘সঙ অব মাইসেল্ফ’-এ আমেরিকার প্রকৃতি ও বাস্তব জীবন বিস্তারিত ভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। এর একটি কারণ আছে। সাধারণত কবি যে সমাজে মানুষ হন সেই সমাজের ধর্মীয় বিশ্বাস, দার্শনিক মতবাদ বা অন্যান্য ধ্যান-ধারণা তাদের মজ্জায় প্রবশ করে। দান্তে, মিলটন, এবং গ্রিক নাট্যকারদের ক্ষেত্রে এটা লক্ষ্য করা যায়। তবে সমাজে প্রচলিত ধ্যান-ধারণার সঙ্গে তাঁদের ব্যক্তিগত চিন্তা-চেতনা বা সংবেদনশীলতার মুখোমুখির ফলে যে স্ফুলিঙ্গ সৃষ্টি হয় তা থেকে সাহিত্য নতুন ফসল ফলে। যে সমাজে বসার গ্রহণযোগ্য কোনো বিশ্বাস বা ঐতিহ্য নেই সেখানে কবির আপনসত্তায় ডুব মারেন। ফলে কবিতায় বিষাদময় অন্তদর্শন প্রাধান্য পায়- যেটা কোনো কোনো রোমানটিক কবির বেলায় সত্য। হুইটম্যান এমন এক দেশে এবং এমন এক সমাজে মানুষ হয়েছিলেন যেখানে পুরোনো ঐতিহ্য বা ধ্যানধারণা গ্রহণযোগ্য ছিল না। তাই তিনি ইউরোপীয় কবিদের মতো প্রচলিত বিশ্বাস বা পৌরানিক কাহিনীকে তাঁর কবিতায় ব্যবহার করেননি; কিন্তু তা বলে তিনি আত্মমগ্ন হননি। তিনি তাঁর সত্তাকে বাইরের জগতের সঙ্গে সম্পর্কিত করার চেষ্টা করেছেন। এই কারণেই বাস্তব জীবন তাঁর কবিতায় প্রবলভাবে উপস্থিত। কিন্তু ‘বিদ্রোহী’তে বাংলাদেশের বাঙ্গালী জীবনের বাস্তব চিত্র তেমন প্রতিফলিত হয়নি। কবি বিদ্রোহবাণী প্রচার করেছেন কিন্তু তা করতে গিয়ে তিনি ইতিহাস, পুরান, হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের ঐতিহ্য ব্যবহার করেছেন। এমন কি তাঁর বিদ্রোহবাণী ভারতীয় ‘সোহহম’ এবং ইসলামী ‘আনাল হক’ তত্ত্ব দ্বারা। প্রভাবিত বলে কেউ কেউ মনে করেন। এই সব ঐতিহ্যের মধ্যে তিনি লালিত হয়েছেন, তাই সেটাকে গ্রহণ করে নিয়ে তার আলোকেই তিনি তাঁর আবেগ, অভিজ্ঞতার শিল্পরূপ উপস্থাপিত করেছেন।
‘সঙ অব মাইসেল্ফ’ ও ‘বদ্রোহী’র এই তুলনামুলক আলোচনার আলোকে নজরুলের কবিতাটির মূল্যায়ন করা যেতে পারে। জীবনবোধের ব্যাপকতা, গভীরতা, ভাব, আঙ্গিক- এসব দিক দিয়ে বিবেচনা করলে ‘সঙ অব মাইসেল্ফ’-এর পাশে ‘বিদ্রোহীকে কিছুটা নিষ্প্রভ মনে হতে পারে। কিন্তু স্বীকার করতেই হবে যে হুইম্যানের কবিতাটির সঙ্গে এর মৌলিক পার্থক্য এবং এর ছন্দ, শব্দ-বিন্যাস, বক্তব্যের ওজস্বিতা ও অপেক্ষাকৃত সুঠাম অবয়ব ‘বিদ্রোহী’কে একটা বিশিষ্টতা দান করেছে। তবে বাংলা কাব্যে ‘বিদ্রোহী’র স্থান যত উচ্চেই হোক না কেন একে অপূর্ব সৃষ্টি বললে অত্যুক্তি হবে। অপরপক্ষে “বিদেশী কবির পদচিহ্ন ধরে অগ্রসর হয়েও শেষ পর্যন্ত সমস্ত বক্তব্য আকুল আক্ষেপে পরিণত হয়েছে” এই অভিমত নিঃসন্দেহে একটি অবমূল্যায়ন।

তথ্য নির্দেশিকা:
১। “বিদ্রোহী’ যুগপ্রবর্তক কেন?” উত্তর নক্ষত্র (আনোয়ারা রহমান এ্যানা কর্তৃক সংকলিত ও সম্পাদিত), ২১শে ফেব্রুয়ারি, ১৯৮৩, পৃঃ ৬৩
২। সৈয়দ আলী আহসান : নজরুল ইসলাম (ঢাকা, ১৯৫৪) পৃ ১৯।
৩। আজহার উদ্দীন খান : নজরুল মানস-সমীক্ষা (জি,এ, হালিম সম্পাদিত) ঢাকা, ১৯৬৮, পৃঃ৪০; আতাউর রহমানঃ নজরুল কব্য-সমীক্ষা
(ডাকা, তৃতীয় সংস্করণ, ১৯৭৪) পৃ:১৩৫।
৪। মযহারুল ইসলাম : সাহিত্য পথে (ঢাকা, ১৯৬০) পৃঃ ১২৫।
৫। কাজী আব্দুল মান্নান : “নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতার পটভূমি” নজরুল মানস-সমীক্ষা, পৃঃ ৬৪-৭৪।

বিষয়সমূহঃTags: